এর মধ্যেই বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি) জ্বালানিসংকটের কারণে ওষুধের আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। গত ২৪ আগস্ট রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত বাপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির এই ইঙ্গিত দেওয়া হয়। সভায় বাপির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান জানান, তীব্র গ্যাসসংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানা সচল রাখতে জেনারেটর ও বিকল্প জ্বালানির (ডিজেল) ওপর তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সরকারি
এই অতিরিক্ত মূল্য ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির বিপরীতে ওষুধের দাম সমন্বয় না করায় ইতোমধ্যেই দেশের ১১৭টি অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশেরই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন উৎপাদকরা। নেতারা স্পষ্ট জানান, এই দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট ও বর্ধিত উৎপাদন খরচ যদি অব্যাহত থাকে, তবে একপর্যায়ে ওষুধের দাম বৃদ্ধি বা সমন্বয় করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৯১টি লাইসেন্সধারী ফার্মেসি রয়েছে। তবে তাদের অনলাইন ডেটাবেসে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৯৩টি ফার্মেসি তালিকাভুক্ত রয়েছে। বাকি ৫৫ হাজার ৪৯৮টি লাইসেন্স কী অবস্থায় আছে এ বিষয়ে জানা যায়নি। জানতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেনকে মেসেজ ও কল দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর বাসাবোর বাসিন্দা চায়না পারভীন (৫৫)। তিনি ও তার স্বামী দুজনই নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খান ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন নেন। চায়না বলেন, ‘দুই বছর আগেও আমাদের দুজনের ওষুধের পেছনে প্রতি মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা ব্যয় হতো। এখন ৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় ৪৩ শতাংশ খরচ বেড়েছে। স্বল্প আয়ের কারণে ওষুধের খরচ চালাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। এই সময়ে এক টাকাও ইনকাম বাড়েনি।’ যোগ করেন তিনি।
মিরপুরের বাসিন্দা হানিফ মিয়া একটি বাসায় দারোয়ানের কাজ করেন। পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। সম্প্রতি অসুস্থ হওয়ায় চিকিৎসকের কাছে যান। চিকিৎসক জানান, তিনি ফ্যাটিলিভার ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। চিকিৎসার জন্য ডাক্তাদের দেওয়া ওষুধ এক মাস খেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থের অভাবে ওষুধ কেনা বাদ দিয়েছেন।
ওষুধের দোকানের বিক্রয়কর্মীরা জানান, অ্যাজিথ্রো মাইসিন (৫০০ এমজি) প্রতি পিস দেড় বছর আগে ছিল ৩০ টাকা। এখন সেটি ৪০ টাকায় পাওয়া যায়। নাপা এক পাতার দাম ৮ টাকা ছিল। এখন ১২ টাকায় বিক্রি হয়। অ্যাভোলাক সিরাপ (অ্যারিস্টোফার্মা) দুই বছর আগে ১০০-১২০ টাকায় মিলতে। এখন দাম ২০০ টাকা। ৭ টাকার নিচে কোনো গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট-ক্যাপসুল পাওয়া যায় না, যা ৫ টাকায় আগে বিক্রি হতো। জীবন রক্ষাকারী ওরস্যালাইন এখন ৬ টাকায় বিক্রি হয়। এক বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে স্যালাইনের দাম। ফেক্সো ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে ৮০ টাকা ছিল। নাপা সিরাপের দাম ২০ টাকা ছিল, এখন ৩৫ টাকার নিচে পাওয়া যায় না।
আবার দোকানভেদে দামের ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণ ওষুধের দোকানে ৪০ পিসের ডায়াপারের দাম যেখানে ৬৫০ টাকা। সুপার মেডিকেল শপ লাজফার্মায় এটি বিক্রি হয় ৭৩০ টাকায়। জেনসুলিন আর ভায়াল ইনসুলিন সাধারণ ফার্মেসিতে পাওয়া যায় ৩৯০ টাকায়। লাজফার্মায় এর দাম ৪১৫ টাকা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা এর কারণ জানাতে পারেননি।
ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের পপুলার মেডিকেল কর্নার। এর স্বত্বাধিকারী নিজামউদ্দিন ২০ বছর ধরে ওষুধের ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ওষুধের দাম বাড়লেও কেনার মানুষের কমতি নেই। দিনে দিনে বিক্রি বেড়েই চলেছে।
গ্লোবাল ডেটা ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক নাগাদ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধের বাজারের আকার ৩৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রিত ওষুধের সরকারি দাম স্থির ছিল। ২০২২ সালে ৫৩টি ব্র্যান্ডের দাম বাড়ে। প্যারাসিটামল ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা, মেট্রোনিডাজল ৬০ পয়সা থেকে ১ টাকা করা হয়। ২০২৩ সালেও কিছু ওষুধের দাম বৃদ্ধির অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালে বাজারে ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিজস্বভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। অন্তত ৫০ ধরনের ওষুধের দাম ২০ থেকে ১৪০ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়।
মিরপুরের উত্তর টোলারবাগের মমতাজ ফার্মেসি। এই ফার্মেসির কর্ণধার রাজিব আহমেদ বলেন, সম্প্রতি স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম বেড়েছে। আগে সেনোরা ব্র্যান্ডের প্যাকেটের মূল্য ছিল ১৩০ টাকা। এখন ১৪০ টাকা হয়েছে। গর্ভকালের ওষুধের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসা খরচও। মফস্বল এলাকায় ৭০ শতাংশের বেশি অ্যান্টিবায়োটিক কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সরাসরি ফার্মেসি থেকে কিনে সেবন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের প্রতি ছয়টির মধ্যে একটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। সাধারণ টাইফয়েড, মূত্রনালির সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া রোগের চিকিৎসা জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘পৃথিবীতে এত ওষুধের দোকান কোথাও দেখিনি। এসব দোকানে কী ওষুধ বিক্রি হচ্ছে সেটিও দেখা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যেন ওষুধ থাকে–এ বিষয়ে সরকারকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। যেন গ্রামের দরিদ্র মানুষরাও ওষুধ কিনে খেতে পারেন। কিন্তু ঔষধ প্রশাসনের জনবলসংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি কমে এসেছে।










