০৩:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
মাসে দেড়শ’ কোটি টাকা অমুক্তিযোদ্ধার পেটে !
রোস্তম মল্লিক
প্রতিমাসে কমপক্ষে অনুমিত প্রায় দেড়শ’ কোটি; বছরে ১৮শ’ কোটি এবং ৫ বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা। অংকটা নেহাত হেলাফেলার নয়। এই টাকায় দেশের জন্য দরকারী কোন বড় প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অথচ উদ্যোগের অভাবে তা লোপাট করছে মুক্তিযোদ্ধা নামের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা একশ্রেণির প্রতারক। এটা চলে আসছে বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মানি চালু হওয়ার পর থেকে। সম্মানি বাড়লে, সমান তালে বাড়ছে এই অর্থ লোপাটের অংক। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু এই বেপরোয়া প্রতারণা থামাতে কেউ উদ্যোগী হন না। বরং সরকার বদলের সাথে এই প্রতারণায় টাকার অংক ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। আর এভাবে চলে আসছে বিগত প্রায় আড়াই দশক। এই ঘটনায় চরম বিরক্ত জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা; দারুণ ক্ষুব্ধ গোটা দেশবাসী। তথাপি কোন নড়চড় নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন প্রতিমাসে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮শ মুক্তিযোদ্ধাকে ৩শ ৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা সম্মানী ভাতা দিয়ে আসছে। একই সাথে, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ১১ হাজার যুদ্ধাহত এবং খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্ন অংকের সম্মানী প্রদান করছে। ওয়াকেবহাল মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, কল্যাণ ট্রাস্টের যুদ্ধাহত তালিকায় যথেষ্ট নয় ছয় করা হয়েছে, যা কঠোর তদন্ত হওয়া উচিত। আর প্রাপ্ত তথ্যের জেরে ধারণা করা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের করা মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী বিতরণের হালনাগাদ তালিকায় ঘাপটি মেরে রয়েছে কম পক্ষে প্রায় ৭০ হাজারের বেশী অমুক্তিযোদ্ধা। এটা জানেন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরাও। কিন্তু প্রতিকারের কোন সরকারী পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। বরং নতুন করে ‘বাদ পড়া মুক্তিযোদ্ধা’ নামে আরও কিছু তালিকায় ঢোকানোর পায়তারা চলছে। এভাবেই চলে আসছে জনগনের কষ্টের টাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদানের মহতি কাজের পাশাপাশি কিছু প্রতারকের পেট ভরানোর নিন্দনীয় কার্যক্রম।
এই ব্যাপারে যে প্রশ্ন অতি গুরুতর তা হলো, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা কতো? সরকারী তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, স্বাধীনতার পর মুজিব নগর সরকারের মন্ত্রীসভা ঢাকায় ফিরে ২৩ ডিসেম্বর প্রথম যে বৈঠক করেছিল তার সবগুলো সিদ্ধান্তই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে। সেই বৈঠকে মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পন ও জাতীয় মিলিশিয়া ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। তাৎক্ষণিক সরকারী রেকর্ডের ভিত্তিতে অনুমিত ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের জন্য জনপ্রতি মাসিক বরাদ্দ ৫০ টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল। তখন সারা দেশে ৫৩টি মিলিশিয়া ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার পর রেকর্ডবিহীন মুক্তিযোদ্ধারাও অস্ত্র সমর্পন শেষে ক্যাম্পে রিপোর্ট করেছিলেন। বাহাত্তরের মার্চ মাসে ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়া হলে অজ্ঞাত কারণে মিলিশিয়া ক্যাম্পে প্রায় ২ মাস অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোন তালিকা সংরক্ষণ করা হয়নি। অর্থাৎ ‘৭২ সালের ওই ঘটনা থেকে সূত্রপাত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে পরবর্তীকালের যাবতীয় সমস্যার।
বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ‘৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক অবদান এবং অর্জিত মর্যাদা বিবেচনা করে তিনি একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেন, যাতে পদাধিকার বলে সভাপতি করা হয়েছিল সেনাবাহিনী প্রধানকে। সেই তালিকার পুরো কাজ সরাসরি তত্বাবধান করেছিল সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। জাতীয় কমিটি দীর্ঘ ৭ বছর নিবিড় পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ১ লাখ ২ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চুড়ান্ত করেছিল। ‘৮৭ সালে তালিকাটি সরকারীভাবে ৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এটিই ছিল দেশে মুক্তিযোদ্ধার প্রথম এবং সরকারী উদ্যোগে প্রণীত একমাত্র তালিকা, যা মুক্তিযোদ্ধার জাতীয় তালিকা নামে পরিচিত। এই তালিকা তৈরীর সময় জাতীয় কমিটির সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আমীন আহমেদ চৌধুরী, বীর বিক্রম এফএফ মুক্তিযোদ্ধার বেশকিছু ডকুমেন্ট খুঁজে পেয়েছিলেন। পরে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলে সেই ডকুমেন্টগুলো স্থায়ীভাবে বিভাগওয়ারী শ্রেণিবদ্ধ করেন। মোট ৬৯ হাজার এফএফ যোদ্ধার সে তালিকাটি ভারতীয় তালিকা নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। উল্লেখ্য, কথিত ভারতীয় তালিকার অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই পরে জাতীয় তালিকাতেও নাম লিখিয়েছেন। সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অন্যবিধ কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণ নামগুলো জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। জানা যায়, পরবর্তীকালে তৈরী হওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভোটার তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা তালিকা এবং সরাসরি গেজেটের মাধ্যমে জাতীয় তালিকার বাইরে থেকে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নামগুলো তালিকাভূক্ত হলেও মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কহীন হাজার হাজার দূরাচারী ব্যক্তিরাও তাতে নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছিল। আর এভাবেই আত্মপ্রকাশ ঘটে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চরম অসম্মানজনক ‘ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি; এবং মুক্তিযোদ্ধা নামের আড়াল নিয়ে জনগণের টাকা লোপাটের নিরাপদ আয়োজন।
বীর মুক্তিযোদ্ধার সঠিক তালিকা করা আসলেই কি অসম্ভব- এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন অতীতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিভিন্ন কমান্ডে দায়িত্ব পালনসহ তালিকা নিয়ে নানাভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেশ ক’জন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের দাবী, সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধার চুড়ান্ত ও সঠিক একটি তালিকা তৈরী করা সর্বোচ্চ ৩ মাসের কাজ। তাদের অভিমত, একাত্তরে মুক্তিবাহিনী ছিল বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সেনাবাহিনী। এদের তালিকা করার দায়িত্ব ছিল সরকারের, কোন সংগঠনের নয়। সময়মত সেটা করা না হলেও এক সময় সরকারী উদ্যোগে সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্বাবধানেই সেটি সম্পন্ন হয়েছিল। এতে উঠে এসেছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার প্রায় ৮৫ শতাংশের বেশি নাম। তারা যুক্তি দিয়ে বলেন, জাতীয় তালিকা যে সময়ে করা হয়েছিল অর্থাৎ ‘৭৯-৮৭ সালে; তখন মুক্তিযোদ্ধাদের কোন আর্থিক অনুদান ছিল না। সামাজিকভাবেও তখন মুক্তিযোদ্ধা ব্যাতীত অন্য কেউ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে সাহস করতো না। কাজেই ‘৮৭ সালে করা জাতীয় তালিকা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য। নকল ব্যক্তিরা ঢুকেছে সম্মানি ভাতা এবং সন্তানদের চাকুরীর কোটা চালু হওয়ার পর থেকে। সুতরাং ন্যায্যতার ভিত্তিতে জাতীয় তালিকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের কথিত ভারতীয় তালিকার নামগুলো অবিকৃত রেখে মুক্তিযোদ্ধার সমন্বিত তালিকা থেকে বাকী নামগুলো খুঁজে নিলেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা হয়ে যায়।
তারা আরও বলেন, এখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পূণরুজ্জিবিত হওয়ায় কাজটা আরও সহজ হয়েছে। মন্ত্রণালয় অথবা এর অধীন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধা চেনে না এবং সেই খোঁজখবর করার মত জনবল বা সক্ষমতাও তাদের নেই। মুক্তিযোদ্ধা চেনেন স্ব স্ব উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা। কাজেই এ কাজে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাহায্য লাগবে। তারা জানান, বিগত সরকার আমলে পূনরুজ্জীবিত
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সকল কমান্ডে এখন দায়িত্ব পালন করছেন আশির দশকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ করা বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এরা মূলত অমুক্তিযোদ্ধার যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ হয়ে হারানো গৌরব পূণরুদ্ধারের গরজে শেষ বয়সে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বে। কাজেই এদের উপর আস্থা রেখে মাত্র ১৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ের কাজ উপজেলা কমান্ডের উপর ন্যস্ত করা উচিত। মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, প্রতি মাসে রাষ্ট্রের প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা যাচ্ছে প্রতারকদের উদরে; যা ঠেকানো না হলে এই আর্থিক ক্ষতি অনন্তকাল চলতেই থাকবে।
জানা যায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আমলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মাঝপথে থমকে যায়। গত বছর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করতে গেলে আইনগত কর্তৃত্বের প্রশ্ন তুলে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল- জামুকা তা স্থগিত করেছে। এভাবেই থমকে আছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একান্ত প্রত্যাশা তাদের নামের তালিকা সঠিক করার কাজ। সমগ্র দেশবাসীরও এটাই দাবী। এই ব্যাপারে মন্ত্রণায়ের উদ্যোগহীনতার কি কারণ, তা কারও বোধগম্য নয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সূত্রে জানা যায়, একদা যে জামুকার কমিটি ছিল মুক্তিযোদ্ধা তৈরীর কুখ্যাত অটো মেশিন; বিগত সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক উপদেস্টা তাকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিলেন। সেই নতুন কমিটির হাতে পড়ে জামুকা হয়েছিল অমুক্তিযোদ্ধা বিতাড়নের কার্যকর যন্ত্র। বর্তমান মন্ত্রী সে কমিটি ভেঙে দিয়েছেন। এখন জামুকায় কোন কমিটি নেই। এতে করে আটকে আছে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ের কাজ। জানা যায়, সম্প্রতি ‘বাদপড়া মুক্তিযোদ্ধা’ হিসাবে তালিকাভূক্তির জন্য নতুন করে আবেদন নেবার উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিদ্যমান তালিকায় থাকা বিপুল সংখ্যক অমুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ দেওয়ার পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো নতুন আবেদন নেওয়ার বিষয়টি অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের আশংকা, এই ঘটনা চরম বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তারা বলেন, মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ ‘৯৮ সালে আওয়ামী লীগ আমলের লাল বই তালিকার মতই আরেক দফা অমুক্তিযোদ্ধা আমদানির পূণরাবৃত্তি ঘটালে মোটেই অবাক হওয়া যাবে না।
ট্যাগস :










