ডিজিটাল বাংলাদেশ:এক সাগর হতাশা নিয়ে বেঁচে আছে মানুষ!
রোস্তম মল্লিক
নদীর সাথে জীবন জড়ানো। জীবন খানিকটা নদীর মতোই। নদীর থেমে থাকার উপায় নেই। থামলেই জীবন শেষ নদীর। তাকে বইতেই হবে। যেতে হবে বহুদূর। যত বাধা-বিপত্তিই আসুক, সবকিছু নিয়েই ধাবিত হতে হবে। নতুন বাঁক আসবে। আসবে নতুন কূলও। সবই ধারণ করে বুকের পাঁজরে বন্দী করে জয় করতে হবে পথ। জীবনও তেমনই। তেমনই তার বৈশিষ্ট্য। জীবন তারই হয়ে ওঠে যে জীবনের বয়ে চলা সময়কে আপন করে নেয়। গুরুত্ব দেয়। কারণ সময়েরও রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ শিল্পকলা। এ শিল্পকলাই জীবন চলার পথে এগিয়ে দেয় মানবজাতিকে। জীবনের পাঠ কখনো এক নয়। হওয়ারও নয়। প্রতিটি জীবনেরই আছে নতুন গল্প। আছে নতুন চিত্র। একজন শিল্পী যখন ছবি আঁকে সে তার মনের ছবিটিই ফুটিয়ে তোলে ক্যানভাসে। রঙের আলোয় ভরিয়ে তোলে অবয়ব। তেমনি জীবন যার তাকেই বয়ে নিয়ে যেতে হবে। আনন্দের করে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ জীবন জীবনের জন্য।
পরাজয় শব্দটি ঘুরেফিরেই আসে আমাদের জীবনে। আসে হতাশা নিয়ে। কিছু হলেও কষ্ট নিয়ে। আসলে জয় আছে বলেই কিন্তু পরাজয়। দৌড় প্রতিযোগিতায় কি সবাই জয়ী হবে? পরীক্ষায় কি সবাই প্রথম হবে? শেষ বেঞ্চের ছেলেটি বা মেয়েটি জীবনের রেসে পিছিয়েই থাকবে? না কিন্তু। কখনো না। এটিই জানতে হবে। মানতেও হবে। যেকোনো বিষয়ে অংশগ্রহণ করার আনন্দ কী। বুঝতে হবে উদার হওয়ার সুখ। মনকে আকাশের মতো করতে হবে। দৃঢ় হতে হবে পাহাড়ের মতো। তবেই জয় আর পরাজয়ের আনন্দ আসবে জীবনে। প্রতিটি মুহূর্তেরই আছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। আছে ধরন। শুধু উপলব্ধির প্রয়োজন। একটি মুভিতে দেখেছিলাম, এক বন্ধু অপর এক বন্ধুকে বলছে বন্ধুর হেরে যাওয়ায় কষ্ট হয় জানতাম। কিন্তু এটা আজ প্রথম জানলাম বন্ধু যদি বেশি ভালো করে তাহলে বেশি কষ্ট হয়। কথাটা কিন্তু নিরেট সত্য। শুধু মানতে পারি না। পারি না বলেই পিছিয়ে থাকা। এভাবে অনেকেই সময়ের এই খাতা শূন্য রেখেই এগোতে চান। জয়ী হতে চান। সময় কিন্তু নিয়ম মেনে চলে। ফলে সে ঠিকই তার সময়ে জীবন ডায়েরির পাতা ভরাট করে ফেলে। তাই জয় আর পরাজয়ের এই সময় যার তার পাঠক হয়ে ওঠে মানুষ।
জন্ম থেকেই চলছি। থেমে নেই এতটুকুও। তবুও কি জানতে পেরেছি আসলে কিভাবে চলতে হবে। কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে। একটি মা যখন মা হয়ে ওঠেন তখনো তাকে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ছেলে হবে নাকি মেয়ে। যে সন্তানটি আজ ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছে তারাই বাবা-মা হয়ে ছেলে আর মেয়েতে পার্থক্য তৈরি করছে। করছে কিছু ভেবে? নাকি সবাই করছে বা বলছে তারই প্রভাব। এসবই আসলে প্রশ্ন। উত্তর জানা নেই একটিরও। যত মত তত পথ। এখানে বলব সময়ের অপেক্ষার গল্প। আশ্চর্য হলেও সত্যি এটাই কখনো কখনো আমরা আমাদের কর্ম দ্বারা সময়ের পরীক্ষার মুখোমুখি হই। তখন আমরা আমাদের সামনে আয়না দেখি। সবাই কি দেখি? যারাই দেখি তাদেরই পথ হয়ে ওঠে আকাশ মুখো। ঊর্ধগামী। যারাই সময়ের এই অনুভূতির গভীরতায় প্রবেশ করতে পারি না তাদেরই পড়ে থাকতে হয় আফসোসের ঘেরে।
ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলা শিশুটিও বুঝতে পারে তাকে এগোতে হবে। তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। বেড়ে ওঠার সময়ে নতুন নতুন সম্পর্কের ঘেরাটোপে নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে। চাইতে হবে। লড়াই করতে হবে। কখনো কখনো ছোট্ট শিশু কেড়ে নেয় তার অধিকার। বর্তমান ব্যস্ততার যুগে এভাবেই আদায় করতে হবে এটাও বোঝা যায় সহজেই। কারণ জীবনযুদ্ধে কোনো কিছুই সহজলভ্য নয়। আক্ষরিক অর্থে আমরা সবাই স্বার্থপর হয়ে উঠছি। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় মেতে আছি। যা বেলাশেষে আমাদেরই হতাশায় ঢেকে দিচ্ছে। শিশুদের কলকাকলির আনন্দ নিতে হবে। তাদের অধিকারকে মানতে হবে। সময় দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তবেই নতুন গানের কলির মতো জীবন হয়ে উঠবে আনন্দের। নতুন পথ তৈরির আনন্দও ভিন্নতায় জাগ্রত। প্রাণবন্ত জীবনের সঙ্গ চায় সবাই। আজ-আগামীকাল কিংবা পরশু কে না চায় সাফল্যের পথে এগোতে। কেউ কেউ তো দৌড়াতে ভালোবাসে। কিন্তু পরক্ষণেই হাঁপিয়ে ওঠার রিস্ক নিতে হয়। তাই সহনশীলতা খুব জরুরি বিষয়। আমার সক্ষমতা কতটুকু। আমি কতটা ধারণ করতে পারি। কতটা দিতে পারি নিজেকে। এটা আমাকেই স্থির করতে হবে। এভাবেই সাফল্যের দ্বারে পৌঁছানো সম্ভব।
পুরনো পৃথিবীর অংশ হতে চায় সবাই। স্বপ্নমাখা ভোর চায়। তারাদের আলোয় আলোকিত জীবন চায়। চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যেই কষ্ট লুকিয়ে থাকে। চাপা বেদনায় বুকভার হয়ে আসে। এসবই জীবনের পাঠ। ভোরের শুভ্রতা আছে বলেই অন্ধকারও রঙিন। কারণ অন্ধকারেরও আছে নিজস্ব ভাষা। প্রকৃতির পাঠ যে যতবেশি রপ্ত করতে পারে জীবন তার জন্য হয়ে ওঠে ততটাই আনন্দের। উচ্ছ্বাসের। কাগজ-কলম কখনো সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা করতে পারে না। সৌন্দর্যের ঔদার্যের জন্য দাঁড়াতে হয় এর কাছে। কারণ আমরা আজ যে সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে পাহাড়সম প্রতিকূলতা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায়ই আজ দৌড়ের প্রতিযাগিতা। একটা সময় ছিল শিশু থেকে যুবক সব বয়সেই নিজেরা তাদের তৈরি পথে সামনে এগোত। স্বপ্ন আঁকত। কল্পনায় মেতে উঠত মন। তারই বাস্তবায়নে নিজেকে ঢেলে দিতো স্বপ্ন পূরণে। কারণ যে যত বেশি স্বপ্নময় সে ততবেশি বাস্তবিক। কিন্তু এ সময়ের চিত্রে পুরোই উল্টো চিত্র দৃশ্যমান। এখনকার শিশু থেকে যুবক সব বয়সের শিশুদের বাবা-মাই তাদের হয়ে স্বপ্ন দেখেন। এবং প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় হতে না পারলে হতাশায় আক্রান্ত হন। যা ভীষণ কষ্টময়। আমরা বাবা-মায়েরা সন্তানের জন্য সবচেয়ে উঁচু আসনের প্রত্যাশা রাখি। এটা ভুল কিছু নয়। অন্যায়ও নয়। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শিশুদের স্বপ্ন দেখার পথে বাধা হয়ে উঠি। প্রতিভার পথ দুর্গম হয়ে উঠলে সৃষ্টিশীলতা মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই পথ তৈরির প্রয়োজন। এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা প্রয়োজন। প্রয়োজন একটি মনের ভাবনাকে গ্রহণ করা। বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। তবেই পৃথিবীর বুকে চিহ্ন আঁকবে পথ।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ আমি আমরা। প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্ব আজ চোখের সান্নিধ্যে। এ সময়েও দেখা মেলে ফুটপাথে পড়ে থাকা অসহায়ত্বের। এখনো লাইটপোস্টের আলোয় পড়াশোনা করবার চিত্র চোখে পড়ে। আজো ডাস্টবিনে পড়ে থাকা খাবার কুড়িয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে পথশিশু-বৃদ্ধ। এখনো অনেক ঘরে শুধু কচু শাক আর আলু পোড়ার গন্ধ নাকে আসে। পোশাকের বিচিত্রতা তো অলীকস্বপ্ন। তবুও তাদের মুখের হাসির লহমায় খুঁজ মেলে পরিতৃপ্তি। কী অদ্ভুত। কী দুঃসাহস। এত এত না-এর মধ্যেও কেমন করে হাসির ঝুল ঝরতে পারে। এ এক রহস্যই। এটাই শিক্ষার। এটাই জানবার। বেঁচে থাকার শক্তির উৎস কেমন করে আসে। কেমন করে তৈরি হয় পথ। আনন্দকে কতটা আনন্দের করে নেয়া যায়। যুগে যুগে কবিরা গেয়েছেন কষ্টের গান। লিখেছেন শতশত কবিতা। কেমন করে প্রতিকূলতার মধ্যেই জীবনের সুখ খুঁজে নিতে হয়। আলোকিত জীবনের গল্প হওয়া যায়।
সৃষ্টির আরম্ভ থেকেই চলে যাওয়ার সূচনা। যে আসছে বা আসবে সবাইকে চলে যেতে হবে। অকাট্য এ সত্য উপলব্ধিই বলে দিচ্ছে কতটা স্পষ্টতায়-দৃঢ়তায় এগোতে হবে। আসলে চাইলেই কি পেছনে যাওয়া যায়? যায় না। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়ার মতো বোকামি আর কিছুতেই পাওয়া সম্ভব না। কাঁটা আছে জেনেও ফুল থেকে কেউ দূরে থাকে না। নদীর গভীরতা আছে জেনেও মানুষ নদীকে ভালোবাসে। পাহাড়ের উচ্চতাও পারেনি মানুষকে থামিয়ে রাখতে। এমনকি চাঁদের দেশেও পৌঁছে গেছে মানুষ। কৌতূহলী মন কখনো থেমে থাকবার নয়। সে জাগ্রত। রহস্যভেদ করাই তার কাজ। ঠিক তেমনি জীবনও রহস্যঘেরা। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বহুবিধ পরিস্থিতির মোকাবেলায় জীবন পরীক্ষার মুখোমুখি। কেউ সুখ দিয়ে দুঃখ কিনছে। কেউবা দুঃখকে শক্তি বানিয়ে রহস্যভেদ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দিগন্তচারী কল্পনার উদ্যমতা সীমাহীন বিস্তৃত। তাই তো কবি ফররুখ আহমদ সাত সাগরের মাঝি কবিতায় বলেছেন,‘কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হলো জানি না তা’। নারাঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা। দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা। তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?
সাফল্যময় জীবন পেতে সত্যকে গ্রহণ করতে হয়। সজাগ চোখ রাখতে হয়। প্রতিটি মানুষই চায় গুছিয়ে নিতে জীবনকে। চলতে চলতে দেখতে হয়। আবার কখনো কখনো দেখে দেখে থামতে হয়। ভাবতে হয়। নতুন বাঁকে পৌঁছে যাওয়া। স্বপ্নের দোলাচলে মাপতে হয়। কাছাকাছি পাশাপাশি চলতে হয়। আরো হয় জগৎকে আবিষ্কারের নেশায় দিকপানে ছুটে বেড়ানো। তাই তো কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার সঙ্কল্প কবিতায় বলেন, ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’ কবিদের এমন বাণীই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষকে উজ্জীবিত করে। মানুষ প্রাণ পায় স্বপ্নকে বাস্তবায়নের। যা চলে যায় তা আর ফিরে না। একেবারেই যায়। তাই হারানো যা কিছুই তা নিয়ে ভাবনা নয়। নতুনের অপেক্ষায় নতুন আনন্দের খোঁজ নতুন দিগন্তের কাছে পৌঁছে দেবে।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতা খুব সহজ নয়। খুব যে কঠিন তা-ও নয়। মূলত বোঝা আর না বোঝার মধ্যেই এর বিচরণ। একটি পাখি যেমন করে তার নীড় বোনে। মৌমাছি যেমনিভাবে মধু সঞ্চয় করে। ফুল ও ফল মানুষ তথা প্রাণিজগতের ক্ষুধা মেটায়। তেমনিভাবে প্রকৃতির শিক্ষাই পারে মানুষকে পরিণতবোধে তৈরি করতে। যারা চাইবে তারাই জীবনের আনন্দিত সময়ের সাক্ষী হবে। যারা চাইবে না তারা পিছিয়ে থাকবে। পিছিয়ে পড়ে কখনো সময়ের সাক্ষী হওয়া যায় না। কারণ সময় তো বহমান। একজন কৃষকের কাছে সবচেয়ে দামি তার ফসল। অতিবৃষ্টিতে যখন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখনো কষ্ট নিয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে হয়। মানতে হবে চলার পথ সবসময়ই কঠিন। তাকে সহজ করে নিতে হয়। ধৈর্যধারণ করতে হয়। যারা চমৎকারভাবে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নেয় তাদের জন্য আগামীর সুন্দর সময় অপেক্ষমাণ। কারণ গতিই জীবন। গতিময়তাকে গভীর ভালোবাসায় ধারণ করেছেন কবি আল্লামা ইকবাল। তিনি বলেন, ‘দুর্বার তরঙ্গ এক বয়ে গেল তীর-তীব্র বেগে, বলে গেল : আমি আছি যে মুহূর্তে আমি গতিমান; যখনি হারাই গতি সে মুহূর্তে আমি আর নাই।’
লেখক: সাংবাদিক,কলামিষ্ট,গীতিকার ও গবেষক
















