জরুরী ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন আমলাতন্ত্রে
রোস্তম মল্লিক
বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতালিপ্সা একটি মস্তবড় সমস্যা। আমলারা ক্ষমতা হাতছাড়া করতে চায়না বরং ক্রমাগতভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সচেষ্ট হয়। ফলে তাদের অধীনস্থ দপ্তরগুলো ক্ষমতাশূন্য হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুনের কোন ধরনের পরিবর্তনকে এরা সহজে মেনে নিতে চায়না।
আমলাতন্ত্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। আমলাগণ সমাজের অন্যান্য অংশের তুলনায় নিজেদেরকে বিছিন্ন ও স্বতন্ত্র বলে গণ্য করেন। আমলাগণ পেশাদারী প্রশাসক। বৈষয়িক উন্নতি এবং প্রশাসনে নতুন মর্যাদা অর্জনের জন্য আমলাগণ সর্বদাইসচেষ্ট থাকেন। জনজীবনেরসমস্যাসম্পর্কে তারা সজাগ থাকেননা। দেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত থাকার জন্য সমাজের অন্যান্য অংশের দের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য মনোভাব গড়ে ওঠে। নিজের পদোন্নতি এবং বৈষয়িক পুরস্কার অর্জন তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত করে। সাধারণ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিক সংগঠনের ফলপ্রসূ কার্য-পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা।
আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতা, আনুষ্ঠানিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিচ্ছার ফলে জনগণের সমস্যার কথা, আবেদন-নিবেদন তাঁদের কাছে প্রেরিত হলে সহজে সেই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। সকল প্রস্তাব দীর্ঘদিন ফাইলবন্দী থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা বিলম্বিত হয়। ফাইলের লাল ফিতা খোলা হয় না। এজন্য অনেকে মনে করেন আমলাতন্ত্র হচ্ছে লাল ফিতার দৌরাত্ম।
আমলাতন্ত্রের ঔদাসীন্য, আনুষ্ঠানিকতা, রুটিন মাফিক কাজের প্রবণতা, দীর্ঘসূত্রিতা, বিভাগীয় মনোভাব এবং গড়িমসির প্রচেষ্টা দূর করার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটি প্রশাসনিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আমলা প্রশাসন উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। সুতরাং সেই সুদূর অতীত থেকে আমলাতন্ত্রের যে সমস্যাগুলো এই উপমহাদেশে আসন গেড়েছে, তাওউত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আমলাগণের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এর অতিবিকাশ ঘটেছে, ফলে সেবকের অবস্থান থেকে তারা প্রভুর অবস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পিছনে কিছু কারণ বিদ্যমান রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব একটি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। নেতৃত্বের দুর্বলতা ও সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিদের অদক্ষতার সুযোগে আমলাগণ প্রশাসনে অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে।
দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে আমলাগণ প্রশাসনে অধিক ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পেয়েছে। অতিরিক্ত ক্ষমতা চর্চার ফলে আমলাগণ জন-সেবকের পরিবর্তে নিজেদেরকে প্রভুর ভূমিকায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন।
উপরিউক্ত কারণ ছাড়াও রাজনৈতিক দল, জনমত, নির্বাচক মন্ডলী কোনটাই এখানে সুসংগঠিত নয়। যার ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান অত্যন্ত নিম্ন। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগেও বিভিন্ন দুর্বলতা বিদ্যমান। বাংলাদেশে এ সবের অভাব তীব্র ভাবে বিদ্যমান থাকায় একটি সংঘবদ্ধ শ্রেণি হিসেবে আমলাতন্ত্রের অতি বিকাশ ঘটেছে।
এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শহরায়ন, শিল্পায়ন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ইত্যাদি কারণে আমলাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ায় বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের অতি বিকাশ ঘটেছে।
জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যসিবাদীর উৎখাতকারী ছাত্র-জনতার আকাংখার প্রতীক অন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাগণের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলছি দেশের স্বার্থে, জনস্বার্থে আমলাতন্ত্রের অতিবিকশিত ব্যবস্থায় লাগাম টানার ব্যবস্থা গ্রহন করুন। আমলাতন্ত্রে জনবান্ধবমুখী পেশাদারী মনোভাব তৈরীর জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা নিন-ব্যবস্থা নিন বিদ্যমান আইনের কঠিন প্রয়োগের।প্রভুত্ব নয় জনসেবা হউক আমলাতন্ত্রের অন্যতম অংগীকার। বৈষম্যমুক্ত এবং কল্যাণকর রাষ্ট বিনির্মানে জরুরী ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন আমলাতন্ত্রে।











