০৩:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষত: শিল্প সচিব মো: ওবায়দুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হলো কেন?

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. ওবায়দুর রহমান ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৬ সালের ০৯ জুন তারিখে তাকে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে তাঁর জায়গায় নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর কর্মজীবন এবং পেশাজীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো: তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতক (স্নাতক) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। চাকরি জীবন শুরু করেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার হিসেবে। পরবর্তীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে পঞ্চগড়, বাগেরহাট ও নালিতাবাড়ী; উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা ও খুলনা এবং বাগেরহাটে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে যোগদানের আগে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পদের পাশাপাশি তিনি এসএমই ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারপারসন হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কর্ম জীবনে তিনি একজন নির্লোভ, সত, মিতব্যায়ী ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে সর্বমহলে স্বীকৃত। কোনদিন কারো কাছ থেকে ১ টাকা ঘুস খেয়েছেন এমন প্রমাণও নেই। ছাত্র জীবনে তিনি মাগুরা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মত নিষ্ঠাবান জাতীয়তাবাদী ঘরাণার আমলা বর্তমান সময়ে খুব কমই আছেন।
অথচ: তাকে অজ্ঞাত কারণে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সবিয়ে দিয়ে তদস্থলে একজন চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারের এই আকর্ষিক সিদ্ধান্তে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সকল শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা আহত হয়েছেন। তাদের চোখে অশ্রু নেমে এসেছে। বাংলাদেশ সচিবালয়ের অনেক বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, মো: ওবায়দুর রহমানের মত এমন একজন নম্্র, ভদ্র, নীতিবান ও দক্ষ সচিবকে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ওএসডি করা একদম উচিত হয়নি। সম্ভাবত; তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোন ক্ষমতাবানের আক্রোশের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিষয়টি পুর্ণবিবেচনার জন্য তাঁরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ খুবই পরিচিত একটি প্রক্রিয়া। এতে অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তা সুযোগ পেলেও বঞ্চিত হন চাকরিতে থাকা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা। ফলে একটা শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়। বিগত সময়ে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তিনটি আমলে প্রশাসনে নির্বিচারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি ভারসাম্য নষ্ট করে প্রশাসনকে বিশৃঙ্খল করে তুলেছিল।
গণঅভ্যুত্থানের পর ড. ইউনুস সরকারের সময়েও বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তিতে নিয়োগ অব্যাহত ছিল। আবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রশাসন সাজানোর ক্ষেত্রে তারাও অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির পথেই হাঁটছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা বলছেন, নতুন একটা সরকারকে গুছিয়ে নিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তিতে নিয়োগের ওপর সরকারের নির্ভরশীল হওয়া ঠিক হবে না।
এখন ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী অবসরে যাওয়া যে কাউকেই চুক্তিতে চাকরিতে ফেরাতে পারে সরকার। তবে নিয়মিত ব্যাচের কর্মরত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে তাদের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তারা দলীয় আনুকূল্য অর্জনের চেষ্টা করেন। ফলে জনপ্রশাসনে একটি ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদেরই চাকরির মেয়াদ শেষে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদোন্নতি পান না।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। আর বীর মুক্তিযোদ্ধা হলে অবসরের বয়স ৬০ বছর।
জনপ্রশাসনের বিশেষায়িত বা কারিগরি পদে কর্মকর্তা সংকটের কারণে গত শতকের আশির দশকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন হয়। কিন্তু পরে বিষয়টি প্রশাসন রাজনীতিকীকরণের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সরকারগুলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের চাকরিতে রেখে দিচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
চলমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ১ মার্চ তখনকার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওই সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে এর জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো সরকারই তা করেনি।
একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘কোনো সরকারই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা করেনি, কারণ এতে এটি অপব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে। মূলত আস্থাভাজন ও দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগটি ব্যবহার করা হয়। বাছ-বিচারহীনভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়মিত কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে।’

জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষত:
মূলত ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ এর ৪৯ ধারার ক্ষমতাবলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আইনের ৪৯ ধারার ১-উপধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের পর, সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করিতে পারিবেন।’ উপধারা-২ এ বলা হয়েছে ‘উপ-ধারা (১) এর অধীন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি ভোগরত থাকিলে, উক্ত ছুটি স্থগিত থাকিবে এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সমাপ্তির পর উক্ত অবশিষ্ট অবসর-উত্তর ছুঁটি ও তদ্সংশ্লিষ্ট সুবিধা ভোগ করা যাইবে।’ সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘নতুন একটি সরকারকে চুক্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া লাগবে। এ কারণে তাদের চুক্তি দিতে হবে যে, অনেক কর্মকর্তা বিএনপির অপবাদ নিয়ে গত ১৫/১৬ বছর অনেক কষ্ট করেছেন। যেহেতু বিএনপির তকমা তাদের গায়ে লেগেছে, তাই বিএনপি তো তাদের একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘সবাইকে তো চুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, অল্পসল্প কিছু কর্মকর্তাকে দেওয়া- যারা যোগ্য, দক্ষ ও সৎ; যারা দেশের কাজে লাগবে।’ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সব সময়েই হয়েছে জানিয়ে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘তবে আওয়ামী লীগ আমলে ঢালাওভাবে হয়েছে। সেভাবে যেন না হয়, সেই বিষয়ে নজর দিতে হবে। সেভাবে এ সরকার করলে সেটা সরকার ও দেশের জন্য ভালো হবে না।’ নতুন একটি সরকার এলে একটি গ্যাপ সৃষ্টি হয়। বিভিন্নভাবে এতদিন গেছে। জুলাই বিপ্লবের মধ্যদিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সরকার দেশ পরিচালনাও করেছে। এখন আবার নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় সরকার এসেছে। প্রত্যেকটি সরকারের নিজস্ব কিছু পলিসি থাকে। সরকারের মেনিফেস্টো থাকে, সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয় থাকে। সেক্ষেত্রে দু-চারজন এক্সপার্টাইজ ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হয়। তবে এটা সাময়িক। সাবেক এ আমলা আরও বলেন, ‘তবে এটা ভালো যে, এ সরকার কাউকে এক বছরের বেশি চুক্তি দিচ্ছে না। যদি দেখা যায় এক বছর তার পারফরম্যান্স ভালো, তাহলে তার মেয়াদ বাড়বে। না হয় এক বছর পরই বিদায় করে দেওয়া উচিত হবে।’

নতুন সরকারের চুক্তিতে যত নিয়োগ:
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তরবর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। ১ মার্চ চুক্তিতে ধর্ম সচিব নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনিও এক বছরের জন্য চুক্তিতে এ নিয়োগ পান। ৩ মার্চ চুক্তিভিত্তিতে চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চারজন সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যে মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, রফিকুল আই মোহাম্মদকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, আবদুল খালেককে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এবং মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবাইকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিতে নিয়োগ পান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল। ২৫ মার্চ এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ২৮ মার্চ তার সেই নিয়োগ আদেশ আবার বাতিলও হয়।

প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক:
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও জরুরি বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। নির্ধারিত পদে যোগ্য ব্যক্তি না পেলে দায়িত্বরত ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত কাউকে চুক্তিতে দায়িত্ব দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তবে যোগ্য ব্যক্তির পদোন্নতি করে পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর অভিযোগ আসে মাঝে মধ্যে। এক্ষেত্রে দলীয় লেজুড়বৃত্তি কিংবা অর্থ লেনদেনের ঘটনাও থাকে। সচিব কিংবা দপ্তর প্রধান যে পদেই হোক না চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আগে কর্মরত সত্যিকারের দক্ষ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়ছেন কিনা তা পরখ করতে অভিমত দিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। একই সচিবকে চার বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দৃষ্টান্ত আছে। কেউ কেউ টানা আট বছর একই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রশাসনের ভারসাম্য আনতে অনেককে ওএসডি আবার কাউকে অবসরে পাঠাতে হয়েছে। সে সময় অবসরপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। আবার শেখ হাসিনার আমলে বঞ্চিত হওয়া বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয় ড. ইউনুস সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা চলছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে ১৩ জন সচিবকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে। এরপর অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। অন্তরবর্তী সরকারের আমলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারাও আছেন। যেমন-মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে এক বছরের চুক্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেধাতন্ত্র’ বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
২০১৪ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে নীতিমালার আলোচনা ছিল। তবে সেটা আর আলোর মুখ দেখেনি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এখন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহতই রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জনপ্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময়ে বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
এখন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহতই রয়েছে। এখন সবার একটিই প্রশ্ন; জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এই ক্ষত কি কোনদিনই সারবে না?
……………………..
রোস্তম মল্লিক
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
১০ জুন ২০২৬

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৫:১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
৩৩ বার পড়া হয়েছে

জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষত: শিল্প সচিব মো: ওবায়দুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হলো কেন?

আপডেট সময় ০৫:১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

রোস্তম মল্লিক

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. ওবায়দুর রহমান ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৬ সালের ০৯ জুন তারিখে তাকে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে তাঁর জায়গায় নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর কর্মজীবন এবং পেশাজীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো: তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতক (স্নাতক) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। চাকরি জীবন শুরু করেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার হিসেবে। পরবর্তীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে পঞ্চগড়, বাগেরহাট ও নালিতাবাড়ী; উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা ও খুলনা এবং বাগেরহাটে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে যোগদানের আগে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পদের পাশাপাশি তিনি এসএমই ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারপারসন হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কর্ম জীবনে তিনি একজন নির্লোভ, সত, মিতব্যায়ী ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে সর্বমহলে স্বীকৃত। কোনদিন কারো কাছ থেকে ১ টাকা ঘুস খেয়েছেন এমন প্রমাণও নেই। ছাত্র জীবনে তিনি মাগুরা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার মত নিষ্ঠাবান জাতীয়তাবাদী ঘরাণার আমলা বর্তমান সময়ে খুব কমই আছেন।
অথচ: তাকে অজ্ঞাত কারণে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সবিয়ে দিয়ে তদস্থলে একজন চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারের এই আকর্ষিক সিদ্ধান্তে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সকল শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা আহত হয়েছেন। তাদের চোখে অশ্রু নেমে এসেছে। বাংলাদেশ সচিবালয়ের অনেক বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, মো: ওবায়দুর রহমানের মত এমন একজন নম্্র, ভদ্র, নীতিবান ও দক্ষ সচিবকে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ওএসডি করা একদম উচিত হয়নি। সম্ভাবত; তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোন ক্ষমতাবানের আক্রোশের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিষয়টি পুর্ণবিবেচনার জন্য তাঁরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ খুবই পরিচিত একটি প্রক্রিয়া। এতে অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তা সুযোগ পেলেও বঞ্চিত হন চাকরিতে থাকা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা। ফলে একটা শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়। বিগত সময়ে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তিনটি আমলে প্রশাসনে নির্বিচারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি ভারসাম্য নষ্ট করে প্রশাসনকে বিশৃঙ্খল করে তুলেছিল।
গণঅভ্যুত্থানের পর ড. ইউনুস সরকারের সময়েও বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তিতে নিয়োগ অব্যাহত ছিল। আবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রশাসন সাজানোর ক্ষেত্রে তারাও অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির পথেই হাঁটছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা বলছেন, নতুন একটা সরকারকে গুছিয়ে নিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তিতে নিয়োগের ওপর সরকারের নির্ভরশীল হওয়া ঠিক হবে না।
এখন ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী অবসরে যাওয়া যে কাউকেই চুক্তিতে চাকরিতে ফেরাতে পারে সরকার। তবে নিয়মিত ব্যাচের কর্মরত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে তাদের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তারা দলীয় আনুকূল্য অর্জনের চেষ্টা করেন। ফলে জনপ্রশাসনে একটি ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদেরই চাকরির মেয়াদ শেষে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদোন্নতি পান না।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। আর বীর মুক্তিযোদ্ধা হলে অবসরের বয়স ৬০ বছর।
জনপ্রশাসনের বিশেষায়িত বা কারিগরি পদে কর্মকর্তা সংকটের কারণে গত শতকের আশির দশকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন হয়। কিন্তু পরে বিষয়টি প্রশাসন রাজনীতিকীকরণের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সরকারগুলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের চাকরিতে রেখে দিচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
চলমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ১ মার্চ তখনকার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওই সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে এর জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো সরকারই তা করেনি।
একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘কোনো সরকারই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা করেনি, কারণ এতে এটি অপব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে। মূলত আস্থাভাজন ও দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগটি ব্যবহার করা হয়। বাছ-বিচারহীনভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়মিত কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে।’

জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষত:
মূলত ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ এর ৪৯ ধারার ক্ষমতাবলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আইনের ৪৯ ধারার ১-উপধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের পর, সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করিতে পারিবেন।’ উপধারা-২ এ বলা হয়েছে ‘উপ-ধারা (১) এর অধীন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি ভোগরত থাকিলে, উক্ত ছুটি স্থগিত থাকিবে এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সমাপ্তির পর উক্ত অবশিষ্ট অবসর-উত্তর ছুঁটি ও তদ্সংশ্লিষ্ট সুবিধা ভোগ করা যাইবে।’ সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘নতুন একটি সরকারকে চুক্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া লাগবে। এ কারণে তাদের চুক্তি দিতে হবে যে, অনেক কর্মকর্তা বিএনপির অপবাদ নিয়ে গত ১৫/১৬ বছর অনেক কষ্ট করেছেন। যেহেতু বিএনপির তকমা তাদের গায়ে লেগেছে, তাই বিএনপি তো তাদের একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘সবাইকে তো চুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, অল্পসল্প কিছু কর্মকর্তাকে দেওয়া- যারা যোগ্য, দক্ষ ও সৎ; যারা দেশের কাজে লাগবে।’ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সব সময়েই হয়েছে জানিয়ে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘তবে আওয়ামী লীগ আমলে ঢালাওভাবে হয়েছে। সেভাবে যেন না হয়, সেই বিষয়ে নজর দিতে হবে। সেভাবে এ সরকার করলে সেটা সরকার ও দেশের জন্য ভালো হবে না।’ নতুন একটি সরকার এলে একটি গ্যাপ সৃষ্টি হয়। বিভিন্নভাবে এতদিন গেছে। জুলাই বিপ্লবের মধ্যদিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সরকার দেশ পরিচালনাও করেছে। এখন আবার নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় সরকার এসেছে। প্রত্যেকটি সরকারের নিজস্ব কিছু পলিসি থাকে। সরকারের মেনিফেস্টো থাকে, সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয় থাকে। সেক্ষেত্রে দু-চারজন এক্সপার্টাইজ ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হয়। তবে এটা সাময়িক। সাবেক এ আমলা আরও বলেন, ‘তবে এটা ভালো যে, এ সরকার কাউকে এক বছরের বেশি চুক্তি দিচ্ছে না। যদি দেখা যায় এক বছর তার পারফরম্যান্স ভালো, তাহলে তার মেয়াদ বাড়বে। না হয় এক বছর পরই বিদায় করে দেওয়া উচিত হবে।’

নতুন সরকারের চুক্তিতে যত নিয়োগ:
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তরবর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। ১ মার্চ চুক্তিতে ধর্ম সচিব নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনিও এক বছরের জন্য চুক্তিতে এ নিয়োগ পান। ৩ মার্চ চুক্তিভিত্তিতে চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চারজন সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যে মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, রফিকুল আই মোহাম্মদকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, আবদুল খালেককে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এবং মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবাইকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিতে নিয়োগ পান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল। ২৫ মার্চ এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ২৮ মার্চ তার সেই নিয়োগ আদেশ আবার বাতিলও হয়।

প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক:
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও জরুরি বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। নির্ধারিত পদে যোগ্য ব্যক্তি না পেলে দায়িত্বরত ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত কাউকে চুক্তিতে দায়িত্ব দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তবে যোগ্য ব্যক্তির পদোন্নতি করে পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর অভিযোগ আসে মাঝে মধ্যে। এক্ষেত্রে দলীয় লেজুড়বৃত্তি কিংবা অর্থ লেনদেনের ঘটনাও থাকে। সচিব কিংবা দপ্তর প্রধান যে পদেই হোক না চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আগে কর্মরত সত্যিকারের দক্ষ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়ছেন কিনা তা পরখ করতে অভিমত দিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। একই সচিবকে চার বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দৃষ্টান্ত আছে। কেউ কেউ টানা আট বছর একই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রশাসনের ভারসাম্য আনতে অনেককে ওএসডি আবার কাউকে অবসরে পাঠাতে হয়েছে। সে সময় অবসরপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। আবার শেখ হাসিনার আমলে বঞ্চিত হওয়া বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয় ড. ইউনুস সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা চলছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে ১৩ জন সচিবকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে। এরপর অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। অন্তরবর্তী সরকারের আমলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারাও আছেন। যেমন-মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে এক বছরের চুক্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেধাতন্ত্র’ বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
২০১৪ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে নীতিমালার আলোচনা ছিল। তবে সেটা আর আলোর মুখ দেখেনি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এখন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহতই রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জনপ্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময়ে বাস্তবে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
এখন বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে। বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহতই রয়েছে। এখন সবার একটিই প্রশ্ন; জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এই ক্ষত কি কোনদিনই সারবে না?
……………………..
রোস্তম মল্লিক
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
১০ জুন ২০২৬