০২:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা: রাজধানীতে কথিত স্বামীসহ জান্নাতুল ফেরদৌসী তমা’র সংঘবদ্ধ হানিট্রাপ!

প্রতিনিধির নাম:

বিশেষ প্রতিবেদক

কখনো মিলা, কখনো লিনা, কখনো তমা, কখনা লাকী, আবার কখনো এনা, প্রেমা ইত্যাদি নাম ধারণ করে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, সরকারী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে প্রেমের অভিনয়ে হানিট্্রাপে ফেলে অথবা অশ্লীল কিংবা অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে একাধিক প্রতারক চক্র প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। দামি ফ্ল্যাট, মূল্যবান অলংকার এমন কি কোটি টাকা দামের গাড়ি পর্যন্ত তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর এইসব মুখোশধারী চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সম্মানিত অসংখ্য মানুষ। পাশাপাশি তার সাথে যোগ হয়েছে “শয়তানের নি:শ্বাস” নামক একধরনের বশীকরণ কেমিকেল। এর মধ্যে সব থেকে বেশি ঘটছে হানিট্রাপ। “শয়তানের নি:শ্বাস” নামক বশীকরণ কেমিকেল প্রয়োগ করে জান্নাতুল ফেরদৌস নামক এক উচ্চবিত্ত পতিতা একজন সরকারী কর্মকর্তার অশেষ ক্ষতিসাধন করেছেন। এই চক্রের শিকার হয়ে তিনি এখন এক নরকময় জীবন যাপন করছেন। সেরকম কয়েকটি ঘটনা নিয়েই আমাদের আজকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

ঘটনা: (১)
আবিদ হাসান (ছদ্মনাম) একজন সরকারী বড় কর্মকর্তা। মতিঝিলের একটি বহুতলা ভবনে তার অফিস। তাদের ধারণা- বেশ অর্থ বিত্তের মালিক তিনি। একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে তার সম্পর্কে সব কিছু তথ্য সংগ্রহ করেন মতিঝিল অফিস ও ক্লাবপাড়ার আলোচিত মক্ষীরাণী কাম ক্যাসিনো কুইন জান্নাতুল ফেরদৌসী ওরফে তমা। প্রথমে ফোনে কথা-বার্তা। এরপর অফিসে আসা যাওয়া। এরপর বাসায় যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানানো। কিন্তু আবিদ হাসান রাজী না হওয়ায় তাকে
“শয়তানের নি:শ^াস” কেমিকেল প্রয়োগ করে অপহরণ করার মাষ্টার প্ল্যান করা হয়। আর তার এই অনৈতিক কাজে সায় দেন জান্নাতুল ফেরদৌসী তমা’র কথিত স্বামীও। একদিন সাপ্তাহিক ছুঁটির দিনে ওই কর্মকর্তা জরুরী কাজে অফিসে আসলে সেটি জেনে যায় জান্নাতুল ফৈরদৌসী তমা চক্র। ওই সময় তারা “জরুরী আলাপ” আছে এই কথা বলে আবিদ হাসানের কাছাকাছি চলে আসেন। তারা কথা বলার এক ফাঁকে শয়তানের নি:শ^াস প্রয়োগ করে সরকারি কর্মকর্তা আবিদ হাসানকে বশীকরণ বা অজ্ঞান করে ফেলেন। এরপর তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যান নিজেদের ফ্ল্যাটে। সেখানে নিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসী তমা’র সাথে বেডশেয়ারিং এর একটি ভিডিও শ্যুট করা হয় সুকৌশলে। মোবাইলে ভিডিওটি ধারণ করেন তমা’র কথিত স্বামী নিজেই। এরপর ওই সরকারি কর্মকর্তাকে গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকদিন পর মোবাইল ফোনসহ নানা মাধ্যমে আবিদ হাসানকে ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়ে ৫ কোটি টাকা দাবী করেন চক্রটি। তারা বলেন, তাদের চাহিদা মত ৫ কোটি টাকা না দিলে সোস্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিও ছেড়ে ( ভাইরাল) করে দিয়ে তার মান সম্মান হানিসহ সরকারী চাকুরী খেয়ে ফেলবেন। আবিদ হাসান তাদের প্রস্তাবে রাজী না হলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে সেই মেকিং ভিডিও ক্লিপটি আবিদ হাসানের অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারি এবং কয়েকজন ইজারাদারের কছে মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করে দেন। অসাধু ওই মহলটি ভিডিওটি প্রথমে একটি মেয়ের ফেসবুকে ফ্লাশ করে দেন। এর পর অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যাপক আকারে প্রচার করে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দেন। কেবল ভাইরালই নয় ,তারা ভিডিও ক্লিপটি মন্ত্রী ও সচিবের কাছে পাঠিয়ে আবিদ হাসানের মান সম্মান সরকারি চাকুরীর অশেষ ক্ষতিসাধন করেন।
এই ভয়ংকর নারী জান্নাতুল ফেরদৌস তমা’র সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, তিনি এ পর্যন্ত ৩ টি বিয়ে করেছেন। প্রেম করেছেন শতাধিক। পরকীয়া প্রেম করেছেন এক ডজনেরও বেশি। এক সময় তিনি মতিঝিল ক্লাবপাড়ার নাইটকুইন ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ক্যাসিনো সম্্রাট ইসমাইল চৌধুরী সম্্রাটের রক্ষিতা ছিলেন। বড় বড় ব্যবসায়ী,আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে তাদেরকে ব্ল্যাকেমেইলিং করে রাণীর হালে জীবন যাপন করেন। তাকে এখন আইন শৃংক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ঘটনা: (২)
কারওয়ানবাজারের বড় এক ব্যবসায়ী। কৌশলে বাসায় ডেকে ভুয়া বিয়ের কাগজপত্র তৈরি করে দাবি করা হয় ৭ লাখ টাকা। ওই ব্যবসায়ী স্ট্যাম্পে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এতেই মুখোশ উন্মোচন হয়ে যায় সেই মিলা বা লিনা মাহমুদের। আটকা পড়েন গোয়েন্দা জালে। দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে এভাবেই প্রতারণা করে যাওয়া এই চক্রটিকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের একটি টিম। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। দেশে কিংবা দেশের বাইরে সব জায়গাতে প্রতারণার জাল ছড়ানো চক্রটি গত ৫ বছরে এভাবে কোটি টাকার ওপরে হাতিয়ে নিয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার বলেন, এই চক্রের মোট সদস্য ৫ জন। এর মধ্যে লিনা মাহমুদ ওরফে মিলা হচ্ছে প্রধান। বাকিরা তার সহযোগী। সহযোগীরা বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি প্রবাসীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে দেয়। পরে কৌশলে ফোনে কথা বলে প্রেমের ফাঁদ পাতে। এক সময় প্রেমিককে বাসায় ডাকে। একপর্যায়ে অন্তরঙ্গ ছবি তুলে টাকা দাবি করে। অনেকে সম্মানের ভয়ে টাকাও দেন।
তিনি বলেন, চক্রটি শুধু প্রেমের ফাঁদ নয়, অনেক সময় ভুয়া বিয়েও করে। সেই বিয়ের কাবিনের টাকা আদায়ও করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো লিনা মাহমুদ ওরফে মিলা, তার সহযোগী মনির ও ভুয়া কাজী হাবিবুর রহমান।
গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রটি জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা পেশাদার সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ধনীদের টার্গেট করে। টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে নারী সদস্যদের দিয়ে ফোন করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নির্ধারিত বাসায় ডেকে আনে। এ সময় নারী সদস্যদের দিয়ে ভিকটিমের আপত্তিকর ও নগ্ন ভিডিও ও ছবি তোলে।
জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত ও তাদের সহযোগীরা ভিকটিমকে জিম্মি করে টাকা দিতে বাধ্য করে। টাকা না দিলে ভুয়া স্ট্যাম্প ও ভুয়া কাবিননামা আর ভুয়া কাজি দিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে। এরপর নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলার হুমকি ও ভয়-ভীতি দেখায়।

ঘটনা: (৩)
বিভিন্ন পত্রিকায় ‘উন্নত দেশগুলোর নাগরিকত্ব’ এমন লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণাই তার ছিল পেশা। নাম জান্নাতুল। কানাডা প্রবাসী, শর্ট ডিভোর্সি অথচ নিঃসন্তান সুন্দরী-এমন নানা উপমা দিয়ে পত্রিকায় মনভোলানো বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। বিয়ে করে বিদেশে আয়েশি জীবনের সেই হাতছানির ফাঁদে পা দিলেই হাতিয়ে নিতেন কোটি কোটি টাকা। এভাবে জান্নাত অন্তত: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধরা পড়ে সিআইডির জালে।
সিনিয়র এসপি জিসানুল হক জানান, প্রতারণার শিকার একজনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার করেছি। সেইসঙ্গে তার ৫ সহযোগীকেও আটক করা হয়। তিনি জানান, এসএসসি পাস করতে না পারা জান্নাত প্রতারণায় পিএইচডি। এ পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তিনি। প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা স্বামীকে নিয়ে নামেন এই প্রতারণায়।
তিনি জানান, গত বছরের আগস্টে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কানাডার নাগরিক, ডিভোর্সি সন্তানহীন, নামাজি পাত্রীর জন্য ব্যবসার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বয়স্ক পাত্র চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। আগ্রহীদের একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বারিধারার একটি বাড়িতে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সিআইডির কাছে অভিযোগ দেওয়া ভুক্তভোগী নাজির হোসেন ওই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন। পরে তার সঙ্গে গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে দেখা করেন জান্নাত। এ সময় ভুক্তভোগী নাজির দেড় লাখ টাকা ও পাসপোর্ট তুলে দেন জান্নাতের হাতে। পরে জান্নাত নাজির হোসেনকে জানান, তিনি নিজেই পাত্রী। কানাডায় দুইশ কোটি টাকার ব্যবসা আছে। কিন্তু বর্তমানে কানাডায় অনেক শীত থাকায় নাজির হোসেনকে নেওয়া যাচ্ছে না। এরপর দেশে ব্যবসার জন্য কানাডা থেকে টাকা আনার কথা বলে ট্যাক্স, ভ্যাট, ডিএইচএল বিল ইত্যাদি খরচের কথা বলে এক কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। জান্নাত এরপর মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। নাজিরের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন। পরে ভুক্তভোগী নাজির হোসেন এ বিষয়ে সিআইডিতে অভিযোগ করেন।
একইভাবে অন্য একজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় জান্নাতকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার করা খাতায় বিগত দিনের প্রতারণার হিসাব ও ভুক্তভোগীদের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়। জান্নাতের নেতৃত্বে এই চক্রটি গত ১০ বছর ধরে এমন প্রতারণা করে আসছিল। এখন পর্যন্ত সিআইডি তাদের ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র জানায়, রাজধানীতে এ ধরনের অর্ধশতাধিক চক্র রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি চক্র গ্রেপ্তারও হয়েছে। এদের কাজই হলো নারী দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা। বিশেষ করে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা এলাকায় এই চক্রের সদস্যরা বেশি থাকে।
গোয়েন্দা পুলিশের একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও প্রতারণা ফাঁদ পাতা কয়েকটি চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটস অ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করেও নারীদের প্রতারণার অভিযোগও পাচ্ছি। আমরা সবাইকে সচেতনত হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। সচেতন হলেই এ ধরনের অপরাধ কমে যাবে।
ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইমের অতিরিক্তি উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতারণা অভিযোগ এখনো অনেক বেশি। নারী ও পুরুষ উভয়েরই অভিযোগ আসছে।
তিনি বলেন, নারীদের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং শিকার যেমন হচ্ছে, তেমনি পুরুষের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং শিকার হচ্ছে অনেকে। তবে অধিকাংশই সম্মান নষ্টের ভয়ে নিজেরাই মিটিয়ে নিচ্ছে, আবার অনেকে অভিযোগও দিচ্ছেন। এ ধরনের বেশ কিছু সিন্ডিকেটকে আমরা আটকও করেছি। তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সতর্কতা। লোভ সংবরণ করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করলে সমস্যায় পড়তে হবে না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১২:৫৬:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
৬২ বার পড়া হয়েছে

হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা: রাজধানীতে কথিত স্বামীসহ জান্নাতুল ফেরদৌসী তমা’র সংঘবদ্ধ হানিট্রাপ!

আপডেট সময় ১২:৫৬:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদক

কখনো মিলা, কখনো লিনা, কখনো তমা, কখনা লাকী, আবার কখনো এনা, প্রেমা ইত্যাদি নাম ধারণ করে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, সরকারী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে প্রেমের অভিনয়ে হানিট্্রাপে ফেলে অথবা অশ্লীল কিংবা অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে একাধিক প্রতারক চক্র প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। দামি ফ্ল্যাট, মূল্যবান অলংকার এমন কি কোটি টাকা দামের গাড়ি পর্যন্ত তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর এইসব মুখোশধারী চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সম্মানিত অসংখ্য মানুষ। পাশাপাশি তার সাথে যোগ হয়েছে “শয়তানের নি:শ্বাস” নামক একধরনের বশীকরণ কেমিকেল। এর মধ্যে সব থেকে বেশি ঘটছে হানিট্রাপ। “শয়তানের নি:শ্বাস” নামক বশীকরণ কেমিকেল প্রয়োগ করে জান্নাতুল ফেরদৌস নামক এক উচ্চবিত্ত পতিতা একজন সরকারী কর্মকর্তার অশেষ ক্ষতিসাধন করেছেন। এই চক্রের শিকার হয়ে তিনি এখন এক নরকময় জীবন যাপন করছেন। সেরকম কয়েকটি ঘটনা নিয়েই আমাদের আজকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

ঘটনা: (১)
আবিদ হাসান (ছদ্মনাম) একজন সরকারী বড় কর্মকর্তা। মতিঝিলের একটি বহুতলা ভবনে তার অফিস। তাদের ধারণা- বেশ অর্থ বিত্তের মালিক তিনি। একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে তার সম্পর্কে সব কিছু তথ্য সংগ্রহ করেন মতিঝিল অফিস ও ক্লাবপাড়ার আলোচিত মক্ষীরাণী কাম ক্যাসিনো কুইন জান্নাতুল ফেরদৌসী ওরফে তমা। প্রথমে ফোনে কথা-বার্তা। এরপর অফিসে আসা যাওয়া। এরপর বাসায় যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানানো। কিন্তু আবিদ হাসান রাজী না হওয়ায় তাকে
“শয়তানের নি:শ^াস” কেমিকেল প্রয়োগ করে অপহরণ করার মাষ্টার প্ল্যান করা হয়। আর তার এই অনৈতিক কাজে সায় দেন জান্নাতুল ফেরদৌসী তমা’র কথিত স্বামীও। একদিন সাপ্তাহিক ছুঁটির দিনে ওই কর্মকর্তা জরুরী কাজে অফিসে আসলে সেটি জেনে যায় জান্নাতুল ফৈরদৌসী তমা চক্র। ওই সময় তারা “জরুরী আলাপ” আছে এই কথা বলে আবিদ হাসানের কাছাকাছি চলে আসেন। তারা কথা বলার এক ফাঁকে শয়তানের নি:শ^াস প্রয়োগ করে সরকারি কর্মকর্তা আবিদ হাসানকে বশীকরণ বা অজ্ঞান করে ফেলেন। এরপর তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যান নিজেদের ফ্ল্যাটে। সেখানে নিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসী তমা’র সাথে বেডশেয়ারিং এর একটি ভিডিও শ্যুট করা হয় সুকৌশলে। মোবাইলে ভিডিওটি ধারণ করেন তমা’র কথিত স্বামী নিজেই। এরপর ওই সরকারি কর্মকর্তাকে গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকদিন পর মোবাইল ফোনসহ নানা মাধ্যমে আবিদ হাসানকে ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়ে ৫ কোটি টাকা দাবী করেন চক্রটি। তারা বলেন, তাদের চাহিদা মত ৫ কোটি টাকা না দিলে সোস্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিও ছেড়ে ( ভাইরাল) করে দিয়ে তার মান সম্মান হানিসহ সরকারী চাকুরী খেয়ে ফেলবেন। আবিদ হাসান তাদের প্রস্তাবে রাজী না হলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে সেই মেকিং ভিডিও ক্লিপটি আবিদ হাসানের অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারি এবং কয়েকজন ইজারাদারের কছে মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করে দেন। অসাধু ওই মহলটি ভিডিওটি প্রথমে একটি মেয়ের ফেসবুকে ফ্লাশ করে দেন। এর পর অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যাপক আকারে প্রচার করে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দেন। কেবল ভাইরালই নয় ,তারা ভিডিও ক্লিপটি মন্ত্রী ও সচিবের কাছে পাঠিয়ে আবিদ হাসানের মান সম্মান সরকারি চাকুরীর অশেষ ক্ষতিসাধন করেন।
এই ভয়ংকর নারী জান্নাতুল ফেরদৌস তমা’র সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, তিনি এ পর্যন্ত ৩ টি বিয়ে করেছেন। প্রেম করেছেন শতাধিক। পরকীয়া প্রেম করেছেন এক ডজনেরও বেশি। এক সময় তিনি মতিঝিল ক্লাবপাড়ার নাইটকুইন ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ক্যাসিনো সম্্রাট ইসমাইল চৌধুরী সম্্রাটের রক্ষিতা ছিলেন। বড় বড় ব্যবসায়ী,আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে তাদেরকে ব্ল্যাকেমেইলিং করে রাণীর হালে জীবন যাপন করেন। তাকে এখন আইন শৃংক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ঘটনা: (২)
কারওয়ানবাজারের বড় এক ব্যবসায়ী। কৌশলে বাসায় ডেকে ভুয়া বিয়ের কাগজপত্র তৈরি করে দাবি করা হয় ৭ লাখ টাকা। ওই ব্যবসায়ী স্ট্যাম্পে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এতেই মুখোশ উন্মোচন হয়ে যায় সেই মিলা বা লিনা মাহমুদের। আটকা পড়েন গোয়েন্দা জালে। দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে এভাবেই প্রতারণা করে যাওয়া এই চক্রটিকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের একটি টিম। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। দেশে কিংবা দেশের বাইরে সব জায়গাতে প্রতারণার জাল ছড়ানো চক্রটি গত ৫ বছরে এভাবে কোটি টাকার ওপরে হাতিয়ে নিয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার বলেন, এই চক্রের মোট সদস্য ৫ জন। এর মধ্যে লিনা মাহমুদ ওরফে মিলা হচ্ছে প্রধান। বাকিরা তার সহযোগী। সহযোগীরা বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি প্রবাসীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে দেয়। পরে কৌশলে ফোনে কথা বলে প্রেমের ফাঁদ পাতে। এক সময় প্রেমিককে বাসায় ডাকে। একপর্যায়ে অন্তরঙ্গ ছবি তুলে টাকা দাবি করে। অনেকে সম্মানের ভয়ে টাকাও দেন।
তিনি বলেন, চক্রটি শুধু প্রেমের ফাঁদ নয়, অনেক সময় ভুয়া বিয়েও করে। সেই বিয়ের কাবিনের টাকা আদায়ও করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো লিনা মাহমুদ ওরফে মিলা, তার সহযোগী মনির ও ভুয়া কাজী হাবিবুর রহমান।
গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রটি জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা পেশাদার সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ধনীদের টার্গেট করে। টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে নারী সদস্যদের দিয়ে ফোন করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নির্ধারিত বাসায় ডেকে আনে। এ সময় নারী সদস্যদের দিয়ে ভিকটিমের আপত্তিকর ও নগ্ন ভিডিও ও ছবি তোলে।
জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত ও তাদের সহযোগীরা ভিকটিমকে জিম্মি করে টাকা দিতে বাধ্য করে। টাকা না দিলে ভুয়া স্ট্যাম্প ও ভুয়া কাবিননামা আর ভুয়া কাজি দিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে। এরপর নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলার হুমকি ও ভয়-ভীতি দেখায়।

ঘটনা: (৩)
বিভিন্ন পত্রিকায় ‘উন্নত দেশগুলোর নাগরিকত্ব’ এমন লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণাই তার ছিল পেশা। নাম জান্নাতুল। কানাডা প্রবাসী, শর্ট ডিভোর্সি অথচ নিঃসন্তান সুন্দরী-এমন নানা উপমা দিয়ে পত্রিকায় মনভোলানো বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। বিয়ে করে বিদেশে আয়েশি জীবনের সেই হাতছানির ফাঁদে পা দিলেই হাতিয়ে নিতেন কোটি কোটি টাকা। এভাবে জান্নাত অন্তত: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধরা পড়ে সিআইডির জালে।
সিনিয়র এসপি জিসানুল হক জানান, প্রতারণার শিকার একজনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার করেছি। সেইসঙ্গে তার ৫ সহযোগীকেও আটক করা হয়। তিনি জানান, এসএসসি পাস করতে না পারা জান্নাত প্রতারণায় পিএইচডি। এ পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তিনি। প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা স্বামীকে নিয়ে নামেন এই প্রতারণায়।
তিনি জানান, গত বছরের আগস্টে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কানাডার নাগরিক, ডিভোর্সি সন্তানহীন, নামাজি পাত্রীর জন্য ব্যবসার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বয়স্ক পাত্র চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। আগ্রহীদের একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বারিধারার একটি বাড়িতে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সিআইডির কাছে অভিযোগ দেওয়া ভুক্তভোগী নাজির হোসেন ওই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন। পরে তার সঙ্গে গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে দেখা করেন জান্নাত। এ সময় ভুক্তভোগী নাজির দেড় লাখ টাকা ও পাসপোর্ট তুলে দেন জান্নাতের হাতে। পরে জান্নাত নাজির হোসেনকে জানান, তিনি নিজেই পাত্রী। কানাডায় দুইশ কোটি টাকার ব্যবসা আছে। কিন্তু বর্তমানে কানাডায় অনেক শীত থাকায় নাজির হোসেনকে নেওয়া যাচ্ছে না। এরপর দেশে ব্যবসার জন্য কানাডা থেকে টাকা আনার কথা বলে ট্যাক্স, ভ্যাট, ডিএইচএল বিল ইত্যাদি খরচের কথা বলে এক কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। জান্নাত এরপর মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। নাজিরের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন। পরে ভুক্তভোগী নাজির হোসেন এ বিষয়ে সিআইডিতে অভিযোগ করেন।
একইভাবে অন্য একজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় জান্নাতকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার করা খাতায় বিগত দিনের প্রতারণার হিসাব ও ভুক্তভোগীদের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়। জান্নাতের নেতৃত্বে এই চক্রটি গত ১০ বছর ধরে এমন প্রতারণা করে আসছিল। এখন পর্যন্ত সিআইডি তাদের ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র জানায়, রাজধানীতে এ ধরনের অর্ধশতাধিক চক্র রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি চক্র গ্রেপ্তারও হয়েছে। এদের কাজই হলো নারী দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা। বিশেষ করে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা এলাকায় এই চক্রের সদস্যরা বেশি থাকে।
গোয়েন্দা পুলিশের একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও প্রতারণা ফাঁদ পাতা কয়েকটি চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটস অ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করেও নারীদের প্রতারণার অভিযোগও পাচ্ছি। আমরা সবাইকে সচেতনত হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। সচেতন হলেই এ ধরনের অপরাধ কমে যাবে।
ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইমের অতিরিক্তি উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতারণা অভিযোগ এখনো অনেক বেশি। নারী ও পুরুষ উভয়েরই অভিযোগ আসছে।
তিনি বলেন, নারীদের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং শিকার যেমন হচ্ছে, তেমনি পুরুষের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং শিকার হচ্ছে অনেকে। তবে অধিকাংশই সম্মান নষ্টের ভয়ে নিজেরাই মিটিয়ে নিচ্ছে, আবার অনেকে অভিযোগও দিচ্ছেন। এ ধরনের বেশ কিছু সিন্ডিকেটকে আমরা আটকও করেছি। তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সতর্কতা। লোভ সংবরণ করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করলে সমস্যায় পড়তে হবে না।