০৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘গান’কে ভর করেই বেঁচে আছেন আক্কাস দেওয়ান

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

‘সুখ ভালো লাগে না। যেমন আছি তেমন থাকতে চাই। আমাকে ভালো জেনে ওরা প্রেমে পড়েছে। ভালো লাগেনি চলে গেছে। কোনো দুঃখ নেই।’
এই দুঃখহীন দুঃখই তার জীবন। শৈশবেই ভিটাচ্যুতি দিয়ে দুঃখজীবনের শুরু। মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তর। পিতা-মাতার মৃত্যু। কসাইর দোকানে কাজ। জীবনরথে ঘুরতে ঘুরতে এক গানপাগল ব্যাংকার দম্পতির ঘরে ওঠা। তাদের অপরিসীম ভালোবাসা আর চেষ্টায় মূর্খজীবন থেকে বইয়ে মগ্ন হওয়া। স্বশিক্ষিত সেই জীবন খুলে দেয় গান আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নয়াজগৎ। জীবনে প্রেম আসে, বিচ্ছেদ মেলে, সাফল্য আসে, খ্যাতি মেলে কিন্তু সচ্ছলতা ধরা দেয় না। সংসার ছাড়েন, নয়া সংসার ধরেন কিন্তু থিতু হওয়া হয় না। বাউল গানের গীতিকার, সুরকার, শিল্পী আক্কাস দেওয়ান ‘গান’কে ভর করেই বেঁচে আছেন। ঘুরছেন দেশে-বিদেশে, মাঠে-প্রান্তরে, মাজারে কিন্তু ‘বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবসা’ হচ্ছে না। এই হওয়া-না হওয়া, পাওয়া-না পাওয়াই আক্কাস দেওয়ানের বাউলজীবন। সেই লড়াকু, দুঃখজীবনের ঝাঁপি খুলেছেন মিডিয়ার-এর কাছে।

প্রশ্ন : ‘দুঃখ’ দিয়েই শুরু করতে চাই। ‘পর মানুষে দুঃখ দিলে দুঃখ মনে হয় না, আপন মানুষ দুঃখ দিলে মেনে নেয়া যায় না’, অপনার লেখা বিখ্যাত গান। কে এত দুঃখ দিলো?
আক্কাস দেওয়ান : সত্যি কথা বলতে কি, আমি একবারে জনম দুখী। দুঃখের মধ্য দিয়েই আমার জন্ম। গ্রামে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার ছিল আমাদের। একবারে অজোপাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি ছিল। অমন দুঃখের সাগরে এখনও ভেসে বেড়াচ্ছি। আত্মপরিচয় তুলে ধরার মতো কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। দারিদ্র্যের কথা না বলাই ভালো।
প্রশ্ন : কোথায় জন্ম?
আক্কাস দেওয়ান : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার নীলগ্রামে আমার জন্ম। ওখানেই আমাদের আদি নিবাস। মায়ের কাছে শুনেছি, যে রাতে আমি জন্ম নিই, সে রাতে কুপিতে এক ফোঁটা কেরোসিনও ছিল না। আমার সঙ্গী ছিল অন্ধাকার। তবে মা বলেছিল, ওইদিন পূর্ণিমার রাত ছিল। ঘরও ভাঙা ছিল। ভাঙা চালের মধ্য দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে প্রবেশ করেছিল।
প্রশ্ন : আঁতুড় ঘরে চাঁদের আলো। সে আলোয় জীবনঘরও আলোকিত হওয়ার কথা?
আক্কাস দেওয়ান : না, তা আর হয়নি। গরিবের ঘর অন্ধকারই থাকে। শৈশব কেটেছে খুবই দীনতায়। অভাবের তাড়নায় মা-বাবা যখন ঢাকায় আসেন, তখন আমার বয়স চার বছর। কোথাও লিখতে গেলে জন্ম সাল ১৯৬৪ বলে উল্লেখ করি। কিন্তু কোন সালে জন্ম তা-ও বলতে পারি না।
প্রশ্ন : বাবা কী করতেন?
আক্কাস দেওয়ান : বাবা এলাহী বকস্ দিনমজুরের কাজ করতেন। ঢাকায় এসে আমরা হাজারীবাগে ঠাঁই নিই। ঢাকায়ও বাবা দিনমজুরের কাজ করতেন। কখনও ইটের ভাটায় মাথায় করে মাটি টানতেন, আবার কখনও ঠেলাগাড়ি চালাতেন। মা সাহারা খাতুন বাড়িতেই থাকতেন।
প্রশ্ন : কয় ভাইবোন ছিলেন আপনারা?
আক্কাস দেওয়ান : চার ভাই, এক বোন। বড় ভাই আকতার হোসেন ওয়াসা ভবনে নিম্ন পদের একটি চাকরি করেন। মেজো ভাই মাংসের দোকানে কাজ করত। তার জীবনব্যবস্থা ভালো বলা যায় না। তার নেশা করেই দিন কাটে। আমার পরে বোন। তাকে ঢাকাতেই বিয়ে দেয়া হয়। তবে সেও সুখী না। আমাদের অমতে বিয়ে করে। বোনের স্বামীও নেশাখোর ছিল। সবার ছোট ভাই ডেমরায় থাকে।
প্রশ্ন : সবাইকে নিয়ে কী বলবেন?
আক্কাস দেওয়ান : গরিবেরা যেমন থাকে আর কি। বলতে পারেন সবাই সবার মতো আছে। তবে খুব ভালো আছে, তা বলা যায় না। সবার মধ্যে যে খুব ভালো যোগাযোগ রয়েছে, ঠিক তা-ও নয়। সবারই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। কে কার খবর রাখে?
প্রশ্ন : মানিকগঞ্জের জন্মস্থানে যাওয়া হয়? কোনো শৈশব স্মৃতি?
আক্কাস দেওয়ান : না, যাওয়া হয় না বললেই চলে। গ্রামের ভিটেহারা হওয়ার শৈশব স্মৃতি এখনও আমাকে তাড়িত করে। আমরা তখন ক্ষুধার জ্বালায় ঢাকা এসেছি। বাড়ি তালাবদ্ধ। দীর্ঘদিন যাওয়া হয়নি। এ সময় বাবার এক ফুফাতো বোন নাকি আমাদের খোঁজে গ্রামের বাড়িতে আসেন। তখন পাশের বাড়ির কলিমউদ্দিন মেম্বার বাবার ফুফাতো বোনকে নামে মাত্র ৩০০ টাকা এবং একটি শাড়ি কিনে দিয়ে পৈতৃক ভিটা লিখে নেয়। আমরা আর বাড়িতে দখলে যেতে পারি নাই। এভাবেই আমাদের উদ্বাস্তু করা হয়। আজও সেই বাড়ির স্মৃতি ভুলতে পারি না। বাবার ফুফাতো বোন এবং কলিমউদ্দিন মেম্বার মিলে জালিয়াতি করে আমাদের এই সর্বনাশ করেছিলেন।
প্রশ্ন : বাবা আইন-আদালতে যাননি?
আক্কাস দেওয়ান : না। কলিম উদ্দিন মেম্বারের বিরুদ্ধে লড়তে যে শক্তির দরকার, তা আমাদের ছিল না। অভাবের কারণে সংসারই চলছিল না। মামলায় গেলে যে টাকা লাগত, তা তো ছিল না।
প্রশ্ন : আপনারা দখলে যেতে পারতেন?
আক্কাস দেওয়ান : সম্ভব হয়নি। তবে ভিটেহারা হওয়ার বেদনা যখন তীব্র হতে থাকল, তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলাম যে বাড়িটি যেন পদ্মায় ভেঙে যায়। তা-ই গিয়েছে। কলিম উদ্দিন মেম্বারের হাত থেকে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, তাতেই শান্তি পেয়েছি। এখন অবশ্য চর জেগেছে। অন্যেরা দখলে যেতে বলছে। ভাবছি।
প্রশ্ন : ঢাকায় আসার কথা মনে আছে?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। টাকার জন্য লঞ্চে আসতে পারিনি। গয়নার নাও অর্থাৎ দার বা বৈঠা বয়ে যে নৌকায় যাত্রী পারাপার হয়, সেই নৌকায় করে ঢাকায় এলাম। সময় বেশি লাগত কিন্তু ভাড়া কম ছিল। আমরা এসে সদরঘাটে নামলাম। তারপর হেঁটে হেঁটে হাজারীবাগে এলাম।
প্রশ্ন : পাঁচ ভাইবোনকে নিয়ে বাবা-মা ঢাকায় এলেন। জীবন তো আরও কঠিন হওয়ার কথা।
আক্কাস দেওয়ান : শহরে কাজ পাওয়া যেত। গ্রামে কাজের মূল্য ছিল খুবই কম। বড় ভাইও বাবার সঙ্গে কাজে যেতেন। দু’বেলা খেতে পারতাম আর কি।
প্রশ্ন : স্কুলে গেলেন কখন?
আক্কাস দেওয়ান : পড়ালেখায় অনুরাগী হয়ে স্কুলে যাওয়া হয়নি বললেই চলে। গ্রামে থাকতে স্কুলে গিয়েছি। তবে বেশির ভাগ সময়ই স্কুল পালাইতাম। পরে ঢাকায় এসে প্রাইভেট পড়ার মতো নাইট স্কুলে কিছুদিন গিয়েছি।
প্রশ্ন : আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন?
আক্কাস দেওয়ান : স্কলে গিয়েছি বটে, তবে স্কুল সার্টিফিকেট নেয়া হয়নি। নাইট স্কুলে একজন হিন্দু আধ্যাত্মিক গুরুর কাছ থেকে আমি শিক্ষা নিই। তিনি আমাকে আদর্শলিপি বই হাতে ধরিয়ে দেন।
প্রশ্ন : কেমন পেয়েছিলেন সে শিক্ষাগুরুকে?
আক্কাস দেওয়ান : অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন। দিনে সরকারি পরিবহন সেক্টরে চাকরি করতেন। রাতে আমাদের পড়াতেন। অনেক গভীর বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। খুব সৎ মানুষ ছিলেন। কোনো অহঙ্কার ছিল না। কোনো দিন চুল-দাড়ি কামাননি। মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো এক গানের অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে পেয়েছিলেন। সেখান থেকেই তার হাতে পড়া।
প্রশ্ন : যুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমরা মানিকগঞ্জে চলে গিয়েছিলাম। যুদ্ধের কথা খুব বেশি মনে করতে পারছি না। তখন তো ছোট আমি। পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য ঢাকা ছেড়ে মানিকগঞ্জে যাই।
প্রশ্ন : ঢাকায় ফিরলেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই-তিন বছর পর আমরা ফের ঢাকায় আসি। আমার মনে আছে বঙ্গবন্ধুকে যে দিন হত্যা করা হয়, সেদিন নিউমার্কেটের সামনের রাস্তায় অনেকগুলো গুলির খোসা পড়ে ছিল। সকালে আমি পিতলের খোসাগুলো বেশ উৎসাহ নিয়ে কুড়িয়েছিলাম, যাতে বিক্রি করতে পারি। পরে জানলাম, দেশের রাজারে আর্মিরা হত্যা করেছে।
প্রশ্ন : ওই দিন ঢাকার চিত্র মনে পড়ে?
আক্কাস দেওয়ান : খুব একটা না। রাজনীতি নিয়ে কখনোই উৎসাহী ছিলাম না। লোকের মুখে মুখে শুনলাম দেশের রাজারে মাইর্যা ফেলছে। তবে সকাল থেকেই থমথমে ছিল। সারাদিন আমি বাইরেই ঘোরাফেরা করি।
প্রশ্ন : হাজারীবাগে কোথায় থাকতেন?
আক্কাস দেওয়ান : বিহারিদের রেখে যাওয়া একটি পরিত্যক্ত বাড়ির একটি কক্ষ ভাগে পেয়েছিলাম। প্রভাবশালীরা অবশ্য দুই তিনটি করে কক্ষ নিয়েছিল। আমরা নিরীহ, তাই পারিনি।
প্রশ্ন : লোকে বলে আপনি স্বল্পভাষী, শান্ত স্বভাবের। কৈশোরে কেমন ছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : এমনই ছিলাম। বেশি কথা বলা মানে তাল হারানো। ছোটকাল থেকেই শান্ত ছিলাম। অস্থিরতা খুব বেশি কাজ করেনি। চুপচাপ থেকে চিন্তা করতে ভালো লাগে। তবে ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে নেতৃত্ব দিতাম। কারও মধ্যে ঝগড়া হলে মিটিয়ে দিতাম। ফুটবল খেলায় বেশি মজা পেতাম।
প্রশ্ন : শৈশবের বেড়ে ওঠা নিয়ে বললেন। যৌবনে এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে ধর্মপিতা হিসেবে পেলেন। এই বিষয়টি নিয়ে যদি বলতেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। ১৯৮৪ সালে আমি একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। তিনি ছিলেন সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। গানপ্রিয়, গুরুভক্ত লোক ছিলেন। তার মধ্যে আধ্যত্মিকতাও ছিল। তিনি আমাকে ধর্মপুত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। ধর্ম মা ছিলেন মনোয়ারা বেগম। তিনি ধর্মবাবার তৃতীয় স্ত্রী। লালবাগ থানাধীন ৬৪ নং এনায়েতগঞ্জের একটি বাড়িতে তাদের সঙ্গে নিচতলায় থাকতাম।
প্রশ্ন : তার সঙ্গে পরিচয় কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : তার বাড়িতে একবার গান করতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই পরিচয়। তিনি গান শুনে আমার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হন। সব খুলে বললাম। তখন আমি সায়েদাবাদে বড় ভাইয়ের বাসায় থাকি। ইতিমধ্যে বাবার মৃত্যু হয়েছে। অভাব তো সব সময় ছিল। অভাব নিয়েই তার বাড়িতে যাওয়া-আসা এবং এক প্রকার সম্পর্ক গড়ে উঠল।
প্রশ্ন : বাবার মৃত্যু হলো কখন?
আক্কাস দেওয়ান : ’৮৩ কি ’৮৪ সালের দিকে বাবা গত হলেন। বাবা অসুস্থ ছিলেন। বাবা-মাসহ বড় ভাইয়ের বাসায় থাকতাম। মেজো ভাই আগেই পৃথক হয়েছিলেন।
প্রশ্ন : দত্তক পরিবারে কেমন ছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : অনেক বড় শিক্ষিত পরিবার ছিল। দত্তক বাবা-মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তারা আমাকে পড়ালেখা করানোর জন্য খুব চেষ্টা করেছেন।

 

প্রশ্ন : সে সুযোগটা নিলেন না কেন?
আক্কাস দেওয়ান : একাডেমিক পড়ালেখায় আমার মন টানেনি। তারা খুব চেষ্টা করেছেন। আমার নেশা ছিল গানে। গান ছাড়া কিছুই বুঝতাম না। আমার দত্তক মা গার্মেন্টসের সুপারভাইজার ছিলেন। প্রতিদিন সকালে উঠে রান্না করে আমার জন্য টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখে যেতেন। আর বাবা বালিশের নিচে আমার পকেট খরচ রেখে যেতেন। সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর প্রতিদিন টাকার পাশাপাাশি ৫টি করে সিগারেট রেখে যেতেন।
প্রশ্ন : এটি তো সম্পর্কের চূড়ান্ত মাত্রা। তিনি একজন সিনিয়র ব্যক্তি। আপনাকে কেন এভাবে পেতে হলো?
আক্কাস দেওয়ান : তিনি আমার মাঝে কী খুঁজতে চেয়েছেন, আমি আজও তা বুঝতে পারিনি। একজন মানুষ আরেকজন মানুষেকে এভাবে ভালোবাসতে পারে, তা আমার দত্তক বাবাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। তিনি আমাকে বলতেন, নজরুলের ইতিহাস জানো। তোমাকে তার মতো হতে হবে। প্রচুর বই পড়তে হবে। বাবা নিজে থেকেই আমাকে বই এনে দিতেন। তখন থেকেই আমার বই পড়া শুরু হয়। তার কাছে ছিলাম বলেই প্রচুর বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। বাবা কলেজে ভর্তি করানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমি তো হাইস্কুলেই যাইনি, কলেজে যাব কী করে। খেতাম, ঘুমাতাম আর বই পড়তাম।
প্রশ্ন : অলসতা ছিল বুঝি?
আক্কাস দেওয়ান : এখনও আছে। তবে অলসতা থাকলেও চিন্তা করতে ভুলিনি। সব সময় চিন্তার মধ্যে থাকতাম।
প্রশ্ন : কী চিন্তা করতেন?
আক্কাস দেওয়ান : চিন্তার মূলে মানুষ থাকত। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে ভাবতাম। মানুষের অভাব, সুখ-দুঃখ নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করতাম। মানুষে মানুষে কেন এত বৈষম্য, কেন এত অহমবোধ। কোন দোষে আমার ভিটেবাড়ি দখল করে নিলÑএগুলোই সারাক্ষণ ঘুরপাক করত।
প্রশ্ন : কোন ধরনের বই পড়তেন?
আক্কাস দেওয়ান : আধ্যাত্মিক ধাচের বইই বেশি পড়তাম। ধর্মীয় বই, বিশেষ করে নবী-রাসূলদের জীবনী, পীর-আউলিয়া, গাউস-কতুবদের কাহিনী বেশি বেশি পড়তাম। সুফি দর্শন নিয়ে ভাবতাম।
প্রশ্ন : পড়ার সময়টা কখন থেকে?
আক্কাস দেওয়ান : জানার আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। কিন্তু এই পরিবারে আসার পর থেকে সুযোগ তৈরি হলো।
প্রশ্ন : এমন বই পড়তে তো আগে নিজের মনকে তৈরি করতে হয়?
আক্কাস দেওয়ান : জ্ঞানের প্রতি বিশেষ অনুরাগ তো আগে থেকেই ছিল। মনের পরিবর্তন হচ্ছিল, তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। আর আমি তো এমন পরিবর্তনের সাধানায়ই মগ্ন ছিলাম। সুফি সাধকদের বই পড়ে নিজের জানার আগ্রহটা আরও বাড়াতে থাকলাম। বাবা বাড়িতে পত্রিকা রাখতেন। পত্রিকা পড়ে জানার আগ্রহটা আরও বাড়তে থাকে।
প্রশ্ন : গানের ভুবনে মন রাঙালেন কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : আমি বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীত, Ÿাউল গান, মুর্শিদি গান শুনতাম নিয়মিত। আব্দুল লতিফ, খালেক দেওয়ানের গান খুবই মন কাড়ত। আব্দুল লতিফ সাহেবের পুঁথি পড়া শুনলে আর কোনো কিছু শুনতে মন চাইত না। লতিফ সাহেবের সঙ্গে একবার গণযোগাযোগ অধিদপ্তরে দেখাসাক্ষাৎ হয়। আমার ভালো লাগার কথা বলেছিলাম।
প্রশ্ন : ছোটবেলাতেই গানের পেছনে ছুটতেন শুনেছি?
আক্কাস দেওয়ান : ঠিকই বলেছেন। আমাদের গ্রামে সানু পাগলা নামের একজন পায়ে ঘুঙুর আর কোমরে ডুগডুগি বেঁধে গান করতেন। সানু পাগলা গানে বেরুলেই আমি তার পেছনে ছুটে যেতাম। খুবই ভালো লাগত। এক সময় যন্ত্রপাতির জোগান দিতে থাকলাম, মাঝে মাঝে দোহারী হিসেবে গাইতাম। সানু পাগলা যেখানে যেতেন, সেখানেই যেতাম।
প্রশ্ন : স্কুল পালিয়ে গানে মন দিচ্ছেন, পরিবার থেকে বাধা দেয়নি?
আক্কাস দেওয়ান : স্কুলে যাওয়ার জন্য মা-বাবা চাপ দিতেন। কিন্তু আমার কাছে স্কুল ভালো লাগত না। গানের অনুষ্ঠানে যাওয়া, শিল্পীদের সঙ্গে থাকা, যাত্রা, সার্কাস দেখতে ভালো লাগত। বড় ভাই কয়েকটি গান জানতেন। মাঝে মাঝে গাইতেন। মন ভরে শুনতাম। বলা যায়, আজকে গান লেখা, গাওয়ার পেছনে বড় ভাইয়ের সেই গানেরও অবদান আছে। মা মাঝে মাঝে স্কুলে বা কাজে যেতে বলতেন। গানে নিষেধ করতেন, শুনিনি। গরিব ঘরের সন্তান হলে যা হয় আর কি। স্কুলে যাওয়া নিয়ে যে খুব তাগিদ ছিল, তা-ও নয়।
প্রশ্ন : নামের পরে দেওয়ান উপাধি লাগালেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : ছোটবেলায় খালেক দেওয়ানের বড় ছেলে বাদল দেওয়ানের চকোলেট ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। বাদল দেওয়ানের ছোট ভাই ছিলেন মাখন দেওয়ান। মাখন দেওয়ানই আমার গানের ওস্তাদ। পরে মাখন দেওয়ানের বাবা খালেক দেওয়ানের অনুমতি সাপেক্ষে আমার নামের পরে দেওয়ান উপাধি যোগ করি।
প্রশ্ন : অন্যকে দেখে বড় কিছু করার কোনো স্বপ্ন জাগেনি?
আক্কাস দেওয়ান : না। অর্থ উপার্জন করেই ভালো থাকতে হবে, আমি তা কখনও মনে করেনি। অর্থ আমাকে কখনোই টানেনি। আমার চোখের সামনে অনেক টাকা উড়েছে। ধরিনি। লাল, নীল, কালো রঙের কত টাকাইত দেখলাম জীবনে। টাকাই সুখের একমাত্র পাথেয় নয়। আর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তেমন কেউ ছিল না যাকে অনুসরণ করে স্কুল বা শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠব। শৈশবে আমার জীবনের যে চিত্র, দেখবেন গ্রামের অধিকাংশ গরিব সন্তানের একই চিত্র।
প্রশ্ন : ঢাকায় এসে কাদের সঙ্গ নিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : জেলে হরেরাম বাবু, তার বাবা মদনমোহন রাজবংশী লালবাগের নবাবগঞ্জে থাকতেন। পরে কলকাতায় চলে যান। হরেরাম বাবুর সঙ্গে বিভিন্ন আসরে যেতাম। প্রথমের দিকে চেষ্টা করতাম একটু দোহারী হতে, একটু বাজাতে। তার দৃষ্টিতে আসার জন্য মাঝে মাঝে সেবা করতাম।
প্রশ্ন : দৃষ্টি পড়েছিল?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। খোঁজখবর নিতে থাকলেন। গানের আসরে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। এটিই অনেক বড় কিছু ছিল তখনকার জন্য। আশপাশে আরও কিছু শিল্পী ছিল। খালেক দেওয়ানের শিষ্য জামাল দেওয়ানের সঙ্গেও যেতাম। মূলত মদনমোহন রাজবংশীর কাছ থেকেই আমার প্রথম তালিম নেয়া। তার কাছ থেকেই হারমোনিয়ামে হাত রাখতে শুরু করি, প্রথম বেহালায় তালিম নিতে শুরু করি।
প্রশ্ন : তিনি কেমন গান করতেন, বাজাতেন?
আক্কাস দেওয়ান : জেলে পরিবার ছিল। মূলত মনের খোরাকের জন্যই তাদের গান-বাজনা। কীর্তন করতেন। তবে মদনমোহন রাজবংশীর ছেলে হরেরাম বাবু মুসলমানদের নানা অনুষ্ঠানে গান করতেন। কিছু মাইনে পেলে পেতেন, না পেলে দুঃখ করতেন না।
প্রশ্ন : হিন্দু পরিবারের সঙ্গে মিশে গান করতেন, কখনও দ্বিধা কাজ করেনি?
আক্কাস দেওয়ান : না, কোনো দ্বিধা কাজ করেনি। আমি নিয়মিত মন্দিরে যেতাম, কীর্তন শুনতাম। জেলে নৌকায় বসে বসে আমি বেহালা বাজাতাম। হাজারীবাগে থেকেই তাদের সঙ্গ পাওয়া। ’৮১, ’৮২ সালের পরের কথা।
প্রশ্ন : এ সময় কৈশোর পেরুলেন। তখনও কাজে মন দেননি?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, তখন টুকটাক কাজ করতাম। মেজো ভাই যে মাংসের দোকানে কাজ করতেন, সেখানে আমিও গিয়ে জোগান দিতাম। এক টাকা, আট আনা করে দিত।
প্রশ্ন : তাতেই সন্তষ্ট থাকতেন?
আক্কাস দেওয়ান : সবাই তখন একসঙ্গে। আমার এইটুকুই বাড়ির আয়ে বাড়তি সংযোজন। বলতে পারেন, অন্তত আমার পকেট খরচ হয়ে যেত। ১৯৮৩ সালের দিকে বাবা মারা যান। এরপর সবাই বড় ভাইয়ের কাছে চলে আসি।
প্রশ্ন : এই সময়ে তো সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তনও ঘটল, তা কি লক্ষ করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : না, আমার কাছে এগুলোর কোনো গুরুত্ব ছিল না। বলতে পারেন আমি কখনও রাজনীতির ধার ধারিনি। গান ছেড়ে ওসবে কখনও মন টানেনি। তবে একটি ঘটনা মনে পড়ে। সম্ভবত ১৯৭৮ সালর কথা। লালবাগের নবাবগঞ্জ বাজারে আমি তখন আলুর দোকানে কাজ করি। একদিন হঠাৎ দেখি, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নবাবগঞ্জ বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। আবুল হাসনাত তখন ওই এলাকার বিএনপির নেতা। সবাই জিয়ার সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে। আমিও দাঁড়ালাম এবং জিয়ার সঙ্গে হাত মেলালাম।
রাজনীতির কাছে যাইনি। দূর থেকেই এর ভালো-মন্দ একটু একটু করে দেখলাম। গান করে খাই। রাজনীতি দিয়ে কী করব। জীবনে অনেক না খেয়ে থেকেছি। এখনও থাকি। এর মধ্যেই জীবনের স্বাদ খুঁজে ফিরি।
প্রশ্ন : সংগীতচর্চায় পরিপূর্ণভাবে মন দিলেন কখন?
আক্কাস দেওয়ান : গান করছি, কাজ করছি। খুব মনেযোগী হয়ে গান করছি বিষয়টিও তা-ও নয়। অনেকটাই অগোছালোভাবে হয়ে আসছিল। তবে ১৯৮১ সালের পর থেকেই গানের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। আমার মনে আছে, জিয়াউর রহমান যে দিন মারা যান সেদিন রাতে গোপীবাগে একটি অনুষ্ঠানে গান করছিলাম। সকালে খবর পেয়ে তার সঙ্গে হাত মেলানোর কথা মনে পড়ে গেল। পুরাতন সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে তার লাশ রাখা হলো। আমি দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভিড়ের কারণে লাশ দেখতে পারিনি।
প্রশ্ন : কোন ধরনের গানে মন দিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : বাংলা সব গানই ভালো লাগত। লোকসংগীত, বাউলগান , মুর্শিদিসহ পাঁচমিশালি গান করতাম।
প্রশ্ন : কার গানে মন মজাতেন?
আক্কাস দেওয়ান : বলছিলাম, রেডিওতে আব্দুল লতিফ সাহেবের গান শুনলে ঠিক থাকতে পারতাম না। তার গান শুনতে পারা আমার কাছে দুর্লভ মনে হতো। বাড়িতে রেড়িও ছিল না। কারও বাড়িতে লতিফ সাহেবের গান বেজে উঠলেই দৌড়ে যেতাম। দাঁড়িয়ে থেকে শুনতাম। নিজেই গান লিখছি, সুর করছি, গাইছি। সুযোগ পেলেই গান নিয়ে খেলা করেছি। মাইনে পাইনি, তবুও গান শুনিয়েছি। বলতে পারেন, ধীরে ধীরে গানপাগলা হয়ে উঠতে থাকলাম।
প্রশ্ন : আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। গান লিখছেন, তা-ও আবার ভারী গান। মুর্শিদি, বিচ্ছেদ, ভাব বিচ্ছেদ, গুরু বিচ্ছেদ, পালা গানে আপনার জুড়ি নেই। কীভাবে সম্ভব হলো?
আক্কাস দেওয়ান : গানের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। এমন সময় ওই সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়িতে আশ্রয় পেলাম। মূলত ওই শিক্ষিত পরিবারে গিয়েই ভাষাজ্ঞান শুদ্ধ হতে থাকে। আমি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত, কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার নানা অভিধান পড়তে থাকলাম। শব্দকোষ সমৃদ্ধ হতে থাকল। শিক্ষার জায়গা আমার এখানেই। আমার গানে যেসব শব্দ ব্যবহার করে থাকি, তা মূলত এখান থেকেই পাওয়া। আমার গান শুনে অনেকেই মনে করে আমি হয়ত অনেক উচ্চশিক্ষিত। আদৌও তা নয়। শিক্ষার স্পর্শ এভাবেই নিতে থাকি। বলতে পারেন আমি স্বশিক্ষিত। অনেকের গানই আমি এডিট করে দিই। তারা মনে করেন, আমি মার্স্টাস ডিগ্রি পাস। সবাই তো জানেও না।
প্রশ্ন : আপনি দত্তক মায়ের কাছে, আপনার মা বড় ভাইয়ের কাছে। সেখানে যেতেন না?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, যেতাম বৈকি। মাঝে মাঝে মায়ের কাছে চলে যেতাম। কাছাকাছিই তো ছিল।
প্রশ্ন : মাকে নিয়ে কোনো স্মৃতি ?
আক্কাস দেওয়ান : সন্তানের কাছে মা-বাবাকে নিয়েই তো যত স্মৃতি। সম্ভবত আমার বয়স তখন ৯ কি ১০ বছর হবে। গানে মন দিচ্ছি, মা বুঝতে পারছে। মায়ের কাছে একটি মাটির ব্যাংক ছিল। গানে আমার আগ্রহ দেখে, মা ওই মাটির ব্যাংকটি ভেঙে ১৮ টাকা দিয়ে একটি দোতারা কিনে দেয়। ওই ঘটনা আজও আমাকে তাড়িত করে। যতবার গানের মঞ্চে উঠি ততবারই মায়ের দেয়া ওই দোতারার কথা মনে পড়ে।
প্রশ্ন : বাবাকে হারালেন যৌবনের শুরুতেই। বাবার অনুপস্থিতি বিচ্ছেদ গানে আরও নতুন মাত্রা যুক্ত করল কি না?
আক্কাস দেওয়ান : যার যায় সে-ই জানে। বাবা-মাই তো সন্তানের কাছে মহাগুরু। এতিমের চেয়ে দুখী আর কে হতে পারে। যৌবনে বাবাকে হারালাম। ২০০৪ সালে মাকে হারালাম। বাবা-মাকে হারিয়ে সর্বহারা। অন্তরে যে বেদনা, লিখতে গেলে তা তো প্রকাশ পাবেই।
প্রশ্ন : শেষ বেলায় মা কোথায় থাকতেন?
আক্কাস দেওয়ান : মা পরে আমার কাছে থাকতেন। বিয়ের পর আমি যখন সংসারে ফিরি, তখন মাকে আমার কাছে নিয়ে আসি।
প্রশ্ন : গান লেখা শুরু কোন সময় থেকে?
আক্কাস দেওয়ান : পরিবেশ আমার মতো করে তৈরি করে নিয়েছিলাম। আর সেটা সম্ভব হয়েছিল দত্তক বাবার বাড়িতে। বাবা আমাকে খুব বুঝতেন। নিচতলায় দুটি কক্ষ ছিল। ভেতরের কক্ষে আমি থাকতাম। অন্ধাকার কক্ষটিতে আলো-বাতাস যেত না। আমি সারাদিন ওখানেই কাটাতাম। অফিসে যাওয়ার আগে টাকা, সিগারেট তো বাবাই দিয়ে যেতেন। বই পড়তাম, গান লিখতাম, আবার তা গুনগুন করে গাইতাম। কোনো কোনো দিন সূর্যের আলোই দেখতে পাইনি। গান সাধনায় মগ্ন ছিলাম। ওই সময়ে যে গানগুলো লিখেছি, তা আমার কাছে এখনও রতœ। ওই রকম আর লিখতে পারি না।
প্রশ্ন : গানে বিশেষত কী ফুটে উঠত?
আক্কাস দেওয়ান : আমি কে, কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাবÑএই তিনটি প্রশ্ন সারাক্ষণ ঘুরপাক করত। এই যে শরীর দেখছেন, এটি তো একটি খাঁচা। মানুষ ভাবে, মৃত্যুর পর মানুষ কবরে যায়। আসলে কি তা-ই। কবরে যায় তার খাঁচা। আমার ভেতরের ‘আমি’ কোথায় যাব। জন্মে তো বাবা-মা পেয়েছি। মরণের পর কাকে পাব? মানুষের তো দুটি সত্তা। জীবসত্তা, অন্তঃআত্মা। মানুষের শরীরটা হচ্ছে জৈবিক বস্তু বা বাহন। এই বাহনই আত্মাকে বয়ে বেড়ায়। বাহন অকেজো হয়ে গেলে আত্মা পরামাত্মার সন্ধানে থাকে। পরামাত্মা আবার মানুষের মধ্যেই বিরাজ করে। পরামাত্মার দেখা পাওয়া হচ্ছে সাধনা। সাধনার মধ্য দিয়ে পরামাত্মা বা স্রষ্টার সঙ্গে কীভাবে প্রেম হতে পারে, তা-ই গানে তুলে ধরার চেষ্টা করতাম। এগুলোই হচ্ছে গুরুতত্ত্ব। এ নিয়েই সারাক্ষণ চিন্তা করতাম।
অন্ধকার কুটিরে না থাকলে এভাবে ভাবতে পারতাম? এ ভাবনায় মানুষেরও সহযোগিতা পেয়েছি অফুরন্ত। যারই সঙ্গ পেয়েছি, তাতেই ধন্য হয়েছি।
প্রশ্ন : একটি অন্ধকার কক্ষে এভাবে দিনের পর দিন কাটাতে কখনও বিরক্তি কাজ করেনি? অন্যরাও তো বিরক্ত হওয়ার কথা?
আক্কাস দেওয়ান : আমি তো কাজে ছিলাম। সাধানায় ছিলাম। আমার মধ্যে কখনও বিরক্তি ভাব কাজ করেনি। বরং ওই অন্ধকার কক্ষই আমার জীবন আলোকিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। ওই পরিবেশ না পেলে আমি আক্কাস দেওয়ান হতে পারতাম না। অন্যরা আমাকে নিয়ে বিরক্ত হতো। বাবার তো আরও শরিক ছিলেন। ওপরতলায় আরও দুই স্ত্রী এবং সন্তানেরা থাকতেন। তারা ভালো চোখে দেখতেন না। কেউ কেউ ঝামেলা, ঝঞ্জাট মনে করতেন। ওগুলো তিক্ত অভিজ্ঞতা। না বলাই ভালো। কারণ আমি তা আমলে নিইনি। আমলে নিলে সাধনা হতো না। দত্তক বাবা-মায়ের ভালোবাসায় অন্যের দেয়া কষ্ট মুহূর্তেই ভুলে যেতাম। বাবা বলতেন, ‘আক্কাস তোকে অনেক বড় হতে হবে, মানুষ হতে হবে। আমি তোর মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই। হাল ছাড়লে হবে না রে। শক্ত করে হাল ধর, দেখবি একদিন তোর গান অন্যরাও গাইছে। তোর নামের সঙ্গে আমার নামও থাকবে। আমি যা পারি নাই, তুই তা করে দেখা।’
প্রশ্ন : বাবাকে কতটুকু বাঁচিয়ে রাখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : এটি বলে-কয়ে প্রকাশ করার মতো নয়। সেও তো আমার গুরু। তাকে উপলক্ষ করেই তো পথচলার চেষ্টা করি। তিনি আমার বাবা। বাবা হয়ে সন্তানের বালিশের নিচে সিগারেট রেখে যাচ্ছেন, এটি কোন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হতে পারে, বলতে পারেন? দত্তক মা গার্মেন্টসের সুপারভাইজার ছিলেন। সকালে উঠে কষ্ট করে রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতেন। বিরক্ত হব, এ কারণে কখনও ঘুম থেকে ডাকেননি। এসব কথা কখনও ভোলা যাবে। তাদের তো হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েই বাঁচিয়ে রেখেছি। আমার অন্তরে তারা বেঁচে আছেন বলেই তো আমি বেঁচে আছি।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে ফিরলেন কখন?
আক্কাস দেওয়ান : ১৯৮৯ সালে বিয়ে করে কামরাঙ্গীর চরে চলে যাই। আমার প্রথম স্ত্রী আয়েশার বাবার বাড়ি ছিল কামরাঙ্গীর চরে।
প্রশ্ন : বিচ্ছেদ গান, প্রেমের গান দিয়েই শিল্পী আক্কাস দেওয়ান পরিচিত। বিয়ে কি প্রেম করেই হলো?
আক্কাস দেওয়ান : প্রেম কি না, জানি না। তবে আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। প্রথম যখন দেখি, তখন ওর বয়স ছিল আট-নয় বছরের মতো। আমি তখন আলুর দোকানে কাজ করতাম। ওর বাবা মাছ বিক্রি করত। প্রতিদিন বিকেলে খরচ নিতে আসত। খুব ভালো লাগত। ওর ভগ্নিপতি ছিল আমার কাছের বন্ধু। তার মাধ্যমেই পরিচয়, ভালো লাগা।
প্রশ্ন : ’৬৪ সালে জন্ম। বিয়ে করলেন ’৮৯ সালে। বেশ বিলম্ব করেই বিয়ে?
আক্কাস দেওয়ান : নিজের পেটই চালাতে পারি না। পায়ের তলায় মাটি ছিল না। বিয়ে করে কী খাওয়াব। এ কারণেই বিয়ে করতে সাহস পাইনি। দত্তক বাড়িতে ছিলাম বলে পরে বিয়ে করার সাহস পাই।
প্রশ্ন : বিয়ে করে ওখানেই থেকে গেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, বাবার বাড়িতেই গেলাম। যাবার জায়গা তো নেই। ১৯৯১ সালে আমার প্রথম মেয়ে সন্তান জন্ম লাভ করে।
প্রশ্ন : আপনি নিজেই উদ্বাস্তু। বিয়ে করে বউকেও নিয়ে এলেন। কীভাবে নিলেন তারা?
আক্কাস দেওয়ান : তারা ভালোভাবে নেয়নি। দত্তক বাবা তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা দাউদকান্দির এক এমপির মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। ওই মেয়ে তখন কলেজে পড়ত। এমপি বাবার বন্ধু ছিল। বিয়েতে আমি রাজি হইনি। অমন পরিবারে ঘর বাঁধব, তা আমার পক্ষে কখনও সম্ভব নয়।
আমার বিয়ের পর বাবা খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি মেনে নেননি। তিনি দুঃখ করে বললেন, ‘আমি তোমাকে নিয়ে গোবরে পদ্মফুলের স্বপ্ন দেখেছিলাম। তোমার মধ্যে আমি তা দেখতে পেয়েছি। আমি তোমার পাশে একজন শিক্ষিত মেয়েকে ঠাঁই দিতে চেয়েছি। তার সহযোগিতায় আলো পাবে। সব ধ্বংস করে দিয়েছ।’ আমি অপরাধীর মতো চুপ করে আছি। কিছুই বলছি না। চুপ করে আছি। পরে অন্যদের অনুরোধে মেনে নিলেন।
প্রশ্ন : কেমন পেয়েছিলেন স্ত্রী আয়েশাকে?
আক্কাস দেওয়ান : প্রথম বিয়ে, নিজের পছন্দের বিয়ে। দীর্ঘ সময় ঘর করলাম। কিন্তু মতের অমিল ছিল। আমার সঙ্গীত জীবন তাকে তৃপ্তি দেয়নি।
প্রশ্ন : এরপর ?
আক্কাস দেওয়ান : তিনি আছেন, হয়ত এখন একটু দূরত্ব নিয়ে। বলতে পারেন, দুজন দুজনার মতো। মেয়ে ঊষা ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ও খুবই ভালো ছাত্রী। ক্যা¤্রব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ থেকে পাশ করেছে। এখন ফার্মেসিতে অনার্স করছে। ছেলে আকাশ এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আকাশও অনেক ভালো করবে। জীবনের যেটুকু স্বপ্ন, তা ওদেরকে নিয়েই।
প্রশ্ন : দূরত্ব সৃষ্টি হলো কখন?
আক্কাস দেওয়ান : ২০১৩ সাল নাগাদ। তবে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। প্রথম স্ত্রী। হয়ত কিছু ঘটনায় ও দুঃখ পেয়েছে। আবার ওর আচরণে আমি দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় তো সংসার করেছি। ডিভোর্স হয়নি। দেখা যাক জীবনতরী কোথায় ঠেকে।
প্রশ্ন : এরই মধ্যে আরেকজন আসলেন। প্রখ্যাত পালাগানশিল্পী নাসিমা দেওয়ান। তাকে পেলেন কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমা আমার কাছে গান শিখত। ২০০১ সালের পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমি তখন বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি। হাইকোর্ট মাজারে বসি। আগে সমিতির কমিটি নির্বাচিত হতো সিলেকশনের মাধ্যমে। একবার আব্দুর রহমান বয়াতি এবং হারেজ মিয়া সাহেব নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কয়েকটি পদে নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হয়। আমার ওস্তাদ মাখন দেওয়ান সভাপতির পদে মনোনয়নপত্র তুলল। আমিও তুললাম। ১৯৯৭ সালের কথা। নাসিমাকে ওই সময় পাওয়া।
প্রশ্ন : দত্তক বাবার বাড়ি থেকে চলে এলেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : ১৯৯২ সালে চলে এলাম। তখন কামরাঙ্গির চরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করলাম। সেখানে মেয়ের নামে ঊষা রেকর্ডিং সেন্টারের দোকান দিলাম।
সাপ্তাহিক : দত্তক বাবার বাড়ি থেকে কেন চলে এলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ইতিমধ্যে দত্তক মায়ের গর্ভে একটি ছেলে সন্তান হয়। পরে কিছুটা অবহেলিত বোধ করি। মূলত এই অনুভূতি থেকেই দত্তক বাবার বাড়ি থেকে চলে আসা।
প্রশ্ন : তখন পুরোদমে গানের মঞ্চে?
আক্কাস দেওয়ান : না, তখনও জনপ্রিয় হয়ে উঠিনি। তবে সারাদেশে বিশেষ পরিচিতি পাচ্ছি।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে গিয়ে ব্যবসাও শুরু করলেন। কেমন ছিল সে ব্যবসা?
আক্কাস দেওয়ান : এখানেও উদাসীন ছিলাম। ব্যবসা নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কর্মচারীরা দেখত। ভালো করতে পারিনি। চার-পাঁচ বছর পরে দোকান বাদ দিয়ে দিলাম।
প্রশ্ন : এরপর আয় রোজগার কীভাবে চলত?
আক্কাস দেওয়ান : আয় রোজগার কখনও ভালো ছিল না। আগেও যেমন, এখনও তেমন আছে।
প্রশ্ন : ভালো ছিল না, নাকি ভালো করার চেষ্টা করেননি?
আক্কাস দেওয়ান : বলতে পারেন চেষ্টাই ছিল না। টাকার পেছনে ছুটলে হয়ত গান এভাবে লিখতে পারতাম না। অন্ধের মতো টাকার পেছনে ছুটতে ভালো লাগত না। যা আয় করেছি, তা-ও ধরে রাখার চেষ্টা করিনি। জীবন তো চলছেই।
প্রশ্ন : দোকান ছেড়ে কী করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : গানেই ছিলাম। গান তো ছাড়তে পারিনি। তখন পুরোদমে গান লিখছি, সুর করছি। ১৯৯১ সালেই আমার একক অ্যালবাম বের হয়।
প্রশ্ন : অ্যালবামের নাম কী ছিল?
আক্কাস দেওয়ান : ‘ও সাথীরে একবার এসে দেখে যাও কত সুখে আছি’ শিরোনামে গানে অ্যালবাম বের করা হলো। নিজের লেখা আটটি গানে নিজেই সুর দিলাম। সবই আমার।
প্রশ্ন : কেমন হলো প্রথম অ্যালবাম?
আক্কাস দেওয়ান : এখানেও দুঃখ আছে। নিজের পয়সা খরচ করে গান করলাম। নিজেই বাজারজাত করব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সামাদ নামের একজন আমাদের এলাকায় ক্যাসেটের দোকান দিয়েছিল। নাম ছিল সুমন রেকর্ডিং হাউস। সামাদ আর ওর মা একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। জাপানি ছোট টেপ রেকর্ডারে রেকর্ডিং করে বাজারে বিক্রি করে। ও যেন কেমন করে খবর পেল যে আমি একটি ক্যাসেট করেছি। ও তখন আমার ওস্তাদের কাছে এসে বলল, আপনি যেমনে পারেন আপনার এই শিষ্যের ক্যাসেটটি নিয়ে দেন, আমি বাজারজাত করব।
প্রশ্ন : পরে কি দিয়ে দিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ওস্তাদকে মদ খাওয়াইয়ে রাজি করেছে। আমি ওস্তাদরে বললাম, আমি নিজেই এই ক্যাসেটের বাজারজাত করব। ওস্তাদ বলল, আমি তোর কাছে কখনও কোনো জিনিস চাইনি। তোর বাড়িতে এসেছি। আমি দাবি নিয়ে এসেছি। তুই অপমান করতে পারস না। দত্তক বাবার বাসায় এ ঘটনা। পরে আমার দত্তক বাবার অনুরোধে ক্যাসেট করে দিলাম। ফার্মগেটে রেকর্ড হলো।
আটটি গানের মধ্যে দুটি গান নিতে চাইল না। ‘ও সাথী’ এবং ‘কে যেন আমার বুকে মারল বিষের তীর’ নামের গান দুটি নিতে চাইল না। ‘কে যেন আমার বুকে মারল বিষের তীর’ চালানো গেলেও ‘ও সাথী’ গানটির ব্যাপারে পুরো দ্বিমত পোষণ করল। আমি বললাম, অনেক আবেগ দিয়ে গানটি লিখেছি। নিয়ে নেন। ভালো হতে পারে। আপনার ব্যবসা হলে আমার প্রচার হবে। জোর করে দিয়ে দিলাম। ‘ও সাথী’ গানের কারণেই অ্যালবামটি সারাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামাদ রেকর্ডিং হাউস একটানা আট কোটি টাকার ব্যবসা করেছে।
প্রশ্ন : এতে আপনার স্বত্বাধিকারি ছিল না?
আক্কাস দেওয়ান : আমার কিছুই ছিল না। গান লিখে গেয়ে দেয়া পর্যন্তই শেষ। এক টাকাও পাইনি। ওরা সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নিয়েছিল। ওস্তাদের অনুরোধে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে ওরা আমার সঙ্গে জালিয়াতি করে। আমাকে মাত্র ৫০০ টাকা দেয়ার চেষ্টা করে। নিইনি। ওস্তাদের মুখে ছুড়ে মেরে বলেছিলাম, এ দিয়ে আপনি মদ খান গিয়ে। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল না। সবাই আমাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।
পরে সুমন রেকর্ডিং হাউসের পক্ষ থেকে একটি মোটরসাইকেল দেয়ার কথা ছিল। তা-ও দেয়নি। পরে সিনেমায় যখন ‘ও সাথী’ গানটি নেয়া হয়, তখন পরিচালক আমাকে ডেকেছিলেন। কাকরাইলে নাজিমুদ্দিন চেয়ারম্যানের স্টুডিওতে পরিচালক বললেন, ‘আমরা আপনার গানটি সিনেমায় নিতে চাই। আপনাকে কিছু সম্মানী দিতে চাই। গানটি নেয়ার ক্ষেত্রে আপনার কোনো আপত্তি আছে কি না?’ আমি বললাম, আমার কোনো আপত্তি নেই। পরে জানতে পারলাম, সম্মানির ৩০ হাজার টাকাও সুমন রেকর্ডিং হাউস এসে নিয়ে গেছে।
প্রশ্ন : গানটি যখন সিনেমায় গাওয়া হলো তখন কেমন লাগল?
আক্কাস দেওয়ান : তেমন কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। পারিশ্রমিক পাইনি বলে অনুভূতি কাজ করেনি, তা নয়। গানটি লিখতে তো আমাকে অর্থ খরচ করতে হয়নি। কেউ যদি গান নিয়ে ব্যবসা করে ভালো থাকতে পারে, থাকুক।
প্রশ্ন : এরপর আরও অ্যালবাম বের হলো। এ সময় তো ভালো অর্থ পাওয়ার কথা?
আক্কাস দেওয়ান : নামেমাত্র সম্মানী পেয়েছি। এককালীন কিছু একটা সম্মানী দিয়েছে। এরা কাউকে সম্মান করতে জানে না। আপনি দেখেন, আমাদের মতো শিল্পীদের গান বিক্রি করে কত রেকর্ডিং প্রতিষ্ঠান কোাটি কোটি টাকা আয় করেছে। আমাদের টাকায় ভর করে তারা গাড়ি-বাড়ি করেছে। শিল্পীদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয় না। প্রযুক্তির কারণে তো এখন সবই বন্ধ। টাকা পাইনি, এ নিয়ে যদি মন খারাপ করে থাকতাম, তাহলে গান লিখতে পারতাম না। এই লাইনে আমাদের মতো শিল্পীরা সবাই প্রতারণার শিকার হন। আমাকে নিয়ে ব্যবসা করে আপনি ১০ টাকা আয় করছেন, ভালো কথা। অন্তত দুই টাকা তো পাবার অধিকার আমি রাখি। কিন্তু তা-ও ওরা দেয় না। এক টাকা, আট আনা নেয়ার উদাহরণও আছে। প্রচুর নয়-ছয় আছে এখানে।
প্রশ্ন : কতগুলো অ্যালবাম বের করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ৪৬টির মতো অডিও ক্যাসেট এবং ৮৪টির মতো সিডি ক্যাসেট করেছি।
প্রশ্ন : সবই আপনার লেখা?
আক্কাস দেওয়ান : প্রায় ৯০ ভাগ গানই আমার নিজের লেখা।
প্রশ্ন : এসব সংগ্রহে আছে?
আক্কাস দেওয়ান : না। বলতে পারেন কিছুই সংগ্রহে নেই। বাজারেও পাওয়া যায় না। খুঁজলে ৩০টির মতো অ্যালবাম পাওয়া যেতে পারে।
প্রশ্ন : সংগ্রহ করা জরুরি মনে করেননি?
আক্কাস দেওয়ান : নিজেরই ঠিক নেই, ক্যাসেট সংগ্রহে রাখব কী করে। কিছু সংগ্রহ রাখতে হলে নিজের ঘর লাগে। আজও তো ঘর করতে পারিনি। স্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া আমার কখনও সুযোগ হয়নি।
প্রশ্ন : উড়নচণ্ডি স্বভাব এখনও?
আক্কাস দেওয়ান : আরও খারাপ অবস্থা বলতে পারেন। যে বইগুলো পড়েছি, তা সংগ্রহে রাখলে পুরো একটি ঘর ভরে যেত। যে যার মতো করে এসে নিয়ে চলে গেছে। আমার জীবনের একটি মূল্যবান ডায়রি হারিয়ে ফেলেছি। ডায়রিতে সাড়ে ৪০০ গান ছিল। সবই আমার লেখা। মনে পড়লে আজও স্থির থাকতে পারি না। আমার যদি ২০টি বাড়ি থাকত, আর তা যদি কেউ ধ্বংস করে দিত, তাহলেও এত কষ্ট পেতাম না। আমার সবচেয়ে মূল্যবান গান ছিল সেগুলো। কোথায় হারালাম, কে নিয়ে গেল, কিছুই মনে নেই। আজও খুঁজে ফিরি। যদি নিজের একটি ভিটা থাকত, তাহলে একটি ছাপড়া ঘর করে সব সংরক্ষণে রাখতে পারতাম।
প্রশ্ন : আপনার প্রেম বিচ্ছেদের গান সবাইকে কাঁদায়। এত কষ্ট কেন?
আক্কাস দেওয়ান : একজন নারীর প্রেমে পড়লে আর তাতে বিচ্ছেদ ঘটলেই এমন গান লেখা যায় না। বিচ্ছেদ শুধু নারী-পুরুষের প্রেম কাহিনীই উপলক্ষ হতে পারে না। মন আপনার যে কাউকে হারিয়ে বিষিয়ে উঠতে পারে। বাবা-মাকে হারানোর বিচ্ছেদের বর্ণনা আপনি কীভাবে দেবেন। অনেকেই ঈশ্বর প্রেমে আকুল হয়ে ঘুরছে। পেটের ক্ষুধার চেয়ে পৃথিবীতে আর কোনো দুঃখ বড় হতে পারে না। আমি কোনো দিন ঈদগাহে যাই না। আমার মনে আছে, শৈশবে বাবা-মা কোনো দিন নতুন জামাকাপড় দিতে পারেননি।
একবার ঈদে দেখলাম, বন্ধুরা সবাই নতুন জামা কিনল। আমি কিনতে পারলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ফজর নামাজের সময় উঠে হাঁড়ি থেকে পান্তা ভাত নিয়ে মরিচ-পিঁয়াজ দিয়ে খেয়ে ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে আসি। সারাদিন ওখনেই বসে কাটাই। বন্ধুরা দেখলে শরম পাব বলে একদম নিচে বসে পানির দিকে তাকিয়ে থাকি সারাদিন। ওই দিন পানি ছাড়া আর কোনো বন্ধু ছিল না আমার। পানির সঙ্গে অনেক কথা বলেছি সে দিন। জীবনকে ভেবেছি। সন্ধ্যায় বাড়িতে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছি। এরপর থেকে ঈদ করার আর কোনো অনুভূতি আমার জাগে না।
প্রশ্ন : দ্বিতীয় স্ত্রী নাসিমা দেওয়ানের ব্যাপারে বলছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর সদরে। ওরা আওয়ামী লীগ করত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে গান গেয়ে প্রচারণা চালায়। নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে এলাকা ছেড়ে দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে। মীরবাগে দুলাভাইয়ের সঙ্গে বাসা নিয়ে থাকত। সেখান থেকে মাঝে মাঝে হাইকোর্ট মাজারে আসে। একবার সে গানের বায়না পায়। তখন সমিতির কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে, নাসিমা সদস্য নয়, অতএব সে বায়না নিতে পারে না। অনেকেই তো আছেন, অন্যের ভালো দেখতে চায় না। একজন গরিব মানুষ একটি বায়না ধরেছে, তাতে অন্যের ঈর্ষার কী আছে বলুন তো? পেটে খাবার নেই ওর। রিকশা ভাড়া দিতে পারে না। একরাত গান গাইলে এক সপ্তাহ চলতে পারবে। কেউ কেউ তখন নাসিমারে কইল, সভাপতিরে জানাও।
আমি তখন নির্বাচিত সভাপতি। তবে নামেমাত্র। কাজের কাজ নেই। রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, মমতাজ বেগমরা সবাই মিলে আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আমার ওস্তাদ মাখন দেওয়ান ফেল করল। কী কারণে সবাই আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করল, আজও বুঝতে পারি না। ওস্তাদের বিরুদ্ধে ভোট করেছি। কেউ ভালো দেখেছে, কেউ মন্দ দেখেছে। তবে যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, তারা আমাকে ভালো এবং সৎ জেনেই ভোট দিয়েছেন। আব্দুল হালিম, দলিলউদ্দিন বয়াতী, আবুল সরকার, মমতাজ বেগম, আকলিমা সরকার, আলেয়া বেগমও আমাকে ভোট দিলেন। আমি অনেক জুনিয়র ছিলাম। এরপরও সবাই আমার ওপর ভরসা পেল।
তো ওই দিন নাসিমা এসে আমার কাছে ঘটনাটি জানায়। আমি তাকে বললাম, এর পর কেউ প্রশ্ন করলে বলিয়েন, সভাপতির কাছে আমি চাঁদার টাকা দিয়েছি। আপনি আপনার মতো চলেন। সে তো মহাখুশি। তখন সবাই তাকে গান শেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। আমি আর তখন কিছু বলছি না। একদিন শবে বরাতের রাতে তার দুলাভাই আমার কাছে নিয়ে এসে বললেন, আপনি যেহেতু সভাপতি সুতরাং আপনার ওপরই ভরসা পাচ্ছি।
আমি বললাম, মেয়ে মানুষের দায়িত্ব নিতে পারব না। মেয়েদের গান শেখাব, আবার কখন মায়ায় পড়ে যাব, বলা যাবে না। পরে তারা এক প্রকার বাধ্য করল নাসিমাকে গান শেখানোর জন্য। অন্যরাও অনুরোধ করলেন। কী আর করা। শেখাতে রাজি হলাম। পরে তো নিজেই নাসিমার মায়াজালে বন্দি হয়ে গেলাম।
প্রশ্ন : যদি পরিষ্কার করতেন ?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমাকে গান শেখানোর সময় স্ত্রী আয়েশা এমন একটি ভূমিকা পালন করল, তাতে নিজের প্রতি আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। রাগ করে নাসিমাকে বিয়েই করে ফেললাম।
প্রশ্ন : শুধুই রাগ করে বিয়ে, প্রেম ছিল না?
আক্কাস দেওয়ান : প্রেম তো ছিলই। রাগ ছিল আমার। প্রেম না থাকলে ও তো আমাকে বিয়ে করত না। আমি গান শেখাই, সে প্রেম শেখায়। প্রেম থাকলেও জেদের বশেই ২০০২ সালে নাসিমাকে বিয়ে করি।
প্রশ্ন : গান শুধু আপনার কাছেই শিখল?
আক্কাস দেওয়ান : না। নাসিমা অনেক আগেই গান শিখেছিল। আমার কাছে আসা ওর অবস্থান শক্ত করার জন্য। ভালো করত। সারা দেশেই ওর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
প্রশ্ন : আপনার লেখা গানেই তার পরিচিতি পাওয়া। কেমন পেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ওর কণ্ঠে তো জাদু আছে। গলায় সাংঘাতিক পাওয়ার। এরপরও শেখানোর সময় মাঝে মাঝে খটকা লাগত। একদিন লালন সাঁইজির গান রেওয়াজ করছে। সুর আদায় করতে পারছে না। বার বার বলে দিচ্ছি। কাজ হচ্ছে না। রাগের মাথায় মন্দিরা দিয়ে ওর পায়ে আঘাত করি। সম্পর্ক মধুর হলে মাঝে মাঝে বিষ এসে যায়।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে কেমন পেয়েছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমাকে বিয়ে করার পর বলা যায় মুসলমান হতে শুরু করলাম। আগে স্ত্রীর হক বুঝতাম না। দুজনকে নিয়ে হক আদায়ের গ্যাঁড়াকলে পরলাম। দুজনের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজের অধিকার কখন যে ক্ষুণœ হচ্ছে, তা বুঝতে পারলাম না। মানুষ হয়ে যন্ত্রে পরিণত হলাম। নাসিমারে নিয়ে গান গাই। ওর টাকা ও-ই ব্যবহার করে। আমার টাকায় সংসার চলে।
নাসিমাকে বিয়ে করার পর ২০০৩ সালে মিরপুরে চলে আসি। আয়েশা এবং নাসিমা দুজনই পাশাপাশি থাকত। নাসিমার বিয়ে আয়েশা কখনও মেনে নেয়নি। বিয়েতে আয়েশার অনুমতি নেইনি বলে সে মামলা করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু মামলা চালাতে আমার কাছ থেকেই টাকা নিতে হবে বলে আর করতে পারেনি। বিয়ে মেনেও নেয়নি।
প্রশ্ন : নাসিমার ঘরে কোনো সন্তান?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, ২০০৩ সালে তার ঘরে এক কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। বড় মেয়ের সঙ্গে মিল রেখে ওর নাম রাখি তৃষা। তৃষা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে।
প্রশ্ন : মেয়ে থাকে কই?
আক্কাস দেওয়ান : ও মায়ের কাছেই থাকে। আমাকে ছেড়ে গিয়ে নাসিমা অন্য জায়গায় বিয়ে করেছিল। তবে সেটাও টেকেনি।
প্রশ্ন : এত মধুর সম্পর্ক, ছাড়লেন কেন?
আক্কাস দেওয়ান : আমি ছাড়িনি। সে-ই আমাকে ছেড়ে গেছে।
প্রশ্ন : একই মঞ্চে গান করতেন। সে তো তৃপ্ত হওয়ার কথা।
আক্কাস দেওয়ান : না। একই মঞ্চে গান গাইলেও সে আমাকে নিয়ে তৃপ্ত ছিল না। হয়ত আমাকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন ছিল, তাতে সাড়া দিতে পারিনি। তবে সে এখন ভালো আছে। কোনো অস্থিরতা নেই। আমরা একই মঞ্চে গানও গাই।
প্রশ্ন : গান তো এখনও লিখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। অনেকেই আমাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু গান আমাকে ছাড়েনি। গান নিয়েই আছি।
প্রশ্ন : কত গান লিখলেন? সংরক্ষণে আছে?
আক্কাস দেওয়ান : আড়াই হাজারের মতো হবে। সব সংরক্ষণে নেই। তবে মানুষের মুখে মুখে আছে। সবাই তো গায়। মাজার, পালাগান, দরাবারি, বৈঠকি গান হলেই তো আমার লেখা গান গায় শিল্পীরা। অনেক গান তো হারিয়ে গেছে।
প্রশ্ন : এখন কোন ধরনের গান লিখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : গত বছর একটি গান লিখেছিলাম, ‘আমি যেন এক দিগভ্রান্ত এক উড়ন্ত পাখি, কাল কাটালাম ডালে ডালে এখন ঘর থুইয়া বাইরে থাকি।’ আমার পুরো জীবনটাই এই গানে এসেছে। আমি সারা জীবন উড়েই চলছি। কোনো দিক নেই। ঠাঁই নেই, ঠিকানা নেই। আজ পর্যন্ত দিক পেলাম না। বাজারে আমার লেখা গানের পাঁচটি বই রয়েছে যার নাম ‘আক্কাস গীতি’। একটি বইয়ের গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। শাহীন মুরাদ নামের আমার এক বন্ধু বইটি অনুবাদ করে বাজারজাত করেন। বইটি আবারও সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়।
পরমতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, পীর-আউলিয়ার জীবনী নিয়ে গান লিখেছি। প্রেম-বিচ্ছেদ, গুরুবিচ্ছেদ, ভাববিচ্ছেদ লিখেছি। এখন সবার কাছে আমার লেখা বিচ্ছেদ এবং মুর্শিদি গানই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্ন : পালা গান কেমন লিখলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ঠিক আলাদা করে বলার সুযোগ নেই। আমি তো পালা গানই করি। আর পালার জন্যই তো গান লিখেছি। সারা রাত আমার লেখা গান দিয়েই পালা শেষ করতে পারি। পালার ধরন বুঝে গান লিখতে হয়, গাইতে হয়।
প্রশ্ন : গ্রামেগঞ্জে জনপ্রিয় পালাগান। ভক্ত নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?
আক্কাস দেওয়ান : অবাক লাগে। আপনি কোনো গানই শ্রোতাদের রাতভর শোনাতে পারবেন না। একমাত্র পালাগান শেষ না হওয়া পর্যন্ত শ্রোতাদের মন ভরবে না। শ্রোতাদের রাতভর ধরে রাখছি, নিজের লেখা গান গাইছি, তাতে ভালোই লাগে। বাউল শিল্পীদের অন্যতম অবলম্বনই হচ্ছে পালাগান।
প্রশ্ন : শিল্পী মহলে দিনকে দিন আপনার লেখা মুর্শিদি গান গুরুত্ব পাচ্ছে। মুর্শিদের দেখা পেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : না, দেখা পাই নাই। এক মুর্শিদ হচ্ছেন প্রত্যক্ষ গুরু, যিনি পরমগুরুর দেখা মেলাবেন। প্রত্যক্ষ বা সম্মুখগুরুর দেখা পেলেও পরমগুরুর দেখা পাইনি। পরম গুরুরে পাইলে তো আমার এই হাল হতো না। মানুষের মাঝেও থাকতাম না। পাবার আশায় আছি।
নিজের লেখা গান, ‘আমি কবে বলো তোমার দেখা পাব, ও প্রাণবন্ধুরে, আমি কবে বলো তোমার দেখা পাব। বন্ধু তোমায় দেখার আশে ঘুরছি আমি পাগল বেশে, দেশে দেশে আর কত ঘুরিব, আমি না দেখে তোমার চেহারা, প্রেমাবেগে আধামরা, হয়ত এবার মরিয়াই যাব। বন্ধু তোমায় খুঁজতে খুঁজতে উঠেছি পাহাড়-চূড়াতে, সম্ভব নয় আর পেছনে পালাব, ডানে-বামে-উপর-নিচে, জায়গা নাই আর আগে-পিছে, এখানেই তোমার আশায় রইব। বন্ধু তোমার দেখা পাইলে, ভরে রাখব আমার হৃদকোমলে, চাঁদ সুরুজ কেহ দেখতে নাহি দেব, হবে একান্তই তুমি আমার, আর কারও নাই কোনো অধিকার, আমি আক্কাস দেওয়ান স্বার্থপরই হব।’ এমন আকুতি পরম বন্ধু, পরম ঈশ্বরের কাছেই করে যাচ্ছি। অনুভূতি? পাহাড়চূড়ায় উঠে আমি বড় ক্লান্ত। আর পারছি না। এবার তিনি দয়া না করলে আমি দিশেহারা। কোনো উপায় থাকবে না। পিছনে এলেই আমি পরাজিত সৈনিক। অল্প সময় নিয়ে এসেছি, আর তাতেই যদি মহান আল্লাহকে ভুলে যাই, তাহলে পরজীবনে কিনারা থাকবে না। এ কারণেই তার দর্শনে সদয় ঘুরে ফিরছি।
প্রশ্ন : বলছিলেন, দিগভ্রান্তের মতো ঘুরছেন। পরমআত্মা অর্থাৎ ঈশ্বর আছে কি নাই, এমন দ্বিধা কাজ করে না?
আক্কাস দেওয়ান : ইশ্বর না থাকলে আমি এলাম কোথা থেকে। এই জীব কাঠামোর মধ্যে যে ‘আমি’ তা তো ঈশ্বরের অনুগ্রহেই সৃষ্টি। আমি তাকে খুঁজে পাইনি ঠিক, সে আমাকে নিয়ন্ত্রণ ঠিকই করছে। নইলে আমি কে? সৃষ্টির মূলে একজন তো আছেন।
প্রশ্ন : সুফিবাদকে কেমন জানলেন?
আক্কাস দেওয়ান : এতটুকু বুঝতে পারি, সুফিবাদ হচ্ছে মানববাদ। মানবের ওপরে আর কিছু নেই। মানবকে ভোজলেই আল্লাহ ভোজন হয়। মানুষের মন পেলেই আল্লাহর মন পাওয়া যায়। এখানে হিংসা থাকে না, লোভ থাকে না, কাম থাকে না, অহঙ্কার থাকে না। আমি তো কোনোটিই ছাড়তে পারি না। এ কারণে হয়ত সুফিদের জীবনী পড়লেও নিজের জীবন তাতে মেলাতে পারিনি। লোভ, কামের তাড়নায় সব হারালাম। কামের ফাঁদেই আটকে রইলাম।
তাই লিখেছিলাম, ‘মন তুই ডাকরে, ডাকার মতো তারে ডাক, যেমন কোলের শিশু মা মা বলে ডাকে, চেনে না আর মা বিহনে কাউকে, তেমনি হয়ে শিশুর মতো, ডাক তুই অবিরত, দেবে ধরা পাকজাত।’ কিন্তু আজও ডাকার মতো ডাকতে পারলাম না। আশেক যদি সত্যিকারভাবে আশেকান হতে পারে, মাশেক এমেিনেতই ধরা দেবে। মাশেকেও তো আশেকের প্রেমে পড়তে চায়। নিজের মধ্যে আমিত্ব রেখে ডাকলে মাশেক মিলবে না। শিশু শুধু মাকেই চিনতে পারে। আর চিনতে পারে বলেই মা শিশুর আহ্বানে সাড়া দেন। আমি যদি শিশুর মতো ডাকতে পারি, খোদা মিলবেই। খোদা পেতে হলে সব বাদ দিতে হবে।
মুনছুর হাল্লাজের মধ্যে আমিত্ব ছিল না। সব বিসর্জন দিয়ে খোদার তরে নিবেদিত ছিল। আর তখনই মুনছুর হাল্লাজ খোদায় মিলে গিয়ে বলল, ‘আমিই আয়নাল হক।’ অর্থাৎ আমিই খোদা। আসলে মুনছুর হাল্লাজ আল্লাহ নন, তার জবানিতে আল্লার জবান বের হলো। অবুঝরা মুনছুর হাল্লাজরে পাপী বলে ঘোষণা করল। আদৌ পাপাী নন। সাধনা করার পর স্বয়ং খোদা তার ওপর ভর করেছিলেন। সাধনা করে জীবকে দুর্বল করলেই পরমাত্মা সবল হয়। এই কারণেই সিয়াম সাধানার মধ্য দিয়ে আল্লার নৈকট্য লাভ করা যায়। রোজা রাখলে শরীর দুর্বল হয়। শরীর দুর্বল হলে নিজের ভেতরকার আমিত্ব দুর্বল হয়। আর তখনই খোদাই শক্তি ভর করে।

 

প্রশ্ন : খোদা কি সব হারাতে বলছে?
আক্কাস দেওয়ান : না, সব হারাতে বলেনি। সব হারালে তো খোদাও হারিয়ে যায়। নিজের ভেতরের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে বলেছেন। আর সেটা সম্ভব হয় অন্যেকে ভোজন করে। আমিত্ব দুর্বল হয়, পরামাত্মা সবল হয়। আপনি সহজ জ্ঞানে এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
প্রশ্ন : শরীয়াত অর্থাৎ প্রকাশ্য এবং মারফাত অর্থাৎ গোপনীয় মতবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। তা নিয়ে আপনারা বাহাসও করেন। আসলে বিষয়টি কী?
আক্কাস দেওয়ান : আমাদের বাহাস দ্বন্দ্ব নিরসেনর জন্য। শরীয়াত-মারফাতের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। খোদার অনুগত বান্দা হিসেবে প্রকাশ্য কতর্ব্য আপনাকে পালন করতেই হবে। আবার মারফত বাদ রেখে আপনি শরীয়াত পালন করতে পারবেন না। আল্লাহকে বিশ্বাস করেন এবং তা কিসের ভিত্তিতে বিশ্বাস করেন, এটি গোপন বিষয় বা মারাফত। আর এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি যখন নামাজ পড়বেন, তা হবে প্রকাশ্য বা শরিয়াত। শরীয়াত-মারফত একে অপরের পরিপূরক। মাওলানা এবং ফকিরেরা যদি এই বিশ্বাস নিয়ে দ্বন্দ্ব করে থাকেন, তাহলে সেখানে ধর্ম থাকে না। দ্বন্দ্ব থাকলে জ্ঞান থাকে না। প্রকৃত মাওলানা এবং প্রকৃত ফকিরের মধ্যে কোনোদিন দ্বন্দ্ব হতে পারে না।
প্রশ্ন : রাষ্ট্রে, সমাজে ধর্মচিন্তা গুরুত্ব পাচ্ছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : এ চিন্তা ব্যক্তি স্বার্থে। ধর্ম ব্যক্তির চিন্তার ওপর নির্ভর করে। তা চাপিয়ে দিলে অপব্যবহার হতে পারে। দুনিয়াজুড়ে তা-ই হচ্ছে। প্রত্যেক মানুষ যদি তার ব্যক্তিজীবনে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূলের পথ অনুসরণ করে, তবে রাষ্ট্র, সমাজ এমনিতেই সঠিকভাবে চলবে। দর্শন নিয়ে যুদ্ধ করে মুসলমানেরা রক্তপাত ঘটাচ্ছে। এতে ইসলামেরই ক্ষতি হচ্ছে। ভুলের মধ্যে থাকার কারণেই নিজেরা নিজেরা খুনাখুনি করছে। ইসলামে ফ্যাসাদের কোনো জায়গা নেই।
প্রশ্ন : মাজার নিয়েও ব্যবসা হয়, রাজনীতি হয়। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : দেখুন, একজন ভক্ত পীর-মাজারকে উপলক্ষ করে একটি গরু মানাত করল। ওই গরু কিন্তু পীর ভোগ করছেন না। মানুষ ভোগ করছে। মানুষকে ভোজন করেই তো পীর-আউলিয়াকে পেতে হয়। আর আল্লাহ, আল্লাহর রাসূলকে পেতে হলে উছিলা লাগবেই। এটি হচ্ছে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসে আপনি আঘাত করতে পারেন না। এখন যদি ওই গরুর মাংস নিয়ে ব্যবসা করে, রাজনীতি করে, তার দায় তো পীর বা ভক্ত নিতে পারে না। কাবা শরিফ ইট-বালুর তৈরি। মাজারও তাই। আপনি কাবায় গেলে আমি মাজারে যেতে পারব না কেন। দুটিই তো আল্লাহর সান্নিধ্য পাবার আশে। পীর-আউলিয়া, আলেম-ওলামায়ের মাধ্যমেই তো আল্লাহ-রাসূলকে পেতে হবে। তারাই তো পথ দেখান।
তাই তো লিখেছিলাম, ‘তার মধু রসের টানে গো, সে আমারে পরান ধইরা টানে, তার জন্য মোর ভালোবাসা ছিল, মনের কোণে গো।’ মধু আছে বলেই তো ভক্তরা মাজারে যায়। তবে হ্যাঁ, মাজারও দুই নম্বর আছে, পীর-মাওলানারও কেউ কেউ দুই নম্বর আছেন। মাজার নিয়েও ব্যবসা হচ্ছে, রাজনীতি হচ্ছে। সারা জীবন আকাম-কুকাম করছেন, মরার পরে টাকার জোরে মাজার হইয়্যা গেছে এমন নজিরও আছে। আমাদের মধ্যেও তো অনেক ধান্দাবাজ আছেন। ভালো পোশাক পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সারা রাত ভালো ভালো কথা বলে ভক্তদের কাঁদাচ্ছি, কিন্তু প্রতিনিয়ত নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতারণা করছি। নবী মুহম্মদ কখনও সুখ ভোগ করেননি। নবীর ভক্ত মাঈনুদ্দিন চিশতী জীবনে সুখ ভোগ করেননি। সাঁইজী লালন ফকির মানুষকে চিনতে গিয়ে সারা জীবন কষ্ট করেছেন। সংসার ছেড়েছেন। তারা মানুষকে দিতে এসেছিলেন, নিতে আসেননি।
প্রশ্ন : আপনি বায়াত পড়লেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, আমি একজন অখ্যাত পীরের হাতে মুরিদ হয়েছি। আমার পীর বাবার নাম আব্দুল হক শাহ্।
প্রশ্ন : পীরকে কেমন পেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : অনেকের সঙ্গেই চলেছি। অনেক পীর-আউলিয়ার দরবারেও গিয়েছি। যাদের হাতে বায়াত পরার কথা, তাদের ওপর ভরসা পাইনি। এখানে ভরসা পেয়েছি। বাবুবাজারের বাহার শাহ বিয়ে করেননি। তার সংসার ধর্ম ছিল না। বাহার শাহ্’র শিষ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাহাত আলী শাহ্ । তিনিও বিয়ে করেননি। তার শিষ্য কালাই শাহ্ও বিয়ে করেননি। কালাই শাহের শিষ্য হক শাহ্ । তিনিও বিয়ে করেননি। সাধানায় তারা পরম্পরায় সবাই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি কর্মে বিশ্বাসী। শাস্ত্র জ্ঞানের চেয়ে কর্মের ওপর আধ্যাত্মিকতা অর্জন করছেন। এ কারণেই তাকে ভালো লেগেছে।
প্রশ্ন : পীর বিয়ে করেননি। আপনি তো তিন বিয়ে করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : আমি সংসার ছাড়তে পারিনি বলেই তো এই দশা। তার হাতে মুরিদ হওয়ার পর থেকে গানের বায়না কমে যায়।
প্রশ্ন : কেন এমন হলো?
আক্কাস দেওয়ান : অনেক জনপ্রিয় পীর দশ লাখ টাকা নিয়ে এসে আমাকে প্রস্তাব করেছেন তার মুরিদ হওয়ার জন্য। ভালো লাগেনি। আমি মুরিদ হলে আমার নাম ভাঙিয়ে তার ব্যবসা হতো। আরও মুরিদ ধরতে পারত। কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে তো ব্যবসা হয় না।
প্রশ্ন : পীরের আশীর্বাদ নিতে যান?
আক্কাস দেওয়ান : এখানেও আমি অধম। পীরের ভোজন আমাতে হয় না। খাজাবাবা তার পীরের টানা ২০ বছর গোলামি করছেন। সেই তুলনায় আমি নিকৃষ্ট। নগণ্য বললেও ভুল হবে।
প্রশ্ন : মন চায় ভোজন করতে?
আক্কাস দেওয়ান : সময় কই, মন কই। আমি তো সংসারের ফাঁদে আটকা। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, তার ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে অইব। বাথরুমের পানির ভাড়া দিতে অইব। অনেকের জন্য নতুন গান লিখতে হয়। কূলহারা মানুষের যে পরিণতি হয় আর কি।
প্রশ্ন : আবারও গান প্রসঙ্গ। বাউলগানের ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : দেখলেন তো, বউ আমারে সিগারেটটি টানতে দিল না। আপনাকেও না। ও জানে, সিগারেট না খাইলে ভেতরটা ভালো থাকে। তেমনি বাউলরাও জানেন ভবিষ্যতে কীভাবে এই গানকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। ভালো মন, ভালো চিন্তা দিয়ে গান লিখলে, গাইলে এই গান কোনো দিনও ধ্বংস হবে না।
২০০৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে গিয়েছিলাম। উপসালা ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে আমাদের আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। প্রফেসর ড. ক্রিস্টিনা নায়াগ্রেন আমাদের আমন্ত্রণ করেছিলেন। সেখানে গিয়ে বুঝেছি বাউল গানের জীবন আছে।
প্রশ্ন : কেন এমনটি মনে হলো?
আক্কাস দেওয়ান : প্রোগ্রামের আগের দিন রাতে খাচ্ছি। তখন এমটিভিতে ইংরেজি গান হচ্ছে। আমি প্রফেসর ক্রিস্টিনাকে বললাম, তুমি আমাদের এই চ্যানেলে গান গাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। ক্রিস্টিনা বলল, দেব। তুমি এখন খাও। পরের দিন প্রোগ্রাম হলো। খুব ভালো হলো। শত বছরের একটি হলে গানের আয়োজন করা হলো। সবই বাংলা বাউল গান গাইলাম। আমাদের গান সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করা হলো। গান শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তখন ক্রিস্টিনা বলল, দেখ তোমাদের গানে মানুষ কাঁদে। এমন গানে মানুষ জীবন খুঁজে পায়। তোমাদের গানে ঈশ্বরের দেখা মেলে। মা, মাটি, মানুষ তোমাদের গানে গুরুত্ব পায়। তোমরা দু’জনই সারারাত গান করো, তবুও দর্শক, শ্রোতা ওঠে না। ফাঁকা জায়গায় মাটিতে বসে রাতভর তোমাদের গান শোনে। আর এমটিভির গানে শুধু যৌনতা প্রকাশ পায়। ওগুলো মানুষের জীবন স্পর্শ করে না। ক্রিস্টিনা নায়াগ্রেন ধর্ম পরিবর্তন করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি আধ্যাত্মিকতারও চর্চা করেন। ক্রিস্টিনার বলার পর আমার বড় একটি শিক্ষা হয়ে গেল। আমি কেন চ্যানেলে গাওয়ার সাধ জাগালাম? ক্রিস্টিনাকে আমার গুরু মানলাম।
প্রশ্ন : প্রথম দেশের বাইরে গেলেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে প্রথম স্পেনে যাই।
প্রশ্ন : কীভাবে গেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের সঙ্গে। তার একটি টিমের সঙ্গে আমাদের বাউলদের একটি টিমকে নিয়ে যাওয়া হয়। জাতিসংঘ এবং স্পেন সরকারের যৌথ আয়োজনে একটি প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। মাদ্রিদ থেকে বেশ দূরে পালমা দ্বীপে অনুষ্ঠানটি হয়।
প্রশ্ন : ওইদিনের কোনো ঘটনা মনে রেখেছেন?
আক্কাস দেওয়ান : স্পেনের রানী ডোনা সোফিয়া আমাদের গানে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচনেল। ছবি তুললেন। দেশের বাইরে গিয়ে প্রথম গান গাওয়ার ঘটনা সত্যিই মনে রাখার মতো।
প্রশ্ন : বিবি রাসেলকে কেমন দেখলেন?
আক্কাস দেওয়ান : বিবি রাসেল অত্যন্ত ভালো মানুষ। তার তুলনা হয় না। ফ্রান্সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তিনি। তার কারণেই প্রথম দেশের বাইরে যেতে পারলাম।
প্রশ্ন : এরপর আর কোথাও গেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ২০০৮ সালে আবারও সুইডেনে গেলাম। ২০০২ সালে ঠুনকো অজুহাতে পুলিশ আমাদের সুইডেন যেতে দেয়নি। আমাদের কাগজপত্রে সচিব স্বাক্ষর না করে উপসচিব স্বাক্ষর করেছিলেন বলে পুলিশ আটকে দিল। এয়ারপোর্ট পুলিশ টাকা চেয়েছিল। আমি বললাম, সৎ মানুষ কোনোদিন দেখেননি, পুলিশে যারা চাকরি করে তারা কখনও সৎ মানুষের সন্ধান পায় না। আমাকে দেইখ্যা রাখেন। কোনো দিন ভালো লাগবে। এক টাকাও আপনাকে দেয়া হবে না। এমন তর্কের মধ্যেই আমাদের বিমান চলে গেল। সেবার বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।
এরপর সিঙ্গাপুর তিনবার, ভারত তিনবার, নেপাল, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় একবার করে গিয়েছি।
প্রশ্ন : দেশের বাইরে প্রোগ্রাম করে কেমন সাড়া পান?
আক্কাস দেওয়ান : স্পেনের প্রোগ্রামে মাত্র চারজন বাঙালি ছিল। সুইডেনের প্রোগ্রামে কোনো বাঙালি ছিল না। সেখানে ১৬টি দেশের টিম গিয়েছিলাম। আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। দেশের বাইরে বাউল গানের অন্যরকম কদর রয়েছে।
প্রশ্ন : লেখার ক্ষেত্রে কাউকে অনুসরণ করেন কি না?
আক্কাস দেওয়ান : ঠিক ওভাবে না। যা মনে ধরে তাই লিখি।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে স্থিরতা পেতে মন চায় না?
আক্কাস দেওয়ান : সারাদিন যা-ই করি, রাতে তো দেহটা এক জায়গায় রাখি। বলতে পারেন, এটুকুই স্থিরতা। মানুষের বাড়িতে থাকি, কিন্তু ভাড়ার টাকা তো আমাকেই জোগাড় করতে হয়। স্থিরতার জন্য বিয়ে করলাম। কই? তেমন হতে পারলাম না। সংসার ছাড়ি, সংসার ধরি। এভাবেই চলছে। আগের দুই বউয়ের মনে ধরা পড়িনি। এখন এরে (স্বপ্না দেওয়ান) নিয়া আছি। দেখা যাক, কতদিন থাকে সে?
প্রশ্ন : কীভাবে পাইলেন স্বপ্না দেওয়ানকে?
আক্কাস দেওয়ান : ওর গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচরে। স্বামী, সন্তান নিয়ে মিরপুর-১১ তে থাকত। সেখান থেকে মাঝে মাঝে শাহ্ আলী বাবার মাজারে আসে। ওর পরিবার বাউল গানের ভক্ত। মাজার থেকে শিল্পীরা ওদের গ্রামের বাড়িতে গান গাইতে যায়। ২০১১ সালের দিকে একদিন হঠাৎ করে ক্লাবে এসে আমার কথা জিজ্ঞাস করে। অন্যেরা আমাকে দেখিয়ে দেয়। সে এসে সালাম দিয়েই বলল, আপনার গান আমার খুব ভালো লাগে। খুব পছন্দ করি। বিয়ের পরে শুনেছি, অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে সে একদিন পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আইসক্রিম বিক্রেতার মাইকে আমার লেখা ‘তোর পিরিতের এত জ্বালা আমি সইবো কেমন করে’ গানটি বারবার শুনেছে।
পরিচয়ের পর সে গান শিখতে আসল। গান শেখার কথা শুনে তো ভয় পেয়ে গেলাম। প্রথম যেদিন অফিসে ঢুকল মনে হলো আগুন ধরে গেল। সে আজ আমার কাছে গান শিখতে চাচ্ছে, এবার মনে হয় কোন খপ্পরে পড়ে যাই। আমি রাজি হইনি। সে তো নাছোড়বান্দা। পরে আমি বললাম, শেখাতে পারি তোমার বাবা-মা এবং স্বামী এসে বলতে হবে। তাই হলো। গান শেখানো শুরু হলো বটে। ও পুরো মন দিল গানে। তখন আমি মনে করলাম শেখানো সম্ভব হবে। পানির মধ্যে নামিয়েও গানের প্র্যাক্টিস করালাম।
প্রশ্ন : স্বপ্নার প্রেমের ফাঁদে পড়লেন কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : ওর ছোটবোনের বিয়েতে গিয়ে পুকুর থেকে শাপলা ফুল তোলাকে কেন্দ্র করে দু’জনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এরপর দার্জিলিং ঘুরতে যাই। সফরের তিন দিনের মাথায় সংসার জীবনের নানা দুঃখ কথা প্রকাশ করি। আমার দুঃখের কথা শুনে ও কান্না করে। এরপরেই প্রেম। এ সময় ‘বন্ধু তোমার মায়া ভুলতে পারি না’ গান লিখে ওকে ফোনে শোনাতাম। ঢাকায় আসার পর ওকে নিয়ে আমার পীরের বাড়ি যাই। সেখান থেকে আসার পর ওর স্বামী ওকে ব্যাপক মারধর করে। এরপর ও আর সময় নেয়নি। ওই দিনই স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে আমারে ফোন দিয়েছে। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। ডিভোর্স দিয়ে সে গ্রামের বাড়ি চলে যায়। এরপর ঢাকায় এসে আলাদা বাড়ি নিয়ে আমার কাছেই গানের তালিম নিতে থাকে।
একদিন আরেকটি মেয়েকে গানের তালিম দিচ্ছি, এমন সময় স্বপ্নাও চলে আসে। সে ওই মেয়েকে দেখে থমকে যায়। বাসায় যাওয়ার পর ফোনে অসুস্থতার কথা জানতে পারি। আমি গিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার মানসিক রোগের কথা বলে হাসপাতালে ভর্তি করানোর কথা বলেন। ওকে নিয়ে হাসপাতালে তিন দিন ছিলাম। আমি ২৪ ঘণ্টাই হাসপাতালে সময় দেই। মোবাইল ফোন বন্ধ। রিলিজ দেয়ার দিন ড্রাইভারকে বললাম, ওকে নামিয়ে দিয়ে আমাকে বাসায় নিয়া যাবা। এর মধ্যে আমার মেয়ে ঊষা এবং ছেলে আকাশ সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে যায় আমাকে আনতে। গাড়ি নিয়ে বাসার গেটে আসতেই আমার প্রথম স্ত্রী বেশ খারাপ ব্যবহার করে। ওর জায়গা থেকে হয়ত স্বাভাবিকই ছিল সেটা। কিন্তু আমরা মানতে পারিনি। এরপরেই রাগের মাথায় বিয়ে করে ফেলি। প্রেম তো আগে থেকেই ছিল। স্বপ্নাকে বিয়ের ঘটনা ২০১৩ সালের। আর নাসিমা দেওয়ান চলে যায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে।
প্রশ্ন : স্বপ্নাকে নিয়ে এখন কেমন আছেন?
আক্কাস দেওয়ান : দিন তো কেটে যাচ্ছে। ও আমাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এক প্রকার বাধ্য হলেও আমিও তাতে সায় দিচ্ছি। গত দু’বছর ধরে সব ধরনের নেশার হাত থেকে রেহাই পেয়েছি।
প্রশ্ন : লেখক, শিল্পী আক্কাস দেওয়ান কোথায় যেতে চায়?
আক্কাস দেওয়ান : গান লেখা আর সুর করার মধ্যেই থাকতে চাই। মিডিয়া অনেক সময় যোগাযোগ করে। ওভাবে সময় দিতে পারি না। অন্য জায়গায় ব্যস্ত হলে লেখার জায়গা ছোট হয়ে আসতে পারে।
প্রশ্ন : কারা গাইছে আপনার গান?
আক্কাস দেওয়ান : অধিকাংশ বাউল শিল্পীই আমার গান গায়। সারা দেশের মাজার-দরবারে অনুষ্ঠান হলে আমার লেখা গান দুই একটি শুনতে পাবেন। টেলিভিশনে যারা গাইছেন তাদের কেউ কেউ আমার গান গাইছেন। তবে আমি কখনও গান বিক্রি করি না।
প্রশ্ন : জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নিয়ে কিছু বলবেন?
আক্কাস দেওয়ান : আমার গান লেখা, আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। রশিদ সরকার, ইসলাম সরকার অনেক ভালো গান করতেন। তাদের সঙ্গেও গান করার সুযোগ হয়েছে। যাকে সঙ্গে পেয়েছি, তাকে আপন করেই পেয়েছি।
প্রশ্ন : রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের সময়ের গানের সঙ্গে এখানকার গানের মান নিয়ে কী বলবেন?
আক্কাস দেওয়ান : মান কমছে, তা বলতেই পারি।
প্রশ্ন : মানিকগঞ্জকে বলা হয় বাউলের খনি। আপনার জন্মও সেখানে। আপনিও কি তা-ই ভাবেন?
আক্কাস দেওয়ান : মানিকগঞ্জের মানুষ ভাবুক। আর ভাবনাটা আনন্দের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চায়। এখনকার মানুষ সহজ সরল, কিন্তু আবেগ বেশি। আর সেই আবেগ দিয়েই গান অত্যন্ত ভালোবাসে।
প্রশ্ন : জীবনের রং ভবিষ্যতে কেমন দেখতে চান?
আক্কাস দেওয়ান : সুখ ভালো লাগে না। যেমন আছি তেমনই থাকতে চাই। আমাকে ভালো জেনে ওরা প্রেমে পড়েছে। ভালো লাগেনি চলে গেছে। কোনো দুঃখ নেই। কষ্টের মধ্যেই জীবনের স্বাদ খুঁজে পাই। নিজের দুঃখ দিয়ে অন্যের দুঃখ অনুভব করি। সুখের চেয়ে দুঃখের গানেই প্রাণ খোলে। তাই বলতে পারেন, দুঃখই আমার চিরবন্ধু।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১১:৩৫:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১
৩২৪৩ বার পড়া হয়েছে

‘গান’কে ভর করেই বেঁচে আছেন আক্কাস দেওয়ান

আপডেট সময় ১১:৩৫:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১

রোস্তম মল্লিক

‘সুখ ভালো লাগে না। যেমন আছি তেমন থাকতে চাই। আমাকে ভালো জেনে ওরা প্রেমে পড়েছে। ভালো লাগেনি চলে গেছে। কোনো দুঃখ নেই।’
এই দুঃখহীন দুঃখই তার জীবন। শৈশবেই ভিটাচ্যুতি দিয়ে দুঃখজীবনের শুরু। মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তর। পিতা-মাতার মৃত্যু। কসাইর দোকানে কাজ। জীবনরথে ঘুরতে ঘুরতে এক গানপাগল ব্যাংকার দম্পতির ঘরে ওঠা। তাদের অপরিসীম ভালোবাসা আর চেষ্টায় মূর্খজীবন থেকে বইয়ে মগ্ন হওয়া। স্বশিক্ষিত সেই জীবন খুলে দেয় গান আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নয়াজগৎ। জীবনে প্রেম আসে, বিচ্ছেদ মেলে, সাফল্য আসে, খ্যাতি মেলে কিন্তু সচ্ছলতা ধরা দেয় না। সংসার ছাড়েন, নয়া সংসার ধরেন কিন্তু থিতু হওয়া হয় না। বাউল গানের গীতিকার, সুরকার, শিল্পী আক্কাস দেওয়ান ‘গান’কে ভর করেই বেঁচে আছেন। ঘুরছেন দেশে-বিদেশে, মাঠে-প্রান্তরে, মাজারে কিন্তু ‘বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবসা’ হচ্ছে না। এই হওয়া-না হওয়া, পাওয়া-না পাওয়াই আক্কাস দেওয়ানের বাউলজীবন। সেই লড়াকু, দুঃখজীবনের ঝাঁপি খুলেছেন মিডিয়ার-এর কাছে।

প্রশ্ন : ‘দুঃখ’ দিয়েই শুরু করতে চাই। ‘পর মানুষে দুঃখ দিলে দুঃখ মনে হয় না, আপন মানুষ দুঃখ দিলে মেনে নেয়া যায় না’, অপনার লেখা বিখ্যাত গান। কে এত দুঃখ দিলো?
আক্কাস দেওয়ান : সত্যি কথা বলতে কি, আমি একবারে জনম দুখী। দুঃখের মধ্য দিয়েই আমার জন্ম। গ্রামে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার ছিল আমাদের। একবারে অজোপাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি ছিল। অমন দুঃখের সাগরে এখনও ভেসে বেড়াচ্ছি। আত্মপরিচয় তুলে ধরার মতো কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। দারিদ্র্যের কথা না বলাই ভালো।
প্রশ্ন : কোথায় জন্ম?
আক্কাস দেওয়ান : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার নীলগ্রামে আমার জন্ম। ওখানেই আমাদের আদি নিবাস। মায়ের কাছে শুনেছি, যে রাতে আমি জন্ম নিই, সে রাতে কুপিতে এক ফোঁটা কেরোসিনও ছিল না। আমার সঙ্গী ছিল অন্ধাকার। তবে মা বলেছিল, ওইদিন পূর্ণিমার রাত ছিল। ঘরও ভাঙা ছিল। ভাঙা চালের মধ্য দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে প্রবেশ করেছিল।
প্রশ্ন : আঁতুড় ঘরে চাঁদের আলো। সে আলোয় জীবনঘরও আলোকিত হওয়ার কথা?
আক্কাস দেওয়ান : না, তা আর হয়নি। গরিবের ঘর অন্ধকারই থাকে। শৈশব কেটেছে খুবই দীনতায়। অভাবের তাড়নায় মা-বাবা যখন ঢাকায় আসেন, তখন আমার বয়স চার বছর। কোথাও লিখতে গেলে জন্ম সাল ১৯৬৪ বলে উল্লেখ করি। কিন্তু কোন সালে জন্ম তা-ও বলতে পারি না।
প্রশ্ন : বাবা কী করতেন?
আক্কাস দেওয়ান : বাবা এলাহী বকস্ দিনমজুরের কাজ করতেন। ঢাকায় এসে আমরা হাজারীবাগে ঠাঁই নিই। ঢাকায়ও বাবা দিনমজুরের কাজ করতেন। কখনও ইটের ভাটায় মাথায় করে মাটি টানতেন, আবার কখনও ঠেলাগাড়ি চালাতেন। মা সাহারা খাতুন বাড়িতেই থাকতেন।
প্রশ্ন : কয় ভাইবোন ছিলেন আপনারা?
আক্কাস দেওয়ান : চার ভাই, এক বোন। বড় ভাই আকতার হোসেন ওয়াসা ভবনে নিম্ন পদের একটি চাকরি করেন। মেজো ভাই মাংসের দোকানে কাজ করত। তার জীবনব্যবস্থা ভালো বলা যায় না। তার নেশা করেই দিন কাটে। আমার পরে বোন। তাকে ঢাকাতেই বিয়ে দেয়া হয়। তবে সেও সুখী না। আমাদের অমতে বিয়ে করে। বোনের স্বামীও নেশাখোর ছিল। সবার ছোট ভাই ডেমরায় থাকে।
প্রশ্ন : সবাইকে নিয়ে কী বলবেন?
আক্কাস দেওয়ান : গরিবেরা যেমন থাকে আর কি। বলতে পারেন সবাই সবার মতো আছে। তবে খুব ভালো আছে, তা বলা যায় না। সবার মধ্যে যে খুব ভালো যোগাযোগ রয়েছে, ঠিক তা-ও নয়। সবারই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। কে কার খবর রাখে?
প্রশ্ন : মানিকগঞ্জের জন্মস্থানে যাওয়া হয়? কোনো শৈশব স্মৃতি?
আক্কাস দেওয়ান : না, যাওয়া হয় না বললেই চলে। গ্রামের ভিটেহারা হওয়ার শৈশব স্মৃতি এখনও আমাকে তাড়িত করে। আমরা তখন ক্ষুধার জ্বালায় ঢাকা এসেছি। বাড়ি তালাবদ্ধ। দীর্ঘদিন যাওয়া হয়নি। এ সময় বাবার এক ফুফাতো বোন নাকি আমাদের খোঁজে গ্রামের বাড়িতে আসেন। তখন পাশের বাড়ির কলিমউদ্দিন মেম্বার বাবার ফুফাতো বোনকে নামে মাত্র ৩০০ টাকা এবং একটি শাড়ি কিনে দিয়ে পৈতৃক ভিটা লিখে নেয়। আমরা আর বাড়িতে দখলে যেতে পারি নাই। এভাবেই আমাদের উদ্বাস্তু করা হয়। আজও সেই বাড়ির স্মৃতি ভুলতে পারি না। বাবার ফুফাতো বোন এবং কলিমউদ্দিন মেম্বার মিলে জালিয়াতি করে আমাদের এই সর্বনাশ করেছিলেন।
প্রশ্ন : বাবা আইন-আদালতে যাননি?
আক্কাস দেওয়ান : না। কলিম উদ্দিন মেম্বারের বিরুদ্ধে লড়তে যে শক্তির দরকার, তা আমাদের ছিল না। অভাবের কারণে সংসারই চলছিল না। মামলায় গেলে যে টাকা লাগত, তা তো ছিল না।
প্রশ্ন : আপনারা দখলে যেতে পারতেন?
আক্কাস দেওয়ান : সম্ভব হয়নি। তবে ভিটেহারা হওয়ার বেদনা যখন তীব্র হতে থাকল, তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলাম যে বাড়িটি যেন পদ্মায় ভেঙে যায়। তা-ই গিয়েছে। কলিম উদ্দিন মেম্বারের হাত থেকে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, তাতেই শান্তি পেয়েছি। এখন অবশ্য চর জেগেছে। অন্যেরা দখলে যেতে বলছে। ভাবছি।
প্রশ্ন : ঢাকায় আসার কথা মনে আছে?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। টাকার জন্য লঞ্চে আসতে পারিনি। গয়নার নাও অর্থাৎ দার বা বৈঠা বয়ে যে নৌকায় যাত্রী পারাপার হয়, সেই নৌকায় করে ঢাকায় এলাম। সময় বেশি লাগত কিন্তু ভাড়া কম ছিল। আমরা এসে সদরঘাটে নামলাম। তারপর হেঁটে হেঁটে হাজারীবাগে এলাম।
প্রশ্ন : পাঁচ ভাইবোনকে নিয়ে বাবা-মা ঢাকায় এলেন। জীবন তো আরও কঠিন হওয়ার কথা।
আক্কাস দেওয়ান : শহরে কাজ পাওয়া যেত। গ্রামে কাজের মূল্য ছিল খুবই কম। বড় ভাইও বাবার সঙ্গে কাজে যেতেন। দু’বেলা খেতে পারতাম আর কি।
প্রশ্ন : স্কুলে গেলেন কখন?
আক্কাস দেওয়ান : পড়ালেখায় অনুরাগী হয়ে স্কুলে যাওয়া হয়নি বললেই চলে। গ্রামে থাকতে স্কুলে গিয়েছি। তবে বেশির ভাগ সময়ই স্কুল পালাইতাম। পরে ঢাকায় এসে প্রাইভেট পড়ার মতো নাইট স্কুলে কিছুদিন গিয়েছি।
প্রশ্ন : আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন?
আক্কাস দেওয়ান : স্কলে গিয়েছি বটে, তবে স্কুল সার্টিফিকেট নেয়া হয়নি। নাইট স্কুলে একজন হিন্দু আধ্যাত্মিক গুরুর কাছ থেকে আমি শিক্ষা নিই। তিনি আমাকে আদর্শলিপি বই হাতে ধরিয়ে দেন।
প্রশ্ন : কেমন পেয়েছিলেন সে শিক্ষাগুরুকে?
আক্কাস দেওয়ান : অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন। দিনে সরকারি পরিবহন সেক্টরে চাকরি করতেন। রাতে আমাদের পড়াতেন। অনেক গভীর বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। খুব সৎ মানুষ ছিলেন। কোনো অহঙ্কার ছিল না। কোনো দিন চুল-দাড়ি কামাননি। মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো এক গানের অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে পেয়েছিলেন। সেখান থেকেই তার হাতে পড়া।
প্রশ্ন : যুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমরা মানিকগঞ্জে চলে গিয়েছিলাম। যুদ্ধের কথা খুব বেশি মনে করতে পারছি না। তখন তো ছোট আমি। পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য ঢাকা ছেড়ে মানিকগঞ্জে যাই।
প্রশ্ন : ঢাকায় ফিরলেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই-তিন বছর পর আমরা ফের ঢাকায় আসি। আমার মনে আছে বঙ্গবন্ধুকে যে দিন হত্যা করা হয়, সেদিন নিউমার্কেটের সামনের রাস্তায় অনেকগুলো গুলির খোসা পড়ে ছিল। সকালে আমি পিতলের খোসাগুলো বেশ উৎসাহ নিয়ে কুড়িয়েছিলাম, যাতে বিক্রি করতে পারি। পরে জানলাম, দেশের রাজারে আর্মিরা হত্যা করেছে।
প্রশ্ন : ওই দিন ঢাকার চিত্র মনে পড়ে?
আক্কাস দেওয়ান : খুব একটা না। রাজনীতি নিয়ে কখনোই উৎসাহী ছিলাম না। লোকের মুখে মুখে শুনলাম দেশের রাজারে মাইর্যা ফেলছে। তবে সকাল থেকেই থমথমে ছিল। সারাদিন আমি বাইরেই ঘোরাফেরা করি।
প্রশ্ন : হাজারীবাগে কোথায় থাকতেন?
আক্কাস দেওয়ান : বিহারিদের রেখে যাওয়া একটি পরিত্যক্ত বাড়ির একটি কক্ষ ভাগে পেয়েছিলাম। প্রভাবশালীরা অবশ্য দুই তিনটি করে কক্ষ নিয়েছিল। আমরা নিরীহ, তাই পারিনি।
প্রশ্ন : লোকে বলে আপনি স্বল্পভাষী, শান্ত স্বভাবের। কৈশোরে কেমন ছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : এমনই ছিলাম। বেশি কথা বলা মানে তাল হারানো। ছোটকাল থেকেই শান্ত ছিলাম। অস্থিরতা খুব বেশি কাজ করেনি। চুপচাপ থেকে চিন্তা করতে ভালো লাগে। তবে ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে নেতৃত্ব দিতাম। কারও মধ্যে ঝগড়া হলে মিটিয়ে দিতাম। ফুটবল খেলায় বেশি মজা পেতাম।
প্রশ্ন : শৈশবের বেড়ে ওঠা নিয়ে বললেন। যৌবনে এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে ধর্মপিতা হিসেবে পেলেন। এই বিষয়টি নিয়ে যদি বলতেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। ১৯৮৪ সালে আমি একটি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। তিনি ছিলেন সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। গানপ্রিয়, গুরুভক্ত লোক ছিলেন। তার মধ্যে আধ্যত্মিকতাও ছিল। তিনি আমাকে ধর্মপুত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন। ধর্ম মা ছিলেন মনোয়ারা বেগম। তিনি ধর্মবাবার তৃতীয় স্ত্রী। লালবাগ থানাধীন ৬৪ নং এনায়েতগঞ্জের একটি বাড়িতে তাদের সঙ্গে নিচতলায় থাকতাম।
প্রশ্ন : তার সঙ্গে পরিচয় কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : তার বাড়িতে একবার গান করতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই পরিচয়। তিনি গান শুনে আমার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হন। সব খুলে বললাম। তখন আমি সায়েদাবাদে বড় ভাইয়ের বাসায় থাকি। ইতিমধ্যে বাবার মৃত্যু হয়েছে। অভাব তো সব সময় ছিল। অভাব নিয়েই তার বাড়িতে যাওয়া-আসা এবং এক প্রকার সম্পর্ক গড়ে উঠল।
প্রশ্ন : বাবার মৃত্যু হলো কখন?
আক্কাস দেওয়ান : ’৮৩ কি ’৮৪ সালের দিকে বাবা গত হলেন। বাবা অসুস্থ ছিলেন। বাবা-মাসহ বড় ভাইয়ের বাসায় থাকতাম। মেজো ভাই আগেই পৃথক হয়েছিলেন।
প্রশ্ন : দত্তক পরিবারে কেমন ছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : অনেক বড় শিক্ষিত পরিবার ছিল। দত্তক বাবা-মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তারা আমাকে পড়ালেখা করানোর জন্য খুব চেষ্টা করেছেন।

 

প্রশ্ন : সে সুযোগটা নিলেন না কেন?
আক্কাস দেওয়ান : একাডেমিক পড়ালেখায় আমার মন টানেনি। তারা খুব চেষ্টা করেছেন। আমার নেশা ছিল গানে। গান ছাড়া কিছুই বুঝতাম না। আমার দত্তক মা গার্মেন্টসের সুপারভাইজার ছিলেন। প্রতিদিন সকালে উঠে রান্না করে আমার জন্য টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখে যেতেন। আর বাবা বালিশের নিচে আমার পকেট খরচ রেখে যেতেন। সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর প্রতিদিন টাকার পাশাপাাশি ৫টি করে সিগারেট রেখে যেতেন।
প্রশ্ন : এটি তো সম্পর্কের চূড়ান্ত মাত্রা। তিনি একজন সিনিয়র ব্যক্তি। আপনাকে কেন এভাবে পেতে হলো?
আক্কাস দেওয়ান : তিনি আমার মাঝে কী খুঁজতে চেয়েছেন, আমি আজও তা বুঝতে পারিনি। একজন মানুষ আরেকজন মানুষেকে এভাবে ভালোবাসতে পারে, তা আমার দত্তক বাবাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। তিনি আমাকে বলতেন, নজরুলের ইতিহাস জানো। তোমাকে তার মতো হতে হবে। প্রচুর বই পড়তে হবে। বাবা নিজে থেকেই আমাকে বই এনে দিতেন। তখন থেকেই আমার বই পড়া শুরু হয়। তার কাছে ছিলাম বলেই প্রচুর বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। বাবা কলেজে ভর্তি করানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমি তো হাইস্কুলেই যাইনি, কলেজে যাব কী করে। খেতাম, ঘুমাতাম আর বই পড়তাম।
প্রশ্ন : অলসতা ছিল বুঝি?
আক্কাস দেওয়ান : এখনও আছে। তবে অলসতা থাকলেও চিন্তা করতে ভুলিনি। সব সময় চিন্তার মধ্যে থাকতাম।
প্রশ্ন : কী চিন্তা করতেন?
আক্কাস দেওয়ান : চিন্তার মূলে মানুষ থাকত। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে ভাবতাম। মানুষের অভাব, সুখ-দুঃখ নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করতাম। মানুষে মানুষে কেন এত বৈষম্য, কেন এত অহমবোধ। কোন দোষে আমার ভিটেবাড়ি দখল করে নিলÑএগুলোই সারাক্ষণ ঘুরপাক করত।
প্রশ্ন : কোন ধরনের বই পড়তেন?
আক্কাস দেওয়ান : আধ্যাত্মিক ধাচের বইই বেশি পড়তাম। ধর্মীয় বই, বিশেষ করে নবী-রাসূলদের জীবনী, পীর-আউলিয়া, গাউস-কতুবদের কাহিনী বেশি বেশি পড়তাম। সুফি দর্শন নিয়ে ভাবতাম।
প্রশ্ন : পড়ার সময়টা কখন থেকে?
আক্কাস দেওয়ান : জানার আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। কিন্তু এই পরিবারে আসার পর থেকে সুযোগ তৈরি হলো।
প্রশ্ন : এমন বই পড়তে তো আগে নিজের মনকে তৈরি করতে হয়?
আক্কাস দেওয়ান : জ্ঞানের প্রতি বিশেষ অনুরাগ তো আগে থেকেই ছিল। মনের পরিবর্তন হচ্ছিল, তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। আর আমি তো এমন পরিবর্তনের সাধানায়ই মগ্ন ছিলাম। সুফি সাধকদের বই পড়ে নিজের জানার আগ্রহটা আরও বাড়াতে থাকলাম। বাবা বাড়িতে পত্রিকা রাখতেন। পত্রিকা পড়ে জানার আগ্রহটা আরও বাড়তে থাকে।
প্রশ্ন : গানের ভুবনে মন রাঙালেন কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : আমি বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীত, Ÿাউল গান, মুর্শিদি গান শুনতাম নিয়মিত। আব্দুল লতিফ, খালেক দেওয়ানের গান খুবই মন কাড়ত। আব্দুল লতিফ সাহেবের পুঁথি পড়া শুনলে আর কোনো কিছু শুনতে মন চাইত না। লতিফ সাহেবের সঙ্গে একবার গণযোগাযোগ অধিদপ্তরে দেখাসাক্ষাৎ হয়। আমার ভালো লাগার কথা বলেছিলাম।
প্রশ্ন : ছোটবেলাতেই গানের পেছনে ছুটতেন শুনেছি?
আক্কাস দেওয়ান : ঠিকই বলেছেন। আমাদের গ্রামে সানু পাগলা নামের একজন পায়ে ঘুঙুর আর কোমরে ডুগডুগি বেঁধে গান করতেন। সানু পাগলা গানে বেরুলেই আমি তার পেছনে ছুটে যেতাম। খুবই ভালো লাগত। এক সময় যন্ত্রপাতির জোগান দিতে থাকলাম, মাঝে মাঝে দোহারী হিসেবে গাইতাম। সানু পাগলা যেখানে যেতেন, সেখানেই যেতাম।
প্রশ্ন : স্কুল পালিয়ে গানে মন দিচ্ছেন, পরিবার থেকে বাধা দেয়নি?
আক্কাস দেওয়ান : স্কুলে যাওয়ার জন্য মা-বাবা চাপ দিতেন। কিন্তু আমার কাছে স্কুল ভালো লাগত না। গানের অনুষ্ঠানে যাওয়া, শিল্পীদের সঙ্গে থাকা, যাত্রা, সার্কাস দেখতে ভালো লাগত। বড় ভাই কয়েকটি গান জানতেন। মাঝে মাঝে গাইতেন। মন ভরে শুনতাম। বলা যায়, আজকে গান লেখা, গাওয়ার পেছনে বড় ভাইয়ের সেই গানেরও অবদান আছে। মা মাঝে মাঝে স্কুলে বা কাজে যেতে বলতেন। গানে নিষেধ করতেন, শুনিনি। গরিব ঘরের সন্তান হলে যা হয় আর কি। স্কুলে যাওয়া নিয়ে যে খুব তাগিদ ছিল, তা-ও নয়।
প্রশ্ন : নামের পরে দেওয়ান উপাধি লাগালেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : ছোটবেলায় খালেক দেওয়ানের বড় ছেলে বাদল দেওয়ানের চকোলেট ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। বাদল দেওয়ানের ছোট ভাই ছিলেন মাখন দেওয়ান। মাখন দেওয়ানই আমার গানের ওস্তাদ। পরে মাখন দেওয়ানের বাবা খালেক দেওয়ানের অনুমতি সাপেক্ষে আমার নামের পরে দেওয়ান উপাধি যোগ করি।
প্রশ্ন : অন্যকে দেখে বড় কিছু করার কোনো স্বপ্ন জাগেনি?
আক্কাস দেওয়ান : না। অর্থ উপার্জন করেই ভালো থাকতে হবে, আমি তা কখনও মনে করেনি। অর্থ আমাকে কখনোই টানেনি। আমার চোখের সামনে অনেক টাকা উড়েছে। ধরিনি। লাল, নীল, কালো রঙের কত টাকাইত দেখলাম জীবনে। টাকাই সুখের একমাত্র পাথেয় নয়। আর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তেমন কেউ ছিল না যাকে অনুসরণ করে স্কুল বা শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠব। শৈশবে আমার জীবনের যে চিত্র, দেখবেন গ্রামের অধিকাংশ গরিব সন্তানের একই চিত্র।
প্রশ্ন : ঢাকায় এসে কাদের সঙ্গ নিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : জেলে হরেরাম বাবু, তার বাবা মদনমোহন রাজবংশী লালবাগের নবাবগঞ্জে থাকতেন। পরে কলকাতায় চলে যান। হরেরাম বাবুর সঙ্গে বিভিন্ন আসরে যেতাম। প্রথমের দিকে চেষ্টা করতাম একটু দোহারী হতে, একটু বাজাতে। তার দৃষ্টিতে আসার জন্য মাঝে মাঝে সেবা করতাম।
প্রশ্ন : দৃষ্টি পড়েছিল?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। খোঁজখবর নিতে থাকলেন। গানের আসরে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। এটিই অনেক বড় কিছু ছিল তখনকার জন্য। আশপাশে আরও কিছু শিল্পী ছিল। খালেক দেওয়ানের শিষ্য জামাল দেওয়ানের সঙ্গেও যেতাম। মূলত মদনমোহন রাজবংশীর কাছ থেকেই আমার প্রথম তালিম নেয়া। তার কাছ থেকেই হারমোনিয়ামে হাত রাখতে শুরু করি, প্রথম বেহালায় তালিম নিতে শুরু করি।
প্রশ্ন : তিনি কেমন গান করতেন, বাজাতেন?
আক্কাস দেওয়ান : জেলে পরিবার ছিল। মূলত মনের খোরাকের জন্যই তাদের গান-বাজনা। কীর্তন করতেন। তবে মদনমোহন রাজবংশীর ছেলে হরেরাম বাবু মুসলমানদের নানা অনুষ্ঠানে গান করতেন। কিছু মাইনে পেলে পেতেন, না পেলে দুঃখ করতেন না।
প্রশ্ন : হিন্দু পরিবারের সঙ্গে মিশে গান করতেন, কখনও দ্বিধা কাজ করেনি?
আক্কাস দেওয়ান : না, কোনো দ্বিধা কাজ করেনি। আমি নিয়মিত মন্দিরে যেতাম, কীর্তন শুনতাম। জেলে নৌকায় বসে বসে আমি বেহালা বাজাতাম। হাজারীবাগে থেকেই তাদের সঙ্গ পাওয়া। ’৮১, ’৮২ সালের পরের কথা।
প্রশ্ন : এ সময় কৈশোর পেরুলেন। তখনও কাজে মন দেননি?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, তখন টুকটাক কাজ করতাম। মেজো ভাই যে মাংসের দোকানে কাজ করতেন, সেখানে আমিও গিয়ে জোগান দিতাম। এক টাকা, আট আনা করে দিত।
প্রশ্ন : তাতেই সন্তষ্ট থাকতেন?
আক্কাস দেওয়ান : সবাই তখন একসঙ্গে। আমার এইটুকুই বাড়ির আয়ে বাড়তি সংযোজন। বলতে পারেন, অন্তত আমার পকেট খরচ হয়ে যেত। ১৯৮৩ সালের দিকে বাবা মারা যান। এরপর সবাই বড় ভাইয়ের কাছে চলে আসি।
প্রশ্ন : এই সময়ে তো সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তনও ঘটল, তা কি লক্ষ করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : না, আমার কাছে এগুলোর কোনো গুরুত্ব ছিল না। বলতে পারেন আমি কখনও রাজনীতির ধার ধারিনি। গান ছেড়ে ওসবে কখনও মন টানেনি। তবে একটি ঘটনা মনে পড়ে। সম্ভবত ১৯৭৮ সালর কথা। লালবাগের নবাবগঞ্জ বাজারে আমি তখন আলুর দোকানে কাজ করি। একদিন হঠাৎ দেখি, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নবাবগঞ্জ বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। আবুল হাসনাত তখন ওই এলাকার বিএনপির নেতা। সবাই জিয়ার সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে। আমিও দাঁড়ালাম এবং জিয়ার সঙ্গে হাত মেলালাম।
রাজনীতির কাছে যাইনি। দূর থেকেই এর ভালো-মন্দ একটু একটু করে দেখলাম। গান করে খাই। রাজনীতি দিয়ে কী করব। জীবনে অনেক না খেয়ে থেকেছি। এখনও থাকি। এর মধ্যেই জীবনের স্বাদ খুঁজে ফিরি।
প্রশ্ন : সংগীতচর্চায় পরিপূর্ণভাবে মন দিলেন কখন?
আক্কাস দেওয়ান : গান করছি, কাজ করছি। খুব মনেযোগী হয়ে গান করছি বিষয়টিও তা-ও নয়। অনেকটাই অগোছালোভাবে হয়ে আসছিল। তবে ১৯৮১ সালের পর থেকেই গানের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। আমার মনে আছে, জিয়াউর রহমান যে দিন মারা যান সেদিন রাতে গোপীবাগে একটি অনুষ্ঠানে গান করছিলাম। সকালে খবর পেয়ে তার সঙ্গে হাত মেলানোর কথা মনে পড়ে গেল। পুরাতন সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে তার লাশ রাখা হলো। আমি দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভিড়ের কারণে লাশ দেখতে পারিনি।
প্রশ্ন : কোন ধরনের গানে মন দিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : বাংলা সব গানই ভালো লাগত। লোকসংগীত, বাউলগান , মুর্শিদিসহ পাঁচমিশালি গান করতাম।
প্রশ্ন : কার গানে মন মজাতেন?
আক্কাস দেওয়ান : বলছিলাম, রেডিওতে আব্দুল লতিফ সাহেবের গান শুনলে ঠিক থাকতে পারতাম না। তার গান শুনতে পারা আমার কাছে দুর্লভ মনে হতো। বাড়িতে রেড়িও ছিল না। কারও বাড়িতে লতিফ সাহেবের গান বেজে উঠলেই দৌড়ে যেতাম। দাঁড়িয়ে থেকে শুনতাম। নিজেই গান লিখছি, সুর করছি, গাইছি। সুযোগ পেলেই গান নিয়ে খেলা করেছি। মাইনে পাইনি, তবুও গান শুনিয়েছি। বলতে পারেন, ধীরে ধীরে গানপাগলা হয়ে উঠতে থাকলাম।
প্রশ্ন : আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। গান লিখছেন, তা-ও আবার ভারী গান। মুর্শিদি, বিচ্ছেদ, ভাব বিচ্ছেদ, গুরু বিচ্ছেদ, পালা গানে আপনার জুড়ি নেই। কীভাবে সম্ভব হলো?
আক্কাস দেওয়ান : গানের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। এমন সময় ওই সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার বাড়িতে আশ্রয় পেলাম। মূলত ওই শিক্ষিত পরিবারে গিয়েই ভাষাজ্ঞান শুদ্ধ হতে থাকে। আমি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত, কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার নানা অভিধান পড়তে থাকলাম। শব্দকোষ সমৃদ্ধ হতে থাকল। শিক্ষার জায়গা আমার এখানেই। আমার গানে যেসব শব্দ ব্যবহার করে থাকি, তা মূলত এখান থেকেই পাওয়া। আমার গান শুনে অনেকেই মনে করে আমি হয়ত অনেক উচ্চশিক্ষিত। আদৌও তা নয়। শিক্ষার স্পর্শ এভাবেই নিতে থাকি। বলতে পারেন আমি স্বশিক্ষিত। অনেকের গানই আমি এডিট করে দিই। তারা মনে করেন, আমি মার্স্টাস ডিগ্রি পাস। সবাই তো জানেও না।
প্রশ্ন : আপনি দত্তক মায়ের কাছে, আপনার মা বড় ভাইয়ের কাছে। সেখানে যেতেন না?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, যেতাম বৈকি। মাঝে মাঝে মায়ের কাছে চলে যেতাম। কাছাকাছিই তো ছিল।
প্রশ্ন : মাকে নিয়ে কোনো স্মৃতি ?
আক্কাস দেওয়ান : সন্তানের কাছে মা-বাবাকে নিয়েই তো যত স্মৃতি। সম্ভবত আমার বয়স তখন ৯ কি ১০ বছর হবে। গানে মন দিচ্ছি, মা বুঝতে পারছে। মায়ের কাছে একটি মাটির ব্যাংক ছিল। গানে আমার আগ্রহ দেখে, মা ওই মাটির ব্যাংকটি ভেঙে ১৮ টাকা দিয়ে একটি দোতারা কিনে দেয়। ওই ঘটনা আজও আমাকে তাড়িত করে। যতবার গানের মঞ্চে উঠি ততবারই মায়ের দেয়া ওই দোতারার কথা মনে পড়ে।
প্রশ্ন : বাবাকে হারালেন যৌবনের শুরুতেই। বাবার অনুপস্থিতি বিচ্ছেদ গানে আরও নতুন মাত্রা যুক্ত করল কি না?
আক্কাস দেওয়ান : যার যায় সে-ই জানে। বাবা-মাই তো সন্তানের কাছে মহাগুরু। এতিমের চেয়ে দুখী আর কে হতে পারে। যৌবনে বাবাকে হারালাম। ২০০৪ সালে মাকে হারালাম। বাবা-মাকে হারিয়ে সর্বহারা। অন্তরে যে বেদনা, লিখতে গেলে তা তো প্রকাশ পাবেই।
প্রশ্ন : শেষ বেলায় মা কোথায় থাকতেন?
আক্কাস দেওয়ান : মা পরে আমার কাছে থাকতেন। বিয়ের পর আমি যখন সংসারে ফিরি, তখন মাকে আমার কাছে নিয়ে আসি।
প্রশ্ন : গান লেখা শুরু কোন সময় থেকে?
আক্কাস দেওয়ান : পরিবেশ আমার মতো করে তৈরি করে নিয়েছিলাম। আর সেটা সম্ভব হয়েছিল দত্তক বাবার বাড়িতে। বাবা আমাকে খুব বুঝতেন। নিচতলায় দুটি কক্ষ ছিল। ভেতরের কক্ষে আমি থাকতাম। অন্ধাকার কক্ষটিতে আলো-বাতাস যেত না। আমি সারাদিন ওখানেই কাটাতাম। অফিসে যাওয়ার আগে টাকা, সিগারেট তো বাবাই দিয়ে যেতেন। বই পড়তাম, গান লিখতাম, আবার তা গুনগুন করে গাইতাম। কোনো কোনো দিন সূর্যের আলোই দেখতে পাইনি। গান সাধনায় মগ্ন ছিলাম। ওই সময়ে যে গানগুলো লিখেছি, তা আমার কাছে এখনও রতœ। ওই রকম আর লিখতে পারি না।
প্রশ্ন : গানে বিশেষত কী ফুটে উঠত?
আক্কাস দেওয়ান : আমি কে, কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাবÑএই তিনটি প্রশ্ন সারাক্ষণ ঘুরপাক করত। এই যে শরীর দেখছেন, এটি তো একটি খাঁচা। মানুষ ভাবে, মৃত্যুর পর মানুষ কবরে যায়। আসলে কি তা-ই। কবরে যায় তার খাঁচা। আমার ভেতরের ‘আমি’ কোথায় যাব। জন্মে তো বাবা-মা পেয়েছি। মরণের পর কাকে পাব? মানুষের তো দুটি সত্তা। জীবসত্তা, অন্তঃআত্মা। মানুষের শরীরটা হচ্ছে জৈবিক বস্তু বা বাহন। এই বাহনই আত্মাকে বয়ে বেড়ায়। বাহন অকেজো হয়ে গেলে আত্মা পরামাত্মার সন্ধানে থাকে। পরামাত্মা আবার মানুষের মধ্যেই বিরাজ করে। পরামাত্মার দেখা পাওয়া হচ্ছে সাধনা। সাধনার মধ্য দিয়ে পরামাত্মা বা স্রষ্টার সঙ্গে কীভাবে প্রেম হতে পারে, তা-ই গানে তুলে ধরার চেষ্টা করতাম। এগুলোই হচ্ছে গুরুতত্ত্ব। এ নিয়েই সারাক্ষণ চিন্তা করতাম।
অন্ধকার কুটিরে না থাকলে এভাবে ভাবতে পারতাম? এ ভাবনায় মানুষেরও সহযোগিতা পেয়েছি অফুরন্ত। যারই সঙ্গ পেয়েছি, তাতেই ধন্য হয়েছি।
প্রশ্ন : একটি অন্ধকার কক্ষে এভাবে দিনের পর দিন কাটাতে কখনও বিরক্তি কাজ করেনি? অন্যরাও তো বিরক্ত হওয়ার কথা?
আক্কাস দেওয়ান : আমি তো কাজে ছিলাম। সাধানায় ছিলাম। আমার মধ্যে কখনও বিরক্তি ভাব কাজ করেনি। বরং ওই অন্ধকার কক্ষই আমার জীবন আলোকিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। ওই পরিবেশ না পেলে আমি আক্কাস দেওয়ান হতে পারতাম না। অন্যরা আমাকে নিয়ে বিরক্ত হতো। বাবার তো আরও শরিক ছিলেন। ওপরতলায় আরও দুই স্ত্রী এবং সন্তানেরা থাকতেন। তারা ভালো চোখে দেখতেন না। কেউ কেউ ঝামেলা, ঝঞ্জাট মনে করতেন। ওগুলো তিক্ত অভিজ্ঞতা। না বলাই ভালো। কারণ আমি তা আমলে নিইনি। আমলে নিলে সাধনা হতো না। দত্তক বাবা-মায়ের ভালোবাসায় অন্যের দেয়া কষ্ট মুহূর্তেই ভুলে যেতাম। বাবা বলতেন, ‘আক্কাস তোকে অনেক বড় হতে হবে, মানুষ হতে হবে। আমি তোর মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই। হাল ছাড়লে হবে না রে। শক্ত করে হাল ধর, দেখবি একদিন তোর গান অন্যরাও গাইছে। তোর নামের সঙ্গে আমার নামও থাকবে। আমি যা পারি নাই, তুই তা করে দেখা।’
প্রশ্ন : বাবাকে কতটুকু বাঁচিয়ে রাখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : এটি বলে-কয়ে প্রকাশ করার মতো নয়। সেও তো আমার গুরু। তাকে উপলক্ষ করেই তো পথচলার চেষ্টা করি। তিনি আমার বাবা। বাবা হয়ে সন্তানের বালিশের নিচে সিগারেট রেখে যাচ্ছেন, এটি কোন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হতে পারে, বলতে পারেন? দত্তক মা গার্মেন্টসের সুপারভাইজার ছিলেন। সকালে উঠে কষ্ট করে রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতেন। বিরক্ত হব, এ কারণে কখনও ঘুম থেকে ডাকেননি। এসব কথা কখনও ভোলা যাবে। তাদের তো হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েই বাঁচিয়ে রেখেছি। আমার অন্তরে তারা বেঁচে আছেন বলেই তো আমি বেঁচে আছি।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে ফিরলেন কখন?
আক্কাস দেওয়ান : ১৯৮৯ সালে বিয়ে করে কামরাঙ্গীর চরে চলে যাই। আমার প্রথম স্ত্রী আয়েশার বাবার বাড়ি ছিল কামরাঙ্গীর চরে।
প্রশ্ন : বিচ্ছেদ গান, প্রেমের গান দিয়েই শিল্পী আক্কাস দেওয়ান পরিচিত। বিয়ে কি প্রেম করেই হলো?
আক্কাস দেওয়ান : প্রেম কি না, জানি না। তবে আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। প্রথম যখন দেখি, তখন ওর বয়স ছিল আট-নয় বছরের মতো। আমি তখন আলুর দোকানে কাজ করতাম। ওর বাবা মাছ বিক্রি করত। প্রতিদিন বিকেলে খরচ নিতে আসত। খুব ভালো লাগত। ওর ভগ্নিপতি ছিল আমার কাছের বন্ধু। তার মাধ্যমেই পরিচয়, ভালো লাগা।
প্রশ্ন : ’৬৪ সালে জন্ম। বিয়ে করলেন ’৮৯ সালে। বেশ বিলম্ব করেই বিয়ে?
আক্কাস দেওয়ান : নিজের পেটই চালাতে পারি না। পায়ের তলায় মাটি ছিল না। বিয়ে করে কী খাওয়াব। এ কারণেই বিয়ে করতে সাহস পাইনি। দত্তক বাড়িতে ছিলাম বলে পরে বিয়ে করার সাহস পাই।
প্রশ্ন : বিয়ে করে ওখানেই থেকে গেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, বাবার বাড়িতেই গেলাম। যাবার জায়গা তো নেই। ১৯৯১ সালে আমার প্রথম মেয়ে সন্তান জন্ম লাভ করে।
প্রশ্ন : আপনি নিজেই উদ্বাস্তু। বিয়ে করে বউকেও নিয়ে এলেন। কীভাবে নিলেন তারা?
আক্কাস দেওয়ান : তারা ভালোভাবে নেয়নি। দত্তক বাবা তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা দাউদকান্দির এক এমপির মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। ওই মেয়ে তখন কলেজে পড়ত। এমপি বাবার বন্ধু ছিল। বিয়েতে আমি রাজি হইনি। অমন পরিবারে ঘর বাঁধব, তা আমার পক্ষে কখনও সম্ভব নয়।
আমার বিয়ের পর বাবা খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি মেনে নেননি। তিনি দুঃখ করে বললেন, ‘আমি তোমাকে নিয়ে গোবরে পদ্মফুলের স্বপ্ন দেখেছিলাম। তোমার মধ্যে আমি তা দেখতে পেয়েছি। আমি তোমার পাশে একজন শিক্ষিত মেয়েকে ঠাঁই দিতে চেয়েছি। তার সহযোগিতায় আলো পাবে। সব ধ্বংস করে দিয়েছ।’ আমি অপরাধীর মতো চুপ করে আছি। কিছুই বলছি না। চুপ করে আছি। পরে অন্যদের অনুরোধে মেনে নিলেন।
প্রশ্ন : কেমন পেয়েছিলেন স্ত্রী আয়েশাকে?
আক্কাস দেওয়ান : প্রথম বিয়ে, নিজের পছন্দের বিয়ে। দীর্ঘ সময় ঘর করলাম। কিন্তু মতের অমিল ছিল। আমার সঙ্গীত জীবন তাকে তৃপ্তি দেয়নি।
প্রশ্ন : এরপর ?
আক্কাস দেওয়ান : তিনি আছেন, হয়ত এখন একটু দূরত্ব নিয়ে। বলতে পারেন, দুজন দুজনার মতো। মেয়ে ঊষা ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ও খুবই ভালো ছাত্রী। ক্যা¤্রব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ থেকে পাশ করেছে। এখন ফার্মেসিতে অনার্স করছে। ছেলে আকাশ এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আকাশও অনেক ভালো করবে। জীবনের যেটুকু স্বপ্ন, তা ওদেরকে নিয়েই।
প্রশ্ন : দূরত্ব সৃষ্টি হলো কখন?
আক্কাস দেওয়ান : ২০১৩ সাল নাগাদ। তবে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। প্রথম স্ত্রী। হয়ত কিছু ঘটনায় ও দুঃখ পেয়েছে। আবার ওর আচরণে আমি দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় তো সংসার করেছি। ডিভোর্স হয়নি। দেখা যাক জীবনতরী কোথায় ঠেকে।
প্রশ্ন : এরই মধ্যে আরেকজন আসলেন। প্রখ্যাত পালাগানশিল্পী নাসিমা দেওয়ান। তাকে পেলেন কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমা আমার কাছে গান শিখত। ২০০১ সালের পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমি তখন বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি। হাইকোর্ট মাজারে বসি। আগে সমিতির কমিটি নির্বাচিত হতো সিলেকশনের মাধ্যমে। একবার আব্দুর রহমান বয়াতি এবং হারেজ মিয়া সাহেব নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কয়েকটি পদে নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হয়। আমার ওস্তাদ মাখন দেওয়ান সভাপতির পদে মনোনয়নপত্র তুলল। আমিও তুললাম। ১৯৯৭ সালের কথা। নাসিমাকে ওই সময় পাওয়া।
প্রশ্ন : দত্তক বাবার বাড়ি থেকে চলে এলেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : ১৯৯২ সালে চলে এলাম। তখন কামরাঙ্গির চরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করলাম। সেখানে মেয়ের নামে ঊষা রেকর্ডিং সেন্টারের দোকান দিলাম।
সাপ্তাহিক : দত্তক বাবার বাড়ি থেকে কেন চলে এলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ইতিমধ্যে দত্তক মায়ের গর্ভে একটি ছেলে সন্তান হয়। পরে কিছুটা অবহেলিত বোধ করি। মূলত এই অনুভূতি থেকেই দত্তক বাবার বাড়ি থেকে চলে আসা।
প্রশ্ন : তখন পুরোদমে গানের মঞ্চে?
আক্কাস দেওয়ান : না, তখনও জনপ্রিয় হয়ে উঠিনি। তবে সারাদেশে বিশেষ পরিচিতি পাচ্ছি।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে গিয়ে ব্যবসাও শুরু করলেন। কেমন ছিল সে ব্যবসা?
আক্কাস দেওয়ান : এখানেও উদাসীন ছিলাম। ব্যবসা নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কর্মচারীরা দেখত। ভালো করতে পারিনি। চার-পাঁচ বছর পরে দোকান বাদ দিয়ে দিলাম।
প্রশ্ন : এরপর আয় রোজগার কীভাবে চলত?
আক্কাস দেওয়ান : আয় রোজগার কখনও ভালো ছিল না। আগেও যেমন, এখনও তেমন আছে।
প্রশ্ন : ভালো ছিল না, নাকি ভালো করার চেষ্টা করেননি?
আক্কাস দেওয়ান : বলতে পারেন চেষ্টাই ছিল না। টাকার পেছনে ছুটলে হয়ত গান এভাবে লিখতে পারতাম না। অন্ধের মতো টাকার পেছনে ছুটতে ভালো লাগত না। যা আয় করেছি, তা-ও ধরে রাখার চেষ্টা করিনি। জীবন তো চলছেই।
প্রশ্ন : দোকান ছেড়ে কী করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : গানেই ছিলাম। গান তো ছাড়তে পারিনি। তখন পুরোদমে গান লিখছি, সুর করছি। ১৯৯১ সালেই আমার একক অ্যালবাম বের হয়।
প্রশ্ন : অ্যালবামের নাম কী ছিল?
আক্কাস দেওয়ান : ‘ও সাথীরে একবার এসে দেখে যাও কত সুখে আছি’ শিরোনামে গানে অ্যালবাম বের করা হলো। নিজের লেখা আটটি গানে নিজেই সুর দিলাম। সবই আমার।
প্রশ্ন : কেমন হলো প্রথম অ্যালবাম?
আক্কাস দেওয়ান : এখানেও দুঃখ আছে। নিজের পয়সা খরচ করে গান করলাম। নিজেই বাজারজাত করব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সামাদ নামের একজন আমাদের এলাকায় ক্যাসেটের দোকান দিয়েছিল। নাম ছিল সুমন রেকর্ডিং হাউস। সামাদ আর ওর মা একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। জাপানি ছোট টেপ রেকর্ডারে রেকর্ডিং করে বাজারে বিক্রি করে। ও যেন কেমন করে খবর পেল যে আমি একটি ক্যাসেট করেছি। ও তখন আমার ওস্তাদের কাছে এসে বলল, আপনি যেমনে পারেন আপনার এই শিষ্যের ক্যাসেটটি নিয়ে দেন, আমি বাজারজাত করব।
প্রশ্ন : পরে কি দিয়ে দিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ওস্তাদকে মদ খাওয়াইয়ে রাজি করেছে। আমি ওস্তাদরে বললাম, আমি নিজেই এই ক্যাসেটের বাজারজাত করব। ওস্তাদ বলল, আমি তোর কাছে কখনও কোনো জিনিস চাইনি। তোর বাড়িতে এসেছি। আমি দাবি নিয়ে এসেছি। তুই অপমান করতে পারস না। দত্তক বাবার বাসায় এ ঘটনা। পরে আমার দত্তক বাবার অনুরোধে ক্যাসেট করে দিলাম। ফার্মগেটে রেকর্ড হলো।
আটটি গানের মধ্যে দুটি গান নিতে চাইল না। ‘ও সাথী’ এবং ‘কে যেন আমার বুকে মারল বিষের তীর’ নামের গান দুটি নিতে চাইল না। ‘কে যেন আমার বুকে মারল বিষের তীর’ চালানো গেলেও ‘ও সাথী’ গানটির ব্যাপারে পুরো দ্বিমত পোষণ করল। আমি বললাম, অনেক আবেগ দিয়ে গানটি লিখেছি। নিয়ে নেন। ভালো হতে পারে। আপনার ব্যবসা হলে আমার প্রচার হবে। জোর করে দিয়ে দিলাম। ‘ও সাথী’ গানের কারণেই অ্যালবামটি সারাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামাদ রেকর্ডিং হাউস একটানা আট কোটি টাকার ব্যবসা করেছে।
প্রশ্ন : এতে আপনার স্বত্বাধিকারি ছিল না?
আক্কাস দেওয়ান : আমার কিছুই ছিল না। গান লিখে গেয়ে দেয়া পর্যন্তই শেষ। এক টাকাও পাইনি। ওরা সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নিয়েছিল। ওস্তাদের অনুরোধে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে ওরা আমার সঙ্গে জালিয়াতি করে। আমাকে মাত্র ৫০০ টাকা দেয়ার চেষ্টা করে। নিইনি। ওস্তাদের মুখে ছুড়ে মেরে বলেছিলাম, এ দিয়ে আপনি মদ খান গিয়ে। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল না। সবাই আমাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।
পরে সুমন রেকর্ডিং হাউসের পক্ষ থেকে একটি মোটরসাইকেল দেয়ার কথা ছিল। তা-ও দেয়নি। পরে সিনেমায় যখন ‘ও সাথী’ গানটি নেয়া হয়, তখন পরিচালক আমাকে ডেকেছিলেন। কাকরাইলে নাজিমুদ্দিন চেয়ারম্যানের স্টুডিওতে পরিচালক বললেন, ‘আমরা আপনার গানটি সিনেমায় নিতে চাই। আপনাকে কিছু সম্মানী দিতে চাই। গানটি নেয়ার ক্ষেত্রে আপনার কোনো আপত্তি আছে কি না?’ আমি বললাম, আমার কোনো আপত্তি নেই। পরে জানতে পারলাম, সম্মানির ৩০ হাজার টাকাও সুমন রেকর্ডিং হাউস এসে নিয়ে গেছে।
প্রশ্ন : গানটি যখন সিনেমায় গাওয়া হলো তখন কেমন লাগল?
আক্কাস দেওয়ান : তেমন কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। পারিশ্রমিক পাইনি বলে অনুভূতি কাজ করেনি, তা নয়। গানটি লিখতে তো আমাকে অর্থ খরচ করতে হয়নি। কেউ যদি গান নিয়ে ব্যবসা করে ভালো থাকতে পারে, থাকুক।
প্রশ্ন : এরপর আরও অ্যালবাম বের হলো। এ সময় তো ভালো অর্থ পাওয়ার কথা?
আক্কাস দেওয়ান : নামেমাত্র সম্মানী পেয়েছি। এককালীন কিছু একটা সম্মানী দিয়েছে। এরা কাউকে সম্মান করতে জানে না। আপনি দেখেন, আমাদের মতো শিল্পীদের গান বিক্রি করে কত রেকর্ডিং প্রতিষ্ঠান কোাটি কোটি টাকা আয় করেছে। আমাদের টাকায় ভর করে তারা গাড়ি-বাড়ি করেছে। শিল্পীদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয় না। প্রযুক্তির কারণে তো এখন সবই বন্ধ। টাকা পাইনি, এ নিয়ে যদি মন খারাপ করে থাকতাম, তাহলে গান লিখতে পারতাম না। এই লাইনে আমাদের মতো শিল্পীরা সবাই প্রতারণার শিকার হন। আমাকে নিয়ে ব্যবসা করে আপনি ১০ টাকা আয় করছেন, ভালো কথা। অন্তত দুই টাকা তো পাবার অধিকার আমি রাখি। কিন্তু তা-ও ওরা দেয় না। এক টাকা, আট আনা নেয়ার উদাহরণও আছে। প্রচুর নয়-ছয় আছে এখানে।
প্রশ্ন : কতগুলো অ্যালবাম বের করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ৪৬টির মতো অডিও ক্যাসেট এবং ৮৪টির মতো সিডি ক্যাসেট করেছি।
প্রশ্ন : সবই আপনার লেখা?
আক্কাস দেওয়ান : প্রায় ৯০ ভাগ গানই আমার নিজের লেখা।
প্রশ্ন : এসব সংগ্রহে আছে?
আক্কাস দেওয়ান : না। বলতে পারেন কিছুই সংগ্রহে নেই। বাজারেও পাওয়া যায় না। খুঁজলে ৩০টির মতো অ্যালবাম পাওয়া যেতে পারে।
প্রশ্ন : সংগ্রহ করা জরুরি মনে করেননি?
আক্কাস দেওয়ান : নিজেরই ঠিক নেই, ক্যাসেট সংগ্রহে রাখব কী করে। কিছু সংগ্রহ রাখতে হলে নিজের ঘর লাগে। আজও তো ঘর করতে পারিনি। স্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া আমার কখনও সুযোগ হয়নি।
প্রশ্ন : উড়নচণ্ডি স্বভাব এখনও?
আক্কাস দেওয়ান : আরও খারাপ অবস্থা বলতে পারেন। যে বইগুলো পড়েছি, তা সংগ্রহে রাখলে পুরো একটি ঘর ভরে যেত। যে যার মতো করে এসে নিয়ে চলে গেছে। আমার জীবনের একটি মূল্যবান ডায়রি হারিয়ে ফেলেছি। ডায়রিতে সাড়ে ৪০০ গান ছিল। সবই আমার লেখা। মনে পড়লে আজও স্থির থাকতে পারি না। আমার যদি ২০টি বাড়ি থাকত, আর তা যদি কেউ ধ্বংস করে দিত, তাহলেও এত কষ্ট পেতাম না। আমার সবচেয়ে মূল্যবান গান ছিল সেগুলো। কোথায় হারালাম, কে নিয়ে গেল, কিছুই মনে নেই। আজও খুঁজে ফিরি। যদি নিজের একটি ভিটা থাকত, তাহলে একটি ছাপড়া ঘর করে সব সংরক্ষণে রাখতে পারতাম।
প্রশ্ন : আপনার প্রেম বিচ্ছেদের গান সবাইকে কাঁদায়। এত কষ্ট কেন?
আক্কাস দেওয়ান : একজন নারীর প্রেমে পড়লে আর তাতে বিচ্ছেদ ঘটলেই এমন গান লেখা যায় না। বিচ্ছেদ শুধু নারী-পুরুষের প্রেম কাহিনীই উপলক্ষ হতে পারে না। মন আপনার যে কাউকে হারিয়ে বিষিয়ে উঠতে পারে। বাবা-মাকে হারানোর বিচ্ছেদের বর্ণনা আপনি কীভাবে দেবেন। অনেকেই ঈশ্বর প্রেমে আকুল হয়ে ঘুরছে। পেটের ক্ষুধার চেয়ে পৃথিবীতে আর কোনো দুঃখ বড় হতে পারে না। আমি কোনো দিন ঈদগাহে যাই না। আমার মনে আছে, শৈশবে বাবা-মা কোনো দিন নতুন জামাকাপড় দিতে পারেননি।
একবার ঈদে দেখলাম, বন্ধুরা সবাই নতুন জামা কিনল। আমি কিনতে পারলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ফজর নামাজের সময় উঠে হাঁড়ি থেকে পান্তা ভাত নিয়ে মরিচ-পিঁয়াজ দিয়ে খেয়ে ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে আসি। সারাদিন ওখনেই বসে কাটাই। বন্ধুরা দেখলে শরম পাব বলে একদম নিচে বসে পানির দিকে তাকিয়ে থাকি সারাদিন। ওই দিন পানি ছাড়া আর কোনো বন্ধু ছিল না আমার। পানির সঙ্গে অনেক কথা বলেছি সে দিন। জীবনকে ভেবেছি। সন্ধ্যায় বাড়িতে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছি। এরপর থেকে ঈদ করার আর কোনো অনুভূতি আমার জাগে না।
প্রশ্ন : দ্বিতীয় স্ত্রী নাসিমা দেওয়ানের ব্যাপারে বলছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর সদরে। ওরা আওয়ামী লীগ করত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে গান গেয়ে প্রচারণা চালায়। নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে এলাকা ছেড়ে দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে। মীরবাগে দুলাভাইয়ের সঙ্গে বাসা নিয়ে থাকত। সেখান থেকে মাঝে মাঝে হাইকোর্ট মাজারে আসে। একবার সে গানের বায়না পায়। তখন সমিতির কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে, নাসিমা সদস্য নয়, অতএব সে বায়না নিতে পারে না। অনেকেই তো আছেন, অন্যের ভালো দেখতে চায় না। একজন গরিব মানুষ একটি বায়না ধরেছে, তাতে অন্যের ঈর্ষার কী আছে বলুন তো? পেটে খাবার নেই ওর। রিকশা ভাড়া দিতে পারে না। একরাত গান গাইলে এক সপ্তাহ চলতে পারবে। কেউ কেউ তখন নাসিমারে কইল, সভাপতিরে জানাও।
আমি তখন নির্বাচিত সভাপতি। তবে নামেমাত্র। কাজের কাজ নেই। রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, মমতাজ বেগমরা সবাই মিলে আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আমার ওস্তাদ মাখন দেওয়ান ফেল করল। কী কারণে সবাই আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করল, আজও বুঝতে পারি না। ওস্তাদের বিরুদ্ধে ভোট করেছি। কেউ ভালো দেখেছে, কেউ মন্দ দেখেছে। তবে যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, তারা আমাকে ভালো এবং সৎ জেনেই ভোট দিয়েছেন। আব্দুল হালিম, দলিলউদ্দিন বয়াতী, আবুল সরকার, মমতাজ বেগম, আকলিমা সরকার, আলেয়া বেগমও আমাকে ভোট দিলেন। আমি অনেক জুনিয়র ছিলাম। এরপরও সবাই আমার ওপর ভরসা পেল।
তো ওই দিন নাসিমা এসে আমার কাছে ঘটনাটি জানায়। আমি তাকে বললাম, এর পর কেউ প্রশ্ন করলে বলিয়েন, সভাপতির কাছে আমি চাঁদার টাকা দিয়েছি। আপনি আপনার মতো চলেন। সে তো মহাখুশি। তখন সবাই তাকে গান শেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। আমি আর তখন কিছু বলছি না। একদিন শবে বরাতের রাতে তার দুলাভাই আমার কাছে নিয়ে এসে বললেন, আপনি যেহেতু সভাপতি সুতরাং আপনার ওপরই ভরসা পাচ্ছি।
আমি বললাম, মেয়ে মানুষের দায়িত্ব নিতে পারব না। মেয়েদের গান শেখাব, আবার কখন মায়ায় পড়ে যাব, বলা যাবে না। পরে তারা এক প্রকার বাধ্য করল নাসিমাকে গান শেখানোর জন্য। অন্যরাও অনুরোধ করলেন। কী আর করা। শেখাতে রাজি হলাম। পরে তো নিজেই নাসিমার মায়াজালে বন্দি হয়ে গেলাম।
প্রশ্ন : যদি পরিষ্কার করতেন ?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমাকে গান শেখানোর সময় স্ত্রী আয়েশা এমন একটি ভূমিকা পালন করল, তাতে নিজের প্রতি আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। রাগ করে নাসিমাকে বিয়েই করে ফেললাম।
প্রশ্ন : শুধুই রাগ করে বিয়ে, প্রেম ছিল না?
আক্কাস দেওয়ান : প্রেম তো ছিলই। রাগ ছিল আমার। প্রেম না থাকলে ও তো আমাকে বিয়ে করত না। আমি গান শেখাই, সে প্রেম শেখায়। প্রেম থাকলেও জেদের বশেই ২০০২ সালে নাসিমাকে বিয়ে করি।
প্রশ্ন : গান শুধু আপনার কাছেই শিখল?
আক্কাস দেওয়ান : না। নাসিমা অনেক আগেই গান শিখেছিল। আমার কাছে আসা ওর অবস্থান শক্ত করার জন্য। ভালো করত। সারা দেশেই ওর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
প্রশ্ন : আপনার লেখা গানেই তার পরিচিতি পাওয়া। কেমন পেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ওর কণ্ঠে তো জাদু আছে। গলায় সাংঘাতিক পাওয়ার। এরপরও শেখানোর সময় মাঝে মাঝে খটকা লাগত। একদিন লালন সাঁইজির গান রেওয়াজ করছে। সুর আদায় করতে পারছে না। বার বার বলে দিচ্ছি। কাজ হচ্ছে না। রাগের মাথায় মন্দিরা দিয়ে ওর পায়ে আঘাত করি। সম্পর্ক মধুর হলে মাঝে মাঝে বিষ এসে যায়।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে কেমন পেয়েছিলেন?
আক্কাস দেওয়ান : নাসিমাকে বিয়ে করার পর বলা যায় মুসলমান হতে শুরু করলাম। আগে স্ত্রীর হক বুঝতাম না। দুজনকে নিয়ে হক আদায়ের গ্যাঁড়াকলে পরলাম। দুজনের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজের অধিকার কখন যে ক্ষুণœ হচ্ছে, তা বুঝতে পারলাম না। মানুষ হয়ে যন্ত্রে পরিণত হলাম। নাসিমারে নিয়ে গান গাই। ওর টাকা ও-ই ব্যবহার করে। আমার টাকায় সংসার চলে।
নাসিমাকে বিয়ে করার পর ২০০৩ সালে মিরপুরে চলে আসি। আয়েশা এবং নাসিমা দুজনই পাশাপাশি থাকত। নাসিমার বিয়ে আয়েশা কখনও মেনে নেয়নি। বিয়েতে আয়েশার অনুমতি নেইনি বলে সে মামলা করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু মামলা চালাতে আমার কাছ থেকেই টাকা নিতে হবে বলে আর করতে পারেনি। বিয়ে মেনেও নেয়নি।
প্রশ্ন : নাসিমার ঘরে কোনো সন্তান?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, ২০০৩ সালে তার ঘরে এক কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। বড় মেয়ের সঙ্গে মিল রেখে ওর নাম রাখি তৃষা। তৃষা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে।
প্রশ্ন : মেয়ে থাকে কই?
আক্কাস দেওয়ান : ও মায়ের কাছেই থাকে। আমাকে ছেড়ে গিয়ে নাসিমা অন্য জায়গায় বিয়ে করেছিল। তবে সেটাও টেকেনি।
প্রশ্ন : এত মধুর সম্পর্ক, ছাড়লেন কেন?
আক্কাস দেওয়ান : আমি ছাড়িনি। সে-ই আমাকে ছেড়ে গেছে।
প্রশ্ন : একই মঞ্চে গান করতেন। সে তো তৃপ্ত হওয়ার কথা।
আক্কাস দেওয়ান : না। একই মঞ্চে গান গাইলেও সে আমাকে নিয়ে তৃপ্ত ছিল না। হয়ত আমাকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন ছিল, তাতে সাড়া দিতে পারিনি। তবে সে এখন ভালো আছে। কোনো অস্থিরতা নেই। আমরা একই মঞ্চে গানও গাই।
প্রশ্ন : গান তো এখনও লিখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ। অনেকেই আমাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু গান আমাকে ছাড়েনি। গান নিয়েই আছি।
প্রশ্ন : কত গান লিখলেন? সংরক্ষণে আছে?
আক্কাস দেওয়ান : আড়াই হাজারের মতো হবে। সব সংরক্ষণে নেই। তবে মানুষের মুখে মুখে আছে। সবাই তো গায়। মাজার, পালাগান, দরাবারি, বৈঠকি গান হলেই তো আমার লেখা গান গায় শিল্পীরা। অনেক গান তো হারিয়ে গেছে।
প্রশ্ন : এখন কোন ধরনের গান লিখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : গত বছর একটি গান লিখেছিলাম, ‘আমি যেন এক দিগভ্রান্ত এক উড়ন্ত পাখি, কাল কাটালাম ডালে ডালে এখন ঘর থুইয়া বাইরে থাকি।’ আমার পুরো জীবনটাই এই গানে এসেছে। আমি সারা জীবন উড়েই চলছি। কোনো দিক নেই। ঠাঁই নেই, ঠিকানা নেই। আজ পর্যন্ত দিক পেলাম না। বাজারে আমার লেখা গানের পাঁচটি বই রয়েছে যার নাম ‘আক্কাস গীতি’। একটি বইয়ের গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। শাহীন মুরাদ নামের আমার এক বন্ধু বইটি অনুবাদ করে বাজারজাত করেন। বইটি আবারও সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়।
পরমতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, পীর-আউলিয়ার জীবনী নিয়ে গান লিখেছি। প্রেম-বিচ্ছেদ, গুরুবিচ্ছেদ, ভাববিচ্ছেদ লিখেছি। এখন সবার কাছে আমার লেখা বিচ্ছেদ এবং মুর্শিদি গানই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্ন : পালা গান কেমন লিখলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ঠিক আলাদা করে বলার সুযোগ নেই। আমি তো পালা গানই করি। আর পালার জন্যই তো গান লিখেছি। সারা রাত আমার লেখা গান দিয়েই পালা শেষ করতে পারি। পালার ধরন বুঝে গান লিখতে হয়, গাইতে হয়।
প্রশ্ন : গ্রামেগঞ্জে জনপ্রিয় পালাগান। ভক্ত নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?
আক্কাস দেওয়ান : অবাক লাগে। আপনি কোনো গানই শ্রোতাদের রাতভর শোনাতে পারবেন না। একমাত্র পালাগান শেষ না হওয়া পর্যন্ত শ্রোতাদের মন ভরবে না। শ্রোতাদের রাতভর ধরে রাখছি, নিজের লেখা গান গাইছি, তাতে ভালোই লাগে। বাউল শিল্পীদের অন্যতম অবলম্বনই হচ্ছে পালাগান।
প্রশ্ন : শিল্পী মহলে দিনকে দিন আপনার লেখা মুর্শিদি গান গুরুত্ব পাচ্ছে। মুর্শিদের দেখা পেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : না, দেখা পাই নাই। এক মুর্শিদ হচ্ছেন প্রত্যক্ষ গুরু, যিনি পরমগুরুর দেখা মেলাবেন। প্রত্যক্ষ বা সম্মুখগুরুর দেখা পেলেও পরমগুরুর দেখা পাইনি। পরম গুরুরে পাইলে তো আমার এই হাল হতো না। মানুষের মাঝেও থাকতাম না। পাবার আশায় আছি।
নিজের লেখা গান, ‘আমি কবে বলো তোমার দেখা পাব, ও প্রাণবন্ধুরে, আমি কবে বলো তোমার দেখা পাব। বন্ধু তোমায় দেখার আশে ঘুরছি আমি পাগল বেশে, দেশে দেশে আর কত ঘুরিব, আমি না দেখে তোমার চেহারা, প্রেমাবেগে আধামরা, হয়ত এবার মরিয়াই যাব। বন্ধু তোমায় খুঁজতে খুঁজতে উঠেছি পাহাড়-চূড়াতে, সম্ভব নয় আর পেছনে পালাব, ডানে-বামে-উপর-নিচে, জায়গা নাই আর আগে-পিছে, এখানেই তোমার আশায় রইব। বন্ধু তোমার দেখা পাইলে, ভরে রাখব আমার হৃদকোমলে, চাঁদ সুরুজ কেহ দেখতে নাহি দেব, হবে একান্তই তুমি আমার, আর কারও নাই কোনো অধিকার, আমি আক্কাস দেওয়ান স্বার্থপরই হব।’ এমন আকুতি পরম বন্ধু, পরম ঈশ্বরের কাছেই করে যাচ্ছি। অনুভূতি? পাহাড়চূড়ায় উঠে আমি বড় ক্লান্ত। আর পারছি না। এবার তিনি দয়া না করলে আমি দিশেহারা। কোনো উপায় থাকবে না। পিছনে এলেই আমি পরাজিত সৈনিক। অল্প সময় নিয়ে এসেছি, আর তাতেই যদি মহান আল্লাহকে ভুলে যাই, তাহলে পরজীবনে কিনারা থাকবে না। এ কারণেই তার দর্শনে সদয় ঘুরে ফিরছি।
প্রশ্ন : বলছিলেন, দিগভ্রান্তের মতো ঘুরছেন। পরমআত্মা অর্থাৎ ঈশ্বর আছে কি নাই, এমন দ্বিধা কাজ করে না?
আক্কাস দেওয়ান : ইশ্বর না থাকলে আমি এলাম কোথা থেকে। এই জীব কাঠামোর মধ্যে যে ‘আমি’ তা তো ঈশ্বরের অনুগ্রহেই সৃষ্টি। আমি তাকে খুঁজে পাইনি ঠিক, সে আমাকে নিয়ন্ত্রণ ঠিকই করছে। নইলে আমি কে? সৃষ্টির মূলে একজন তো আছেন।
প্রশ্ন : সুফিবাদকে কেমন জানলেন?
আক্কাস দেওয়ান : এতটুকু বুঝতে পারি, সুফিবাদ হচ্ছে মানববাদ। মানবের ওপরে আর কিছু নেই। মানবকে ভোজলেই আল্লাহ ভোজন হয়। মানুষের মন পেলেই আল্লাহর মন পাওয়া যায়। এখানে হিংসা থাকে না, লোভ থাকে না, কাম থাকে না, অহঙ্কার থাকে না। আমি তো কোনোটিই ছাড়তে পারি না। এ কারণে হয়ত সুফিদের জীবনী পড়লেও নিজের জীবন তাতে মেলাতে পারিনি। লোভ, কামের তাড়নায় সব হারালাম। কামের ফাঁদেই আটকে রইলাম।
তাই লিখেছিলাম, ‘মন তুই ডাকরে, ডাকার মতো তারে ডাক, যেমন কোলের শিশু মা মা বলে ডাকে, চেনে না আর মা বিহনে কাউকে, তেমনি হয়ে শিশুর মতো, ডাক তুই অবিরত, দেবে ধরা পাকজাত।’ কিন্তু আজও ডাকার মতো ডাকতে পারলাম না। আশেক যদি সত্যিকারভাবে আশেকান হতে পারে, মাশেক এমেিনেতই ধরা দেবে। মাশেকেও তো আশেকের প্রেমে পড়তে চায়। নিজের মধ্যে আমিত্ব রেখে ডাকলে মাশেক মিলবে না। শিশু শুধু মাকেই চিনতে পারে। আর চিনতে পারে বলেই মা শিশুর আহ্বানে সাড়া দেন। আমি যদি শিশুর মতো ডাকতে পারি, খোদা মিলবেই। খোদা পেতে হলে সব বাদ দিতে হবে।
মুনছুর হাল্লাজের মধ্যে আমিত্ব ছিল না। সব বিসর্জন দিয়ে খোদার তরে নিবেদিত ছিল। আর তখনই মুনছুর হাল্লাজ খোদায় মিলে গিয়ে বলল, ‘আমিই আয়নাল হক।’ অর্থাৎ আমিই খোদা। আসলে মুনছুর হাল্লাজ আল্লাহ নন, তার জবানিতে আল্লার জবান বের হলো। অবুঝরা মুনছুর হাল্লাজরে পাপী বলে ঘোষণা করল। আদৌ পাপাী নন। সাধনা করার পর স্বয়ং খোদা তার ওপর ভর করেছিলেন। সাধনা করে জীবকে দুর্বল করলেই পরমাত্মা সবল হয়। এই কারণেই সিয়াম সাধানার মধ্য দিয়ে আল্লার নৈকট্য লাভ করা যায়। রোজা রাখলে শরীর দুর্বল হয়। শরীর দুর্বল হলে নিজের ভেতরকার আমিত্ব দুর্বল হয়। আর তখনই খোদাই শক্তি ভর করে।

 

প্রশ্ন : খোদা কি সব হারাতে বলছে?
আক্কাস দেওয়ান : না, সব হারাতে বলেনি। সব হারালে তো খোদাও হারিয়ে যায়। নিজের ভেতরের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে বলেছেন। আর সেটা সম্ভব হয় অন্যেকে ভোজন করে। আমিত্ব দুর্বল হয়, পরামাত্মা সবল হয়। আপনি সহজ জ্ঞানে এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
প্রশ্ন : শরীয়াত অর্থাৎ প্রকাশ্য এবং মারফাত অর্থাৎ গোপনীয় মতবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। তা নিয়ে আপনারা বাহাসও করেন। আসলে বিষয়টি কী?
আক্কাস দেওয়ান : আমাদের বাহাস দ্বন্দ্ব নিরসেনর জন্য। শরীয়াত-মারফাতের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। খোদার অনুগত বান্দা হিসেবে প্রকাশ্য কতর্ব্য আপনাকে পালন করতেই হবে। আবার মারফত বাদ রেখে আপনি শরীয়াত পালন করতে পারবেন না। আল্লাহকে বিশ্বাস করেন এবং তা কিসের ভিত্তিতে বিশ্বাস করেন, এটি গোপন বিষয় বা মারাফত। আর এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি যখন নামাজ পড়বেন, তা হবে প্রকাশ্য বা শরিয়াত। শরীয়াত-মারফত একে অপরের পরিপূরক। মাওলানা এবং ফকিরেরা যদি এই বিশ্বাস নিয়ে দ্বন্দ্ব করে থাকেন, তাহলে সেখানে ধর্ম থাকে না। দ্বন্দ্ব থাকলে জ্ঞান থাকে না। প্রকৃত মাওলানা এবং প্রকৃত ফকিরের মধ্যে কোনোদিন দ্বন্দ্ব হতে পারে না।
প্রশ্ন : রাষ্ট্রে, সমাজে ধর্মচিন্তা গুরুত্ব পাচ্ছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : এ চিন্তা ব্যক্তি স্বার্থে। ধর্ম ব্যক্তির চিন্তার ওপর নির্ভর করে। তা চাপিয়ে দিলে অপব্যবহার হতে পারে। দুনিয়াজুড়ে তা-ই হচ্ছে। প্রত্যেক মানুষ যদি তার ব্যক্তিজীবনে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূলের পথ অনুসরণ করে, তবে রাষ্ট্র, সমাজ এমনিতেই সঠিকভাবে চলবে। দর্শন নিয়ে যুদ্ধ করে মুসলমানেরা রক্তপাত ঘটাচ্ছে। এতে ইসলামেরই ক্ষতি হচ্ছে। ভুলের মধ্যে থাকার কারণেই নিজেরা নিজেরা খুনাখুনি করছে। ইসলামে ফ্যাসাদের কোনো জায়গা নেই।
প্রশ্ন : মাজার নিয়েও ব্যবসা হয়, রাজনীতি হয়। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : দেখুন, একজন ভক্ত পীর-মাজারকে উপলক্ষ করে একটি গরু মানাত করল। ওই গরু কিন্তু পীর ভোগ করছেন না। মানুষ ভোগ করছে। মানুষকে ভোজন করেই তো পীর-আউলিয়াকে পেতে হয়। আর আল্লাহ, আল্লাহর রাসূলকে পেতে হলে উছিলা লাগবেই। এটি হচ্ছে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসে আপনি আঘাত করতে পারেন না। এখন যদি ওই গরুর মাংস নিয়ে ব্যবসা করে, রাজনীতি করে, তার দায় তো পীর বা ভক্ত নিতে পারে না। কাবা শরিফ ইট-বালুর তৈরি। মাজারও তাই। আপনি কাবায় গেলে আমি মাজারে যেতে পারব না কেন। দুটিই তো আল্লাহর সান্নিধ্য পাবার আশে। পীর-আউলিয়া, আলেম-ওলামায়ের মাধ্যমেই তো আল্লাহ-রাসূলকে পেতে হবে। তারাই তো পথ দেখান।
তাই তো লিখেছিলাম, ‘তার মধু রসের টানে গো, সে আমারে পরান ধইরা টানে, তার জন্য মোর ভালোবাসা ছিল, মনের কোণে গো।’ মধু আছে বলেই তো ভক্তরা মাজারে যায়। তবে হ্যাঁ, মাজারও দুই নম্বর আছে, পীর-মাওলানারও কেউ কেউ দুই নম্বর আছেন। মাজার নিয়েও ব্যবসা হচ্ছে, রাজনীতি হচ্ছে। সারা জীবন আকাম-কুকাম করছেন, মরার পরে টাকার জোরে মাজার হইয়্যা গেছে এমন নজিরও আছে। আমাদের মধ্যেও তো অনেক ধান্দাবাজ আছেন। ভালো পোশাক পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সারা রাত ভালো ভালো কথা বলে ভক্তদের কাঁদাচ্ছি, কিন্তু প্রতিনিয়ত নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতারণা করছি। নবী মুহম্মদ কখনও সুখ ভোগ করেননি। নবীর ভক্ত মাঈনুদ্দিন চিশতী জীবনে সুখ ভোগ করেননি। সাঁইজী লালন ফকির মানুষকে চিনতে গিয়ে সারা জীবন কষ্ট করেছেন। সংসার ছেড়েছেন। তারা মানুষকে দিতে এসেছিলেন, নিতে আসেননি।
প্রশ্ন : আপনি বায়াত পড়লেন?
আক্কাস দেওয়ান : হ্যাঁ, আমি একজন অখ্যাত পীরের হাতে মুরিদ হয়েছি। আমার পীর বাবার নাম আব্দুল হক শাহ্।
প্রশ্ন : পীরকে কেমন পেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : অনেকের সঙ্গেই চলেছি। অনেক পীর-আউলিয়ার দরবারেও গিয়েছি। যাদের হাতে বায়াত পরার কথা, তাদের ওপর ভরসা পাইনি। এখানে ভরসা পেয়েছি। বাবুবাজারের বাহার শাহ বিয়ে করেননি। তার সংসার ধর্ম ছিল না। বাহার শাহ্’র শিষ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাহাত আলী শাহ্ । তিনিও বিয়ে করেননি। তার শিষ্য কালাই শাহ্ও বিয়ে করেননি। কালাই শাহের শিষ্য হক শাহ্ । তিনিও বিয়ে করেননি। সাধানায় তারা পরম্পরায় সবাই ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি কর্মে বিশ্বাসী। শাস্ত্র জ্ঞানের চেয়ে কর্মের ওপর আধ্যাত্মিকতা অর্জন করছেন। এ কারণেই তাকে ভালো লেগেছে।
প্রশ্ন : পীর বিয়ে করেননি। আপনি তো তিন বিয়ে করলেন?
আক্কাস দেওয়ান : আমি সংসার ছাড়তে পারিনি বলেই তো এই দশা। তার হাতে মুরিদ হওয়ার পর থেকে গানের বায়না কমে যায়।
প্রশ্ন : কেন এমন হলো?
আক্কাস দেওয়ান : অনেক জনপ্রিয় পীর দশ লাখ টাকা নিয়ে এসে আমাকে প্রস্তাব করেছেন তার মুরিদ হওয়ার জন্য। ভালো লাগেনি। আমি মুরিদ হলে আমার নাম ভাঙিয়ে তার ব্যবসা হতো। আরও মুরিদ ধরতে পারত। কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে তো ব্যবসা হয় না।
প্রশ্ন : পীরের আশীর্বাদ নিতে যান?
আক্কাস দেওয়ান : এখানেও আমি অধম। পীরের ভোজন আমাতে হয় না। খাজাবাবা তার পীরের টানা ২০ বছর গোলামি করছেন। সেই তুলনায় আমি নিকৃষ্ট। নগণ্য বললেও ভুল হবে।
প্রশ্ন : মন চায় ভোজন করতে?
আক্কাস দেওয়ান : সময় কই, মন কই। আমি তো সংসারের ফাঁদে আটকা। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, তার ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে অইব। বাথরুমের পানির ভাড়া দিতে অইব। অনেকের জন্য নতুন গান লিখতে হয়। কূলহারা মানুষের যে পরিণতি হয় আর কি।
প্রশ্ন : আবারও গান প্রসঙ্গ। বাউলগানের ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?
আক্কাস দেওয়ান : দেখলেন তো, বউ আমারে সিগারেটটি টানতে দিল না। আপনাকেও না। ও জানে, সিগারেট না খাইলে ভেতরটা ভালো থাকে। তেমনি বাউলরাও জানেন ভবিষ্যতে কীভাবে এই গানকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। ভালো মন, ভালো চিন্তা দিয়ে গান লিখলে, গাইলে এই গান কোনো দিনও ধ্বংস হবে না।
২০০৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে গিয়েছিলাম। উপসালা ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে আমাদের আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। প্রফেসর ড. ক্রিস্টিনা নায়াগ্রেন আমাদের আমন্ত্রণ করেছিলেন। সেখানে গিয়ে বুঝেছি বাউল গানের জীবন আছে।
প্রশ্ন : কেন এমনটি মনে হলো?
আক্কাস দেওয়ান : প্রোগ্রামের আগের দিন রাতে খাচ্ছি। তখন এমটিভিতে ইংরেজি গান হচ্ছে। আমি প্রফেসর ক্রিস্টিনাকে বললাম, তুমি আমাদের এই চ্যানেলে গান গাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। ক্রিস্টিনা বলল, দেব। তুমি এখন খাও। পরের দিন প্রোগ্রাম হলো। খুব ভালো হলো। শত বছরের একটি হলে গানের আয়োজন করা হলো। সবই বাংলা বাউল গান গাইলাম। আমাদের গান সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করা হলো। গান শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তখন ক্রিস্টিনা বলল, দেখ তোমাদের গানে মানুষ কাঁদে। এমন গানে মানুষ জীবন খুঁজে পায়। তোমাদের গানে ঈশ্বরের দেখা মেলে। মা, মাটি, মানুষ তোমাদের গানে গুরুত্ব পায়। তোমরা দু’জনই সারারাত গান করো, তবুও দর্শক, শ্রোতা ওঠে না। ফাঁকা জায়গায় মাটিতে বসে রাতভর তোমাদের গান শোনে। আর এমটিভির গানে শুধু যৌনতা প্রকাশ পায়। ওগুলো মানুষের জীবন স্পর্শ করে না। ক্রিস্টিনা নায়াগ্রেন ধর্ম পরিবর্তন করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি আধ্যাত্মিকতারও চর্চা করেন। ক্রিস্টিনার বলার পর আমার বড় একটি শিক্ষা হয়ে গেল। আমি কেন চ্যানেলে গাওয়ার সাধ জাগালাম? ক্রিস্টিনাকে আমার গুরু মানলাম।
প্রশ্ন : প্রথম দেশের বাইরে গেলেন কবে?
আক্কাস দেওয়ান : ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে প্রথম স্পেনে যাই।
প্রশ্ন : কীভাবে গেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের সঙ্গে। তার একটি টিমের সঙ্গে আমাদের বাউলদের একটি টিমকে নিয়ে যাওয়া হয়। জাতিসংঘ এবং স্পেন সরকারের যৌথ আয়োজনে একটি প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। মাদ্রিদ থেকে বেশ দূরে পালমা দ্বীপে অনুষ্ঠানটি হয়।
প্রশ্ন : ওইদিনের কোনো ঘটনা মনে রেখেছেন?
আক্কাস দেওয়ান : স্পেনের রানী ডোনা সোফিয়া আমাদের গানে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচনেল। ছবি তুললেন। দেশের বাইরে গিয়ে প্রথম গান গাওয়ার ঘটনা সত্যিই মনে রাখার মতো।
প্রশ্ন : বিবি রাসেলকে কেমন দেখলেন?
আক্কাস দেওয়ান : বিবি রাসেল অত্যন্ত ভালো মানুষ। তার তুলনা হয় না। ফ্রান্সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তিনি। তার কারণেই প্রথম দেশের বাইরে যেতে পারলাম।
প্রশ্ন : এরপর আর কোথাও গেলেন?
আক্কাস দেওয়ান : ২০০৮ সালে আবারও সুইডেনে গেলাম। ২০০২ সালে ঠুনকো অজুহাতে পুলিশ আমাদের সুইডেন যেতে দেয়নি। আমাদের কাগজপত্রে সচিব স্বাক্ষর না করে উপসচিব স্বাক্ষর করেছিলেন বলে পুলিশ আটকে দিল। এয়ারপোর্ট পুলিশ টাকা চেয়েছিল। আমি বললাম, সৎ মানুষ কোনোদিন দেখেননি, পুলিশে যারা চাকরি করে তারা কখনও সৎ মানুষের সন্ধান পায় না। আমাকে দেইখ্যা রাখেন। কোনো দিন ভালো লাগবে। এক টাকাও আপনাকে দেয়া হবে না। এমন তর্কের মধ্যেই আমাদের বিমান চলে গেল। সেবার বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।
এরপর সিঙ্গাপুর তিনবার, ভারত তিনবার, নেপাল, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় একবার করে গিয়েছি।
প্রশ্ন : দেশের বাইরে প্রোগ্রাম করে কেমন সাড়া পান?
আক্কাস দেওয়ান : স্পেনের প্রোগ্রামে মাত্র চারজন বাঙালি ছিল। সুইডেনের প্রোগ্রামে কোনো বাঙালি ছিল না। সেখানে ১৬টি দেশের টিম গিয়েছিলাম। আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। দেশের বাইরে বাউল গানের অন্যরকম কদর রয়েছে।
প্রশ্ন : লেখার ক্ষেত্রে কাউকে অনুসরণ করেন কি না?
আক্কাস দেওয়ান : ঠিক ওভাবে না। যা মনে ধরে তাই লিখি।
প্রশ্ন : সংসার জীবনে স্থিরতা পেতে মন চায় না?
আক্কাস দেওয়ান : সারাদিন যা-ই করি, রাতে তো দেহটা এক জায়গায় রাখি। বলতে পারেন, এটুকুই স্থিরতা। মানুষের বাড়িতে থাকি, কিন্তু ভাড়ার টাকা তো আমাকেই জোগাড় করতে হয়। স্থিরতার জন্য বিয়ে করলাম। কই? তেমন হতে পারলাম না। সংসার ছাড়ি, সংসার ধরি। এভাবেই চলছে। আগের দুই বউয়ের মনে ধরা পড়িনি। এখন এরে (স্বপ্না দেওয়ান) নিয়া আছি। দেখা যাক, কতদিন থাকে সে?
প্রশ্ন : কীভাবে পাইলেন স্বপ্না দেওয়ানকে?
আক্কাস দেওয়ান : ওর গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচরে। স্বামী, সন্তান নিয়ে মিরপুর-১১ তে থাকত। সেখান থেকে মাঝে মাঝে শাহ্ আলী বাবার মাজারে আসে। ওর পরিবার বাউল গানের ভক্ত। মাজার থেকে শিল্পীরা ওদের গ্রামের বাড়িতে গান গাইতে যায়। ২০১১ সালের দিকে একদিন হঠাৎ করে ক্লাবে এসে আমার কথা জিজ্ঞাস করে। অন্যেরা আমাকে দেখিয়ে দেয়। সে এসে সালাম দিয়েই বলল, আপনার গান আমার খুব ভালো লাগে। খুব পছন্দ করি। বিয়ের পরে শুনেছি, অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে সে একদিন পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আইসক্রিম বিক্রেতার মাইকে আমার লেখা ‘তোর পিরিতের এত জ্বালা আমি সইবো কেমন করে’ গানটি বারবার শুনেছে।
পরিচয়ের পর সে গান শিখতে আসল। গান শেখার কথা শুনে তো ভয় পেয়ে গেলাম। প্রথম যেদিন অফিসে ঢুকল মনে হলো আগুন ধরে গেল। সে আজ আমার কাছে গান শিখতে চাচ্ছে, এবার মনে হয় কোন খপ্পরে পড়ে যাই। আমি রাজি হইনি। সে তো নাছোড়বান্দা। পরে আমি বললাম, শেখাতে পারি তোমার বাবা-মা এবং স্বামী এসে বলতে হবে। তাই হলো। গান শেখানো শুরু হলো বটে। ও পুরো মন দিল গানে। তখন আমি মনে করলাম শেখানো সম্ভব হবে। পানির মধ্যে নামিয়েও গানের প্র্যাক্টিস করালাম।
প্রশ্ন : স্বপ্নার প্রেমের ফাঁদে পড়লেন কীভাবে?
আক্কাস দেওয়ান : ওর ছোটবোনের বিয়েতে গিয়ে পুকুর থেকে শাপলা ফুল তোলাকে কেন্দ্র করে দু’জনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এরপর দার্জিলিং ঘুরতে যাই। সফরের তিন দিনের মাথায় সংসার জীবনের নানা দুঃখ কথা প্রকাশ করি। আমার দুঃখের কথা শুনে ও কান্না করে। এরপরেই প্রেম। এ সময় ‘বন্ধু তোমার মায়া ভুলতে পারি না’ গান লিখে ওকে ফোনে শোনাতাম। ঢাকায় আসার পর ওকে নিয়ে আমার পীরের বাড়ি যাই। সেখান থেকে আসার পর ওর স্বামী ওকে ব্যাপক মারধর করে। এরপর ও আর সময় নেয়নি। ওই দিনই স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে আমারে ফোন দিয়েছে। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। ডিভোর্স দিয়ে সে গ্রামের বাড়ি চলে যায়। এরপর ঢাকায় এসে আলাদা বাড়ি নিয়ে আমার কাছেই গানের তালিম নিতে থাকে।
একদিন আরেকটি মেয়েকে গানের তালিম দিচ্ছি, এমন সময় স্বপ্নাও চলে আসে। সে ওই মেয়েকে দেখে থমকে যায়। বাসায় যাওয়ার পর ফোনে অসুস্থতার কথা জানতে পারি। আমি গিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার মানসিক রোগের কথা বলে হাসপাতালে ভর্তি করানোর কথা বলেন। ওকে নিয়ে হাসপাতালে তিন দিন ছিলাম। আমি ২৪ ঘণ্টাই হাসপাতালে সময় দেই। মোবাইল ফোন বন্ধ। রিলিজ দেয়ার দিন ড্রাইভারকে বললাম, ওকে নামিয়ে দিয়ে আমাকে বাসায় নিয়া যাবা। এর মধ্যে আমার মেয়ে ঊষা এবং ছেলে আকাশ সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে যায় আমাকে আনতে। গাড়ি নিয়ে বাসার গেটে আসতেই আমার প্রথম স্ত্রী বেশ খারাপ ব্যবহার করে। ওর জায়গা থেকে হয়ত স্বাভাবিকই ছিল সেটা। কিন্তু আমরা মানতে পারিনি। এরপরেই রাগের মাথায় বিয়ে করে ফেলি। প্রেম তো আগে থেকেই ছিল। স্বপ্নাকে বিয়ের ঘটনা ২০১৩ সালের। আর নাসিমা দেওয়ান চলে যায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে।
প্রশ্ন : স্বপ্নাকে নিয়ে এখন কেমন আছেন?
আক্কাস দেওয়ান : দিন তো কেটে যাচ্ছে। ও আমাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এক প্রকার বাধ্য হলেও আমিও তাতে সায় দিচ্ছি। গত দু’বছর ধরে সব ধরনের নেশার হাত থেকে রেহাই পেয়েছি।
প্রশ্ন : লেখক, শিল্পী আক্কাস দেওয়ান কোথায় যেতে চায়?
আক্কাস দেওয়ান : গান লেখা আর সুর করার মধ্যেই থাকতে চাই। মিডিয়া অনেক সময় যোগাযোগ করে। ওভাবে সময় দিতে পারি না। অন্য জায়গায় ব্যস্ত হলে লেখার জায়গা ছোট হয়ে আসতে পারে।
প্রশ্ন : কারা গাইছে আপনার গান?
আক্কাস দেওয়ান : অধিকাংশ বাউল শিল্পীই আমার গান গায়। সারা দেশের মাজার-দরবারে অনুষ্ঠান হলে আমার লেখা গান দুই একটি শুনতে পাবেন। টেলিভিশনে যারা গাইছেন তাদের কেউ কেউ আমার গান গাইছেন। তবে আমি কখনও গান বিক্রি করি না।
প্রশ্ন : জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নিয়ে কিছু বলবেন?
আক্কাস দেওয়ান : আমার গান লেখা, আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। রশিদ সরকার, ইসলাম সরকার অনেক ভালো গান করতেন। তাদের সঙ্গেও গান করার সুযোগ হয়েছে। যাকে সঙ্গে পেয়েছি, তাকে আপন করেই পেয়েছি।
প্রশ্ন : রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ানের সময়ের গানের সঙ্গে এখানকার গানের মান নিয়ে কী বলবেন?
আক্কাস দেওয়ান : মান কমছে, তা বলতেই পারি।
প্রশ্ন : মানিকগঞ্জকে বলা হয় বাউলের খনি। আপনার জন্মও সেখানে। আপনিও কি তা-ই ভাবেন?
আক্কাস দেওয়ান : মানিকগঞ্জের মানুষ ভাবুক। আর ভাবনাটা আনন্দের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চায়। এখনকার মানুষ সহজ সরল, কিন্তু আবেগ বেশি। আর সেই আবেগ দিয়েই গান অত্যন্ত ভালোবাসে।
প্রশ্ন : জীবনের রং ভবিষ্যতে কেমন দেখতে চান?
আক্কাস দেওয়ান : সুখ ভালো লাগে না। যেমন আছি তেমনই থাকতে চাই। আমাকে ভালো জেনে ওরা প্রেমে পড়েছে। ভালো লাগেনি চলে গেছে। কোনো দুঃখ নেই। কষ্টের মধ্যেই জীবনের স্বাদ খুঁজে পাই। নিজের দুঃখ দিয়ে অন্যের দুঃখ অনুভব করি। সুখের চেয়ে দুঃখের গানেই প্রাণ খোলে। তাই বলতে পারেন, দুঃখই আমার চিরবন্ধু।