এ পর্যন্ত তদন্তে বেরিয়ে এসেছে সাবেক সংসদ সদস্যসহ তার পরিবারের ৫ সদস্য ও সরকারি দপ্তরের ২২ জন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর এই লুটপাটের সংশ্লিষ্টতার তথ্য। লুটপাটের কারণে শ শ রাস্তা ও সেতুর কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে জেলা জুড়ে। যার অর্ধেকের বেশি কার্যাদেশ পেয়েছিল মিরাজুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ৮টি লাইসেন্সে। তবে অধিকাংশ প্রকল্প থেকেই মিরাজ তুলে নিয়েছেন পুরো টাকা। এ ছাড়া শুধুমাত্র কাগজে কলমে ভুয়া প্রকল্প এবং একই স্থানে একাধিক কাজ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে যার প্রধান সহযোগী পিরোজপুর এলজিইডি’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার, তার আরও দুই অসাধু সহযোগী, এলজিইডি’র ঢাকা ও বরিশাল অফিসের বেশ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা এবং জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস মিলিয়ে মোট ২৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
২০২০-২০২১ থেকে পরবর্তী ৪টি অর্থবছরে ১৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে পিরোজপুরে ১ হাজার ৮১০ টি স্কিমের জন্য ৩,৫৫৮.৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। কাজগুলো থেকে ১,৬৪৭.৪৮ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে ৮টি প্রকল্পে তদন্ত শেষে প্রায় এক হাজার ৭৯ কোটি টাকা দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
কোনো কাজ না করেই প্রকল্পের প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। খাতা-কলমে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৭ শতাংশ। এই চিত্র উঠে এসেছে জেলার সাত উপজেলায় ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকা করার জন্য নেয়া ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে। ২০২১ সালে নেয়া প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের জুন মাসে। প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছিল সোয়া কোটি টাকা। কিন্তু বিধিবহির্ভূতভাবে কয়েকগুণ বেশি বিল তুলে নেয়া হলেও কাজ হয়নি কোথাও। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের অনুসদ্ধানে এই চিত্র উঠে এসেছে।
ডিপিপি’র (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলায় মোট নিবন্ধিত গ্রামীণ সড়ক রয়েছে ৫ হাজার ৮১৯ কিলোমিটার। এর একটি বড় অংশ এখনো কাঁচা। এই কাঁচা সড়কের আংশিক পাকা করতেই নেয়া হয় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প। ২০২১ সালের ১৬ই মার্চ সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। এর মেয়াদ ছিল এপ্রিল ২০২১ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় মোট ৩১টি ভুয়া স্কিম বা প্যাকেজ দেখিয়ে কোনো প্রকার নির্মাণকাজ না করেই প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের ৪৭টি প্যাকেজে বাস্তব কাজের অগ্রগতির তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সরজমিন দেখা যায়, ভাণ্ডারিয়া মহিলা কলেজ থেকে পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মন্ত্রী বাড়ি রোড ভায়া খন্দকার বাড়ি রোডে বিসি রাস্তা এবং তিনটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করার কথা থাকলেও মাঠে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজ না হলেও তিন কোটি ৭০ লাখ টাকার বিল তুলে নেয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মেজারমেন্ট বুক ও ছাড়পত্র ছাড়াই সরাসরি জেলা দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের (এজি অফিস) যোগসাজশে জালিয়াতি করে বিল পাস করা হয়েছে।
মাটিভাঙ্গা-কাঠালিয়া বর্ডার রোডে বিসি রাস্তা এবং ২-ভেন্টসহ মোট ১২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এই কাজের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। অথচ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে তুলে নেয়া হয়েছে দুই কোটি ৭১ লাখ টাকা।
পিরোজপুর সদর উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় থেকে এসব কাজের কোনো বিল প্রস্তুত বা মেজারমেন্ট বুকে (এমবি) সই করা হয়নি। তৎকালীন জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সইএন) কার্যালয়, ঠিকাদার ও প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে সরাসরি জেলা কার্যালয় থেকেই নথিপত্র ছাড়া ও অনিয়ম করে বিল ছাড় করা হয়। কাউখালী ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ বা নথিপত্র ছাড়াই বিল পাস বা বিলিং সম্পন্ন করা হয়েছে।
পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য (পিরোজপুর-২) মহিউদ্দিন মহারাজ, এলজিইডি’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পৃথক ৮টি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিরোজপুরের দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। দুদক সূত্র জানায়, আসামিরা নিজেদের ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন ৮টি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আত্মসাৎ ও লুটপাটের তদন্তের কারণে জেলায় উন্নয়ন কার্যক্রম এখন স্থবির হয়ে আছে বলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তদন্তাধীন বিষয় বলে অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
এলজিইডি পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, যেসব প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে এবং অভিযোগ এসেছে এগুলো আগের। অনেক প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নেয়াই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের প্রকল্পগুলোর পুরো টাকা তুলে নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরকমই। কারণ তখন কোনো কিছুই নিয়মমতো হয়নি। সব বিষয়ই তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি বলেন, যেসব কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে তা এগিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এসব কাজ শেষ করতে নতুন করে বরাদ্দ প্রয়োজন। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিলে কাজগুলো শেষ করা যাবে। অসমাপ্ত অনেক কাজের জন্য অনেক এলাকায় জনদুর্ভোগ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।










