০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিয়োগ-বদলী-কেনাকাটা সব তার হাতে: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে মহাপরিচালকের ভুমিকায় ডিএডি শামস আরমান!

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে ডিএডি শামস আরমানের ক্ষমতার রাজত্ব চলছে। তিনি স্বৈরাচার সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময়েও একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। তার অধিপত্য ও হাফভাব এমনই যে, মনে হয় তিনিই এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলে তৎকালীন মহাপরিচালকের যেমন অতি-আস্থাভাজন ছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান মহাপরিচালকের অন্যতম নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা ডিপার্টমেন্ট।

শামস আরমানের আচরণ দেখে অনেকেই কটাক্ষ করে বলেন, “তিনি নিজেই যেন মহাপরিচালকা” বাস্তবেও তার স্বেচ্ছাচারিতার ধরন অনেকটা সেরকমই। অধিদপ্তরের নিয়মনীতি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এমনকি বদলির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক দখলদারিত্ব ফায়ার সার্ভিসে নিয়ম অনুযায়ী একই স্টেশনে তিন বছরের বেশি সময় কেউ কর্মরত থাকতে পারে না। এই নীতির আড়ালে তৈরি হয়েছে বদলি বাণিজ্যের সুবর্ণ ক্ষেত্র। অভিযোগ আছে শামস আরমান বদলি সংক্রান্ত কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। প্রকৃতপক্ষে বদলি প্রশাসন শাখার অধীনে হলেও তিনি ডিজির পিএস পরিচয়ে নিজের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

অপারেশনের কাজ বাদ দিয়ে ডিএডিদের অফিসে বসানো ফায়ার সার্ভিসের মূল কাজ হলো আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার কার্যক্রম-অর্থাৎ অপারেশন। কিন্তু শামস আরমানের নেতৃত্বে বহু দক্ষ ডিএডিকে মাঠের কাজ থেকে তুলে এনে দপ্তরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এতে অপারেশনাল দক্ষতা যেমন কমেছে, তেমনি মাঠ পর্যায়ে অফিসারদের মধ্যে হতাশা ও বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

এডি ও ডিএডিদের পরিদর্শন চালু নতুন গ্রুপিংয়ের সৃষ্টি। ফায়ার সেফটি প্ল্যান এবং কার্যকরী সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে নতুনভাবে এডি ও ডিএডিদের পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পূর্বে যা ছিল না। ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করে সুবিধাভোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
রিপোর্ট ও তদন্তে হস্তক্ষেপ:
ফায়ার দুর্ঘটনার রিপোর্ট কিংবা তদন্তে আরমানের হস্তক্ষেপ বহু পুরনো অভিযোগ। নিজের পকেটের লোক দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রভাবিত রিপোর্ট তৈরি করা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

প্যাক ও ট্রেনিংয়ে অংশ না নিয়ে অর্থ উত্তোপন আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো-শামস আরমান বিভিন্ন প্যাকেজের ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ না করেও ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করেছেন।

বই প্রকাশ ও অডিট আপত্তি:
মিরপুর ট্রেনিং কমপ্লেক্সে অবস্থানকালে ডিপার্টমেন্টের কিছু প্রকাশনার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিল করেন শামস আরমান। সরকারি অডিট টিম এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিলের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

অব্যাহত দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন:
ফায়ার সার্ভিসের অত্যন্তরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে একজন কর্মকর্তা কীভাবে এতদিন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটিয়ে বহাল তবিয়তে থাকেন? সরকারি দপ্তরের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় যেখানে জবাবদিহিতার দাবি উঠে সেখানে শামস আরমানের এই অবস্থান কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়? শামস আরমানকে নিয়ে জুলাই আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট মহল প্রশ্ন তুলতে এমন একজন স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকর্তাকে কবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে?

শামস আরমানের অপকর্মে সমূহ:
১.একই স্টেশনে তিন বছরের অধিক সময়কাল চাকরির কারণে ফায়ার ফাইটার, ড্রাইভার ও অফিসারদের বদলি বাধ্যতামূলক। এর কারণে প্রচুর বদলীর সুযোগ তৈরি হয় এবং বদলি বাণিজ্যের সুবিধা হয়েছে।
২.ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও কার্যকরী সনদের পরিদর্শনের অন্য অধিদপ্তরে নিয়োজিত এডি ও ডিএডিদের পরিদর্শন প্রথা চালু করা (যা আগে ছিল না)। এর ফলে অপারেশন কাজে নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে একটা গ্রুপিং তৈরি হয়েছে।
৩.ফায়ার সার্ভিসের উন্নয়নের চিন্তা না করে বদলীর ভয় দেখিয়ে অফিসার ও অন্যান্য স্টাফদের চাপে রাখা হয়েছে।
৪.ফায়ার সার্ভিদের মূল কাজ অপারেশন কর্মকান্ড। সে কাজ বাদ দিয়ে ডিএডিদের বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
৫.ডিএডি শামস আরমান বিভিন্ন ফায়ার রিপোর্টে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। কমিশনের কন্ডিশনে নিজের পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি তৈরি করেন।
৬.মোটা অংকের টাকার বিনিময় ফায়ারফাইটার এবং অফিসার বদলিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা এবং পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে মোটা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
৭. প্যাকের এবং ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ না করেও টাকা উত্তোলন করেন।
৮.বদলী সংক্রান্ত কাজ হলো প্রশাসন শাখার কিন্তু সেটা উপেক্ষা করে নিজেই বদলীর ফাইলে হস্তক্ষেপ করেন।
৯.ফায়ার ফাইটার পদ সহ অন্যান্য পদে লোক নিয়োগে হস্তক্ষে করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
১০. তিনি এক নাগাড়ে ১৫/১৬ বছর ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। ৩ বছর পর পর বদলীর নিয়ম থাকলেও তার ক্ষেত্রে সেই বিধান কার্যকর হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ডিএডি শামস আরমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ডিজির পারমিশন ছাড়া কোন কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
২১ বার পড়া হয়েছে

নিয়োগ-বদলী-কেনাকাটা সব তার হাতে: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে মহাপরিচালকের ভুমিকায় ডিএডি শামস আরমান!

আপডেট সময় ১০:০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

রোস্তম মল্লিক

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে ডিএডি শামস আরমানের ক্ষমতার রাজত্ব চলছে। তিনি স্বৈরাচার সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময়েও একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। তার অধিপত্য ও হাফভাব এমনই যে, মনে হয় তিনিই এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলে তৎকালীন মহাপরিচালকের যেমন অতি-আস্থাভাজন ছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান মহাপরিচালকের অন্যতম নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা ডিপার্টমেন্ট।

শামস আরমানের আচরণ দেখে অনেকেই কটাক্ষ করে বলেন, “তিনি নিজেই যেন মহাপরিচালকা” বাস্তবেও তার স্বেচ্ছাচারিতার ধরন অনেকটা সেরকমই। অধিদপ্তরের নিয়মনীতি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এমনকি বদলির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক দখলদারিত্ব ফায়ার সার্ভিসে নিয়ম অনুযায়ী একই স্টেশনে তিন বছরের বেশি সময় কেউ কর্মরত থাকতে পারে না। এই নীতির আড়ালে তৈরি হয়েছে বদলি বাণিজ্যের সুবর্ণ ক্ষেত্র। অভিযোগ আছে শামস আরমান বদলি সংক্রান্ত কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। প্রকৃতপক্ষে বদলি প্রশাসন শাখার অধীনে হলেও তিনি ডিজির পিএস পরিচয়ে নিজের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

অপারেশনের কাজ বাদ দিয়ে ডিএডিদের অফিসে বসানো ফায়ার সার্ভিসের মূল কাজ হলো আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার কার্যক্রম-অর্থাৎ অপারেশন। কিন্তু শামস আরমানের নেতৃত্বে বহু দক্ষ ডিএডিকে মাঠের কাজ থেকে তুলে এনে দপ্তরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এতে অপারেশনাল দক্ষতা যেমন কমেছে, তেমনি মাঠ পর্যায়ে অফিসারদের মধ্যে হতাশা ও বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

এডি ও ডিএডিদের পরিদর্শন চালু নতুন গ্রুপিংয়ের সৃষ্টি। ফায়ার সেফটি প্ল্যান এবং কার্যকরী সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে নতুনভাবে এডি ও ডিএডিদের পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পূর্বে যা ছিল না। ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করে সুবিধাভোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
রিপোর্ট ও তদন্তে হস্তক্ষেপ:
ফায়ার দুর্ঘটনার রিপোর্ট কিংবা তদন্তে আরমানের হস্তক্ষেপ বহু পুরনো অভিযোগ। নিজের পকেটের লোক দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রভাবিত রিপোর্ট তৈরি করা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

প্যাক ও ট্রেনিংয়ে অংশ না নিয়ে অর্থ উত্তোপন আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো-শামস আরমান বিভিন্ন প্যাকেজের ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ না করেও ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করেছেন।

বই প্রকাশ ও অডিট আপত্তি:
মিরপুর ট্রেনিং কমপ্লেক্সে অবস্থানকালে ডিপার্টমেন্টের কিছু প্রকাশনার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিল করেন শামস আরমান। সরকারি অডিট টিম এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিলের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

অব্যাহত দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন:
ফায়ার সার্ভিসের অত্যন্তরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে একজন কর্মকর্তা কীভাবে এতদিন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটিয়ে বহাল তবিয়তে থাকেন? সরকারি দপ্তরের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় যেখানে জবাবদিহিতার দাবি উঠে সেখানে শামস আরমানের এই অবস্থান কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়? শামস আরমানকে নিয়ে জুলাই আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট মহল প্রশ্ন তুলতে এমন একজন স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকর্তাকে কবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে?

শামস আরমানের অপকর্মে সমূহ:
১.একই স্টেশনে তিন বছরের অধিক সময়কাল চাকরির কারণে ফায়ার ফাইটার, ড্রাইভার ও অফিসারদের বদলি বাধ্যতামূলক। এর কারণে প্রচুর বদলীর সুযোগ তৈরি হয় এবং বদলি বাণিজ্যের সুবিধা হয়েছে।
২.ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও কার্যকরী সনদের পরিদর্শনের অন্য অধিদপ্তরে নিয়োজিত এডি ও ডিএডিদের পরিদর্শন প্রথা চালু করা (যা আগে ছিল না)। এর ফলে অপারেশন কাজে নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে একটা গ্রুপিং তৈরি হয়েছে।
৩.ফায়ার সার্ভিসের উন্নয়নের চিন্তা না করে বদলীর ভয় দেখিয়ে অফিসার ও অন্যান্য স্টাফদের চাপে রাখা হয়েছে।
৪.ফায়ার সার্ভিদের মূল কাজ অপারেশন কর্মকান্ড। সে কাজ বাদ দিয়ে ডিএডিদের বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
৫.ডিএডি শামস আরমান বিভিন্ন ফায়ার রিপোর্টে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। কমিশনের কন্ডিশনে নিজের পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি তৈরি করেন।
৬.মোটা অংকের টাকার বিনিময় ফায়ারফাইটার এবং অফিসার বদলিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা এবং পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে মোটা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
৭. প্যাকের এবং ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ না করেও টাকা উত্তোলন করেন।
৮.বদলী সংক্রান্ত কাজ হলো প্রশাসন শাখার কিন্তু সেটা উপেক্ষা করে নিজেই বদলীর ফাইলে হস্তক্ষেপ করেন।
৯.ফায়ার ফাইটার পদ সহ অন্যান্য পদে লোক নিয়োগে হস্তক্ষে করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
১০. তিনি এক নাগাড়ে ১৫/১৬ বছর ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। ৩ বছর পর পর বদলীর নিয়ম থাকলেও তার ক্ষেত্রে সেই বিধান কার্যকর হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ডিএডি শামস আরমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ডিজির পারমিশন ছাড়া কোন কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।