৫ বছরেও নিয়োগ হয়নি দক্ষ প্রধান প্রকৌশলী: অদক্ষ মনজুরুল কবিরের হাতে জিম্মি নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর!
রোস্তম মল্লিক
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন¯’ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে এক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ সব পদই রাজস্ব খাতের এবং যুগ্মসচিব মর্যাদার। তবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা অধিদপ্তরের ¯’ায়ী কর্মকর্তা নন। ‘চার্টার অব ডিউটিজ’ অনুযায়ী, সং¯’াটি অভ্যন্তরীণ এবং উপকূল ও সমুদ্রগামী নৌ চলাচল ব্যব¯’া নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অধিদপ্তরের অ¯’ায়ী প্রধান প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক (সিইএসএস) মনজুরুল কবির তাঁর দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত চিফ মেরিন এক্সামিনার এর দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) এস এস নাজমুল হক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে গ্রেপ্তার হয়ে সাময়িক বরখাস্তের পর চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির প্রশিক্ষক মনজুরুল কবিরকে প্রেষণে এ পদে নিয়োগ দেয় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এর আগে ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলামও দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁকে সাময়িক বরখাস্তের পর নাজমুল হককে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
তবে জাহাজ জরিপকারক হিসেবে মনজুরুল কবিরের কোনো পূর্বঅভিজ্ঞতা ছিল না। তা সত্ত্বেও সংকটকালে আপদকালীন তাঁকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি তখন থেকে টানা সোয়া চার বছর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া অ¯’ায়ীভাবে পদায়ন পাওয়া এই কর্মকর্তার ওপর পরবর্তী সময়ে আরো দুটি দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এ নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাঝে মৃদু ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও চাকরি বিধি অনুযায়ী, নৌ মন্ত্রণালয় এ ধরনের শূন্যপদে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে চলতি দায়িত্ব প্রদান অথবা মন্ত্রণালয়ের অধীন¯’ অন্য কোনো সং¯’া থেকে সংযুক্তিতে বা প্রেষণে নিয়োগ দিতে পারে। এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অন্য যেকোনো সং¯’ার উপযুক্ত কর্মকর্তাকেও প্রেষণে নিয়োগ দিতে পারে। তবে এসব পদে দৈনন্দিন অথবা আপদকালীন অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ার এখতিয়ার নৌ অধিদপ্তরের নেই।
বিশেষজ্ঞসহ নৌখাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নৌ নিরাপত্তার জন্য চিফ মেরিন এক্সামিনার বা সিএমই পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অধীনে সকল ধরনের অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টারশিপ ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা ছাড়াও সমুদ্র ও উপকূলগামী জাহাজের নাবিকদের সব ধরনের যোগ্যতানির্ধারণী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে সিএমইর গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা আদৌ সম্ভব নয়। এর ফলে জাহাজের নাবিকদের দক্ষতা যাচাইয়ে ত্রুটি থেকে যেতে পারে; যা নৌ দুর্ঘটনার ঝুঁকিপ্রবণ।
এসব কাজে লন্ডনে আইএমও সদর দপ্তরসহ বছরে একাধিকবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সভা-সেমিনারেও যেতে হয় তাঁকে; প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থেকে সম্ভব নয়। মূলত: যোগ্যতার বিচারে একজন মাস্টার মেরিনার সিএনএস পদের জন্য উপযুক্ত। কিš‘ মনজুরুল কবির মাস্টার মেরিনার নন; তিনি একজন নৌ প্রকৌশলী।
এদিকে প্রধান প্রকৌশলী পদটির প্রকৃত নাম ‘প্রধান প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক (সিইএসএস)’ হলেও জাহাজ জরিপ (ফিটনেস পরীক্ষা) ও নিবন্ধন প্রদানের কোনো অভিজ্ঞতা মনজুরুল কবিরের নেই। যে কারণে নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা ও নিবন্ধন প্রদানে তাঁর অধীন¯’ জাহাজ জরিপকারকেরা কোনো ভুল বা অনিয়ম করলে তা দেখার সুযোগও নেই তাঁর। তা সত্ত্বেও দীর্ঘ সোয়া চার বছর তাঁকে এ পদে রাখা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ অব¯’ায় তাঁকে অতিরিক্ত আরো দুটি দায়িত্ব দেয়ায় জোরালো হয়ে উঠেছে সে প্রশ্ন।
এছাড়া নৌ মন্ত্রণালয় প্রায় তিন বছরেও সিএমই পদে কাউকে চলতি দায়িত্ব প্রদান কিংবা পদায়ন দেয়নি। মহাপরিচালকের অফিস আদেশে অ¯’ায়ী প্রধান প্রকৌশলী দীর্ঘদিন সিএমই এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন, যা প্রচলিত রীতিবহির্ভুত বলে খোদ নৌ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই মন্তব্য করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে অতিসম্প্রতি নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ হয়েছে এবং তিনি সদ্য যোগদান করেছেন। তাই তাঁর সঙ্গে যোগদান করা সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘদিন নৌ পরিবহন ব্যব¯’া নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠন ‘নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলন’ এর সদস্যসচিব আমিনুর রসুল বাবুল বলেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো সংশোধন করে কর্মকর্তা ও কর্মচারির সংখ্যা বাড়িয়েছে।
এ অব¯’ায় প্রধান প্রকৌশলীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তার ওপর যুগ্মসচিব মর্যাদার আরো দুটি পদের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। এছাড়া তিনি অধিদপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তাও নন। তাঁর ওপর থেকে বাড়তি দায়িত্ব প্রত্যাহার করে প্রত্যেক পদে আলাদা কর্মকর্তা পদায়ন এবং অবিলম্বে নতুন প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান নৌযান মালিকরা।
এই বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল কবিরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।











