০৩:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আক্রান্ত সাংবাদিক সমাজ, দুষ্টগ্রহের কবলে দেশ!

প্রতিনিধির নাম:

ফকির ইলিয়াস
সাংবাদিকরা আবারো আক্রান্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতার কথা মুখে বলা হচ্ছে কিন্তু কোথায় সেই স্বাধীনতা? ছোপ ছোপ রক্তে কালচে হয়ে গিয়েছে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক রোস্তম মল্লিকের ওপর নির্মমভাবে বর্বর হামলার ঘটনায়। এই দুষ্টচক্রের শিকড় কোথায়?
এর আগে তিনজন ফটোসাংবাদিককে নির্মমভাবে প্রহার করেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার তিন ফটোসাংবাদিককে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। গুরুতর আহত অবস্থায় থানা থেকে তাদের পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতরা হলেন খালেদ সরকার, সাজিদ হোসেন ও জাহিদুল করিম। এই ঘটনায় উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করছেন সাংবাদিকরা। এরপরই বিডিনিউজ কার্যালয়ে হামলা করা হয়েছে। যা চলমান জাতীয় সংসদ অধিবেশনেও আলোচনায় এসেছে। সাংবাদিকদের ওপর পুলিশি নির্যাতন এবং সন্ত্রাসী হামলার জন্য সরকারকে দ্রত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্পিকার ।
দৈনিক প্রথম আলোর আলোকচিত্রীর ওপর পুলিশি হামলার বিষয়টি তুলে ধরে ফজলুল আজিম বলেন, ‘পুলিশ সাহেবরা এই হামলা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে চট্টগ্রামে বদলি করেছেন।’ সাংবাদিকদের ওপর হামলায় উষ্মা প্রকাশ করে আজিম বলেন, ‘প্রত্যেকটা ঘটনার পর আমরা দেখি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছুটে যান। ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সকলকে ধরা হবে বলে আশ্বস্থও করেন। এরপর, কিছু হয় না। এতে সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পাচ্ছে।’ একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে উঠে এসেছে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা। কথা বলেছেন মাননীয় স্পিকার। তারপরও এই আক্রমণ থেমে থাকেনি। সিএমএম আদালত চত্বরে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন ফারজানা নামের এক কিশোরী। সে মা-বাবার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল। আমরা টিভিতে ফারজানার যে ভাষ্য দেখেছি ও শুনেছি তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। একজন কিশোরী এভাবে সম্ভ্রমহানির শিকার হবে আদালত চত্বরে!! কী নির্মম এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য!
দেশে আসলে এসব কী হচ্ছে? এ প্রশ্নগুলো ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো তীব্র শঙ্কা প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবাধিকার বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তীব্র শঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা দেয়ার নতুন নীতি বাস্তবায়নেও সরকার ব্যর্থ বলে দাবি করা হয় প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যা ব) ২০১১ সালে কমপক্ষে ৫৪ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। ২০০৪ সালে র্যাযব প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুরু করে হিসাব করলে এ ধরনের হত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় সাত শতাধিক। এ ছাড়া এ সময়ে র্যা ব অনেককেই আহত ও নির্যাতন করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সংস্থাটিকে বলেছে, র্যাব গ্রেপ্তার করার পর তাদের স্বজন মারা গেছে। র্যাুবের দাবি অনুযায়ী এনকাউন্টারে মারা যায়নি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ডের উদাহরণ হিসেবে র্যােবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির কলেজ ছাত্র লিমনের ঘটনা উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি।
অন্য একটি রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হয়েছে নিখোঁজ, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার ও আটক রাখার জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনী। তারা মানবাধিকারের বড় সমস্যা। বিচার বিভাগকে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। এতে সমস্যা বেড়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে সরকার। এক্ষেত্রে সেলফ সেন্সর চলছেই। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা সাংবাদিকদের হয়রানি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে বলা হয়েছে, সরকার সমাবেশ করার স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ সহিংসতা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি মারাত্মক এক সমস্যা। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও বড় একটি সমস্যা। শ্রমিকদের অধিকার সীমিত করা, শিশুশ্রম, কর্মক্ষেত্রে অনিরাপত্তা রয়েই গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমা মারাত্মক এক সমস্যা। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য সাধারণ ক্ষমার অধীনে কাজ করেন। এক্ষেত্রে র্যাএবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যাকান্ডের ঘটনার তদন্তে সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারি দুর্নীতি ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সাধারণ ক্ষমা অব্যাহত রয়েছে।
ওই রিপোর্টে নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে বলা হয়, পুরো বছরে যেসব নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে অভিযোগ আছে তা ঘটিয়েছে বেশির ভাগই নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। ২০১১ সাল জুড়ে তা বেড়ে যায়। কিন্তু এর সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি। কমপক্ষে কতোগুলো অপহরণ ঘটেছে রাজনৈতিক উদ্দেশে। কিছু অপহরণ ঘটেছে টাকার জন্য। আবার কিছু অপহরণ ঘটেছে স্থানীয় শত্রুতা থেকে। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকার-এর মতে, নিরাপত্তা বাহিনী জড়িত এমন অভিযোগ আছে ৩০টি নিখোঁজের ঘটনায়। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯।
সরকারি কার্যক্রমের অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সরকার তার যথাযথ প্রয়োগ করে না। সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে দুর্নীতি করলেও শাস্তি হয় না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ‘দন্তহীন বাঘ’ আখ্যা দিয়েছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে শাসক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব মামলা হয়েছিল কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশের বলে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অথচ খালেদা জিয়া কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা খুব কম মামলাই প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কেমন যাচ্ছে, তার কিছু নমুনা আমরা পাচ্ছি এই রিপোর্টগুলো থেকে। কেউ হয়তো বলতে পারেন ওসব রিপোর্টে আমাদের কি-ই বা আসে যায়! কিন্তু মনে রাখতে হবে, দাতাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতির মূল নিয়ামক মুরব্বিদের প্রভাবমুক্ত নয় বাংলাদেশের রাজনীতি। তাই এসব বিষয় আলোচনায় এলে তা অন্যান্য বিনিয়োগকারীকেও প্রভাবিত করবে। দেশে এই যে চরম অশুভ কাজগুলো ঘটছে, এর প্রতিকার কি? সরকার কি এভাবে একের পর এক ঘটনার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারবে না?
দেশে মানুষর প্রথম চাওয়াটি হচ্ছে শান্তি। গ্রাম-গ্রামান্তরে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানির অনেক ঘটনাই হয়তো মিডিয়ায় বড় করে আসছে না। কথা হচ্ছে, মানুষ যে চরমভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন, তা কি ক্ষমতাসীনরা অনুধাবন করতে পারছেন?

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৮:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ মে ২০২৩
২৫০ বার পড়া হয়েছে

আক্রান্ত সাংবাদিক সমাজ, দুষ্টগ্রহের কবলে দেশ!

আপডেট সময় ০৮:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ মে ২০২৩

ফকির ইলিয়াস
সাংবাদিকরা আবারো আক্রান্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতার কথা মুখে বলা হচ্ছে কিন্তু কোথায় সেই স্বাধীনতা? ছোপ ছোপ রক্তে কালচে হয়ে গিয়েছে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক রোস্তম মল্লিকের ওপর নির্মমভাবে বর্বর হামলার ঘটনায়। এই দুষ্টচক্রের শিকড় কোথায়?
এর আগে তিনজন ফটোসাংবাদিককে নির্মমভাবে প্রহার করেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার তিন ফটোসাংবাদিককে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। গুরুতর আহত অবস্থায় থানা থেকে তাদের পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতরা হলেন খালেদ সরকার, সাজিদ হোসেন ও জাহিদুল করিম। এই ঘটনায় উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করছেন সাংবাদিকরা। এরপরই বিডিনিউজ কার্যালয়ে হামলা করা হয়েছে। যা চলমান জাতীয় সংসদ অধিবেশনেও আলোচনায় এসেছে। সাংবাদিকদের ওপর পুলিশি নির্যাতন এবং সন্ত্রাসী হামলার জন্য সরকারকে দ্রত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্পিকার ।
দৈনিক প্রথম আলোর আলোকচিত্রীর ওপর পুলিশি হামলার বিষয়টি তুলে ধরে ফজলুল আজিম বলেন, ‘পুলিশ সাহেবরা এই হামলা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে চট্টগ্রামে বদলি করেছেন।’ সাংবাদিকদের ওপর হামলায় উষ্মা প্রকাশ করে আজিম বলেন, ‘প্রত্যেকটা ঘটনার পর আমরা দেখি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছুটে যান। ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সকলকে ধরা হবে বলে আশ্বস্থও করেন। এরপর, কিছু হয় না। এতে সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পাচ্ছে।’ একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে উঠে এসেছে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা। কথা বলেছেন মাননীয় স্পিকার। তারপরও এই আক্রমণ থেমে থাকেনি। সিএমএম আদালত চত্বরে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন ফারজানা নামের এক কিশোরী। সে মা-বাবার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল। আমরা টিভিতে ফারজানার যে ভাষ্য দেখেছি ও শুনেছি তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। একজন কিশোরী এভাবে সম্ভ্রমহানির শিকার হবে আদালত চত্বরে!! কী নির্মম এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য!
দেশে আসলে এসব কী হচ্ছে? এ প্রশ্নগুলো ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো তীব্র শঙ্কা প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবাধিকার বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তীব্র শঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা দেয়ার নতুন নীতি বাস্তবায়নেও সরকার ব্যর্থ বলে দাবি করা হয় প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যা ব) ২০১১ সালে কমপক্ষে ৫৪ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। ২০০৪ সালে র্যাযব প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুরু করে হিসাব করলে এ ধরনের হত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় সাত শতাধিক। এ ছাড়া এ সময়ে র্যা ব অনেককেই আহত ও নির্যাতন করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সংস্থাটিকে বলেছে, র্যাব গ্রেপ্তার করার পর তাদের স্বজন মারা গেছে। র্যাুবের দাবি অনুযায়ী এনকাউন্টারে মারা যায়নি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ডের উদাহরণ হিসেবে র্যােবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির কলেজ ছাত্র লিমনের ঘটনা উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি।
অন্য একটি রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হয়েছে নিখোঁজ, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার ও আটক রাখার জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনী। তারা মানবাধিকারের বড় সমস্যা। বিচার বিভাগকে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। এতে সমস্যা বেড়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে সরকার। এক্ষেত্রে সেলফ সেন্সর চলছেই। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা সাংবাদিকদের হয়রানি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে বলা হয়েছে, সরকার সমাবেশ করার স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ সহিংসতা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি মারাত্মক এক সমস্যা। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও বড় একটি সমস্যা। শ্রমিকদের অধিকার সীমিত করা, শিশুশ্রম, কর্মক্ষেত্রে অনিরাপত্তা রয়েই গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমা মারাত্মক এক সমস্যা। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য সাধারণ ক্ষমার অধীনে কাজ করেন। এক্ষেত্রে র্যাএবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যাকান্ডের ঘটনার তদন্তে সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারি দুর্নীতি ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সাধারণ ক্ষমা অব্যাহত রয়েছে।
ওই রিপোর্টে নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে বলা হয়, পুরো বছরে যেসব নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে অভিযোগ আছে তা ঘটিয়েছে বেশির ভাগই নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। ২০১১ সাল জুড়ে তা বেড়ে যায়। কিন্তু এর সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি। কমপক্ষে কতোগুলো অপহরণ ঘটেছে রাজনৈতিক উদ্দেশে। কিছু অপহরণ ঘটেছে টাকার জন্য। আবার কিছু অপহরণ ঘটেছে স্থানীয় শত্রুতা থেকে। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকার-এর মতে, নিরাপত্তা বাহিনী জড়িত এমন অভিযোগ আছে ৩০টি নিখোঁজের ঘটনায়। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯।
সরকারি কার্যক্রমের অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সরকার তার যথাযথ প্রয়োগ করে না। সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে দুর্নীতি করলেও শাস্তি হয় না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ‘দন্তহীন বাঘ’ আখ্যা দিয়েছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে শাসক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব মামলা হয়েছিল কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশের বলে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অথচ খালেদা জিয়া কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা খুব কম মামলাই প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কেমন যাচ্ছে, তার কিছু নমুনা আমরা পাচ্ছি এই রিপোর্টগুলো থেকে। কেউ হয়তো বলতে পারেন ওসব রিপোর্টে আমাদের কি-ই বা আসে যায়! কিন্তু মনে রাখতে হবে, দাতাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতির মূল নিয়ামক মুরব্বিদের প্রভাবমুক্ত নয় বাংলাদেশের রাজনীতি। তাই এসব বিষয় আলোচনায় এলে তা অন্যান্য বিনিয়োগকারীকেও প্রভাবিত করবে। দেশে এই যে চরম অশুভ কাজগুলো ঘটছে, এর প্রতিকার কি? সরকার কি এভাবে একের পর এক ঘটনার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারবে না?
দেশে মানুষর প্রথম চাওয়াটি হচ্ছে শান্তি। গ্রাম-গ্রামান্তরে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানির অনেক ঘটনাই হয়তো মিডিয়ায় বড় করে আসছে না। কথা হচ্ছে, মানুষ যে চরমভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন, তা কি ক্ষমতাসীনরা অনুধাবন করতে পারছেন?