০২:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এমডি মোকাম্মেলে ডুবছে ইউনিয়ন ব্যাংক!

প্রতিনিধির নাম:

 

বিশেষ প্রতিবেদক

গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সংগৃহীত আমানতের চেয়ে তিন গুণ বেশি অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে চতুর্থ প্রজন্মের ইউনিয়ন ব্যাংক। ওই সময়ে ব্যাংকটিতে আমানত ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ে ২ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। এর ফলে ব্যাংকটির ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা ছাড়িয়ে যায়। গত বছর শেষে এডিআর বেড়ে হয় ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ বলে ব্যাংকটি জানাচ্ছে। যদিও শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা ৯২ শতাংশ।
ব্যাংকটির গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, গত বছর শেষে ইসলামি ধারার এই ব্যাংকে শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থের প্রবাহ প্রায় ১৪ টাকা ঋণাত্মক ছিল। ২০২১ সালে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ ছিল ৯ টাকা ৩৮ পয়সা। তবে ২০২২ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা বেড়ে হয়েছে ১৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৮৭ কোটি টাকা।

আমানতের তুলনায় ঋণ বেশি:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর শেষ ব্যাংকটির ঋণ বেড়ে হয় ২২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৯ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। ২০২১ সাল শেষে ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় গত বছরের সেপ্টেম্বরের ঋণ কিছুটা কমে যায়। তবে অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ঋণ বেড়ে যায় ২ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা।
এদিকে গত বছর শেষে ব্যাংকটিতে আমানত ছিল ২১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ২০ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির আমানত ২১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা হলেও গত বছর শেষে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। ফলে আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকটি। পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থের প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।
গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক যে কয়েকটি ব্যাংককে বিশেষ বিবেচনায় টাকা ধার দেয়, তার মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকও একটি। ওই ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাহিদামতো নগদ অর্থ জমা রাখতে ব্যর্থ হয়।

ভরসা অন্য ব্যাংকের ওপর:
ব্যাংকটি মূলত গ্রাহক আমানতের পরিবর্তনে অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার ও আমানত এনে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, গত বছর ইউনিয়ন ব্যাংকে অন্য ব্যাংকগুলোর জমা রাখা আমানত বেড়ে হয় ৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা, যা ২০২১ সাল শেষে ছিল ৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের আমানত ছিল ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৩৪৯ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩১৪ কোটি টাকা ও আল-আরাফাহ ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা।
ব্যাংকটি ঋণের মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি দিয়েছে ঢাকা বিভাগে ও ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি চট্টগ্রামে। অন্য বিভাগের ঋণের পরিমাণ সামান্যই। গত বছরে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হলেও তহবিল খরচ ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আর খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাম্মেল হক চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আলোচিত ভল্টে টাকা কমের কারণে:
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টে ১৯ কোটি টাকার গরমিল পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে ঋণ অনিয়মের আরও নানা তথ্য খুঁজে পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১ সাল শেষে ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল, বিতরণ করা এ ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার যোগ্য, যা মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অথচ ২০২১ সাল শেষে ব্যাংকটি খেলাপি দেখিয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

ওই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারেন, রাজধানীর পান্থপথ, গুলশান, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, খাতুনগঞ্জসহ প্রায় ৪০টি শাখার মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণের যথাযথ নথিপত্রও ব্যাংকের কাছে নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
১০ বছর আগে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটি এখন ইসলামি ধারার ব্যাংক। যাত্রার শুরুতে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী আহসানুল আলম।

বেনামি ঋণে বড় ঝুঁকিতে ইউনিয়ন ব্যাংক!
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন শেষে বলেছে, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ ঋণ শ্রেণীকরণযোগ্য। ঋণ আদায়ে সময় বেঁধে দিয়েছে।
বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংকের বিতরণ করা বেশির ভাগ ঋণে বড় ধরনের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে কোম্পানি গঠন করে ঋণের বড় অংশই বের করে নিয়েছে প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান। আবার অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সও ছিল না। কাগুজে এসব কোম্পানিকে দেওয়া ঋণের বেশির ভাগেরই খোঁজ মিলছে না এখন। ফলে এসব ঋণ আদায়ও হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে ঋণ অনিয়মের এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের হল–মার্ক কেলেঙ্কারি ও সাবেক ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) এবং বহুল আলোচিত পি কে হালদারের আর্থিক কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে।
জানা গেছে, বিতরণ করা ঋণ আদায় না হলেও ইউনিয়ন ব্যাংক এসব ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করছে না। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার যোগ্য, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে যত ঋণ বিতরণ করেছে, তার সিংহভাগই খেলাপি বা অনিয়মের ঋণে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় এসব অনিয়ম ও করণীয় বিষয়ে ব্যাংকটির সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার পর গত ২৭ এপ্রিল ইউনিয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ নিয়ে একটি চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ব্যাংকটিকে এসব ঋণ সমন্বয়ে সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতি ত্রৈমাসিকে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।’
একসঙ্গে এই বিপুল পরিমাণ ঋণকে খেলাপি করা হলে তাতে পুরো আর্থিক খাত ঝুঁকিতে পড়বে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চিঠিতে এখনই পুরো ঋণকে খেলাপি না করে ধাপে ধাপে ঋণ সমন্বয় ও নিয়মিত করার জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সমন্বয় বা নিয়মিত করতে না পারলে এসব ঋণকে খেলাপি করার নির্দেশ দেওয়া হয় চিঠিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শক দল চলতি বছরের শুরুতে ইউনিয়ন ব্যাংক পরিদর্শনে গিয়ে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের এই তথ্য উদ্ঘাটন করে। এরপর ব্যাংকটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাধিক সভা হয়। তার ভিত্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টে ১৯ কোটি টাকার গরমিল পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে অজ্ঞাত কারণে ওই ঘটনায় ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কোনো সংস্থা। ওই ঘটনার পর ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে ঋণ অনিয়মের আরও নানা তথ্য খুঁজে পায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা বের করতে অসংখ্য কাগুজে কোম্পানি গঠন করেছিলেন। তবে সেসব কোম্পানি যৌথ মূলধন ও কোম্পানিসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত ছিল। কিন্তু ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে যেসব কোম্পানির নামে ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে, সেসব কোম্পানির অস্তিত্ব বলতে শুধু ট্রেড লাইসেন্স। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো অস্তিত্ব নেই।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাম্মেল হক চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করে ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ব্যাংকটিতে যা হয়েছে:
২০২১ সাল শেষে ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বিতরণ করা এ ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার যোগ্য, যা মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অথচ গত বছর শেষে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ দেখিয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ৯ বছর আগে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটি এখন ইসলামি ধারার ব্যাংক। যাত্রার শুরুতে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারেন, রাজধানীর পান্থপথ, গুলশান, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, খাতুনগঞ্জসহ প্রায় ৪০টি শাখার মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণের যথাযথ নথিপত্রও ব্যাংকের কাছে নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তাই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এসব ঋণ আদায় হলে তার প্রমাণসহ বিবরণী তিন মাস পর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, বস্তুগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা এবং গুণগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৬৮৯। এর মধ্যে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ২৫ শতাংশ হিসাবে ৪ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩৫ শতাংশ হিসাবে ৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা এবং বাকি ৭ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা বা ৪০ শতাংশ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বয় বা নিয়মিত করতে হবে। বস্তুগত ও গুণগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণের অর্থ কী—জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় ব্যাংক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ঋণের জামানত ও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, যথাযথ নথিপত্রও নেই। আবার অনেক সময় এক কাজের জন্য ঋণ নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়। ঋণ নিয়মিত থাকলেও এসব ঋণ বড় ঝুঁকিতে পড়ে। তখন বস্তুগত ও গুণগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণ করতে বলা হয়।’

যেভাবে চলছে ব্যাংকটি:
ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটির তহবিল খরচ ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। ফলে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে আমানত এনে ব্যাংকটি কীভাবে মুনাফা করছে এটাও বড় প্রশ্ন। কারণ, ব্যাংকটির যে সুদ আয় হয়, তার বড় অংশ আমানত সংগ্রহে খরচ হয়ে যায়। এরপরও ব্যাংকটি ২০২১ সালে ৮৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২০ সালের মুনাফা ছিল ৯৮ কোটি টাকা। আর এই মুনাফা দেখিয়ে ইউনিয়ন ব্যাংক প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৪২৮ কোটি উত্তোলন করেছে। গত জানুয়ারিতে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তও হয়। ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের ঋণ দেওয়ার কোনো লক্ষ্য নেই। শুধু আমানত এনে দিলেই পদোন্নতি ও বেতন বাড়ে। আর যেসব শাখা ব্যবস্থাপক বেনামি ঋণ দিতে পেরেছেন, তাঁরা সহজেই পদোন্নতি পেয়েছেন।
২০২১ সালে ইউনিয়ন ব্যাংকের আমানত ছিল ২০ হাজার ২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আমানত প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আর বিভিন্ন ব্যাংকের আমানত ৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের আমানত দুই হাজার ২৯০ কোটি টাকা ও সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংকের ৩৭৮ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংক এসব আমানত ফেরত দিচ্ছে না, দফায় দফায় মেয়াদ বাড়াচ্ছে।
২০২১ সাল শেষে ব্যাংকটির ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকায় ৮ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা ও চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশই গেছে এ দুই শহরে। যদিও সারা দেশে সেবা দিতে গত বছর শেষে ব্যাংকটির শাখা বেড়ে হয়েছে ১০৪টি।
ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসানুল আলম ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২১– এ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির চাপ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের নিকট প্রধান সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে উচ্চ অনাদায়ি ঋণও একটি বড় উদ্বেগের কারণ।’

ইউনিয়ন ব্যাংকের ভল্টে টাকার হিসাব মিলছে না:

ইসলামি ধারায় পরিচালিত বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টের টাকার হিসাব মিলছে না। কাগজপত্রে ওই শাখার ভল্টে যে পরিমাণ টাকা থাকার তথ্য রয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে প্রায় ১৯ কোটি টাকা কম পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গত সোমবার ওই শাখা পরিদর্শনে গিয়ে ভল্ট খুলে টাকা গুনে কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবে বড় ধরনের গরমিল পান। শাখাটির নথিপত্রে দেখানো হয়েছে, ভল্টে ৩১ কোটি টাকা রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা গুনে পেয়েছেন ১২ কোটি টাকা। বাকি ১৯ কোটি টাকার ঘাটতি সম্পর্কে শাখাটির কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দলকে যথাযথ কোনো জবাব দিতে পারেননি।
নিয়ম অনুযায়ী, ভল্টের টাকার গরমিল থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হয়। কিন্তু গতকাল বুধবার পর্যন্ত ব্যাংকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকেও বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়নি। তবে ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভল্ট ডাকাতির কথা শোনা গেলেও, ভল্টে ঘোষণার চেয়ে কম টাকা পাওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি শোনা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর বিভিন্ন ব্যাংক ও বড় শাখাগুলোতে বিশদ পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা পরিদর্শনে ভল্টের টাকার গরমিল পাওয়া যায়। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি, নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থাও নিচ্ছি। ব্যাংকের ভল্টে ঘোষণার কম টাকা থাকবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগের একজন যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে একটি দল নিয়মিত বিশদ পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের নিচে অবস্থিত গুলশান শাখায় যায়। পরিদর্শনের প্রথম দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা ভল্টে রাখা টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখেন। সেটি করতে গিয়েই ব্যাংকটির ওই শাখায় ১৯ কোটি টাকার গরমিলের বিষয়টি ধরা পড়ে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শক দলের কর্মকর্তারা ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেননি। উল্টো ব্যাংকটিতে কর্মরত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সাবেক কর্মকর্তা বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য পরিদর্শক দলের সদস্যদের প্রতি অনুরোধ করেন। এ অবস্থায় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা একাধিক দফায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। এরপর এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ভল্টের সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, হাই সিকিউরিটি অ্যালার্ম, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারসহ নানা উদ্যোগ নিতে হয়। এত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিধান থাকার পরও ভল্টে টাকায় গরমিল থাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, ভল্টের চাবি থাকে দুজনের কাছে। শাখা ব্যবস্থাপক, শাখা পরিচালনা ব্যবস্থাপক, ক্যাশ ইনচার্জ ও ক্যাশ অফিসার এ চার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যেকোনো দুজনের কাছে চাবি থাকবে। দুজনের উপস্থিতি ও চাবি ছাড়া ভল্ট খোলা ও বন্ধের সুযোগ নেই। প্রতিদিন লেনদেন শেষে ঠিক কত টাকার কতটি নোট ভল্টে জমা রাখা হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হয়। সেই খাতাও থাকে ভল্টের ভেতরে। টাকার হিসাব মেলার পর কর্মকর্তারা প্রতিদিন ওই রেজিস্টারে স্বাক্ষর করেন। তাই ভল্টের টাকার গরমিলের সুযোগ কম। শাখা ব্যবস্থাপক ও প্রধান শাখার কর্মকর্তারা হঠাৎ হঠাৎ ভল্ট পরিদর্শন করে টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখেন। গরমিল পাওয়া গেলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি করতে হয়। সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলার বিধান রয়েছে।
ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টের টাকার গরমিলের বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ বি এম মোকাম্মেল হক চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ব্যাংকটির জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০২০ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকটিতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতই ৪ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। ওই বছর শেষে ব্যাংকটির বিনিয়োগ (ঋণ) ছিল ১৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। গত বছর ব্যাংকটি ৯৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। গত বছর ব্যাংকটির শাখা ছিল ৯৫টি।
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৫ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদন করেছে। ব্যাংকটি শেয়ারবাজার থেকে ৪২৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, নথিতে থাকার হিসাব বা ঘোষণার এক পয়সাও ভল্টে কম থাকার কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো গরমিল হয়, তাহলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করতে হয়। যদি কোনো ব্যাংক সেটি না করে, তবে বুঝতে হবে সেখানে কোনো সমস্যা আছে। (চলবে)

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:৪৯:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ মে ২০২৩
১৫৭ বার পড়া হয়েছে

এমডি মোকাম্মেলে ডুবছে ইউনিয়ন ব্যাংক!

আপডেট সময় ১০:৪৯:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ মে ২০২৩

 

বিশেষ প্রতিবেদক

গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সংগৃহীত আমানতের চেয়ে তিন গুণ বেশি অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে চতুর্থ প্রজন্মের ইউনিয়ন ব্যাংক। ওই সময়ে ব্যাংকটিতে আমানত ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ে ২ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। এর ফলে ব্যাংকটির ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা ছাড়িয়ে যায়। গত বছর শেষে এডিআর বেড়ে হয় ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ বলে ব্যাংকটি জানাচ্ছে। যদিও শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা ৯২ শতাংশ।
ব্যাংকটির গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, গত বছর শেষে ইসলামি ধারার এই ব্যাংকে শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থের প্রবাহ প্রায় ১৪ টাকা ঋণাত্মক ছিল। ২০২১ সালে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ ছিল ৯ টাকা ৩৮ পয়সা। তবে ২০২২ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা বেড়ে হয়েছে ১৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৮৭ কোটি টাকা।

আমানতের তুলনায় ঋণ বেশি:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর শেষ ব্যাংকটির ঋণ বেড়ে হয় ২২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৯ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। ২০২১ সাল শেষে ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় গত বছরের সেপ্টেম্বরের ঋণ কিছুটা কমে যায়। তবে অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ঋণ বেড়ে যায় ২ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা।
এদিকে গত বছর শেষে ব্যাংকটিতে আমানত ছিল ২১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ২০ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির আমানত ২১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা হলেও গত বছর শেষে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। ফলে আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকটি। পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থের প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।
গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক যে কয়েকটি ব্যাংককে বিশেষ বিবেচনায় টাকা ধার দেয়, তার মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকও একটি। ওই ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাহিদামতো নগদ অর্থ জমা রাখতে ব্যর্থ হয়।

ভরসা অন্য ব্যাংকের ওপর:
ব্যাংকটি মূলত গ্রাহক আমানতের পরিবর্তনে অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার ও আমানত এনে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, গত বছর ইউনিয়ন ব্যাংকে অন্য ব্যাংকগুলোর জমা রাখা আমানত বেড়ে হয় ৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা, যা ২০২১ সাল শেষে ছিল ৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের আমানত ছিল ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৩৪৯ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩১৪ কোটি টাকা ও আল-আরাফাহ ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা।
ব্যাংকটি ঋণের মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি দিয়েছে ঢাকা বিভাগে ও ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি চট্টগ্রামে। অন্য বিভাগের ঋণের পরিমাণ সামান্যই। গত বছরে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হলেও তহবিল খরচ ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আর খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাম্মেল হক চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আলোচিত ভল্টে টাকা কমের কারণে:
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টে ১৯ কোটি টাকার গরমিল পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে ঋণ অনিয়মের আরও নানা তথ্য খুঁজে পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১ সাল শেষে ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল, বিতরণ করা এ ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার যোগ্য, যা মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অথচ ২০২১ সাল শেষে ব্যাংকটি খেলাপি দেখিয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

ওই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারেন, রাজধানীর পান্থপথ, গুলশান, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, খাতুনগঞ্জসহ প্রায় ৪০টি শাখার মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণের যথাযথ নথিপত্রও ব্যাংকের কাছে নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
১০ বছর আগে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটি এখন ইসলামি ধারার ব্যাংক। যাত্রার শুরুতে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী আহসানুল আলম।

বেনামি ঋণে বড় ঝুঁকিতে ইউনিয়ন ব্যাংক!
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন শেষে বলেছে, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ ঋণ শ্রেণীকরণযোগ্য। ঋণ আদায়ে সময় বেঁধে দিয়েছে।
বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংকের বিতরণ করা বেশির ভাগ ঋণে বড় ধরনের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে কোম্পানি গঠন করে ঋণের বড় অংশই বের করে নিয়েছে প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান। আবার অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সও ছিল না। কাগুজে এসব কোম্পানিকে দেওয়া ঋণের বেশির ভাগেরই খোঁজ মিলছে না এখন। ফলে এসব ঋণ আদায়ও হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে ঋণ অনিয়মের এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের হল–মার্ক কেলেঙ্কারি ও সাবেক ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) এবং বহুল আলোচিত পি কে হালদারের আর্থিক কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে।
জানা গেছে, বিতরণ করা ঋণ আদায় না হলেও ইউনিয়ন ব্যাংক এসব ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করছে না। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার যোগ্য, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে যত ঋণ বিতরণ করেছে, তার সিংহভাগই খেলাপি বা অনিয়মের ঋণে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় এসব অনিয়ম ও করণীয় বিষয়ে ব্যাংকটির সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার পর গত ২৭ এপ্রিল ইউনিয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ নিয়ে একটি চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ব্যাংকটিকে এসব ঋণ সমন্বয়ে সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতি ত্রৈমাসিকে ঋণ আদায়ের অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।’
একসঙ্গে এই বিপুল পরিমাণ ঋণকে খেলাপি করা হলে তাতে পুরো আর্থিক খাত ঝুঁকিতে পড়বে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চিঠিতে এখনই পুরো ঋণকে খেলাপি না করে ধাপে ধাপে ঋণ সমন্বয় ও নিয়মিত করার জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সমন্বয় বা নিয়মিত করতে না পারলে এসব ঋণকে খেলাপি করার নির্দেশ দেওয়া হয় চিঠিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শক দল চলতি বছরের শুরুতে ইউনিয়ন ব্যাংক পরিদর্শনে গিয়ে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের এই তথ্য উদ্ঘাটন করে। এরপর ব্যাংকটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাধিক সভা হয়। তার ভিত্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টে ১৯ কোটি টাকার গরমিল পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে অজ্ঞাত কারণে ওই ঘটনায় ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কোনো সংস্থা। ওই ঘটনার পর ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে ঋণ অনিয়মের আরও নানা তথ্য খুঁজে পায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা বের করতে অসংখ্য কাগুজে কোম্পানি গঠন করেছিলেন। তবে সেসব কোম্পানি যৌথ মূলধন ও কোম্পানিসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত ছিল। কিন্তু ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে যেসব কোম্পানির নামে ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে, সেসব কোম্পানির অস্তিত্ব বলতে শুধু ট্রেড লাইসেন্স। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো অস্তিত্ব নেই।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাম্মেল হক চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করে ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ব্যাংকটিতে যা হয়েছে:
২০২১ সাল শেষে ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বিতরণ করা এ ঋণের ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার যোগ্য, যা মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অথচ গত বছর শেষে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ দেখিয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ৯ বছর আগে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটি এখন ইসলামি ধারার ব্যাংক। যাত্রার শুরুতে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকটি পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারেন, রাজধানীর পান্থপথ, গুলশান, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, খাতুনগঞ্জসহ প্রায় ৪০টি শাখার মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণের যথাযথ নথিপত্রও ব্যাংকের কাছে নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তাই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এসব ঋণ আদায় হলে তার প্রমাণসহ বিবরণী তিন মাস পর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, বস্তুগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা এবং গুণগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৬৮৯। এর মধ্যে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ২৫ শতাংশ হিসাবে ৪ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩৫ শতাংশ হিসাবে ৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা এবং বাকি ৭ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা বা ৪০ শতাংশ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বয় বা নিয়মিত করতে হবে। বস্তুগত ও গুণগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণযোগ্য ঋণের অর্থ কী—জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় ব্যাংক পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ঋণের জামানত ও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, যথাযথ নথিপত্রও নেই। আবার অনেক সময় এক কাজের জন্য ঋণ নিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়। ঋণ নিয়মিত থাকলেও এসব ঋণ বড় ঝুঁকিতে পড়ে। তখন বস্তুগত ও গুণগত মাপকাঠিতে শ্রেণীকরণ করতে বলা হয়।’

যেভাবে চলছে ব্যাংকটি:
ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটির তহবিল খরচ ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। ফলে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে আমানত এনে ব্যাংকটি কীভাবে মুনাফা করছে এটাও বড় প্রশ্ন। কারণ, ব্যাংকটির যে সুদ আয় হয়, তার বড় অংশ আমানত সংগ্রহে খরচ হয়ে যায়। এরপরও ব্যাংকটি ২০২১ সালে ৮৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২০ সালের মুনাফা ছিল ৯৮ কোটি টাকা। আর এই মুনাফা দেখিয়ে ইউনিয়ন ব্যাংক প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৪২৮ কোটি উত্তোলন করেছে। গত জানুয়ারিতে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তও হয়। ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের ঋণ দেওয়ার কোনো লক্ষ্য নেই। শুধু আমানত এনে দিলেই পদোন্নতি ও বেতন বাড়ে। আর যেসব শাখা ব্যবস্থাপক বেনামি ঋণ দিতে পেরেছেন, তাঁরা সহজেই পদোন্নতি পেয়েছেন।
২০২১ সালে ইউনিয়ন ব্যাংকের আমানত ছিল ২০ হাজার ২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আমানত প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আর বিভিন্ন ব্যাংকের আমানত ৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের আমানত দুই হাজার ২৯০ কোটি টাকা ও সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংকের ৩৭৮ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংক এসব আমানত ফেরত দিচ্ছে না, দফায় দফায় মেয়াদ বাড়াচ্ছে।
২০২১ সাল শেষে ব্যাংকটির ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকায় ৮ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা ও চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশই গেছে এ দুই শহরে। যদিও সারা দেশে সেবা দিতে গত বছর শেষে ব্যাংকটির শাখা বেড়ে হয়েছে ১০৪টি।
ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসানুল আলম ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২১– এ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির চাপ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের নিকট প্রধান সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতে উচ্চ অনাদায়ি ঋণও একটি বড় উদ্বেগের কারণ।’

ইউনিয়ন ব্যাংকের ভল্টে টাকার হিসাব মিলছে না:

ইসলামি ধারায় পরিচালিত বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টের টাকার হিসাব মিলছে না। কাগজপত্রে ওই শাখার ভল্টে যে পরিমাণ টাকা থাকার তথ্য রয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে প্রায় ১৯ কোটি টাকা কম পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গত সোমবার ওই শাখা পরিদর্শনে গিয়ে ভল্ট খুলে টাকা গুনে কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবে বড় ধরনের গরমিল পান। শাখাটির নথিপত্রে দেখানো হয়েছে, ভল্টে ৩১ কোটি টাকা রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা গুনে পেয়েছেন ১২ কোটি টাকা। বাকি ১৯ কোটি টাকার ঘাটতি সম্পর্কে শাখাটির কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দলকে যথাযথ কোনো জবাব দিতে পারেননি।
নিয়ম অনুযায়ী, ভল্টের টাকার গরমিল থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হয়। কিন্তু গতকাল বুধবার পর্যন্ত ব্যাংকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকেও বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়নি। তবে ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভল্ট ডাকাতির কথা শোনা গেলেও, ভল্টে ঘোষণার চেয়ে কম টাকা পাওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি শোনা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর বিভিন্ন ব্যাংক ও বড় শাখাগুলোতে বিশদ পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা পরিদর্শনে ভল্টের টাকার গরমিল পাওয়া যায়। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি, নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থাও নিচ্ছি। ব্যাংকের ভল্টে ঘোষণার কম টাকা থাকবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগের একজন যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে একটি দল নিয়মিত বিশদ পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের নিচে অবস্থিত গুলশান শাখায় যায়। পরিদর্শনের প্রথম দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা ভল্টে রাখা টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখেন। সেটি করতে গিয়েই ব্যাংকটির ওই শাখায় ১৯ কোটি টাকার গরমিলের বিষয়টি ধরা পড়ে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শক দলের কর্মকর্তারা ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেননি। উল্টো ব্যাংকটিতে কর্মরত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সাবেক কর্মকর্তা বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য পরিদর্শক দলের সদস্যদের প্রতি অনুরোধ করেন। এ অবস্থায় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা একাধিক দফায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। এরপর এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ভল্টের সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, হাই সিকিউরিটি অ্যালার্ম, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারসহ নানা উদ্যোগ নিতে হয়। এত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিধান থাকার পরও ভল্টে টাকায় গরমিল থাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, ভল্টের চাবি থাকে দুজনের কাছে। শাখা ব্যবস্থাপক, শাখা পরিচালনা ব্যবস্থাপক, ক্যাশ ইনচার্জ ও ক্যাশ অফিসার এ চার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যেকোনো দুজনের কাছে চাবি থাকবে। দুজনের উপস্থিতি ও চাবি ছাড়া ভল্ট খোলা ও বন্ধের সুযোগ নেই। প্রতিদিন লেনদেন শেষে ঠিক কত টাকার কতটি নোট ভল্টে জমা রাখা হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হয়। সেই খাতাও থাকে ভল্টের ভেতরে। টাকার হিসাব মেলার পর কর্মকর্তারা প্রতিদিন ওই রেজিস্টারে স্বাক্ষর করেন। তাই ভল্টের টাকার গরমিলের সুযোগ কম। শাখা ব্যবস্থাপক ও প্রধান শাখার কর্মকর্তারা হঠাৎ হঠাৎ ভল্ট পরিদর্শন করে টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখেন। গরমিল পাওয়া গেলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি করতে হয়। সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলার বিধান রয়েছে।
ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টের টাকার গরমিলের বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ বি এম মোকাম্মেল হক চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ব্যাংকটির জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০২০ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকটিতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতই ৪ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। ওই বছর শেষে ব্যাংকটির বিনিয়োগ (ঋণ) ছিল ১৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। গত বছর ব্যাংকটি ৯৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। গত বছর ব্যাংকটির শাখা ছিল ৯৫টি।
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৫ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদন করেছে। ব্যাংকটি শেয়ারবাজার থেকে ৪২৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, নথিতে থাকার হিসাব বা ঘোষণার এক পয়সাও ভল্টে কম থাকার কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো গরমিল হয়, তাহলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে অবহিত করতে হয়। যদি কোনো ব্যাংক সেটি না করে, তবে বুঝতে হবে সেখানে কোনো সমস্যা আছে। (চলবে)