২ বছর নকশা অনুমোদন বন্ধ: রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার : নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে সেবার নামে পদে পদে হয়রানি ও ভোগান্তি!
রোস্তম মল্লিক
নৌ পরিবহন অধিদপ্তর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। নৌযানের নকশা অনুমোদন,নির্মাণ,তদারকি,নৌযান রেজিষ্ট্রেশন ও অভ্যন্তরীন এবং বিদেশগামী নৌযান সমুহের নাবিকদের পরীক্ষা সনদায়ন এই অধিদপ্তরের কাজ। নৌখাতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসাবেও কাজ করে থাকে এই অধিদপ্তর।
বর্তমানে এই অধিদপ্তরে চলছে সেবার নামে হয়রানি ও আধুনিকায়নের নামে বহুপ্রকার দুর্নীতি। সেবা গ্রহিতাদের প্রতিটি পদক্ষেপে পোহাতে হচ্ছে অশেষ ভোগান্তি।
অধিদপ্তরের প্রধান ও প্রথম ধাপ হলো নৌযানের নকশা প্রনয়ন ও অনুমোদন। আর এই নকশা অনুমোদনে চলছে তুঘলকি কান্ড। একটি নকশা ৪৫ দিনে পাশ হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২ বছরেও সেটি পাশ হচ্ছে না। নকশা অনুমোদনের নামে হয়রানিতে নৌযান মালিকদের নাভিশ্বাস উঠেছে।
সাধারণ নৌযান সমুহের নকশা অনুমোদনের নামে বিগত ২ বছর ধরে তামাসা চলছে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে। নকশা পাশের নামে বারবার মিটিং করে সাধারন নৌযান মালিক,ডিজাইন হাউস ও সংশ্লিষ্টদেরকে নাকে নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরানো হচ্ছে। অথচ: এর দাযভার নিতে অনিচ্ছুক নৌ পরিবহন অধিদপ্তর।
নৌযান নকশা অনুমোদনের নির্বাহী প্রধান চীফ ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার মো: মঞ্জুরুল কবীর। কিন্তু তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। মুলত তিনি একজন মেরিণ প্রশিক্ষক। ফলে এই অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম পালনে অদক্ষ ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তার অদক্ষতার কারণেই নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে নানা অনিয়ম ,দুর্নীতি ও নকশা অনুমোদন জট দেখা দিয়েছে। এছাড়া নৌযান সার্ভেতে সুকৌশলে নতুন নতুন আইন জারি করে লাখ লাখ টাকা ঘুস আদায় করা হচ্ছে।
নৌযান মালিকদের অভিযোগ, চীফ ইঞ্জিনিয়ার মো: মঞ্জুরুল কবীর নিজ দায়িত্বে কোন সমস্যারই সমাধান করতে পারেন না। উল্টো সহজ বিষয়গুলোকে জটিল করে সমাধানের জন্য মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখেন।
তারা আরো জানান, নকশা অনুমোদনকালীন সময়ে অনুমোদিত পত্রে সার্ভে অফিস নির্দ্ধারণ করে দেওয়ার কোন ্িবধান না থাকলেও চীফ ইঞ্জিনিয়ার বিশেষ স্বার্থ হাসিল করার জন্য সেটি অবলীলায় করে যাচ্ছেন। এতেকরে একদিকে যেমন নৌযান মালিকদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট সার্ভে অফিস নির্দ্ধারণ করে দেওয়ায় ওই সার্ভেয়ারের কাছে নৌযান মালিকরা জিম্মি হয়ে যাচ্ছেন। এই সুযোগে সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার ইচ্ছামত ঘুস আদায় করছেন।
উল্লেখ্য যে, নৌযান রেজিষ্ট্রেশন একান্তই নৌযান মালিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। নৌযান মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক সুবিধার্থে যে কোন সার্ভে অফিসে রেজিষ্ট্রেশন ও সার্ভে করার স্বাধীনতা রাখেন। অথচ: নৌ পরিবহন অধিদপ্তর সেই স্বাধীনতা খর্ব করে যাচ্ছে। আর এই কালো আইনের বলি হচ্ছেন সাধারন নৌযান মালিকরা। ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিনেন্স,১৯৭৬ এর বিধি অনুযায়ী সার্ভে অফিস নির্দ্ধারণ করে দেওয়ার কোন নিয়ম নেই। নৌযান মালিকদের প্রশ্ন, শিপিং অর্ডিনেন্সে এ নিয়ম না থাকলেও তাহলে এ ধরনের জনস্বার্থ বিরোধী রুলস কার স্বার্থে ? এ বিষয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে রীট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নৌযান নির্মাণে জটিলতা: রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
একটি নৌযান নির্মাণের প্রথম শর্ত নকশা অনুমোদন। নৌযান মালিকরা বছরের পর বছর নকশা জমা দিয়ে রাখলেও অনুমোদন দিচ্ছে না নৌ পরিবহন অধিদপ্তর। আইএসও ধারাতে বলা আছে যে, নকশা জমা দেওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে নকশা অনুমোদন দিতে হবে। সঠিক সময়ে নৌযানের নকশা অনুমোদন না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মালিকরা। একজন মালিক ২০১৯ সাালে নৌযান নির্মানের জন্য নকশা জমা দিয়েছেন কিন্তু ২০২২ সালে এসেও তার নকশা পাশ হয়নি। এ বিষয়ে নৌযান মালিকরা বলেন ২০১৯ সালে নৌযানের প্লেট,এ্যাংগেলের দাম ছিলো ৫২ হাজার টাকা টন। ২০২২ সালে এসে তার দাম হয়েছে ৯২ হাজার টাকা টন। ২০১৯ সালে যে মুল্যে নৌযান নির্মাণ করা যেতো এখন তার দ্বিগুন দাম লাগবে। এই ক্ষতির দায়ভার কি চীফ ইঞ্জিনিয়ার বা নৌ পরিবহন অধিদপ্তর নেবেন ? তারা আরো জানান, নকশা অনুমোদন বন্ধ না থাকলে প্রতি বছর ৫ শতাধিক নকশা অনুমোদিত হতো। এত সরকারের মোটা অংকের রাজস্ব আয় হতো। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের খামখেয়ালিপনায় সরকার প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা সেই রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভোগান্তির অপর নাম টাস্ক নাম্বার ,কীল লেয়িং সনদ
নতুন নৌযান নির্মানের ক্ষেত্রে অধিদপ্তর থেকে টাস্ক নাম্বার ,কীল লেয়িং নির্মাণ সিডিউল সনদ নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এই সনদ গ্রহনেও রয়েছে দুর্নীতি ও ভোগান্তি। একজন মালিক যখন সঠিক সময়ে নৌযানের নকশা অনুমোদন না পেয়ে একান্ত বাধ্য ও নিরুপায় হয়ে নৌযান নির্মাণ করে ফেলেন । তখন কীল লেয়িং সনদ নিতে শুরু হয় তুঘলকি কান্ড। নির্মিত নৌযানে প্রথমে কারণ দর্শানো, তারপর তদন্তের নামে মালিকদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। একপর্যায়ে আর্থিক দফারফার মাধ্যমে মালিকদের শুলে চড়ানো হয়।
সুত্রমতে , বিগত সময়ে নৌযান নির্মাণের পুর্বে কীল লেয়িং সনদ নেওয়ার বিষয়ে কোন জটিলতা ছিরেঅ না। কিন্তু কিছুদিন ধরে জাহাজ নির্মানের জন্য কীল লেয়িং সনদ জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় মালিকরা জাহাজ নির্মাণে অনুৎসাহী হয়ে পড়েছেন। প্রথমত: অভ্যন্তরীণ নৌযান সমুহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর তীরে অনুমোদিত ডকইয়ার্ড সমুহে শিপবিল্ডার্স দ্বারা নির্মাণ করা হয়। সেক্ষেদ্রে কীল লেয়িং সনদ নেওয়ার জন্য মালিকগণ শিপবিল্ডার্স এনওসি ব্যবহার করে থাকেন। নকশা অনুমোদনপত্রে অনুমোদিত ডকইয়ার্ড / শিপইয়ার্ড /শিপবিল্ডার্স দ্বারা নৌযান নির্মাণের শর্ত দেয়া থাকে। কাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় অনুমোদিত ডকইয়ার্ড / শিপইয়ার্ড /শিপবিল্ডার্স খুবই অপ্রতুল। এবং এই ধরনের ডকইয়ার্ড / শিপইয়ার্ড /শিপবিল্ডার্স এ এতো পরিমাণ জাহাজ তৈরী করা
কষ্টসাধ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ অনুমোদিত ডকইয়ার্ড কুড়িগংগা নদীর তীরে অবস্থিত। কিন্তু বর্তমান সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুড়িগংগা তীরবর্তী ডকইয়ার্প সমুহ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় ডকইয়ার্ড সমুহে এনওসি নবায়ন বন্ধ রয়েছে। এমতবস্থায় বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক ফোরশের সনদ বন্ধ থাকায় ডকইয়ার্ড এনওসি নবায়ন বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে নবায়নকৃত এনওসি ব্যতিরেকে ডিজি শিপিং কীল লেয়িং সনদ প্রদান করছে না। এটি একটি উভমুখী সমস্যার সৃষ্টি করেছে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের এমন একটি নিয়মের কারণে নৌযান মালিকরা জাহাজ তৈরীর আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এতে সরকার মোটা অংকের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের এমন কল্পনাগ্রসুত নিয়মের কারণে সরকারের অন্যতম একটি অর্থনৈতিক খাত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আর এসব ঘটনার মুলে রয়েছেন চীফ ইঞ্জিনিয়ার মো: মঞ্জুরুল কবীর। তিনি মেরিণ ইঞ্জিনিয়ার হলেও বাস্তবিক জ্ঞান না থাকায় অধিদপ্তরের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।
২২ হাজার টাকা ঘুস দাবী
মেসার্স সায়ফা নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের এক লিখিত অভিযোগে জানাগেছে, এমভি সায়ফা নৌ পরিবহন ( ৯৬০৬)
বালিবাহি নৌযানটির রেজিষ্ট্রেশন সনদ মুল সনদ হারিয়ে যাওয়ায় যথাযথ নিয়মে থানায় জিডি ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সদরঘাট সার্ভে অফিসে ফি-জমান্তে ডুপ্লিকেট রেজিষ্ট্রেশন সনদ প্রাপ্তির আবেদন জানান।
সদরঘাট অফিসের সার্ভেয়ার সিরাজুল ইসলাম আবেদনটি অফিসিয়ালি গ্রহন করলেও দীর্ঘদিনেও সনদটি জারি করেন নি। নৌযানটির মালিক হাজী মো: শফিকুল ইসলাম সরাসরি যোগাযোগ করলে তিনি ২২ হাজার টাকা ঘুস দাবী করেন।
এ বিষয়ে গত ৪ এপ্রিল ২০২২ ইং তারিখে নৌযানটির মালিক হাজী মো: শফিকুল ইসলাম নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের চীফ ইঞ্জিনিয়ার মো: মঞ্জুরুল কবীর ফোনে কোন কথা বলতে রাজী হননি। অন্যদিকে সদরঘাট অফিসের সার্ভেয়ার মো: সিরাজুল ইসলাম সরাসরি তার অফিসে দেখা করতে বলেন। (চলবে)













