০৩:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মামলার গ্যাড়াকলে নিয়োগ-পদন্নোতি-পদায়ন: বন বিভাগে এসব হচ্ছে কী?

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

মামলার পর মামলায় জর্জরিত বন বিভাগ। কর্মকর্তাদের হিংসা,বিদ্বেষ আর দলাদলিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকান্ড ঝিমিয়ে পড়েছে। জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে সৃষ্ট হয়েছে নানা জটিলতা। এই সমস্যাগুলি সৃষ্টির পিছনে বন বিভাগের কিছু উচ্চবিলাসী কর্মকর্তা, বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থ , সর্বোপরি লাগামহীন দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব দায়ী বলে মনে করছেন বন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান সময়ে বনভূমি, বনজ সম্পদ, বন্যপ্রাণী রক্ষায় এবং বর্তমানে আলোচিত ও প্রশংসিত বনভূমি জবর দখল উচ্ছেদে পর্যাপ্ত জনবল বন বিভাগের নেই। ৯০ দশকে যেখানে বন বিভাগের জনবল ছিল প্রায় ২২ হাজারের অধিক বর্তমানে তলানিতে এসে ৭ হাজার ৫০০ শততে এসে ঠেকেছে। সেই হিসেবে দেশের জনসংখ্যার তুলনায় ৪০ হাজার জনসংখ্যার পিছনে মাত্র একজন বনকর্মী। জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি দুটোই অপর্যাপ্ততা। এক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় মামলা মোকদ্দমা। মামলার কারণে কোন পক্ষ লাভবান হচ্ছে কিনা জানিনা। বরঞ্চ উভয় পক্ষই বঞ্চিত হচ্ছে। ডিপার্টমেন্টাল মামলার কারণে কোন পদক্ষেপ নিতে বা কোন সমাধান দিতে পারছেন না। সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী , বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ডঃ হাসান মাহমুদ বৃক্ষ মেলা সমাপনী অনুষ্ঠানে সমাপনী ভাষণে আক্ষেপ করে বলে ছিলেন যে, অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে লোক নিয়োগ হচ্ছে, পদোন্নতি হচ্ছে অথচ মামলার কারণে আমি পারছিনা। এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি মামলাগুলো প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুস আলী সকল পক্ষকে ডেকে মামলা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কয়েকদফা বৈঠকের পরও ফলাফল শুন্য । বন বিভাগের এই সমস্ত বিশেষ শ্রেণী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে বন বিভাগে প্রকারভেদ সৃষ্টি করে। প্রকারভেদের কারনে বন বিভাগ জগাখিচুড়ী বিভাগে রূপান্তর হয়ে যায়। বন বিভাগে সহকারী বন সংরক্ষক কয়েক প্রকার যেমনঃ ক্যাডার, নন ক্যাডার, প্রকল্পের ১৬ জন,উচ্চ গ্রেডের ওয়াইল্ড লাইফ সুপারভাইজার, ইনভেস্টিগেটর ইত্যাদি পদের কর্মকর্তাদের নিম্নতর গ্রেডের পদ ফরেস্ট রেঞ্জার পদে আত্তীকরণ ফরেষ্ট রেঞ্জার, সরাসরি ফরেষ্ট রেঞ্জার ও ফরেষ্টার থেকে পদোন্নতি প্রাপ্ত সহকারি বন সংরক্ষক। এই প্রকারভেদের কারণে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। একে অপরের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। ফরেষ্টারদের মধ্য আরো কঠিন জটিলতা যেমনঃ রাজস্ব খাত, বিভিন্ন প্রকল্প, ডিপ্লোমা, পদোন্নতি প্রাপ্ত ও উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত প্লান্টেশন সহকারীদের বন বিভাগে আত্তীকরণ ফরেস্টার। ফরেষ্ট গার্ডদের মধ্য রাজস্ব খাত ও বিভিন্ন প্রকল্পের ফরেস্ট গার্ড। এসব কারা করেছে ? নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়া এগুলো করা কি সম্ভব ? এই প্রকারের পদধারীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী এবং তাই হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের চাকুরী স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণের দায়িত্ব উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অহংকার, উদাসীনতা, গাফিলতি এবং অবহেলার কারণে আজ মাঠ পর্যায়ে বন কর্মীদের মাঝে বিরাট ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকারি কর্মচারীদের চাকুরীকাল তিন বছর সন্তোষজনক হলে চাকুরী স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণের সার্কুলার জারী করা থাকলেও সেই সার্কুলার কে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একই দিনে স্থায়ীকরণ একই দিনে নিয়মিতকরনের কারনে সিনিয়র কর্মচারীরা জুনিয়র হয়েগেছেন এবং জুনিয়র কর্মচারীরা সিনিয়র হয়েগেছেন । এখন এর দায়-দায়িত্ব কে নিবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ না-কি মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীবৃন্দ?
যখনই মাঠ পর্যায়ের বনকর্মীদের গ্রেডেশন লিস্ট প্রকাশ পাবে তখনই সিনিয়র-জুনিয়রের জটিলতা নিয়ে আরেকটি মামলা হবে তখন এর দায়-দায়িত্ব কার উপর বর্তাবে ? বন বিভাগে জৈষ্ঠতা নিয়ে এমনিতেই ৮/৯ টি মামলা চলমান। আইনি লড়াইয়ে পক্ষে রায় পেলেও কর্তৃপক্ষ রায় বাস্তবায়ন না করে উচ্চতর আদালতে আপিল করে সময় ক্ষেপণ করছেন। এমতাবস্থায় যারা মামলা করেছে তাদের চাকুরীও বেশিদিন নেই। বন কর্মকর্তাদের আমি কিছু পাইনি অন্যদেরও কিছু পেতে দিবো না, এই মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আগামী প্রজন্মকে সুযোগ দিতে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। সবাইকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। তাহলে সব পরিবর্তন হবে, নয়তো না ।পক্ষান্তরে ডিপার্টমেন্টের সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মচারীরা হবে বঞ্চিত, থাকবে অবহেলিত। অপরদিকে চাটুকার, তেলবাজ, তোষামোদকারী ও চোগলখোরদের দৌরাত্ম্য বেড়েই যাবে। যে পদে নিয়োগ সে পদেই বিদায় নিতে হবে । বিষয়গুলো ডিপার্টমেন্টের স্বার্থে কর্তৃপক্ষের অতি গুরুত্বের সাথে সুবিবেচনা করা উচিত। আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে নিশ্চয় বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব। বর্তমান পেক্ষাপটে বন বিভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ । জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে এ বিভাগের কোন বিকল্প নেই । তাই সকল সমস্যার সমাধান করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনোবল সমুন্নত রাখা অতিব জরুরী বলে মনে করছেন দেশ প্রেমিক বন কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৫:০৩:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ অক্টোবর ২০২১
২৫৯ বার পড়া হয়েছে

মামলার গ্যাড়াকলে নিয়োগ-পদন্নোতি-পদায়ন: বন বিভাগে এসব হচ্ছে কী?

আপডেট সময় ০৫:০৩:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ অক্টোবর ২০২১

রোস্তম মল্লিক

মামলার পর মামলায় জর্জরিত বন বিভাগ। কর্মকর্তাদের হিংসা,বিদ্বেষ আর দলাদলিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকান্ড ঝিমিয়ে পড়েছে। জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে সৃষ্ট হয়েছে নানা জটিলতা। এই সমস্যাগুলি সৃষ্টির পিছনে বন বিভাগের কিছু উচ্চবিলাসী কর্মকর্তা, বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থ , সর্বোপরি লাগামহীন দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব দায়ী বলে মনে করছেন বন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান সময়ে বনভূমি, বনজ সম্পদ, বন্যপ্রাণী রক্ষায় এবং বর্তমানে আলোচিত ও প্রশংসিত বনভূমি জবর দখল উচ্ছেদে পর্যাপ্ত জনবল বন বিভাগের নেই। ৯০ দশকে যেখানে বন বিভাগের জনবল ছিল প্রায় ২২ হাজারের অধিক বর্তমানে তলানিতে এসে ৭ হাজার ৫০০ শততে এসে ঠেকেছে। সেই হিসেবে দেশের জনসংখ্যার তুলনায় ৪০ হাজার জনসংখ্যার পিছনে মাত্র একজন বনকর্মী। জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি দুটোই অপর্যাপ্ততা। এক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় মামলা মোকদ্দমা। মামলার কারণে কোন পক্ষ লাভবান হচ্ছে কিনা জানিনা। বরঞ্চ উভয় পক্ষই বঞ্চিত হচ্ছে। ডিপার্টমেন্টাল মামলার কারণে কোন পদক্ষেপ নিতে বা কোন সমাধান দিতে পারছেন না। সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী , বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ডঃ হাসান মাহমুদ বৃক্ষ মেলা সমাপনী অনুষ্ঠানে সমাপনী ভাষণে আক্ষেপ করে বলে ছিলেন যে, অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে লোক নিয়োগ হচ্ছে, পদোন্নতি হচ্ছে অথচ মামলার কারণে আমি পারছিনা। এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি মামলাগুলো প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুস আলী সকল পক্ষকে ডেকে মামলা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কয়েকদফা বৈঠকের পরও ফলাফল শুন্য । বন বিভাগের এই সমস্ত বিশেষ শ্রেণী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে বন বিভাগে প্রকারভেদ সৃষ্টি করে। প্রকারভেদের কারনে বন বিভাগ জগাখিচুড়ী বিভাগে রূপান্তর হয়ে যায়। বন বিভাগে সহকারী বন সংরক্ষক কয়েক প্রকার যেমনঃ ক্যাডার, নন ক্যাডার, প্রকল্পের ১৬ জন,উচ্চ গ্রেডের ওয়াইল্ড লাইফ সুপারভাইজার, ইনভেস্টিগেটর ইত্যাদি পদের কর্মকর্তাদের নিম্নতর গ্রেডের পদ ফরেস্ট রেঞ্জার পদে আত্তীকরণ ফরেষ্ট রেঞ্জার, সরাসরি ফরেষ্ট রেঞ্জার ও ফরেষ্টার থেকে পদোন্নতি প্রাপ্ত সহকারি বন সংরক্ষক। এই প্রকারভেদের কারণে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। একে অপরের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। ফরেষ্টারদের মধ্য আরো কঠিন জটিলতা যেমনঃ রাজস্ব খাত, বিভিন্ন প্রকল্প, ডিপ্লোমা, পদোন্নতি প্রাপ্ত ও উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত প্লান্টেশন সহকারীদের বন বিভাগে আত্তীকরণ ফরেস্টার। ফরেষ্ট গার্ডদের মধ্য রাজস্ব খাত ও বিভিন্ন প্রকল্পের ফরেস্ট গার্ড। এসব কারা করেছে ? নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়া এগুলো করা কি সম্ভব ? এই প্রকারের পদধারীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী এবং তাই হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের চাকুরী স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণের দায়িত্ব উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অহংকার, উদাসীনতা, গাফিলতি এবং অবহেলার কারণে আজ মাঠ পর্যায়ে বন কর্মীদের মাঝে বিরাট ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সরকারি কর্মচারীদের চাকুরীকাল তিন বছর সন্তোষজনক হলে চাকুরী স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণের সার্কুলার জারী করা থাকলেও সেই সার্কুলার কে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একই দিনে স্থায়ীকরণ একই দিনে নিয়মিতকরনের কারনে সিনিয়র কর্মচারীরা জুনিয়র হয়েগেছেন এবং জুনিয়র কর্মচারীরা সিনিয়র হয়েগেছেন । এখন এর দায়-দায়িত্ব কে নিবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ না-কি মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীবৃন্দ?
যখনই মাঠ পর্যায়ের বনকর্মীদের গ্রেডেশন লিস্ট প্রকাশ পাবে তখনই সিনিয়র-জুনিয়রের জটিলতা নিয়ে আরেকটি মামলা হবে তখন এর দায়-দায়িত্ব কার উপর বর্তাবে ? বন বিভাগে জৈষ্ঠতা নিয়ে এমনিতেই ৮/৯ টি মামলা চলমান। আইনি লড়াইয়ে পক্ষে রায় পেলেও কর্তৃপক্ষ রায় বাস্তবায়ন না করে উচ্চতর আদালতে আপিল করে সময় ক্ষেপণ করছেন। এমতাবস্থায় যারা মামলা করেছে তাদের চাকুরীও বেশিদিন নেই। বন কর্মকর্তাদের আমি কিছু পাইনি অন্যদেরও কিছু পেতে দিবো না, এই মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আগামী প্রজন্মকে সুযোগ দিতে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। সবাইকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। তাহলে সব পরিবর্তন হবে, নয়তো না ।পক্ষান্তরে ডিপার্টমেন্টের সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মচারীরা হবে বঞ্চিত, থাকবে অবহেলিত। অপরদিকে চাটুকার, তেলবাজ, তোষামোদকারী ও চোগলখোরদের দৌরাত্ম্য বেড়েই যাবে। যে পদে নিয়োগ সে পদেই বিদায় নিতে হবে । বিষয়গুলো ডিপার্টমেন্টের স্বার্থে কর্তৃপক্ষের অতি গুরুত্বের সাথে সুবিবেচনা করা উচিত। আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে নিশ্চয় বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব। বর্তমান পেক্ষাপটে বন বিভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ । জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে এ বিভাগের কোন বিকল্প নেই । তাই সকল সমস্যার সমাধান করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনোবল সমুন্নত রাখা অতিব জরুরী বলে মনে করছেন দেশ প্রেমিক বন কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা।