খুলনা জেলার রূপসায় উগ্র মৌলবাদীদের বর্বরতা: ৪ মন্দিরসহ ১০ বাড়ি ও ৫৬ প্রতিমা ভাংচুর!
রূপসা থেকে ফিরে প্রদীপ আচার্য্য
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামে উগ্র মৌলবাদীরা তান্ডব চালিয়ে ৪ টি বড় মন্দিরসহ ১০ টি বাড়ি ও মন্দিরের ৫৬ টি প্রতিমা ভাংচুর করেছে। ঘরের আসবাবপত্রও লুটপাট করা হয়েছে। এমনকি গৃহপালিত গরুও লুট করে নিয়েগেছে। সীমাহীন এই বর্বরচিত হামলায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানাগেছে, খুলনা জেলার রূপসা উপজেলা শিয়ালী পূর্বপাড়া গ্রামের একজন ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে, মহাশশ্মানে ০৩ দিন ভগবানের নামে পূজা করিলে কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস) থেকে মুক্তি লাভ করবে। সেই আশায় গত ০৬ আগষ্ট ২০২১ তারিখ শুক্রবার রাত্র ৮ টার সময় রূপসা থানাধীন ৫নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের শিয়ালী পূর্বপাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৫/২০ জন ঠাক-ঢোল বাজিয়ে হরিকীর্ত্তন গান গেয়ে শিয়ালী গ্রাম হইতে মহাশশ্মানের দিকে যাওয়ার পথে পশ্চিম পাড়ার দায়পাড়া জামে মসজিদের সামনে রাস্তায় পৌঁছাইলে মসজিদের এশার নামাজের জন্য থাকা মসজিদের ঈমাম মোঃ নাজিম সমাদ্দার মসজিদ থেকে বাহির হয়ে আসিয়া বলেন যে, এখন নামাজের সময় আগত ব্যক্তিদের ঢাক-ঢোল বন্দসহ হরিকীর্ত্তন গান গাইতে নিষেধ করে। তখন উভয়ের মধ্যে বাগবিতন্ডা শুরু হয়।
একপর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে ইমাম সাহেবকে মারধর করা হয়েছে । এমন ঘটনার সংবাদ সাথে সাথে শিয়ালী ক্যাম্পের পুলিশ ও রূপসা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় কোন প্রকার আইনশৃঙ্খলা অবনতি না হয় পুলিশি টহল টিম মোতায়েন করা হয়। পরের দিন ০৭ তারিখ শনিবার বিকাল ৫ টার সময় স্থানীয় চাঁদপুর গ্রাম, শিয়ালী গ্রামসহ আশপাশের এলাকার বিভিন্ন মসজিদের মুসুল্লিরা শিয়ালী বাজারে একত্রিত হয়। চাঁদপুর গ্রাম, শিয়ালী গ্রামসহ আশপাশের এলাকার ১৫০/২০০ জন উত্তেজিত জনগন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর উষ্কানিমুলক দাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে শিয়ালী পূর্বপাড়া গ্রামের পিছন দিক দিয়ে সঙ্গবদ্ধ হয়ে হাতুডড়ি লোহার রড, শাবল, কুড়াল, দা, বাঁশের লাঠি ইত্যাদি দেশীয় তৈরি অস্ত্রশস্ত্র নিয়া একত্রিত হইয়া শিয়ালী গ্রামের নিপুল ধর ও শিব ধর এর পারিবারিক মন্দিরে প্রবেশ করে মন্দিরে থাকা প্রতিমা ভাংচুর করে। আসামীরা শিয়ালী মহাশশ্মান মন্দির, পূর্বপাড়া সার্বজনীন মন্দির ও মন্দিরের ভিতরে থাকা মূর্তি ভাংচুরসহ গ্রামের কয়েকটি বসত বাডী, দোকানপাট ভাংচুর করে। এমন অবস্থায় এলাকায় থমথমে বিরাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয় অবগত হয়ে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার মিঃ রাজেশ কুমার রায়না ক্ষতিগ্রস্থ মন্দির ও বাড়ি পরিদর্শন করেন তিনি সকলকে ধৈর্য ধরতে বলেন এবং ঘটনার পিছনে যারা আছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন।
এই বর্বরোচিত হামলায় ৪ টি বড় মন্দিরসহ ১০ টি বাড়ি ও মন্দিরের ৫৬ টি প্রতিমা ভাংচুর করা হয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র লুটপাট করা হয়েছে! এমনকি গৃহপালিত গরু নিয়ে গেছে! এ ঘটনারপর এলাকার হিন্দু সমাজ চরম উৎকন্ঠার মধ্যে দিনরাত কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপসা থানা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শক্তিপদ বসু জানান,শতাধিক যুবক রামদা, চাপাতি, কুড়াল নিয়ে শিয়ালী গ্রামে হামলা চালায়। তারা বাজারের গণেশ মল্লিকের ওষুধের দোকান, শ্রীবাস মল্লিকের মুদি দোকান, সৌরভ মল্লিকের চা ও মুদি দোকান, অনির্বাণ হীরার চায়ের দোকান ও তার বাবা মজুমদারের দোকান ভাঙচুর করে। এ সময় শিবপদ ধরের বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয়। তার বাড়ির গোবিন্দ মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া হরি মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া দুর্গা মন্দির ও শিয়ালী মহাশ্মশান মন্দিরের বেশিরভাগ প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়।
ঘাটভোগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাধন অধিকারী বলেন, পাশের চাঁদপুর গ্রামের যুবকরা এই ভাঙচুরে অংশ নেয়। এভাবে মন্দির ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা এর আগে কখনও হয়নি।
এ বিষয়ে খুলনার পুলিশ সুপার মাহবুব হাসান বলেন, ঘটনার পর এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনার জড়িত বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।





















