১২:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হানিট্র্যাপ: ভয়ানক তৎপর প্রতারকরা

প্রতিনিধির নাম:

ফোনে রিং বাজছিল। অফিসের কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত জাকির হোসেন, তবু ‘রিসিভ’ করলেন। হ্যালো, কে বলছেন? জবাবে বলা হলো–‘আমাকে চিনবেন না। আপনার ছেলে কোথায়? খোঁজখবর নেন…।’ এর পরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন। দ্রুতই পাল্টা কল দিলেন জাকির হোসেন। কিন্তু ফোন নম্বরটি (০১৮৬১-০৭০৯৫৫) ডায়াল করতেই মাথায় যেন বাজ পড়ল। কেননা, ফোনে থাকা ‘ট্রু কলারে’ নম্বরটি ডায়াল করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘অপহরণকারী’ লেখা। ঘটনার আকস্মিকতায় পাগলপ্রায় জাকির ছেলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, তার শিশু ছেলেটি অপহৃত হয়নি, এটি ছিল প্রতারক চক্রের অপতৎপরতার ফাঁদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাকির হোসেন কেবল একাই এমন ভুক্তভোগী নন, এভাবেই নিত্যনতুন কৌশলে সহজ-সরল মানুষদের টার্গেট করে ‘জীবন-মৃত্যু’ নিয়েও খেলা শুরু করেছে প্রতারক চক্র। অপহরণকারী, ছেলে ধরা, চাঁদাবাজসহ নানা পরিচয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে ফাঁদ পাতছে প্রতারকরা। এ ছাড়া নারীদের দিয়ে ‘হানিট্র্যাপ’ (মধুর ফাঁদ), কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধির ভুয়া পরিচয়, এমনকি সামরিক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নাম-ছবির ব্যবহার করেও অহরহ ভয়ানক প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রগুলো। সাম্প্রতিক সময়ের এমনই বেশ কয়েকটি অপতৎপরতার তথ্য-উপাত্ত এসেছে খবরের কাগজের হাতে।

আলাপকালে ওই ভুক্তভোগী জাকির হোসেন জানান, তিনি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। রাজধানীর তুরাগ থানা এলাকায় সপরিবারে ভাড়ায় বসবাস করেন। কথিত অপহরণকারীর সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জাকির বলেন, ‘রহস্যজনক ফোনের পর দ্রুত বাসায় খবর নিলেও জানতে পারেন, ছেলে বেশ কিছু সময় ধরে বাইরে। সেই সময়ের পরিস্থিতি বোঝানোর মতো নয়। মনে হচ্ছিল, ছেলেটির কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে বা নিজেই যেন ‘স্ট্রোক’ না করে ফেলি। পুলিশকেও জানানোর পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন জাকির হোসেন। এক পর্যায়ে ছেলেকে তার বন্ধুর সঙ্গে পাশের এলাকায় আড্ডারত অবস্থায় পাওয়া যায়। ছেলেকে প্রশ্ন করলে সে জানায়, তার সঙ্গে এমন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।’

পরে কথিত ‘অপহরণকারী’ বা প্রতারণায় ব্যবহৃত ০১৮৬১-০৭০৯৫৫ নম্বরটির প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে–জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ওই নম্বরটি জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল থানার নওটিকা ভাদারপাড়ার গায়ত্রী রানীর। তবে নম্বরটি সেই সময়ে সর্বশেষ ব্যবহার হয় ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার নাসিরাবাদ থেকে। গতকাল এবং তার আগে একাধিকবার ওই নম্বরে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ  বলেন, ‘প্রতারক চক্রের এই ধরনের অপতৎপরতার খবর মাঝেমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় পারিবারিক বিরোধ থেকেও অপহরণ নাটকের ঘটনা ঘটে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করে এগোতে হবে।’

সম্প্রতি দেশের প্রখ্যাত একজন লেখক ও কথাসাহিত্যিককেও ০১৬৩৬-৫০০৩৫৪ নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হয়। পুলিশের পোশাক পরিহিত ছবিসংবলিত চেহারা প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই নম্বর থেকে সেই কথা সাহিত্যিককে বলা হয়, ‘আপনার নম্বরটি একটি নগ্নতাভিত্তিক গ্রুপে যুক্ত রয়েছে। আপনি বিপদে পড়তে যাচ্ছেন। আপনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ আকস্মিক এমন কথায় কিছুটা অবাক হন তিনি। বিষয়টি তার জন্য অস্বস্তিকর হলেও ঘটনা জানার চেষ্টার করেন। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে যাওয়া কোড নম্বরসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে বলা হলে ওই লেখক বুঝতে পারেন এটি প্রতারণার ফাঁদ। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেই নম্বরটি পুলিশের নয়, বরং ঘটনার পর থেকে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে গত সপ্তাহে আপেল মাহমুদ নামে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ‘হানি ট্র্যাপের’ (মধুর ফাঁদ) শিকার হন বলে জানিয়েছেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা’ নামকরণে ভারতীয় একটি নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ঘটনার তিন দিন আগে ‘হ্যায়, হ্যালো’ মেসেজ আসে। সুন্দরী তরুণীর ছবিযুক্ত প্রোফাইল দেখে আপেল মাহমুদও জবাব দেন। পরে চলতে থাকে নানা রকম ‘মেসেজ’ আদান-প্রদান। দ্রুতই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আপেল মাহমুদ যখন অফিসে, তখন কথিত প্রিয়াঙ্কার ভিডিও কল আসে। একটু নিভৃতে বসে ‘রিসিভ’ করতেই আকর্ষণীয় চেহারার এক তরুণীকে দেখতে পান তিনি। কুশল বিনিময় হতে না হতেই সেই তরুণী দ্রুত নগ্ন হয়ে নিজেকে প্রদর্শন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই তরুণী নিজেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর যা হয়েছে, তাতে ভয়ানক এক বিপদের মুখে পড়েন সেই ব্যাংক কর্মকর্তা। সেই ‘বিবস্ত্র’ ভিডিও কলের বেশ কয়েকটি ‘স্ক্রিনশট’ কথিত প্রিয়াঙ্কা পাঠিয়ে দেন এই ব্যাংকারের ফোনে। সঙ্গে হুমকি দিয়ে লেখা হয়, ৫ লাখ টাকা দিতে হবে, নইলে সেই ব্যাংকারের ফেসবুক আইডিতে গিয়ে তার স্ত্রীসহ তার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা সবাইকে সেই স্ক্রিনশটগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরে নানা প্রক্রিয়ায় বিষয়টির রফা হয়েছে বলে জানান ওই ভুক্তভোগী।

গত ৬ জুলাই রাজধানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণকারী এক কর্মকর্তাকে হানি ট্র্যাপের খপ্পরে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগে দুই নারীসহ চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এর আগে ১৬ জুন ‘সুন্দরী নারী’র প্রলোভন দেখিয়ে সালেহীন মিয়া ও তার বন্ধু টিটু মিয়াকে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকার একটি ভবনে ডেকে নিয়ে জিম্মি করে নির্যাতন ও টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ সেই চক্রের পাঁচ সদস্যের মধ্যে দুই নারী ও এক পুরুষ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক  বলেন, প্রতারণামূলক তৎপরতায় চক্রের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে–টার্গেট ব্যক্তির বিশ্বাস বা আস্থা অর্জন। চক্রের কৌশলগুলো তাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন বা নিত্যনতুন হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চক্রের সদস্যরা টার্গেট ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতাকে জেনে সে অনুসারে তৎপরতা চালিয়ে থাকে।

মূলত, বিশ্বাস বা আস্থা অর্জনের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, প্রেম, বন্ধুত্ব, চাকরির প্রলোভনসহ বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করে। জিম্মি-নির্যাতনের মাধ্যমে চক্রগুলো অর্থও হাতিয়ে নেয়। এ জন্য সচেতন থাকতে হবে। লোভ-লালসা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে লোভনীয় কথা বলে ফাঁদ পাতা হয়, ফলে এসব ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোনো কিছু মনে হলে অবশ্যই সেগুলো নিয়ে পরিবার ও নিকটজন বা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:২১:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
৬০ বার পড়া হয়েছে

হানিট্র্যাপ: ভয়ানক তৎপর প্রতারকরা

আপডেট সময় ০১:২১:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

ফোনে রিং বাজছিল। অফিসের কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত জাকির হোসেন, তবু ‘রিসিভ’ করলেন। হ্যালো, কে বলছেন? জবাবে বলা হলো–‘আমাকে চিনবেন না। আপনার ছেলে কোথায়? খোঁজখবর নেন…।’ এর পরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন। দ্রুতই পাল্টা কল দিলেন জাকির হোসেন। কিন্তু ফোন নম্বরটি (০১৮৬১-০৭০৯৫৫) ডায়াল করতেই মাথায় যেন বাজ পড়ল। কেননা, ফোনে থাকা ‘ট্রু কলারে’ নম্বরটি ডায়াল করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘অপহরণকারী’ লেখা। ঘটনার আকস্মিকতায় পাগলপ্রায় জাকির ছেলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, তার শিশু ছেলেটি অপহৃত হয়নি, এটি ছিল প্রতারক চক্রের অপতৎপরতার ফাঁদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাকির হোসেন কেবল একাই এমন ভুক্তভোগী নন, এভাবেই নিত্যনতুন কৌশলে সহজ-সরল মানুষদের টার্গেট করে ‘জীবন-মৃত্যু’ নিয়েও খেলা শুরু করেছে প্রতারক চক্র। অপহরণকারী, ছেলে ধরা, চাঁদাবাজসহ নানা পরিচয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে ফাঁদ পাতছে প্রতারকরা। এ ছাড়া নারীদের দিয়ে ‘হানিট্র্যাপ’ (মধুর ফাঁদ), কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধির ভুয়া পরিচয়, এমনকি সামরিক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নাম-ছবির ব্যবহার করেও অহরহ ভয়ানক প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রগুলো। সাম্প্রতিক সময়ের এমনই বেশ কয়েকটি অপতৎপরতার তথ্য-উপাত্ত এসেছে খবরের কাগজের হাতে।

আলাপকালে ওই ভুক্তভোগী জাকির হোসেন জানান, তিনি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। রাজধানীর তুরাগ থানা এলাকায় সপরিবারে ভাড়ায় বসবাস করেন। কথিত অপহরণকারীর সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জাকির বলেন, ‘রহস্যজনক ফোনের পর দ্রুত বাসায় খবর নিলেও জানতে পারেন, ছেলে বেশ কিছু সময় ধরে বাইরে। সেই সময়ের পরিস্থিতি বোঝানোর মতো নয়। মনে হচ্ছিল, ছেলেটির কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে বা নিজেই যেন ‘স্ট্রোক’ না করে ফেলি। পুলিশকেও জানানোর পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন জাকির হোসেন। এক পর্যায়ে ছেলেকে তার বন্ধুর সঙ্গে পাশের এলাকায় আড্ডারত অবস্থায় পাওয়া যায়। ছেলেকে প্রশ্ন করলে সে জানায়, তার সঙ্গে এমন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।’

পরে কথিত ‘অপহরণকারী’ বা প্রতারণায় ব্যবহৃত ০১৮৬১-০৭০৯৫৫ নম্বরটির প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে–জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ওই নম্বরটি জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল থানার নওটিকা ভাদারপাড়ার গায়ত্রী রানীর। তবে নম্বরটি সেই সময়ে সর্বশেষ ব্যবহার হয় ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার নাসিরাবাদ থেকে। গতকাল এবং তার আগে একাধিকবার ওই নম্বরে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ  বলেন, ‘প্রতারক চক্রের এই ধরনের অপতৎপরতার খবর মাঝেমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় পারিবারিক বিরোধ থেকেও অপহরণ নাটকের ঘটনা ঘটে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করে এগোতে হবে।’

সম্প্রতি দেশের প্রখ্যাত একজন লেখক ও কথাসাহিত্যিককেও ০১৬৩৬-৫০০৩৫৪ নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হয়। পুলিশের পোশাক পরিহিত ছবিসংবলিত চেহারা প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই নম্বর থেকে সেই কথা সাহিত্যিককে বলা হয়, ‘আপনার নম্বরটি একটি নগ্নতাভিত্তিক গ্রুপে যুক্ত রয়েছে। আপনি বিপদে পড়তে যাচ্ছেন। আপনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ আকস্মিক এমন কথায় কিছুটা অবাক হন তিনি। বিষয়টি তার জন্য অস্বস্তিকর হলেও ঘটনা জানার চেষ্টার করেন। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে যাওয়া কোড নম্বরসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে বলা হলে ওই লেখক বুঝতে পারেন এটি প্রতারণার ফাঁদ। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেই নম্বরটি পুলিশের নয়, বরং ঘটনার পর থেকে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে গত সপ্তাহে আপেল মাহমুদ নামে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ‘হানি ট্র্যাপের’ (মধুর ফাঁদ) শিকার হন বলে জানিয়েছেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা’ নামকরণে ভারতীয় একটি নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ঘটনার তিন দিন আগে ‘হ্যায়, হ্যালো’ মেসেজ আসে। সুন্দরী তরুণীর ছবিযুক্ত প্রোফাইল দেখে আপেল মাহমুদও জবাব দেন। পরে চলতে থাকে নানা রকম ‘মেসেজ’ আদান-প্রদান। দ্রুতই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আপেল মাহমুদ যখন অফিসে, তখন কথিত প্রিয়াঙ্কার ভিডিও কল আসে। একটু নিভৃতে বসে ‘রিসিভ’ করতেই আকর্ষণীয় চেহারার এক তরুণীকে দেখতে পান তিনি। কুশল বিনিময় হতে না হতেই সেই তরুণী দ্রুত নগ্ন হয়ে নিজেকে প্রদর্শন শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই তরুণী নিজেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর যা হয়েছে, তাতে ভয়ানক এক বিপদের মুখে পড়েন সেই ব্যাংক কর্মকর্তা। সেই ‘বিবস্ত্র’ ভিডিও কলের বেশ কয়েকটি ‘স্ক্রিনশট’ কথিত প্রিয়াঙ্কা পাঠিয়ে দেন এই ব্যাংকারের ফোনে। সঙ্গে হুমকি দিয়ে লেখা হয়, ৫ লাখ টাকা দিতে হবে, নইলে সেই ব্যাংকারের ফেসবুক আইডিতে গিয়ে তার স্ত্রীসহ তার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা সবাইকে সেই স্ক্রিনশটগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরে নানা প্রক্রিয়ায় বিষয়টির রফা হয়েছে বলে জানান ওই ভুক্তভোগী।

গত ৬ জুলাই রাজধানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণকারী এক কর্মকর্তাকে হানি ট্র্যাপের খপ্পরে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগে দুই নারীসহ চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এর আগে ১৬ জুন ‘সুন্দরী নারী’র প্রলোভন দেখিয়ে সালেহীন মিয়া ও তার বন্ধু টিটু মিয়াকে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকার একটি ভবনে ডেকে নিয়ে জিম্মি করে নির্যাতন ও টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ সেই চক্রের পাঁচ সদস্যের মধ্যে দুই নারী ও এক পুরুষ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক  বলেন, প্রতারণামূলক তৎপরতায় চক্রের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে–টার্গেট ব্যক্তির বিশ্বাস বা আস্থা অর্জন। চক্রের কৌশলগুলো তাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন বা নিত্যনতুন হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চক্রের সদস্যরা টার্গেট ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতাকে জেনে সে অনুসারে তৎপরতা চালিয়ে থাকে।

মূলত, বিশ্বাস বা আস্থা অর্জনের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, প্রেম, বন্ধুত্ব, চাকরির প্রলোভনসহ বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করে। জিম্মি-নির্যাতনের মাধ্যমে চক্রগুলো অর্থও হাতিয়ে নেয়। এ জন্য সচেতন থাকতে হবে। লোভ-লালসা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে লোভনীয় কথা বলে ফাঁদ পাতা হয়, ফলে এসব ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোনো কিছু মনে হলে অবশ্যই সেগুলো নিয়ে পরিবার ও নিকটজন বা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।