বিআইডব্লিউটিএতে অনিয়ম-দুর্নীতির মচ্ছব!
ক্স অনুমতি ছাড়া একাধিক কর্মচারির বিদেশ গমন।
ক্স পিয়ন-মার্কম্যানদের শুল্ক প্রহরীর দায়িত্ব প্রদান।
ক্স নৌকাবাইচ কেলেঙ্কারির হোতাদের রক্ষার চেষ্টা।
ক্স সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এক কর্মচারি।
রোস্তম মল্লিক
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অভ্যন্তরে ঘটে চলেছে নানা অনিয়ম ও বিধিবহির্ভুত কাজ। খোদ বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অনেকেই এমন অভিযোগ করেছেন। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন চিঠি, মামলার এজাহার ও দপ্তর আদেশেও অনেক অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের জোরে এক কর্মচারি এমপি হওয়ারও স্বপ্ন দেখছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্র মতে, এসব অনিয়মের কয়েকটি হলো- যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এক কর্মচারির বিদেশ যাতায়াত, ছুটি মঞ্জুর না করিয়ে এক কর্মচারির বিদেশ গমন ও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সেখানে নিজের অবস্থান জানান দেয়া, প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করে একজন পিয়ন (অফিস সহায়ক) ও দুই জন মার্কম্যানকে শুল্ক প্রহরীর দায়িত্ব প্রদান এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালন উপলক্ষে আয়োজিত নৌকাবাইচে অর্থ কেলেঙ্কারিসহ মারাত্মক অব্যবস্থাপনা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের মার্কম্যান এবং সিবিএ নারায়ণগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. ইসলামুল হক পবিত্র ওমরাহ্ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ২৩ দিন ছুটি চেয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। তবে আবেদন মঞ্জুর হওয়ার আগেই তিনি সৌদি আরব চলে যান এবং ১০ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত অনুপস্থিত থেকে ৩১ অক্টোবর কর্মস্থলে যোগদান করেন। বিষয়টি দেরিতে জানাজানি হওয়ার পর অর্থ বিভাগের উপ-পরিচালক (রাজস্ব) কবিরুল ইসলামের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে বিআইডব্লিউটিএ। সংস্থার পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) কাজী ওয়াকিল নওয়াজ স্বাক্ষরিত গত ১২ সেপ্টেম্বরের এক দপ্তর আদেশে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।
এতে বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরব গমন এবং সেখান থেকে ফিরে কর্মে যোগদান করায় বিআইডব্লিউটিএ কর্মচারি চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ এর ৩৯ (২) (গ) মোতাবেক ইসলামুল হকের বিরুদ্ধে গুরুদ- আরোপের উদ্দেশে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের স্বপক্ষে বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তার নিকট উপস্থাপনের জন্য প্রবিধান ৪০ (৪) মোতাবেক সংস্থার অর্থ বিভাগের সহকারি অর্থ কর্মকর্তা এ কে এম মেহেদী হাসানকে দায়িত্ব দেয় কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের নিকট প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে বলে দপ্তর আদেশে উল্লেখ করা হয়।
সংস্থার আরেক কর্মচারি, ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পিয়ন আনোয়ারুল মতিন (জনি) দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত। জানা গেছে, নিজেকে বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ নেতা পরিচয়দানকারী আনোয়ারুল মতিন জনি গত ২ আগস্ট থেকে তিনি কর্মস্থলে আসেন না এবং ওইদিন থেকে হাজিরা খাতায়ও তার স্বাক্ষর নেই। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন; যা নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট দিয়ে জানান দিয়েছেন তিনি। এ সংক্রান্ত কয়েকটি পোস্টের স্ক্রিনশট আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। তবে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, তিনি বিদেশ যাওয়ার অনমুতি নেননি। এমনকি কর্মস্থল থেকে ছুটি নেননি। তবে পূর্বানুমতি ছাড়া আনোয়ারুল মতিন জনি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরব ঘুরে আসা ইসলামুল হক ছাড়াও তার বড়ভাই ওমর ফারুক ও ছোটভাই মো. ইব্রাহিম বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে ওমর ফারুক ও ইসলামুল চাকরি করেন মার্কম্যান পদে। আর অফিস সহায়ক বা পিয়ন পদে চাকরি করেন মো. ইব্রাহিম। তবে তারা কেউই নিয়োগপ্রাপ্ত পদে কাজ করেন না। তিনজনই নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে টোলগার্ড বা শুল্ক প্রহরীর (টিজি) দায়িত্বে নিয়োজিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিআইডব্লিউটিএ কর্মচারি চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী, শুল্ক প্রহরীর দায়িত্ব পালনের এখতিয়ার মার্কম্যান ও পিয়নের নেই। তা সত্ত্বেও তিন ভাইকেই একই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড় মার্কম্যান পদটি জাতীয় বেতন স্কেলের ১৯ গ্রেডের। অন্যদিকে, শুল্ক প্রহরী হলো জাতীয় বেতন স্কেলের ২০ গ্রেডের পদ। ওমর ফারুক ও ইসলামুল হক নিয়োগপ্রাপ্ত পদের একধাপ নিচে নেমে শুল্ক প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছেন এবং কর্তৃপক্ষই এ সুযোগ করে দিয়েছে তাদের।
এদিকে, মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে জোর গুঞ্জন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে নৌকাবাইচসহ সমগ্র অনুষ্ঠান আয়োজনের মারাত্মক অব্যবস্থাপনা ও অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা ব্যাপক সমালোচিত হলেও তদন্তের নামে অভিযুক্তদের রক্ষার অপচেষ্টা চলছে। ওই ঘটনা তদন্তে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের নির্দেশে সংস্থার ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে কমিটির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন যাবত এ কে এম আরিফ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। ফলে ঘনিষ্ঠজনকে রক্ষার স্বার্থে তার পক্ষে সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেয়া সম্ভব নয়।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কর্তৃপক্ষ আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করে দিলেও বন্দর ও পরিবহন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন মূল দায়িত্বে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. শাজাহান এবং জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) মোবারক হোসেন মজুমদার। অর্থসংশ্লিষ্ট কাজগুলো তারাই করেছেন। ফলে এ তিনজনের দিকেই অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারির অভিযোগের তীর।
অন্যদিকে, এক অসাধু কর্মচারি নিকট ভবিষ্যতে একটি বড় দলের মনোনয়ন প্রাপ্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। নিজের আকাঙ্খার কথা ঘনিষ্ঠজনদের কাছে ইতোমধ্যে প্রকাশও করেছেন তিনি। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সামান্য একজন কর্মচারি হয়েও তিনি গত একযুগে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থোপার্জন করেছেন। সূত্র মতে, তার আয়ের প্রধান উৎসগুলো হচ্ছে- বেনামে করা একাধিক লাইসেন্সের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন ধরনের কাজ বাগিয়ে নেওয়া, বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংস্থার তালিকাভুক্ত ঠিকাদারদের সমঝোতা করিয়ে দিয়ে কমিশন আদায়, বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, বেনামে বিভিন্ন নদীবন্দরের ঘাট ইজারা নেওয়া ও ইজারাদারদের ঘাট পাইয়ে দেয়া এবং নদীবন্দরগুলো থেকে আদায়কৃত রাজস্বের আত্মসাত করা অর্ধ থেকে অবৈধ অংশীদারীত্ব আদায়।
এই কর্মচারির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি ছাড়াও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বেশকিছু তথ্য আমাদের কাছে এসেছে এবং সেগুলো অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তিনি ছাড়া তার সহযোগী আরেক কর্মচারির বিরুদ্ধেও নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছি আমরা। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, বিআইডব্লিউটিএর অন্য কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার পাশাপাশি এ দুই কর্মচারির বিরুদ্ধে শিগগির আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা তদন্ত করে বিভাগীয় শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
















