০৭:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
৬৩৯ ট্রান্সফরমার গায়েব!
পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের ৬৩৯টি ট্রান্সফরমারের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকল্প পরিচালকের অফিস বলছে, ট্রান্সফরমার প্রকল্প এলাকায় লাগানো হয়েছে কিন্তু কোন লাইনে বা এলাকায় লাগানো হয়েছে তার কোনো তথ্য তারা দিতে পারেনি। এমনকি ট্রান্সফরমার সরবরাহ করার কোনো ওয়ার্ক অর্ডারও দেখাতে পারেনি তারা। গায়েব হওয়া এসব ট্রান্সফরমারের দ্রুত হদিস জানাতে বলেছে আইএমইডি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সমাপ্ত প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। সম্প্রতি ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের আওতায় ৭০ হাজার ওভারলোড বিতরণ ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপন’ শীর্ষক সমাপ্ত প্রকল্প মূল্যায়ন করে আইএমইডি।
প্রকল্পের ডিপিপি সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৭টি বিভাগের ৬১টি জেলার সব উপজেলায় সিস্টেম লস কমিয়ে আনা এবং বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ৭০ হাজার ওভারলোডেড বিতরণ ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপনে ৭৯৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নেয় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)। প্রকল্পটির ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নকাল ধরা হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে ৭৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা করা হয়।
প্রকল্প অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, প্রকল্পের ৭০ হাজার ট্রান্সফরমারের মধ্যে ৬৯ হাজার ৭০০ ট্রান্সফরমার স্থাপনা করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এতে ব্যয় হয়েছে ৭৪১ কোটি ২ লাখ টাকা। গড়ে প্রতিটি ট্রান্সফরমার কিনতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩১৫ টাকা।
প্রকল্পের অডিট সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই মেয়াদে অডিট করা হলে কোনো আপত্তি পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের পূর্ত অডিট অধিদফতর প্রকল্পের সব ধরনের কার্যাবলির ওপর অডিট করলে ৪টি আপত্তি উঠে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প পরিচালকের অফিস থেকে জবাব দেওয়া হয়। এগুলো এখনও প্রক্রিয়াধীন, আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি।
আইএমইডি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশে বলছে, প্রকল্প থেকে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ৬৩৯টি ট্রান্সফরমার সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এই প্রকল্পের আওতায় সরবরাহকৃত ট্রান্সফরমারগুলো কোন লাইনে অথবা কোন এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ট্রান্সফারমার স্থাপনের জন্য আলাদাভাবে কোনো ওয়ার্ক অর্ডার পাওয়া যায়নি। গড়ে প্রতিটি ট্রান্সফরমার কিনতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩১৫ টাকা। সে হিসাবে ৬৩৯টি ট্রান্সফরমারের মূল্য আসে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯২ টাকা।
আইএমইডি আরও বলছে, একই এলাকায় একই ধরনের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান থাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো এক প্রকল্পের মালামাল অন্য প্রকল্পে ব্যবহার করে থাকে। এর ফলে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের আউটপুট নির্ণয় করা এবং মালামালের সঠিকভাবে হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে অন্য চলমান প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে প্রকল্পের মালামাল সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার রেকর্ড এবং ওয়ার্ক অর্ডারের কপি সংরক্ষণ করতে হবে।
প্রকল্পের ব্যয় সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেলেও বাস্তবায়নকাল ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প গ্রহণের সময় এমনভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যেন বাস্তবায়নকাল বৃদ্ধি না পায়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রকল্পের পরিচালক ও বিআরইবির কার্যক্রম ও পরিকল্পনা পরিদফতরের পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এগুলো বোগাস, এমন কোনো কিছুই ঘটেনি। আইএমইডি এ ধরনের কোনো প্রতিবেদনই দেয়নি। আমাদের সঙ্গে কথা না বলে আইএমইডি এই ধরনের অভিযোগ কোথা থেকে পাবে? সাংবাদিকরা এমনিতেই এগুলো বলেন। এই প্রতিবেদক তাকে আইএমইডির প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করলেও তিনি তা মানতে নারাজ। প্রতিবেদক জানান, আইএমইডির ওয়েবসাইটেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। আপনি কি এই প্রতিবেদনকে নাকচ করেছেন? জবাবে পিডি বলেন, হ্যাঁ।
আইএমইডির সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমরা সমাপ্ত প্রকল্প মূল্যায়নের আগে প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে নিয়ে মিটিং করি। কোনো আপত্তি থাকলে সেটা তাদের জানাই। আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে অনেক প্রকল্প প্রকাশ করায় স্পেসিফিকলি বলতে পারব না এই প্রকল্পে কী কী ত্রুটি উল্লেখ করা হয়েছে। দেখে বলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় প্রকল্প পরিদর্শনে যেসব ত্রুটি পাওয়া যায় পরবর্তী সময়ে সেগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। এই প্রকল্পে এমনটা হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এখন পর্যন্ত তাদের জবাব পাইনি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ত্রুটি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশংসাও করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সিস্টেম লস ০.৪৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা এই প্রকল্পের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ভবিষ্যতে অনুমোদিত ডিপিপির মেয়াদের বাস্তবায়নের শর্তে সমধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
ট্যাগস :
















