১২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পেনশন স্কীম বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বিসিকের দুই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারির চোখে জল!

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালে তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রম, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী থাকাকালীন একটি বিলের মাধ্যমে ‘ইপসিক’ তথা বর্তমান ‘বিসিক’ প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি খাতের মুখ্য প্রতিষ্ঠান। বিসিক সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে উন্নয়নমুখী ও জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকে। ফলে বেসরকারি উদ্যোগে সারা দেশে নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠেছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে শিল্প সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিল্প ক্ষেত্রে যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তা বাস্তব রূপ লাভ করে। মূল উদ্দেশ্য: উৎপাদন বৃদ্ধি (ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতার সদ্ধব্যবহার ও নতুন উৎপাদন ক্ষমতা সৃষ্টি) কর্মসংস্থান সৃষ্টি দারিদ্র্য বিমোচন ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন অর্থ ও মানব সম্পদের সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম: মাঝারি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগপূর্ব ও বিনিয়োগোত্তর সেবা প্রদান তথা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন ; বিসিকের নিজস্ব ঋণ কর্মসূচি ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ঋণ ব্যবস্থাকরণ ও বিতরণে সহায়তাকরণ ; পরিবেশবান্ধব ও স্থায়ী অবকাঠামো বিশিষ্ট (রাস্তা, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি সুবিধা সম্বলিত) শিল্পনগরী ও শিল্পপার্ক স্থাপন এবং বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনের জন্য প্লট বরাদ্দ দান ; দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান ; শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্য বিপণনের লক্ষ্যে মেলা, সেমিনার, কর্মশালা ও ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মিলন আয়োজন ; উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপন উপযোগী প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও মূল্যায়ন, প্রজেক্ট প্রোফাইল প্রণয়ন, উন্নতমানের নকশা উদ্ভাবন ও বিতরণ ; ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইউনিট স্থাপন, পণ্য উৎপাদন, মানোন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা সমীক্ষা এবং জরিপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা। বৃহৎ শিল্পের খুচরা যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী সাব-কন্ট্রাক্টিং ইউনিট তালিকাভুক্তিকরণ এবং বৃহৎ শিল্পের সাথে তালিকাভুক্ত ইউনিটের সাব-কন্ট্রাক্টিং সংযোগ স্থাপন ; ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের উপযোগী যথাযথ প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণ বিশেষত বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন সংক্রান্ত ধারণা প্রদান করা ; উন্নত পদ্ধতি ও প্রযুক্তি নির্ভর লবণ উৎপাদনে লবণ চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান ; শিল্পপ্লটের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে খালি/অব্যবহৃত প্লট বরাদ্দের নিমিত্ত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ, প্লট বরাদ্দ কমিটির সভা আয়োজন, রুগ্ন/বন্ধ প্লটের বরাদ্দ বাতিলকরণ ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার অনুকূলে প্লট বরাদ্দকরণ। নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম: ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি শিল্পের নিবন্ধন; কর অবকাশ, কর, শুল্ক ইত্যাদি মওকুফ বিষয়ে সুপারিশ প্রদান; শিল্পের কাঁচামাল ও মোড়ক সামগ্রী আমদানীর ক্ষেত্রে প্রাধিকার নির্ধারণে সুপারিশ প্রদান; আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন শিল্পের রেজিস্ট্রেশন ও সাব-কন্ট্রাকটিং সংযোগ স্থাপন।
আর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বিসিক প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারি রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত রাজস্বখাতভুক্ত আছেন ১৭০৫ জন। বিসিক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা এই সংস্থায় কাজ করছেন। অনেকেই অবসর নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ পিআর এলএ রয়েছেন। এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন স্কীম বাস্তবায়নের জন্য প্রায় একযুগ ধরে সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে আসলেও সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পেনশন স্কীম চালুর বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে শর্তাদি রয়েছে সেটারও কোন ঘটতি নেই এ সংস্থাটিতে। অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধিনে থাকা বিটাক ও বিসিআইসির কর্মকর্তা কর্মচারিরা পেনশন সুবিধা পেলেও বিসিকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা সেটা থেকে কেন বঞ্চিত রয়েছেন তার কোন সদুত্তোর দিতে পারছেন না কেউই।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে ফাইল চালাচালি হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছেন সংস্থাটির আড়াই হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারি। এই চিঠিটি পাঠ করে তাদের চোখে জল ঝরছে। তাদের ভবিষ্যত ঝাপসা হয়ে আসছে। অবসরকালীন জীবন কিভাবে কাটবে সে শংকায় উদ্বিগ্ন তারা।

বিসিকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, গত প্রায় এক যুগ ধরে তারা সরকারের কাছে তাদের চাকুরী জীবনের অবসরকালীন পেনশন স্কীম চালুর বিষয়ে দাবী জানিয়ে আসছেন। কিন্ত বিসিক সরকারের একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরকার সেই দাবী বরাবরই উপেক্ষা করে আসছিল। বর্তমান সরকার আমলে তারা শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথে বৈঠক করে পেনশন স্কীম বাস্তবায়নের দাবী জানান। তাদের সেই দাবীর বিষয়টি বিবেচনায় এনে শিল্প সচিব বিসিক চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা পেয়ে বিসিক চেয়ারম্যান একটি বিভাগীয় কমিটি গঠন করেন এবং নিয়ম মোতাবেক বিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন স্কীম চালু করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করেন। শিল্প মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়।
বিসিক চেয়ারম্যান,শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা একবুক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের ধারণা ছিল এবার তাদের পেনশন স্কীম পাশ হবেই। তারা অবসরকালীন জীবনে আপন নির্ভরতা পাবেন। এ জন্য তাদের মধ্যে কর্মস্পৃহাও বেড়ে গিয়েছিল। মন্ত্রী, সচিব ও বিসিক চেয়ারম্যানের জন্য তারা দোয়াও করছিলেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব জ্ঞানহীন একটি চিঠি তাদের সব আসা ও ভবিষ্যত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
একটি অসত্য ও খোড়া যুক্তি দেখিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন স্কীম প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৩০ জুলাই ২০২৩ ইং তারিখে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে প্রেরিত চিঠিতে জানায় যে, বাংলাদেশ স্মল এন্ড কটেজ ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন এ্যাক্ট ১৯৫৭ অনুযায়ী বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প কর্পোরেশন একটি সংবিধিবদ্ধ (স্বায়ত্বশাসিত) প্রতিষ্ঠান। নিজেস্ব আয়ের মাধ্যমে পেনশন তহবীলে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকাসহ মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের ০৯/০৮/১৯৯৯ তারিখের মপবি/শা:ক্র:/অর্থ-৭/৯৯-১৬৩ নং স্মারকের সকল নির্দেশনাসমুহ যথাযথভাবে প্রতিপালিত না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে পেনশন স্কীম প্রবর্তনে নির্দেশক্রমে অর্থ বিভাগের অসন্মতি জ্ঞাপন করা হলো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব আ ফ ম ফজলে রাব্বী স্বাক্ষরিত এই পত্রের স্মারক নং ০৭.০০.০০০০.১২৮.৩৬.০০২.২১.১৬,তাং ৩০ জুলাই ২০২৩ইং।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই পত্রের সুত্র ধরে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প কর্পোরেশনের অর্থ বিভাগে খোজ খবর নিয়ে জানাগেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিসিক চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত একপত্রে দেখা যায়, বিসিকের নিজস্ব আয়ের তহবীলে পেনশন স্কীম খাতে গত ৩১/০৭/২০২২ তারিখ পর্যন্ত সিএ ফার্মের প্রত্যায়িত প্রতিবেদন মতে দুটি ব্যাংকে মোট ৪৭৪.৯১.১৬.৯২৮.৪৯/-(চারশত চুয়াত্তর কোটি, একানব্বই লক্ষ, ষোল হাজার, নয় শত, আঠাশ টাকা, উনপঞ্চাশ পয়সা স্থিতি রয়েছে। যা প্রতি বছর ব্যাংকিং অনুপাতে লভ্যাংশ পেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই টাকা থেকে ২০২১-২২ হতে ২০২৫/২৬ অর্থ বছরে ৪৯৫ জন কর্মকর্তা কর্মচারিদের পেনশনের দাবী পরিশোধে মাত্র ২০৮ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আরো উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৫ সালের পর বিসিকের অবসরগামি কর্মকর্তা কর্মচারির সংখ্যা থাকবে ১০০ জনেরও কম। ফলে পেনশনে অর্থ সংস্থানের কোন অভাব পড়বে না। বিসিকের চেয়ারম্যান ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের এই মন্তব্যের পরও অর্থ মন্ত্রণালয় কি ভাবে বলে যে, বিসিকের নিজেস্ব আয়ের মাধ্যমে পেনশন তহবীলে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকায়…..। প্রতিষ্ঠানটিতে পেনশন স্কীম প্রবর্তনে নির্দেশক্রমে অর্থ বিভাগের অসন্মতি জ্ঞাপন করা হলো।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যই কারো বোধগম্য হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই চিঠি পেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা বিস্মিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মাহবুবর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্মকর্তা কর্মচারিদের দাবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের সাথে বারবার মিটিং করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যাবতীয় তথ্যাদি (ছকে) পুরণঅন্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালায় সেটি নাকচ করে দিয়েছে।

এ দিকে বিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা বিষয়টিতে নজর দানের জন্য জননেত্রী প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা বলেন,আমরা এখন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের অভিভাবক,জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পানে তাকিয়ে আছি। তিনি যদি আমাদের এই আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তবেই আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার পেতে পারবো। অন্যথায় অবসরকালীন সময়ে বৃদ্ধ বয়সে আমাদের চরম দুরবস্থায় পড়তে হবে। আমরা আমাদের এই অনিশ্চিত ভবিষ্যত থেকে মুক্তি চাই।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:৩২:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩
৪১৩ বার পড়া হয়েছে

পেনশন স্কীম বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বিসিকের দুই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারির চোখে জল!

আপডেট সময় ০১:৩২:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

রোস্তম মল্লিক
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালে তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রম, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী থাকাকালীন একটি বিলের মাধ্যমে ‘ইপসিক’ তথা বর্তমান ‘বিসিক’ প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি খাতের মুখ্য প্রতিষ্ঠান। বিসিক সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে উন্নয়নমুখী ও জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকে। ফলে বেসরকারি উদ্যোগে সারা দেশে নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠেছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে শিল্প সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিল্প ক্ষেত্রে যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তা বাস্তব রূপ লাভ করে। মূল উদ্দেশ্য: উৎপাদন বৃদ্ধি (ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতার সদ্ধব্যবহার ও নতুন উৎপাদন ক্ষমতা সৃষ্টি) কর্মসংস্থান সৃষ্টি দারিদ্র্য বিমোচন ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন অর্থ ও মানব সম্পদের সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম: মাঝারি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগপূর্ব ও বিনিয়োগোত্তর সেবা প্রদান তথা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন ; বিসিকের নিজস্ব ঋণ কর্মসূচি ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ঋণ ব্যবস্থাকরণ ও বিতরণে সহায়তাকরণ ; পরিবেশবান্ধব ও স্থায়ী অবকাঠামো বিশিষ্ট (রাস্তা, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি সুবিধা সম্বলিত) শিল্পনগরী ও শিল্পপার্ক স্থাপন এবং বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনের জন্য প্লট বরাদ্দ দান ; দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান ; শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্য বিপণনের লক্ষ্যে মেলা, সেমিনার, কর্মশালা ও ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মিলন আয়োজন ; উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপন উপযোগী প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও মূল্যায়ন, প্রজেক্ট প্রোফাইল প্রণয়ন, উন্নতমানের নকশা উদ্ভাবন ও বিতরণ ; ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইউনিট স্থাপন, পণ্য উৎপাদন, মানোন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা সমীক্ষা এবং জরিপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা। বৃহৎ শিল্পের খুচরা যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী সাব-কন্ট্রাক্টিং ইউনিট তালিকাভুক্তিকরণ এবং বৃহৎ শিল্পের সাথে তালিকাভুক্ত ইউনিটের সাব-কন্ট্রাক্টিং সংযোগ স্থাপন ; ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের উপযোগী যথাযথ প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণ বিশেষত বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন সংক্রান্ত ধারণা প্রদান করা ; উন্নত পদ্ধতি ও প্রযুক্তি নির্ভর লবণ উৎপাদনে লবণ চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান ; শিল্পপ্লটের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে খালি/অব্যবহৃত প্লট বরাদ্দের নিমিত্ত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ, প্লট বরাদ্দ কমিটির সভা আয়োজন, রুগ্ন/বন্ধ প্লটের বরাদ্দ বাতিলকরণ ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার অনুকূলে প্লট বরাদ্দকরণ। নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম: ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি শিল্পের নিবন্ধন; কর অবকাশ, কর, শুল্ক ইত্যাদি মওকুফ বিষয়ে সুপারিশ প্রদান; শিল্পের কাঁচামাল ও মোড়ক সামগ্রী আমদানীর ক্ষেত্রে প্রাধিকার নির্ধারণে সুপারিশ প্রদান; আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন শিল্পের রেজিস্ট্রেশন ও সাব-কন্ট্রাকটিং সংযোগ স্থাপন।
আর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বিসিক প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারি রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত রাজস্বখাতভুক্ত আছেন ১৭০৫ জন। বিসিক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা এই সংস্থায় কাজ করছেন। অনেকেই অবসর নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ পিআর এলএ রয়েছেন। এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন স্কীম বাস্তবায়নের জন্য প্রায় একযুগ ধরে সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে আসলেও সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পেনশন স্কীম চালুর বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে শর্তাদি রয়েছে সেটারও কোন ঘটতি নেই এ সংস্থাটিতে। অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধিনে থাকা বিটাক ও বিসিআইসির কর্মকর্তা কর্মচারিরা পেনশন সুবিধা পেলেও বিসিকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা সেটা থেকে কেন বঞ্চিত রয়েছেন তার কোন সদুত্তোর দিতে পারছেন না কেউই।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে ফাইল চালাচালি হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছেন সংস্থাটির আড়াই হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারি। এই চিঠিটি পাঠ করে তাদের চোখে জল ঝরছে। তাদের ভবিষ্যত ঝাপসা হয়ে আসছে। অবসরকালীন জীবন কিভাবে কাটবে সে শংকায় উদ্বিগ্ন তারা।

বিসিকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, গত প্রায় এক যুগ ধরে তারা সরকারের কাছে তাদের চাকুরী জীবনের অবসরকালীন পেনশন স্কীম চালুর বিষয়ে দাবী জানিয়ে আসছেন। কিন্ত বিসিক সরকারের একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরকার সেই দাবী বরাবরই উপেক্ষা করে আসছিল। বর্তমান সরকার আমলে তারা শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথে বৈঠক করে পেনশন স্কীম বাস্তবায়নের দাবী জানান। তাদের সেই দাবীর বিষয়টি বিবেচনায় এনে শিল্প সচিব বিসিক চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা পেয়ে বিসিক চেয়ারম্যান একটি বিভাগীয় কমিটি গঠন করেন এবং নিয়ম মোতাবেক বিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন স্কীম চালু করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করেন। শিল্প মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়।
বিসিক চেয়ারম্যান,শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা একবুক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের ধারণা ছিল এবার তাদের পেনশন স্কীম পাশ হবেই। তারা অবসরকালীন জীবনে আপন নির্ভরতা পাবেন। এ জন্য তাদের মধ্যে কর্মস্পৃহাও বেড়ে গিয়েছিল। মন্ত্রী, সচিব ও বিসিক চেয়ারম্যানের জন্য তারা দোয়াও করছিলেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব জ্ঞানহীন একটি চিঠি তাদের সব আসা ও ভবিষ্যত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
একটি অসত্য ও খোড়া যুক্তি দেখিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের অবসরকালীন পেনশন স্কীম প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৩০ জুলাই ২০২৩ ইং তারিখে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে প্রেরিত চিঠিতে জানায় যে, বাংলাদেশ স্মল এন্ড কটেজ ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন এ্যাক্ট ১৯৫৭ অনুযায়ী বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প কর্পোরেশন একটি সংবিধিবদ্ধ (স্বায়ত্বশাসিত) প্রতিষ্ঠান। নিজেস্ব আয়ের মাধ্যমে পেনশন তহবীলে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকাসহ মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের ০৯/০৮/১৯৯৯ তারিখের মপবি/শা:ক্র:/অর্থ-৭/৯৯-১৬৩ নং স্মারকের সকল নির্দেশনাসমুহ যথাযথভাবে প্রতিপালিত না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে পেনশন স্কীম প্রবর্তনে নির্দেশক্রমে অর্থ বিভাগের অসন্মতি জ্ঞাপন করা হলো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব আ ফ ম ফজলে রাব্বী স্বাক্ষরিত এই পত্রের স্মারক নং ০৭.০০.০০০০.১২৮.৩৬.০০২.২১.১৬,তাং ৩০ জুলাই ২০২৩ইং।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই পত্রের সুত্র ধরে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প কর্পোরেশনের অর্থ বিভাগে খোজ খবর নিয়ে জানাগেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিসিক চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত একপত্রে দেখা যায়, বিসিকের নিজস্ব আয়ের তহবীলে পেনশন স্কীম খাতে গত ৩১/০৭/২০২২ তারিখ পর্যন্ত সিএ ফার্মের প্রত্যায়িত প্রতিবেদন মতে দুটি ব্যাংকে মোট ৪৭৪.৯১.১৬.৯২৮.৪৯/-(চারশত চুয়াত্তর কোটি, একানব্বই লক্ষ, ষোল হাজার, নয় শত, আঠাশ টাকা, উনপঞ্চাশ পয়সা স্থিতি রয়েছে। যা প্রতি বছর ব্যাংকিং অনুপাতে লভ্যাংশ পেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই টাকা থেকে ২০২১-২২ হতে ২০২৫/২৬ অর্থ বছরে ৪৯৫ জন কর্মকর্তা কর্মচারিদের পেনশনের দাবী পরিশোধে মাত্র ২০৮ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আরো উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৫ সালের পর বিসিকের অবসরগামি কর্মকর্তা কর্মচারির সংখ্যা থাকবে ১০০ জনেরও কম। ফলে পেনশনে অর্থ সংস্থানের কোন অভাব পড়বে না। বিসিকের চেয়ারম্যান ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের এই মন্তব্যের পরও অর্থ মন্ত্রণালয় কি ভাবে বলে যে, বিসিকের নিজেস্ব আয়ের মাধ্যমে পেনশন তহবীলে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান না থাকায়…..। প্রতিষ্ঠানটিতে পেনশন স্কীম প্রবর্তনে নির্দেশক্রমে অর্থ বিভাগের অসন্মতি জ্ঞাপন করা হলো।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যই কারো বোধগম্য হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই চিঠি পেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা বিস্মিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মাহবুবর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্মকর্তা কর্মচারিদের দাবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের সাথে বারবার মিটিং করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যাবতীয় তথ্যাদি (ছকে) পুরণঅন্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালায় সেটি নাকচ করে দিয়েছে।

এ দিকে বিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা বিষয়টিতে নজর দানের জন্য জননেত্রী প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা বলেন,আমরা এখন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের অভিভাবক,জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পানে তাকিয়ে আছি। তিনি যদি আমাদের এই আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তবেই আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার পেতে পারবো। অন্যথায় অবসরকালীন সময়ে বৃদ্ধ বয়সে আমাদের চরম দুরবস্থায় পড়তে হবে। আমরা আমাদের এই অনিশ্চিত ভবিষ্যত থেকে মুক্তি চাই।