ঘুস খেয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জন: নৌ পরিবহন অধিদফতর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের বিরুদ্ধে ফের অনুসন্ধানের নির্দেশ
বিশেষ প্রতিবেদক
–
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত নৌ পরিবহন অধিদফতরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ারের (সিএনএস) চলতি দায়িত্বে কর্মরত গিয়াসউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ফের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানের জন্য সম্প্রতি নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে দুদক। সম্পদবিবরণীর সাথে বৈধ আয়ের সপক্ষে দাখিল করা কাগজপত্রে ভুয়া, অবাস্তব ও অনেক মিথ্যা তথ্য থাকায় দুদক এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। তিনি অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পাচ্ছেন এমন খবর প্রচারিত হলেও শেষ পর্যন্ত দায়মুক্তি পাচ্ছেন না তিনি।
দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বিষয়ে আগে অনুসন্ধান কর্মকর্তা ছিলেন দুদকের উপ পরিচালক শাহীন আরা মমতাজ। তিনি অবসরে যাওয়ায় উপ পরিচালক মশিউর রহমানকে নতুন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গিয়াসউদ্দিন ২০১২ সালে নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার পদে নৌ অধিদফতরে যোগ দেন। ২০২১ সালে দুদকে দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে সব মিলিয়ে তিনি ১২ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৯৫ টাকা আয় দেখান। এর মধ্যে স্ত্রী সাজেদা আহমেদের নামে কিনেছেন ৯ কোটি ৬২ লাখ ৩০ হাজার টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। স্বামী-স্ত্রীর এই সম্পদের হিসাব দেখানো হয়েছে বিভিন্ন জাহাজে চাকরি করে উপার্জিত অর্থ এবং ২০১২ সালে নৌ অধিদফতরে যোগদান ও কর্মকালীন মিলিয়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গিয়াসউদ্দিন অধিদফতরে যোগদানের পর ঢাকায় ইস্টার্ন হাউজিং কোম্পানির (১০৫/সি, রোড-২৭, ধানমন্ডি) ইস্টার্ন ডালিয়া অ্যাপার্টমেন্টের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এটির বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হলেও সম্পদ বিবরণীতে প্রকৃত মূল্য কম দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ইস্টার্ন হাউজিংকে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে গিয়াসউদ্দিন এক বছরে যে লেনদেন করেছেন তা অস্বাভাবিক। ফ্ল্যাটের বিপরীতে পরিশোধিত অর্থের স্পষ্ট কোনো উৎস তিনি সম্পদবিবরণীতে উল্লেখ করেননি।
দুদকে দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে গিয়াসউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার লোহাইঢ় গ্রামের পৈতৃক ভিটায় একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণের তথ্য রয়েছে, যার নির্মাণ ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ ৯ হাজার ২৯০ টাকা। দুদক এই ব্যয়ের সত্যতা যাচাই করে সঠিক তথ্য দেয়ার জন্য গণপূর্ত অধিদফতরকে (পিডব্লিউডি) অনুরোধ জানায়। পিডব্লিøউডির দু’জন প্রকৌশলী সরেজমিন পরিদর্শন ও মাপজোখ করে দুদককে জানায়, বাড়িটির নির্মাণ ব্যয় ৫৯ লাখ ৪৩ হাজার ১১২ টাকা। এতে দেখা যায়, ২৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকার তথ্য গোপন করেছেন তিনি।
গিয়াসউদ্দিনের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়া হয়েছে। অবৈধ সম্পদ বৈধ দেখানোর জন্য মিথ্যা তথ্যসহ অনেক জাল কাগজপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। নৌ অধিদফতরে যোগদানের আগে যেসব বিদেশী জাহাজে চাকরি করেছেন, সেসব শিপিং লাইন্সের (নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান) প্রত্যয়নপত্র, কর্মকাল ও প্রাপ্ত বেতনভাতাদির ফিরিস্তি জমা দিয়েছেন সাবেক অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে। তবে সেসব তথ্যের অনেকগুলোই অবাস্তব এবং এ ক্ষেত্রে মিথ্যা ও জাল জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করেননি, এমন জাহাজ ও শিপিং লাইন্সের কাগজপত্রও রয়েছে তার সম্পদ বিবরণীতে। এ ছাড়া বিদেশী জাহাজ কোম্পানিগুলো থেকে তার কোন ব্যাংক হিসাবে কখন কত টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে- তারও রেকর্ড নেই সম্পদবিবরণীতে।
জানা যায়, গিয়াসউদ্দিনের এমটি পেট্টো কনকর্ড জাহাজে জুনিয়র অফিসার পদে চাকরি ও সেখান থেকে আয় ৬৪ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার। সমুদ্ররাজ জাহাজে চাকরি দেখিয়েছেন ডেক অফিসার হিসেবে। আয় দেখিয়েছেন ১৯ হাজার ৯৫০ মার্কিন ডলার। এভাবে এমটি পেট্টো স্ক্যাম জাহাজেও চাকরি দেখিয়েছেন। তবে প্রকৃতপক্ষে উল্লিখিত জাহাজগুলোতে কখনোই চাকরি করেননি তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম মেরিন ফিশারিজ একাডেমি থেকে পাস করার পর জাহাজে চাকরি নেন। তার ধারাবাহিক অব্যাহতিপত্র (সিডিসি) নম্বর সিও-৩৯৬৯। নৌ পরিবহন অধিদফতরে যোগ দেন ২০১২ সালে। দুদকে দাখিলকৃত সম্পদবিবরণীতে তিনি নিজ নামে চার কোটি ৮৮ লাখ ১১ হাজার ৬৮০ টাকার স্থাবর সম্পত্তি দেখিয়েছেন। অস্থাবর সম্পত্তি দেখিয়েছেন দুই কোটি ১৪ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫ টাকা। মোট সাত কোটি দুই লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৫ টাকার সম্পত্তি দেখান তিনি। ১৯৯২ সালের ১১ জুন থেকে ২০১২ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত ২০ অর্থবছরে আয়ের উৎস দেখিয়েছেন ২১টি সমুদ্রগামী জাহাজে বিভিন্ন পদে চাকরি। এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় মোট আয় দেখিয়েছেন ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৯৩ হাজার ২৪৬ টাকা।
এ ছাড়া গিয়াসউদ্দিন এমটি পেট্টো শামস জাহাজে চাকরি থেকে অতিরিক্ত ৩৮ হাজার ৪০০ মার্কিন ডলার আয়ের কাগজপত্র দাখিল করেছেন। এমটি ওশান হাক জাহাজে দ্বিতীয়বারের চাকরিতে প্রতি মাসে অতিরিক্ত তিন হাজার মার্কিন ডলার আয় দেখিয়েছেন। এমভি সমুদ্র সম্রাট জাহাজে চাকরি করেছেন জুনিয়র অফিসার পদে। সম্পদ বিবরণীতে এখান থেকে অতিরিক্ত আয় দেখিয়েছেন ২৭ হাজার ৩০০ ডলার। এমটি অ্যামাজি গ্যালাক্সি জাহাজ থেকে ১৬ হাজার ৪৭১ দশমিক ৫ ডলার আয় দেখিয়েছেন।
জানা গেছে, গিয়াসউদ্দিন এমটি পেট্টো রেঞ্জার জাহাজে জুনিয়র অফিসার হিসেবে ১১ মাসে আয় করেন ৩০০ ডলার। কিন্তু এখানে কাগজপত্রে দেখানো হয় আটগুণ বেশি আয়। এমটি ওশান স্কিল জাহাজে আট মাস চাকরিতে প্রাপ্ত অর্থের অতিরিক্ত ৬৮ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার আয় বেশি দেখিয়েছেন। সম্পদবিবরণীতে এমটি ওশান সানরাইজ জাহাজে চিফ অফিসার পদে চাকরি করেছেন উল্লেখ করে সেখান থেকে ৫৩ হাজার ৫৫০ মার্কিন ডলার আয় দেখিয়েছেন। এমটি অঞ্জনি জাহাজ থেকে আয় দেখান ১৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। ১০ হাজার মার্কিন ডলার আয় দেখান এমটি বাদরাইনি জাহাজ থেকে।
অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য নেয়ার জন্য নৌ পরিবহন অধিদফতরের সিএনএস (চলতি দায়িত্বে) গিয়াসউদ্দিন আহমেদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দায়মুক্তির বিষয় আমার জানা নেই। দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না ।












