০৫:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাগুরায় কসাই ডাক্তারের মৃত্যুর মিছিলে আরো এক গৃহবধূ: ডা: শফিউর রহমান বদলী হচ্ছে না কেন?

প্রতিনিধির নাম:

মাগুরা প্রতিনিধি
আবারও একজন গৃহবধূর প্রাণ বলি হয়েছে মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের সার্জন ডা: শফিউর রহমানের ভুল অপারেশনে। এই নিয়ে আজ অব্দি তার হাতে মোট কতজন বোগীর প্রাণ বলি হলো তার কোন হিসাব নেই কারো কাছে। তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে গত এক যুগে তিনি প্রায় শতাধিক রোগীকে ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর প্রতিটি ঘটনাকেই দুঘর্টনা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। প্রতিটি প্রানের মুল্য দিয়েছেন ২/১ লাখ টাকা।সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তার ভুল অপারেশনে অকাল মৃত্যু হয়েছে এক গৃহবধূর। এই গৃহবধূর নাম-শারমিন (২৫)। মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার নিকড়হাটা গ্রামে তার বাড়ী। মাগুরা শহরের ইসলামিয়া ক্লিনিকে এই ঘটনাটি ঘটে। এ নিয়ে এখন মাগুরা শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রশ্ন উঠেছে ভুল অপারেশন করে আর কত রোগীর জীবন কেড়ে নেবেন এই কসাই ডাক্তার? দীর্ঘ এক যুগ অতিবাহিত হলেও তাকে কেন বদলী করা হচ্ছে না মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল থেকে? জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত এই ডাক্তারের খেপ বাণিজ্য আর কতদিন চলবে?
অনুসন্ধানে জানাগেছে, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মাগুরার সদর হাসপাতালে সার্জন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ডাক্তার শফিউর রহমান। সরকারী বিধি বিধান ভংগ করে তাকে কি আজীবনের জন্য মাগুরা জেলায় পোষ্টিং দিয়ে রাখা হয়েছে? শোনা যায় তার ছত্রছায়ায় মাগুরাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানহীন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল। সরকারি চাকরি বিধি মোতাবেক হাসপাতলে ওটিতে অপারেশন না করলেও চুক্তিভিত্তিক হাসপাতালের রোগীগুলো ভাগিয়ে নিয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়মিত অপারেশন করছেন তিনি। প্রতিটি অপারেশনে ফি নিচ্ছেন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এভাবে প্রচুর পরিমাণে অর্থ উপার্জন করে ঢাকাতে চার-পাঁচটি, ফ্ল্যাট ও বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কিনেছেন লেটেষ্ট মডেলের প্রিমিও গাড়ি। সকাল থেকে গভীর রাত অব্দি ছুঁটে বেড়াচ্ছেন এ ক্লিনিক থেকে সে ক্লিনিকে। । ইতিপুর্বে যশোর ও সাতক্ষীরাতে বদলি হয়ে গেলেও মোটা অর্থের বিনিময়ে আবার ফিরে এসেছেন মাগুরাতে। ইতিপুর্বে যশোরে অপারেশন করে রোগীর পেটের ভিতর গজ ও যন্ত্রপাতি রেখে দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে যশোরে একটি মামলা হয়েছিল। তাছাড়া উনি মাগুরা সরকারি হাসপাতালে সুইপার, ঝাড়–দার দিয়ে অপারেশন করান যা দৈনিক যুগান্তর পত্রিকাসহ যমুনা টেলিভিশন,চ্যানেল একাত্তোরে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ডাক্তার শফিউর রহমান বিভিন্ন অপকর্ম বিভিন্ন টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলেও একটি অদৃশ্য মহলের সহযোগিতায় সে এক যুগেরও বেশী সময় একই ষ্টেশনে বা হাসপাতালে চাকরি করে যাচ্ছেন। একজন দরিদ্র অসহায় রোগীর হাতের ভিতর সুচ ফুটে গেলেও তাকে বিভিন্ন টালবাহানায় অপারেশন না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান। দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যান বিভিন্ন ক্লিনিকে। তিনি লেখাপড়া করাকালীন ছাত্র শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বর্তমানে জামাতের অর্থযোগানদাতা হিসাবে পরিচিত। তার বাড়ী সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া থানায়। এই এলাকায় বিএনপি জামায়াতের আধিপত্য রয়েছে। কিছুদিন আগে তাকে নিয়ে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় একটি সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে শিরোনাম ছিল: “মাগুরা ২৫০ শয্যার হাসপাতাল: অস্ত্রপাচারে সার্জনের সহযোগি ঝাড়–দার”। সেই রিপোর্টে বলা হয়- অপারেশন থিয়েটারে এক বৃদ্ধার শরীরে অস্ত্রোপচার করছিলেন সার্জন (শল্যচিকিৎসক)। তাকে সহযোগিতা করছেন এপ্রোন (সজ্জাবরণী) পরা দুই সহযোগী। পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নার্স। আপাতদৃষ্টিতে সব ঠিকঠাক মনে হলেও দুই সহযোগীর পরিচয় পেলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তারা যে ওই হাসপাতালের ঝাড়ুদার! এ চিত্র মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালের। রোববার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া আনোয়ারা বেগম নামের এক রোগীর হাতে ওই অস্ত্রোপচারে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। অস্ত্রোপচার করেন ডা. শফিউল। তার সহযোগী ছিলেন সুবাস চন্দ্র বিশ্বাস ও আবু বক্কার। হাসপাতালে তারা নিয়োগ পেয়েছেন এমএলএসএস কাম ওয়ার্ডবয় হিসেবে। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজও করেন তারা।
সূত্র জানায়, এ হাসপাতালে তিনজন সার্জন অস্ত্রোপচার করে থাকেন। সপ্তাহে দু’দিন করে (মোট ছয় দিন) অস্ত্রোপচার করেন তারা। দিনে চার-পাঁচটি বা তারও বেশি অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে এখানে। এ সময়ে তাদের সহযোগী হিসেবে অন্তত দু’জন করে চিকিৎসক বা সহকারী সার্জন থাকার কথা। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে ওয়ার্ডবয়, পিয়ন, ঝাড়–দারকে নিয়েই অস্ত্রোপচারের জটিলতম কাজটি করে থাকেন সার্জন। অস্ত্রোপচারের জন্য অপরিহার্য একজন এনেসথেসিস্ট (অজ্ঞানবিদ)। সূত্রমতে, হাসপাতালটিতে ৬ মাস এ পদটি শূন্য। জরুরি ক্ষেত্রে তাই জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার অরুণ কান্তি ঘোষকে এনেসথেসিস্টের কাজ করতে হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শফিউর রহমান বলেন, অপারেশনের সময় একজন সার্জনের সহযোগিতার জন্য অন্তত দু’জন সহযোগী ডাক্তার থাকা প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসক সংকট থাকায় ডাক্তারের পরিবর্তে পিয়ন-সুইপারদের দিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এ কারণে একটি সাধারণ অপারেশনেও অতিরিক্ত সময় লাগছে। যথাযথ সেবাও রোগীদের দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার বিকাশ কুমার সিকদার বলেন, হাসপাতালটির নামই শুধু ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। পুরনো ১০০ শয্যা হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী যে পরিমাণ চিকিৎসক-কর্মচারী প্রয়োজন ছিল সেটিও এখন পর্যন্ত নেই। তিনি বলেন, ১০০ শয্যা হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক-কর্মচারী মিলে এখানে মঞ্জুরি করা পদ ২০৩ জনের। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ ২৯টি। বর্তমানে চিকিৎসক রয়েছেন ১৯ জন। মোট জনবল ১৬৬ জন। বিকাশ কুমার আরও বলেন, এ হাসপাতালে প্রতিদিন ইনডোর-আউডডোর মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার রোগীকে সেবা দিতে হয়। এর মধ্যে গড়ে তিনশ’র বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। সূত্রমতে, ২০১৭ সালের ২১ মার্চ হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এখনও ২৫০ শয্যা হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) তৈরি হয়নি। রোববার হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১৫৬ জন রোগী সেবা নেন। এদিন নতুন রোগী ভর্তি করা হয় ৯১ জন। হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন সুদীপ্তা জানান, সরকারি হাসপাতালে সাধারণত গরিব রোগীরা সেবা নিতে আসেন। কিন্তু সেখানে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া বা দীর্ঘসূত্রতা দুঃখজনক। অস্ত্রোপচারের দেরি বা ঠিকভাবে অস্ত্রোপচার না হলে যে কোনো মুহূর্তে রোগীর প্রাণহানি ঘটতে পারে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে খেয়াল করা উচিত। জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক স্বপন কুমার কুন্ডু বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট বিভাগে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে মাগুরার সুশীল সমাজ,আইনজীবি, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সর্বস্তরের জনগনের সাথে কথা বললে তারা জানান, মাগুরা জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে এখন অরাজকতা চলছে। হাসপাতালে প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবা মিলছে না। নানা অব্যবস্থাপনায় ডুবে আছে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালটি। কর্মকর্তা-কর্মচারিরা কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না। তারা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই নিজ নিজ ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বর্হি:বিভাগ ও আন্ত:বিভাগের কোন সমন্বয় নেই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা পদে পদে অশেষ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ( সুপার) প্রায় সময়ই অনুপস্থিত থাকেন। বর্হি:বিভাগের ডাক্তাররা সময়মত হাসপাতালে আসেন না। রোগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয় একটা প্রেসক্রিপশনের জন্য। আন্ত:বিভাগেরও একই অবস্থা। ভর্তি রোগিদের সঠিক নিয়মে ভিজিট করা হয়না। কোন রোগির অবস্থা সংকটপন্ন হলে শত চেষ্টা করেও ডাক্তার মেলে না। এছাড়া ভর্তি রোগীদে;র খাদ্যের মান অতি নিন্ম মানের হলেও সেটি দেখার কেউ নেই। ঠিকাদারের সাথে ভাগ বাটোয়ারায় সব কিছু ম্যানেজ হয়ে থাকে। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো অত্যন্ত অপরিছন্ন ও দুর্গন্ধযুক্ত। টয়লেটগুলো নোংরায় ডুবে থাকে। আর কেবিনগুলো নিয়ে চলে নির্লজ্য বাণিজ্য। অপারেশনের ক্ষেত্রে টাকা ছাড়া কোন সেবা মেলে না। নার্স ও আয়াদের ব্যবহার প্রভুদের মত। মনে হয় রোগীরা তাদের দাসী বাদি। এসব দেখার দায়িত্ব যে, তত্ত্বাবধায়ক বা হাসপাতাল সুপারের তিনি দলীয় বা পেশাগত সংগঠনের কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। মাগুরাবাসী এখন এই অবস্থার দ্রত অবসান চান।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০২:৫১:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ অক্টোবর ২০২৩
৩৪১ বার পড়া হয়েছে

মাগুরায় কসাই ডাক্তারের মৃত্যুর মিছিলে আরো এক গৃহবধূ: ডা: শফিউর রহমান বদলী হচ্ছে না কেন?

আপডেট সময় ০২:৫১:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ অক্টোবর ২০২৩

মাগুরা প্রতিনিধি
আবারও একজন গৃহবধূর প্রাণ বলি হয়েছে মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের সার্জন ডা: শফিউর রহমানের ভুল অপারেশনে। এই নিয়ে আজ অব্দি তার হাতে মোট কতজন বোগীর প্রাণ বলি হলো তার কোন হিসাব নেই কারো কাছে। তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে গত এক যুগে তিনি প্রায় শতাধিক রোগীকে ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর প্রতিটি ঘটনাকেই দুঘর্টনা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। প্রতিটি প্রানের মুল্য দিয়েছেন ২/১ লাখ টাকা।সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তার ভুল অপারেশনে অকাল মৃত্যু হয়েছে এক গৃহবধূর। এই গৃহবধূর নাম-শারমিন (২৫)। মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার নিকড়হাটা গ্রামে তার বাড়ী। মাগুরা শহরের ইসলামিয়া ক্লিনিকে এই ঘটনাটি ঘটে। এ নিয়ে এখন মাগুরা শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রশ্ন উঠেছে ভুল অপারেশন করে আর কত রোগীর জীবন কেড়ে নেবেন এই কসাই ডাক্তার? দীর্ঘ এক যুগ অতিবাহিত হলেও তাকে কেন বদলী করা হচ্ছে না মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল থেকে? জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত এই ডাক্তারের খেপ বাণিজ্য আর কতদিন চলবে?
অনুসন্ধানে জানাগেছে, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মাগুরার সদর হাসপাতালে সার্জন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ডাক্তার শফিউর রহমান। সরকারী বিধি বিধান ভংগ করে তাকে কি আজীবনের জন্য মাগুরা জেলায় পোষ্টিং দিয়ে রাখা হয়েছে? শোনা যায় তার ছত্রছায়ায় মাগুরাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানহীন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল। সরকারি চাকরি বিধি মোতাবেক হাসপাতলে ওটিতে অপারেশন না করলেও চুক্তিভিত্তিক হাসপাতালের রোগীগুলো ভাগিয়ে নিয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়মিত অপারেশন করছেন তিনি। প্রতিটি অপারেশনে ফি নিচ্ছেন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এভাবে প্রচুর পরিমাণে অর্থ উপার্জন করে ঢাকাতে চার-পাঁচটি, ফ্ল্যাট ও বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কিনেছেন লেটেষ্ট মডেলের প্রিমিও গাড়ি। সকাল থেকে গভীর রাত অব্দি ছুঁটে বেড়াচ্ছেন এ ক্লিনিক থেকে সে ক্লিনিকে। । ইতিপুর্বে যশোর ও সাতক্ষীরাতে বদলি হয়ে গেলেও মোটা অর্থের বিনিময়ে আবার ফিরে এসেছেন মাগুরাতে। ইতিপুর্বে যশোরে অপারেশন করে রোগীর পেটের ভিতর গজ ও যন্ত্রপাতি রেখে দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে যশোরে একটি মামলা হয়েছিল। তাছাড়া উনি মাগুরা সরকারি হাসপাতালে সুইপার, ঝাড়–দার দিয়ে অপারেশন করান যা দৈনিক যুগান্তর পত্রিকাসহ যমুনা টেলিভিশন,চ্যানেল একাত্তোরে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ডাক্তার শফিউর রহমান বিভিন্ন অপকর্ম বিভিন্ন টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলেও একটি অদৃশ্য মহলের সহযোগিতায় সে এক যুগেরও বেশী সময় একই ষ্টেশনে বা হাসপাতালে চাকরি করে যাচ্ছেন। একজন দরিদ্র অসহায় রোগীর হাতের ভিতর সুচ ফুটে গেলেও তাকে বিভিন্ন টালবাহানায় অপারেশন না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান। দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যান বিভিন্ন ক্লিনিকে। তিনি লেখাপড়া করাকালীন ছাত্র শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বর্তমানে জামাতের অর্থযোগানদাতা হিসাবে পরিচিত। তার বাড়ী সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া থানায়। এই এলাকায় বিএনপি জামায়াতের আধিপত্য রয়েছে। কিছুদিন আগে তাকে নিয়ে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় একটি সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে শিরোনাম ছিল: “মাগুরা ২৫০ শয্যার হাসপাতাল: অস্ত্রপাচারে সার্জনের সহযোগি ঝাড়–দার”। সেই রিপোর্টে বলা হয়- অপারেশন থিয়েটারে এক বৃদ্ধার শরীরে অস্ত্রোপচার করছিলেন সার্জন (শল্যচিকিৎসক)। তাকে সহযোগিতা করছেন এপ্রোন (সজ্জাবরণী) পরা দুই সহযোগী। পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নার্স। আপাতদৃষ্টিতে সব ঠিকঠাক মনে হলেও দুই সহযোগীর পরিচয় পেলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তারা যে ওই হাসপাতালের ঝাড়ুদার! এ চিত্র মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালের। রোববার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া আনোয়ারা বেগম নামের এক রোগীর হাতে ওই অস্ত্রোপচারে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। অস্ত্রোপচার করেন ডা. শফিউল। তার সহযোগী ছিলেন সুবাস চন্দ্র বিশ্বাস ও আবু বক্কার। হাসপাতালে তারা নিয়োগ পেয়েছেন এমএলএসএস কাম ওয়ার্ডবয় হিসেবে। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজও করেন তারা।
সূত্র জানায়, এ হাসপাতালে তিনজন সার্জন অস্ত্রোপচার করে থাকেন। সপ্তাহে দু’দিন করে (মোট ছয় দিন) অস্ত্রোপচার করেন তারা। দিনে চার-পাঁচটি বা তারও বেশি অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে এখানে। এ সময়ে তাদের সহযোগী হিসেবে অন্তত দু’জন করে চিকিৎসক বা সহকারী সার্জন থাকার কথা। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে ওয়ার্ডবয়, পিয়ন, ঝাড়–দারকে নিয়েই অস্ত্রোপচারের জটিলতম কাজটি করে থাকেন সার্জন। অস্ত্রোপচারের জন্য অপরিহার্য একজন এনেসথেসিস্ট (অজ্ঞানবিদ)। সূত্রমতে, হাসপাতালটিতে ৬ মাস এ পদটি শূন্য। জরুরি ক্ষেত্রে তাই জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার অরুণ কান্তি ঘোষকে এনেসথেসিস্টের কাজ করতে হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শফিউর রহমান বলেন, অপারেশনের সময় একজন সার্জনের সহযোগিতার জন্য অন্তত দু’জন সহযোগী ডাক্তার থাকা প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসক সংকট থাকায় ডাক্তারের পরিবর্তে পিয়ন-সুইপারদের দিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এ কারণে একটি সাধারণ অপারেশনেও অতিরিক্ত সময় লাগছে। যথাযথ সেবাও রোগীদের দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার বিকাশ কুমার সিকদার বলেন, হাসপাতালটির নামই শুধু ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। পুরনো ১০০ শয্যা হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী যে পরিমাণ চিকিৎসক-কর্মচারী প্রয়োজন ছিল সেটিও এখন পর্যন্ত নেই। তিনি বলেন, ১০০ শয্যা হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক-কর্মচারী মিলে এখানে মঞ্জুরি করা পদ ২০৩ জনের। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ ২৯টি। বর্তমানে চিকিৎসক রয়েছেন ১৯ জন। মোট জনবল ১৬৬ জন। বিকাশ কুমার আরও বলেন, এ হাসপাতালে প্রতিদিন ইনডোর-আউডডোর মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার রোগীকে সেবা দিতে হয়। এর মধ্যে গড়ে তিনশ’র বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। সূত্রমতে, ২০১৭ সালের ২১ মার্চ হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এখনও ২৫০ শয্যা হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) তৈরি হয়নি। রোববার হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১৫৬ জন রোগী সেবা নেন। এদিন নতুন রোগী ভর্তি করা হয় ৯১ জন। হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন সুদীপ্তা জানান, সরকারি হাসপাতালে সাধারণত গরিব রোগীরা সেবা নিতে আসেন। কিন্তু সেখানে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া বা দীর্ঘসূত্রতা দুঃখজনক। অস্ত্রোপচারের দেরি বা ঠিকভাবে অস্ত্রোপচার না হলে যে কোনো মুহূর্তে রোগীর প্রাণহানি ঘটতে পারে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে খেয়াল করা উচিত। জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক স্বপন কুমার কুন্ডু বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট বিভাগে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে মাগুরার সুশীল সমাজ,আইনজীবি, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সর্বস্তরের জনগনের সাথে কথা বললে তারা জানান, মাগুরা জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে এখন অরাজকতা চলছে। হাসপাতালে প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবা মিলছে না। নানা অব্যবস্থাপনায় ডুবে আছে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালটি। কর্মকর্তা-কর্মচারিরা কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না। তারা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই নিজ নিজ ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বর্হি:বিভাগ ও আন্ত:বিভাগের কোন সমন্বয় নেই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা পদে পদে অশেষ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ( সুপার) প্রায় সময়ই অনুপস্থিত থাকেন। বর্হি:বিভাগের ডাক্তাররা সময়মত হাসপাতালে আসেন না। রোগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয় একটা প্রেসক্রিপশনের জন্য। আন্ত:বিভাগেরও একই অবস্থা। ভর্তি রোগিদের সঠিক নিয়মে ভিজিট করা হয়না। কোন রোগির অবস্থা সংকটপন্ন হলে শত চেষ্টা করেও ডাক্তার মেলে না। এছাড়া ভর্তি রোগীদে;র খাদ্যের মান অতি নিন্ম মানের হলেও সেটি দেখার কেউ নেই। ঠিকাদারের সাথে ভাগ বাটোয়ারায় সব কিছু ম্যানেজ হয়ে থাকে। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো অত্যন্ত অপরিছন্ন ও দুর্গন্ধযুক্ত। টয়লেটগুলো নোংরায় ডুবে থাকে। আর কেবিনগুলো নিয়ে চলে নির্লজ্য বাণিজ্য। অপারেশনের ক্ষেত্রে টাকা ছাড়া কোন সেবা মেলে না। নার্স ও আয়াদের ব্যবহার প্রভুদের মত। মনে হয় রোগীরা তাদের দাসী বাদি। এসব দেখার দায়িত্ব যে, তত্ত্বাবধায়ক বা হাসপাতাল সুপারের তিনি দলীয় বা পেশাগত সংগঠনের কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। মাগুরাবাসী এখন এই অবস্থার দ্রত অবসান চান।