তবে, এই লেখা রাজনীতির সঙ্গে দাবদাহ বা আবহাওয়ার বিপর্যয়ের বিষয়ে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে যে দল সরকার গঠন করে, সেই দলের ভাবাদর্শের ওপর তাদের অ্যামাজন বা রেইন ফরেস্টের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর আইডিওলজির ওপর তাদের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিবণ্টনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। Environmental politics তাই আজ এক গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্স।
তবে, বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর রাজনীতির প্রভাব আলোচনা করা এত সহজ নয়। প্রতিটা দেশ যখন আজ পরিবেশগত সুরক্ষায় তাদের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় প্রাধান্য দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থা আজও নাজুক।
২০২০ সালের ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের বনায়ন মাত্র ১৪.৪৭%। যে কোনও দেশের আয়তনের তুলনায় এটা যে নিছকই অপ্রতুল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনসংখ্যার ঘনত্বকে বনায়নের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। বলা হয় নগরায়ণের জন্য বৃক্ষ নিধনের কোনও বিকল্প নেই। অথচ, এই অজুহাত এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও হংকং তার মোট ভূমির ৫৫% বনায়ন নিশ্চিত করেছে। আসলে একটা রাষ্ট্রের পরিবেশ নীতিমালা কতটা জনবান্ধব, কতটা ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে করা হয়, তার ওপর নির্ভর করে সেই দেশের বনায়ন বা বৃক্ষসম্পদ।
আলেন গিন্সবারগের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন জেসর (যশোর) রোড’ কবিতা লেখা হয়েছিল ১৯৭১-এর পটভূমিকায়। মানুষ কিভাবে যুদ্ধ শরণার্থী হয়ে যশোর রোড ধরে পার্শ্ববর্তী দেশে এক অন্তহীন যাত্রা করেছিল, কীভাবে রিক্ত-শূন্য মানুষ নিরাশা বুকে নিয়েও, আশার সন্ধানে ছুটেছিল সেটা গিন্সবারগ অতি সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছিলেন তার কবিতায়। ওই কবিতা যারা পড়েছেন, তারা জানেন যশোর রোড ধরে চলা শরণার্থীদের অনেক কিছুর অভাব থাকলেও, সেখানে একটা জিনিসের অভাব ছিল না, আর তা হচ্ছে বৃক্ষের ছায়া। ভারত এবং বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে চলা যশোর রোডের পাশে ছিল বিশাল বিশাল বৃক্ষরাজি। যা রাস্তা ব্যবহারকারীদের ছায়া দিতো, কষ্ট কমাতো। এমনটা বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাস্তার পাশেই ছিল। যশোর রোডের পাশে বাড়ি হবার কারণে, দেখেছি কীভাবে রাস্তা নির্মাণের অজুহাতে শত বছরের পুরনো গাছগুলো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা নিধন করেছে নির্মমভাবে। গত ত্রিশ বছর ধরে এই বৃক্ষগুলো নিধন করা হলেও, লাগানো হয়নি তেমন কোন গাছ, নেওয়া হয়নি রোপিত গাছগুলোর যথেষ্ট পরিচর্যা। খটখটে রোদে পথচারীরা পথ চলে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার মধ্যেই বর্তমানের জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের কোনও সরকারই বনভূমির ওপর যত্নশীল হয়নি। বিবেচনাহীন সাময়িক উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সীমাহীনভাবে স্থায়ী (পরিবেশগত) উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।
শুধু বৃক্ষ কেন, রাষ্ট্রীয় এমন কোনও সম্পদ নেই, যা তথাকথিত রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের হাতে নিরাপদ। রাজনৈতিক দলগুলো এবং এদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ যেন যাবতীয় জাতীয় সম্পদের জিম্মাদার হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে নদীর বালু উত্তোলনের মাধ্যমে আর তার কেনাবেচা করে, একশ্রেণির লোক আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছে। নদীগুলো অবৈধভাবে দখল করে, তার নাব্য কমিয়ে, গতিপথ পালটিয়ে, নদীগুলোর স্বাভাবিক জীবনচক্র নষ্ট করা হয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনের প্রতিও আমরা যত্নবান হয়নি।
দিনের পর দিন পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে রাজনীতির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে। পাহাড়ি বনভূমিগুলো কমতে কমতে একটা বিপজ্জনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে, অথচ আমদের তেমন কোনও প্রতিরোধক কার্যক্রম হাতে নেওয়া সম্ভব হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার প্রতিবেদনে দেখাচ্ছে যে দশকের পর দশক ধরে তিন পার্বত্য জেলায় যেমন রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি অনিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপনা, অপরিণামদর্শী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া, এবং ভূমি দখলের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মারাত্মক ক্ষতি করা হয়েছে। এমনকি গ্রামাঞ্চলের বৃক্ষরাজি বা ফসলি ক্ষেত ধ্বংস করা হয়েছে বালি ফেলার বেড, কয়লা মজুদের স্থাপনা, আর পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক কলকারখানা নির্মাণ করে। নগরাঞ্চলে সৌন্দর্য বর্ধনের অজুহাতে বৃক্ষ কেটে উজাড় করা হচ্ছে। কোনও বিকল্প পরিকল্পনার কথা আসলে আমরা আমলে নেই না। গবেষকদের মতামত অগ্রাহ্য করে, রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চায় প্রায়ই এ দেশে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে।
আজকে বাংলাদেশে যে সাংঘাতিক দাবদাহ, তা আসলে আমাদের বহুদিনের কৃতকর্মের ফল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাংঘাতিক হারে দুর্বৃত্তায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায়, জনস্বার্থ যেসব ক্ষেত্রে বিঘ্নিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম পরিবেশ এর ক্ষতি। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়, উভয় প্রকার রাজনীতিই দায়ী এর জন্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মুনাফা’র বা লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হয়। এরই কারণে রাষ্ট্রের অনেক সম্পদ অহেতুক অপচয় হয় এবং অকারণে ক্ষতি করা হয় পরিবেশের।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী এই পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যা বার্ষিক জিডিপি’র প্রায় ৩.৪%। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রশ্রয় এই ক্ষতির জন্য সাংঘাতিকভাবে দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের ক্ষতিকে আমরা আমলে নেয়নি। এখনও যে খুব একটা নেওয়া হচ্ছে, তেমনটা দেখা যায় না। তাই, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ এখন তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। সাংঘাতিক দাবদাহে আজ জনজীবন অতিষ্ঠ। ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস আসছে ফি বছর। এতদসত্ত্বেও সুন্দরবনের অবশিষ্ট বৃক্ষরাজি আজও ঢাল হয়ে দাঁড়ায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু, অকৃতজ্ঞ আমরা সেই বৃক্ষরাজি নিধন করতে দুঃসাহস দেখাই। এত এত বৃক্ষের মৃত্যু ঘটালেও, আমরা নতুন বৃক্ষ রোপণ করে তার যত্ন নেই না। কখনও হয়তো, লোক দেখানোর জন্য বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয় বটে, কিন্তু সেই চারাগাছগুলোর সঠিক পরিচর্যার দিকে খেয়াল রাখা হয় না। অথচ, উন্নত রাষ্ট্রে, সরকারিভাবে লাগানো প্রতিটা বৃক্ষের রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়। যেন, তারা বৃক্ষগুলোর ভবিষ্যৎ জানতে পারে, নিতে পারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। আমাদের সংবিধানের মৌলিক নীতিমালায় আমরা পরিবেশ সুরক্ষার কথা বললেও আসলে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা কখনও পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের নীতিমালা বা আইনগুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
লেখক: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
















