অগ্রণী ব্যাংকে ৫ বছরে ৪৫ বছরের অগ্রগতি
রোস্তম মল্লিক
সবার অগ্রে থাকার যে লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নবগঠিত ব্যাংকটির নাম রেখেছিলেন অগ্রণী, সেই লক্ষ্য গত ৫ বছরের বিপুল কর্মযজ্ঞে বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে একসময়ে সকল সূচকে পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রায়ত্ত এই বাণিজ্যিক ব্যাংকটি।
অগ্রণী ব্যাংকের এই ম্যাজিক্যাল উত্থানের কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে ৪৫ বছরে ব্যাংকটিতে যা কাজ হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই তার তুলনায় বেশি কাজ হয়েছে গত ৫ বছরে। যে কারণে এই ৫ বছরে সাফল্যও ধরা দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। করোনা মহামারি সহ নানামুখী প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক খাতের আইকনিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে অগ্রণী। আর এই অভাবনীয় অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম, যিনি বঙ্গবন্ধু কর্নারের নন্দিত উদ্ভাবক হিসেবে দেশব্যাপী সমাদৃত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ অগ্রযাত্রার যোগ্য সারথী হিসেবে ব্যাংকটিকে তিনি নিয়ে এসেছেন সম্মুখসারিতে। ২০১৬ সালের আগস্টে দায়িত্ব পাওয়ার পর ৫ বছর ৪ মাসের পথপরিক্রমায় তিনি প্রয়োজনীয় সমর্থন ও দিকনির্দেশনা পেয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. জায়েদ বখতের নেতৃত্বাধীন অভিজ্ঞ পর্ষদের।
ব্যাংকটি ইতোমধ্যে রেমিট্যান্স আহরণ, আমানত, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, গ্রীন ব্যাংকিং, অনাদয়ী ঋণ আদায়, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়ন সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে শীর্ষে উঠে এসেছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যাংকটিকে মধ্যমেয়াদে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সর্ববৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভিত গড়ে দিতে নিরবিচ্ছিন্ন গতিতে কাজ করে যাচ্ছেন মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম।
অগ্রণী ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪৫ বছরের তুলনায় ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ১০৪ শতাংশ, ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ১২৫ শতাংশ, বিনিয়োগ বেড়েছে ৭২ শতাংশ, মোট সম্পদ বেড়েছে ৯২ শতাংশ, গ্রামীণ ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫৮ শতাংশ, শিল্প ঋণ বেড়েছে ১০৬ শতাংশ এবং এসএমই খাতে অগ্রিম বেড়েছে ১৬০ শতাংশ। পাশাপাশি লোকসানি শাখা কমেছে ৭৭ শতাংশ; শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২৯ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রেই ৪৫ বছরে যা অগ্রগতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে গত ৫ বছরে।
এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার ওপর যে দায়িত্বগুলো অর্পণ করেছেন সেগুলো যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। একইসঙ্গে ব্যাংকে গুড গভর্নেন্স বাস্তবায়নে আমরা বেশ উন্নতি করেছি। আমি খুবই সৌভাগ্যবান যে আমি অগ্রণী ব্যাংকে একটি ভালো পর্ষদ পেয়েছি যারা প্রতিনিয়ত ব্যাংককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথোপযুক্ত দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে অনেক সমস্যাই আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।’
অগ্রণী ব্যাংকের গত ৫০ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪৫ বছরে আমানত বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরে আমানত বেড়েছে ৫১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। ৪৫ বছরের তুলনায় ৫ বছরে আমানত বেশি সংগ্রহ হয়েছে ২ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা।
২০২১ সালের মে মাসে দেশের তৃতীয় ব্যাংক হিসেবে লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলক অতিক্রম করে অগ্রণী ব্যাংক। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত ১ লাখ ৯৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ এই সময়ে আমানত ধরে রখাই ছিল চ্যালেঞ্জ। কারণ ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখার বিধান করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বেসরকারি ব্যাংকে আমানতে সুদ হারও দশমিক ৫ শতাংশ বেশি বেধে দেয়া হয়। এসবের সঙ্গে করোনা মহামারির কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমানত দ্বিগুণের বেশি বাড়াতে পেরেছে মোহম্মদ শামস-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন অগ্রণী ব্যাংক।
শুধু আমানত বৃদ্ধি করে ব্যাংকের ভিত মজবুত করা নয়, বিপুল ঋণ বিতরণের মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন শামস-উল ইসলাম।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৪৫ বছরে ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ২৬ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। অথচ ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৫ বছরে ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি টাকা যা দেশের জিডিপির ১ দশমিক ১২ শতাংশ । ৪৫ বছরের তুলনায় ৫ বছরে বিতরণ বেশি হয়েছে ৬ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৫৯ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।
গত ৫ বছরে ব্যাংকের মোট সম্পদও বেড়েছে বিপুল পরিমাণে। ৪৫ বছরে যেখানে সম্পদ বেড়েছে ৬২ হাজার ২২০ কোটি টাকা সেখানে মাত্র ৫ বছরে বেড়েছে ৫৭ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির লোকসানি শাখাও কমেছে। ৫ বছরে লোকসানি শাখা ৬০টি কমে ১৮টিতে নেমেছে।এদিকে ২০১৬ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৯ শতাংশ যা ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এসে ১৩ শতাংশে নেমেছে। ৫ বছরে খেলাপি ঋণ কমেছে ১৬ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে অগ্রণী এমডি বলেন, করোনা মহামারি না থাকলে বিগত বছর শেষেই শ্রেণিকৃত ঋণ আমরা সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে পারতাম। চলতি বছর শ্রেণিকৃত ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনাই হবে আমাদের লক্ষ্য।
বিভিন্ন সূচকে অসামান্য অগ্রগতির কারণে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড গত ৫ বছরে অনেকগুলো সম্মাননা ও পুরষ্কার পেয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে অ্যারাবিয়ান ব্যাংকার অ্যাওয়ার্ড,২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড, সিটি ব্যাংক এনএ পারফরমেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড, ২০১৯ সালে আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড উল্লেখযোগ্য । প্রথমবারের মত অগ্রণী ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এর সাথে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি ২০১৯-২০২০ এর মূল্যায়নে প্রথম স্থান অর্জন করে। আর বৈদেশিক রেমিট্যান্স আহরণে অগ্রণী ব্যাংক বিগত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ‘১ম’ এবং দেশের সকল সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আছে। ২০২০ সালে দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবুজ অর্থায়নে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এছাড়া ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সরকার ঘোষিত প্রণােদনা প্যাকেজের সিএমএসএমই ঋণ বিতরণে প্রথম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংককে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকসমূহের মধ্যে অনলাইন ব্যাংকিং- এ প্রথম, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রথম, রেমিট্যান্স আহরণে ধারাবাহিকভাবে প্রথম হয়ে আসিছে। অগ্রণী ব্যাংক পরপর ৪ বছর আইসিএবি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলামকে ‘বেস্ট ব্যাংকার’ হিসেবে “৮ম ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড-২০১৮”-তে ভূষিত করেছে ড. ওয়াজেদ মিয়া মেমােরিয়াল ফাউন্ডেশন।
মাত্র ৫ বছরে এত অর্জন কিভাবে সম্ভব হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, “বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করার ফলেই ৫ বছরে এত অর্জন সম্ভব হয়েছে। কারণ, কিভাবে দেশকে ভালবাসতে হয়, মানুষকে ভালবাসতে হয় সেই আদর্শ স্থাপন করে গেছেন জাতির পিতা। যে কেউ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করবে তার পক্ষেই সম্ভব হবে দেশের ও দেশের মানুষকে সেবা দেয়ার।”
দেখা গেছে, ৪৫ বছরের কাজ ৫ বছরেই করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বঙ্গবন্ধু কর্নারের নন্দিত উদ্ভাবক মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম। তাই আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে বাংলাদেশ।















