স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় কাজ করছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর!
রোস্তম মল্লিক
নতুন মহাপরিচালক কমডোর আবু জাফর মো: জালাল উদ্দিন যোগদান ও অভ্যন্তরীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার নয়া বিন্যাসে আমূল বদলে গেছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর। ফিরে এসেছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা । দীর্ঘদিন পর ঘুষ -দুর্র্নীতির কলংকমুক্ত হতে যাচ্ছে সরকারী এই সংস্থাটি। সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানের আমলে পরপর তিন জন প্রকৌশলী ঘুষ গ্রহনের দায়ে দুদকের ফাঁদে গ্রেফতার হলে এই অধিদপ্তরটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে। পত্র -পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে প্রায়ই শিরোনাম হতে থাকে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর। সয়ং প্রধান মন্ত্রীও নাখোষ হন কর্মকর্তাদের ওপর। তিনি মন্ত্রী শাজাহান খানকে সাফ সাফ জানিয়ে দেন যে, এখন থেকে তিনি নিজেই এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ দেবেন। পরবর্তীতে তৃতীয় মেয়াদে নয়া সরকার গঠনকালে তিনি মন্ত্রী শাহজাহান খানকে বাদ দিয়ে নীতি,আদর্শ ও সততায় প্রতিজ্ঞ মো: খালেদ মাহমুদ চৌধুরীকে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতি মন্ত্রী নিয়োগ দেন। তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহনের পর প্রধান মন্ত্রীর দোয়া আনতে গেলে তাকে এই মন্ত্রণালয়ের যে বদনাম আছে তা দ্রুত নিরসনের নির্দেশনা দেন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশনা শিরধার্য করে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী নৌ মন্ত্রণালয়ে ব্যপক পরিবর্তন আনেন। তিনি শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে কাজ করার জন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের নির্দেশ দেন। একই সাথে অনিয়ম -দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষনা করেন। প্রতি মন্ত্রীর এই কঠোর মনোভাবাপন্ন কর্মসুচীতে আমূল বদলে যায় নৌ মন্ত্রণালয়। কর্মকান্ডে গতি ফিরে আসে। অতীতের বদনামগুলোও মুছে যেতে শুরু করে।
কেবলমাত্র নৌ মন্ত্রণালয়েই নয়, তিনি নৌ মন্ত্রণালয়ের অধিনে থাকা অন্য ৯টি সংস্থায়ও একই নির্দেশনা প্রদান করেন। কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারির বিরুদ্ধে অনিয়ম,দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাকে যথাযথ শাস্তি পেতেই হবে বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। এতেকরে ম্যাজিকের মত কাজ হয়। সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরে আসে। সেবার মানও বৃদ্ধি পায়। এবার তিনি হাত দেন কলংকের মালা পরিহিত নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে। প্রথম পদক্ষেপেই নৌযানের নকশা পাশের দুর্নীতি বন্ধের জন্য নকশা অনুমোদনের নিয়ন্ত্রণ নিজ দপ্তরে নিয়ে যান। পরবর্তীতে গণহারে নৌযানের নকশা অনুমোদন বন্ধ করে দেন। তৃতীয় পর্যায়ে পাইকারী হারে নৌযান সার্ভের লাগাম টেনে ধরেন। তিনি সার্ভেয়ারদের অফিসে বসে নৌযান সার্ভে করার বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। সরেজমিনে গিয়ে নৌযান সার্ভে করে তবেই সার্ভে সনদ প্রদান ও রেজিষ্ট্রেশন দানের নির্দেশ দেন। একই সাথে নৌপরিবহন অধিদপ্তরে ৭/৮ জন শীপ সার্ভেয়ার ও ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করেন। এতেকরে কাজের গতি বেশ বৃদ্ধি পায়। অতীতে এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থেকে শুরু করে প্রধান প্রকৌশলী ও সার্ভেয়াররা লাগামহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন। তারা একেকটি বড় নৌযানের নকশা পাশ করতে ২০/৩০ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতেন। নৌযানের রেজিষ্ট্রেশন দিতে নিতেন ৩/৪ লক্ষ টাকা। নৌযান সার্ভে সনদ দিতে নিতেন ১/২ লক্ষ টাকা। এ ছাড়া কর্ণফুলি এনডোর্সমেন্ট, ক্যাডেটদের এনওসি প্রদানেও নির্দিষ্ট অংকের টাকা নেওয়া হতো। সব থেকে বেশী অনিয়ম দুর্নীতি করা হতো প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর মাষ্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষায়। ৫ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহনের দ্বায়ে বরখাস্থ থাকা সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী এস এম নাজমুল হক যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন তিনি এই অধিদপ্তরটিকে টাকার মেশিনে পরিণত করেছিলেন। প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর মাষ্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করে প্রতি পরীক্ষায় ৫০/৬০ জনকে পাশ করিয়ে দেওয়া হতো । বিনিময়ে মাথাপিছু ঘুষ নেওয়া হতো ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। চুক্তিভিত্তিক এসব পরীক্ষার্থী জোগাড় করতে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন সাবেক ওই প্রধান প্রকৌশলী। এক কথায় ঘুষের দোকান খুলে বসেছিলেন তিনি। সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানকে বশীভূত করে তিনি দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানাতে পারতেন। নিজের সুবিধা হাসিল করার জন্য মন্ত্রীকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই আদেশ জারি করাতেন। তিনি ক্ষমতায় এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, সয়ং মহাপরিচালকও তার কথায় ওঠবস করতেন।
৫ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহনের সময় দুদক কর্মকর্তাদের হাতে গ্রেফতার হয়ে তিনি এই অধিদপ্তর থেকে বিতাড়িত হলে সংস্থাটি কালাজ্বরমুক্ত হয়। তদাস্থলে প্রেষনে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে আসেন বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো: মন্জুরুল কবীর । তিনি দায়িত্ব গ্রহনের পরই ঘুষের রাজত্ব নির্মূল হতে থাকে। নৌ প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বদলে ফেলেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে। কিন্তু সাবেক মহাপরিচালকের কারণে শতভাগ সফল হতে পারেননি।
এই অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তা আছেন চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন কে এম জসিম উদ্দিন সরকার । তিনি একজন নীতিপরায়ন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। অধিদপ্তরটিকে তিনি সুনামের শীর্ষ উচ্চতায় নিতে আপ্রান চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ও সাবেক মহাপরিচালক। তারা দুজনে মিলে কোনঠাসা করে রেখেছিলেন এই দেশ প্রেমিক কর্মকর্তাকে। ফলে তিনি ওএসডি কর্মকর্তারমত কর্মহীন দিন কাটাতেন। এখন অবশ্য তিনি ভীতিমুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এই অধিদপ্তরটিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় আনতে সচেষ্ট রয়েছেন।
বর্তমান মহাপরিচালক কমডোর আবু জাফর মো: জালাল উদ্দিন যোগদান করায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মধ্যে প্রানচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তারা সকলেই উৎফুল্লমনে দাপ্তরিক কাজগুলো সমাধান করছেন। কারো মনে আর কোন সংশয় নেই। তারা মনে করেন যে, বর্তমান মহাপরিচালক তাদের অভিবাবক হয়ে মাথার ওপর থাকবেন। ভুল ত্রুটি হলে শাসন করবেন। তাদের প্রতি সব সময়ই মানবিক আচরণ করবেন। অন্যদিকে বর্তমান চীফ ইঞ্জিনিয়ার মো: মন্জুরুল কবীর ও চীফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন কে এম জসিম উদ্দিন সরকার এর প্রতি তারা সকলেই অনুগত। তারা দু’জনেই ছায়া মায়ায় জড়িয়ে রেখেছেন। বিপদে আপদে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। দাপ্তরিক কাজ কর্মে সহযোগিতা চাইলে মুক্তমনে সহযোগিতা করছেন। এই পরিবেশে তারা ভীষন খুশি।
আরো জানাগেছে, নৌপরিবহন অধিদপ্তরে এখন আর আগেরমত ফাইল সন্ত্রাস ও জন ভোগান্তি নেই। সেবা নিতে আসা ক্যাডেট ,জাহাজ মালিক ও নৌযান মাষ্টার ,ড্রাইভাররা খুব অল্প সময়েই তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পেয়ে যাচ্ছে। একটি টাকাও ঘুষ দেওয়া লাগছে না। দপ্তরের সামগ্রীক কর্মকান্ড ডিজিটালাইজড ফর্মে ( অনলাইন) ভিত্তিক সম্পাদিত হচ্ছে। মেরিণ কোর্টেও আর আগেরমত মামলা জট নেই। এক কথায় নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরে এখন এক নবধারার সুচনা হয়েছে।















