০৭:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জীবন যেখানে যেমন

প্রতিনিধির নাম:

কান্তা কাবির, নিউইয়র্ক থেকে

সব মানুষেরই একটা নিজস্বতা আছে। আর একলা থাকলে সেটা খুব মনে পড়ে। তবে সেই জায়গা পোড়ায় না বরং নিজেকে নিজের সামনে দাঁড় করায়। সেই ঘরটা যেন দর্পণ, কেমন যেন মসৃণ তল। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী আলোর স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। দর্পণে আলোর প্রতিফলনের জন্যই বিম্বের সৃষ্টি হয়। জীবনটাও অনেকটা তেমনই।

জীবন তার মাঝ বরাবর এসে পুলককে অনেক শিখিয়েছে। সবচেয়ে বেশি যা শিখিয়েছে তা হলো খোলা ময়দানে কাউকে দাঁড় করিয়ে ট্রিগার টেপা। ঠুস-ঠাস গুলি করার নাম ভালোবাসা হতে পারে না। তাই পুলক খুব সহজেই অনুর চলে যাওয়া মেনে তাকে যেতে দিয়েছে। শুধু চোয়াল শক্ত করে নিঃশ্বাসের সঙ্গে কান্না চেপে তাকে বলেছিল, যাচ্ছ যাও শুধু ভালো থেক। যদি ভালো না থাক তবে আমি হিংস্র হব। কথা রেখেছে অনু। সে তার ছোট্ট পরীকে সাথে নিয়ে এখন পর্যন্ত বেশ আছে।

টাইম ফ্লাই করে। এইতো মনে হয় সেদিনের কথা। অথচ বিশ বছর হয়ে গেল। অনুকে প্রথম দেখেছিল পুলক পাড়ার মোড়ের ব্রিজের ওপর। মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল। আর পুলক ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে সিগারেট শেয়ার করছিল। ও না একটু ভুল হয়েছে। ওটা সিগারেট ছিল না। সেই সময়ে সিগারেট এত বেশি বেশি ছিল না। তখন কাগজের প্যাকেটে আকিজ বিড়ি চলত।

আমাদের সিগারেটের হাতে খড়ি আকিজ বিড়ি দিয়ে। তাও লুকিয়ে লুকিয়ে। আর ব্রিজের নিচের জায়গাটা আমাদের চার বন্ধুর জন্য অনেকটা সেফ জোন। পুরো প্যাকেট বিড়ি কেনার পয়সা আমাদের বন্ধুদের ছিল না। ব্যাস সারাদিন ১ টাকা দিয়ে দুইটা বিড়ি কিনতে পারলেই আমরা সুখী ছিলাম। ওটাকেই সুখটান মনে করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেতাম। কি কারণে ওইদিন আমাদের কাছে দিয়াশলাই ছিল না।

যেহেতু ওটা আমার পাড়া, সঙ্গত কারণে আমাকেই পাঠানো হলো ঠাণ্ডা কাকুর দোকান থেকে দেয়াশলাই আনার জন্য। ব্রিজে ওঠা মাত্রই চোখ আটকে গেল কি সাধারণ আবার কি অসাধারণ দুটি মায়াময় চোখ। আমি তখন সবে মাত্র দশম শ্রেণিতে। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়া শুরু করেছি। তখনও শেষ করতে পারিনি। অমিতের লাবন্যকে নিয়ে করা প্রশংসা তখনও আমার চোখে মুখে লেগে আছে।

ঠিক যেন পুলকই বলছে- ‘লাবন্যের সৌন্দর্য সকাল বেলার মতো, তাতে অস্পষ্টতার মোহ নেই। তার সমস্তটা বুদ্ধিতে পরিব্যাপ্ত। অমিতের যেমন বুদ্ধি আছে, ক্ষমা নেই, বিচার আছে, ধৈর্য্য নেই। ও অনেক জেনেছে শিখেছে, কিন্তু শান্তি পায়নি। লাবন্যের মুখে শান্তরূপ দেখেছিল। যে শান্তি হৃদয়ের তৃপ্তি থেকে নয়। যা ওর বিবেচনায় শক্তির গভীরতার অঞ্চল। অনু ঠিক তেমন। অমিতের কি হয়েছিল কতখানি ডুবেছিল তা তখনও জানেনি পুলক। জীবনের মানেই বদলে গিয়েছিল।

জীবনকে ছাঁচে ঢেলে তৈরি করেছিল পুলুক। এরপর কেটে গেল চারটি বছর ভালবাসা আর অভিমানে। কিন্তু জীবনের মোড় বাঁকে বাঁকে বদলায়। অনু আর একদিকে বহমান থাকতে চায়নি। পুলক বাঁধা দেয়নি তাকে যেতে দিল। তবে অনু যে ভালো আছে। দিনশেষে ভালোবাসার মানুষ ভালো থাকুক এটাই কাম্য।

বলাবাহুল্য, পুলকের জীবনে প্রেম এসেছিল সরলরৈখিকভাবে নয় কিছুটা ত্রিকোনমিকভাবে। অনু যাবার পর দিন যাচ্ছিল আর সবকটা দিনের মতোই। ইন্টারমিডিয়েট দুবার ড্রপ করে তৃতীয় বারের মতো আবারও মন দেয় পুলক পড়লেখায়। ভালো রেজাল্টও করে। অনু এখন অনেকটা ফিকে। মায়ের ইচ্ছেতে আবারও নিজেকে প্রস্তুত করে ইউনিভার্সিটির পরীক্ষাগুলোতে। ব্যাপক প্রতিযোগিতা।

রাতদিন এক করে পড়তে হয় ইউনিভার্সিটির ভর্তি গাইড। এরপর চলে আসে সেই কাঙ্খিত দিন । সুযোগ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার। এখানে বন্ধুত্ব হয় জয়িতার সাথে। প্রখর বন্ধুত্ব। জয়িতা আমার দুই ইয়ার নিচে পড়তো। তারপর প্রণয়। জয়ি বলতো আমি নাকি তার হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। ও খুব মজা করে কথা বলতো। চোখে মুখে দুষ্টুমি লেগে থাকতো। আমার ভালোবাসার বাঁশির কম্পাঙ্ক নাকি ২৫ হার্জের উপর ছিল।

এই উচ্চ কম্পাঙ্কের ভালোবাসা তাকে Hypnotized করত। হঠাৎ একদিন জয়ি সিদ্ধান্ত নেয়, তার হিপনোটিজম থেকে সে বেরিয়ে আসবে। তাই বেমালুম ভুলে যায় আমাকে। ইন্টেলিজেন্সে কাজ করা এক আর্মি অফিসারকে বিয়ে করে ফেলে। না কোনো অভিযোগ নেই। শুধু মাঝে মধ্যে অভিমান হয়। অপমান হয়। তবে তা নিজের সাথে নিজের ভাগ্যের কথপোকথনে। জয়ি ভালো থাকুক। ভালোবাসার মানুষগুলোই আমৃত্যু ভালো থাকুক।

জয়ি যাওয়ার পর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসকে মনে হত শ্বশান ঘর। বাবা মাকে রাজি করিয়ে এপ্লাই করি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। কিছুদিন পর ওরা অফার লেটার পাঠিয়ে দেয়। সব কাগজপত্র রেডি করে ভিসার জন্য দাঁড়াই। কেন যেন ভাগ্যদেবতা সুপ্রসন্ন হলেন। পাসপোর্টের গায়ে স্ট্রাচু অভ লেবার্টির একটা সিল লাগল। এই প্রথম অনুকে অনেক দিন পর মনে পড়ল। চোখ ফেটে জল গড়ালো। মা কেঁদে কেটে অস্থির। চলে এলাম আমেরিকা। যখন আসলাম কেউ ছিল না রিসিভ করার জন্য। এত রং-বের-ঙের মানুষ। আমার জন্য কেউ নেই। সেই রবীন্দ্রনাথের বীর পুরুষ কবিতার লাইনের মতো।

‘ধু ধু করে যেদিক পানে চাই
কোনখানে জনমানব নাই’

শুরু হলো বাস্তবতা। না কোনো বন্ধু নেই, নেই-মা-বাবা, নেই আত্মীয়-স্বজন। এখানে এসে জানতে পারলাম স্টুডেন্টদের কাজ করার পারমিশন নেই। শুরু হলো অর্থনৈতিক সমস্যা। বাধ্য হয়ে ক্যাশে কাজ শুরু করলাম। কাজ হলো ব্রঙ্ক্রেস একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে। ক্লিনিং কাজ। বিকেল ৪টা থেকে রাত ২টা। সকালে ক্লাসে জয়েন করে বিকেলের মধ্যে রেস্টুরেন্টে চলে যেতাম। সপ্তাহে ৭ দিন কাজ আর ৫ দিন ক্লাস। পেরে উঠছিলাম না। প্রচুর টিউশনি ফি। ছেড়ে দিলাম পড়াশোনা। অ্যাসাইলাম করলাম।

ফাস্ট হেয়ারিং-এর ডেট পড়ল ৩ বছর পর। শুরু হলো জীবনের অন্যরকম লড়াই। ততদিনে সোশ্যাল সিকিরিটি নম্বর পেলাম। মেট্রো প্লাস হেলথ কার্ড পেলাম। টেক্স ফাইল করলাম। কিছুটা নিজেকে গুছিয়ে নিলাম। প্রতিদিন ভাবি পেপারস পেতেই হবে। তাই সব রকমের কাগজ রেডি করছিলাম নিপুন হাতে। এই রেস্টুরেন্টের প্রধান সেপ আজিজ ভাই। তার স্নেহভাজন হওয়ার কারণে আমি ও একজন দক্ষ সেপ হয়ে উঠলাম। এখানকার চা সারা ইউ এস এ বিখ্যাত। কেউ নিউইয়র্ক আসবে অথচ এখানের চা খেয়ে যাবেন না।

এমনটা খুব কম হয়েছে। চা টা আমি বানাই। এই ভালো চা বানানোর সূত্র ধরেই পরিচয় হয় বন্যার সাথে। বন্যা কাজ করে মানহাটন একটা ল ফার্মে। ও শুধু চা পানের জন্যই ও আমাদের রেস্টুরেন্টে আসে। আমাদের মাঝে মাঝে অনেক গল্প হয়। কখনও রাজনীতি কখনও বাংলা সাহিত্য কখনও একসাথের জীবনের পরিকল্পনা। ও খুব ছোট বেলায় আমেরিকা এসেছে। বাংলা সাহিত্য ওর ওরোকম দখল নেই। ও শুনতে চায়। জানতে চাই রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, নজরুলদেরকে।

বন্যাকে জানাই জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেনের কথা। জানাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আজ ও আমার অবসেশন। ওকে বলি সরিষার তেলে শুকনো লঙ্কার ফোঁড়ন দিলে যেমন চোখ ঝাঁজায় তেমন ঝাঁজালো ওর দিন রাতের কাব্য পুতুল নাচের ইতিকথা। বন্যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমার কথা শোনে। ও আধো বাঙলায় আমাকে শুনায় কাহলিল জিবরানের ‘দ্য প্রফেট’। ইতোমধ্যে আমার হেয়ারিংয়ের ডেট চলে আসে। গ্রাউন্ড ভালো হওয়ার কারণে আমার এসাইলাম এক্সেপ্ট হয়। জয় করি।

ওরা বলে গ্রিন কার্ড থ্রি উয়িকের ভেতর পৌঁছে যাবে আমার বাসার এড্রেসে। আমি আর বন্যা ভবিষ্যত পরিকল্পনা করতে থাকি। অলরেডি চারদিক কোভিট-১৯ এর পেনডামিক সিচুয়েশন শুরু হয়ে গেছে। নিউইয়র্ক হট স্পট। চারদিক মৃত্যুর মিছিল। আমি অসুস্থ হতে শুরু করি। কোথায় কিভাবে ইনফেক্টেড হয়েছি জানি না। বন্যাকে বলে দিয়েছি আমার সঙ্গে দেখা হবে না। ও শুনতে চায় না। প্রচুর শ্বাস কষ্ট ফোনে কথা বলতে পারছি না। ও চলে আসে আমার বাসায়।

আমি দরজা খুলি না। কিছুক্ষণ পর ও চলে যায়। আমি অ্যাম্বুলেন্স কল করি। ওরা আমাকে নিয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি আমি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মায়ের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে প্রিয় বাংলাদেশের কথা, আমার প্রিয় শহরের কথা। মনে পড়ে অন দ্য ওয়েতা থাকা গ্রিন কার্ড, মনে পড়ে অনুকে, মনে পড়ে জয়িতাকে মনে পড়ে বন্যাকে। ‘মৈত্রির দেবীর ন হন্যতে’। আমার ভীষণ ভেন্টিলেটর দরকার। আমার বাঁচার আকুতিতে নার্সের চোখে জল। সে আমাকে এই বলে আশ্বাস করে যে, সে আরও একটা মৃত্যুর অপেক্ষা করছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০৯:২৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২০
৩১৮ বার পড়া হয়েছে

জীবন যেখানে যেমন

আপডেট সময় ০৯:২৫:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২০

কান্তা কাবির, নিউইয়র্ক থেকে

সব মানুষেরই একটা নিজস্বতা আছে। আর একলা থাকলে সেটা খুব মনে পড়ে। তবে সেই জায়গা পোড়ায় না বরং নিজেকে নিজের সামনে দাঁড় করায়। সেই ঘরটা যেন দর্পণ, কেমন যেন মসৃণ তল। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী আলোর স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। দর্পণে আলোর প্রতিফলনের জন্যই বিম্বের সৃষ্টি হয়। জীবনটাও অনেকটা তেমনই।

জীবন তার মাঝ বরাবর এসে পুলককে অনেক শিখিয়েছে। সবচেয়ে বেশি যা শিখিয়েছে তা হলো খোলা ময়দানে কাউকে দাঁড় করিয়ে ট্রিগার টেপা। ঠুস-ঠাস গুলি করার নাম ভালোবাসা হতে পারে না। তাই পুলক খুব সহজেই অনুর চলে যাওয়া মেনে তাকে যেতে দিয়েছে। শুধু চোয়াল শক্ত করে নিঃশ্বাসের সঙ্গে কান্না চেপে তাকে বলেছিল, যাচ্ছ যাও শুধু ভালো থেক। যদি ভালো না থাক তবে আমি হিংস্র হব। কথা রেখেছে অনু। সে তার ছোট্ট পরীকে সাথে নিয়ে এখন পর্যন্ত বেশ আছে।

টাইম ফ্লাই করে। এইতো মনে হয় সেদিনের কথা। অথচ বিশ বছর হয়ে গেল। অনুকে প্রথম দেখেছিল পুলক পাড়ার মোড়ের ব্রিজের ওপর। মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল। আর পুলক ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে সিগারেট শেয়ার করছিল। ও না একটু ভুল হয়েছে। ওটা সিগারেট ছিল না। সেই সময়ে সিগারেট এত বেশি বেশি ছিল না। তখন কাগজের প্যাকেটে আকিজ বিড়ি চলত।

আমাদের সিগারেটের হাতে খড়ি আকিজ বিড়ি দিয়ে। তাও লুকিয়ে লুকিয়ে। আর ব্রিজের নিচের জায়গাটা আমাদের চার বন্ধুর জন্য অনেকটা সেফ জোন। পুরো প্যাকেট বিড়ি কেনার পয়সা আমাদের বন্ধুদের ছিল না। ব্যাস সারাদিন ১ টাকা দিয়ে দুইটা বিড়ি কিনতে পারলেই আমরা সুখী ছিলাম। ওটাকেই সুখটান মনে করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেতাম। কি কারণে ওইদিন আমাদের কাছে দিয়াশলাই ছিল না।

যেহেতু ওটা আমার পাড়া, সঙ্গত কারণে আমাকেই পাঠানো হলো ঠাণ্ডা কাকুর দোকান থেকে দেয়াশলাই আনার জন্য। ব্রিজে ওঠা মাত্রই চোখ আটকে গেল কি সাধারণ আবার কি অসাধারণ দুটি মায়াময় চোখ। আমি তখন সবে মাত্র দশম শ্রেণিতে। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়া শুরু করেছি। তখনও শেষ করতে পারিনি। অমিতের লাবন্যকে নিয়ে করা প্রশংসা তখনও আমার চোখে মুখে লেগে আছে।

ঠিক যেন পুলকই বলছে- ‘লাবন্যের সৌন্দর্য সকাল বেলার মতো, তাতে অস্পষ্টতার মোহ নেই। তার সমস্তটা বুদ্ধিতে পরিব্যাপ্ত। অমিতের যেমন বুদ্ধি আছে, ক্ষমা নেই, বিচার আছে, ধৈর্য্য নেই। ও অনেক জেনেছে শিখেছে, কিন্তু শান্তি পায়নি। লাবন্যের মুখে শান্তরূপ দেখেছিল। যে শান্তি হৃদয়ের তৃপ্তি থেকে নয়। যা ওর বিবেচনায় শক্তির গভীরতার অঞ্চল। অনু ঠিক তেমন। অমিতের কি হয়েছিল কতখানি ডুবেছিল তা তখনও জানেনি পুলক। জীবনের মানেই বদলে গিয়েছিল।

জীবনকে ছাঁচে ঢেলে তৈরি করেছিল পুলুক। এরপর কেটে গেল চারটি বছর ভালবাসা আর অভিমানে। কিন্তু জীবনের মোড় বাঁকে বাঁকে বদলায়। অনু আর একদিকে বহমান থাকতে চায়নি। পুলক বাঁধা দেয়নি তাকে যেতে দিল। তবে অনু যে ভালো আছে। দিনশেষে ভালোবাসার মানুষ ভালো থাকুক এটাই কাম্য।

বলাবাহুল্য, পুলকের জীবনে প্রেম এসেছিল সরলরৈখিকভাবে নয় কিছুটা ত্রিকোনমিকভাবে। অনু যাবার পর দিন যাচ্ছিল আর সবকটা দিনের মতোই। ইন্টারমিডিয়েট দুবার ড্রপ করে তৃতীয় বারের মতো আবারও মন দেয় পুলক পড়লেখায়। ভালো রেজাল্টও করে। অনু এখন অনেকটা ফিকে। মায়ের ইচ্ছেতে আবারও নিজেকে প্রস্তুত করে ইউনিভার্সিটির পরীক্ষাগুলোতে। ব্যাপক প্রতিযোগিতা।

রাতদিন এক করে পড়তে হয় ইউনিভার্সিটির ভর্তি গাইড। এরপর চলে আসে সেই কাঙ্খিত দিন । সুযোগ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার। এখানে বন্ধুত্ব হয় জয়িতার সাথে। প্রখর বন্ধুত্ব। জয়িতা আমার দুই ইয়ার নিচে পড়তো। তারপর প্রণয়। জয়ি বলতো আমি নাকি তার হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। ও খুব মজা করে কথা বলতো। চোখে মুখে দুষ্টুমি লেগে থাকতো। আমার ভালোবাসার বাঁশির কম্পাঙ্ক নাকি ২৫ হার্জের উপর ছিল।

এই উচ্চ কম্পাঙ্কের ভালোবাসা তাকে Hypnotized করত। হঠাৎ একদিন জয়ি সিদ্ধান্ত নেয়, তার হিপনোটিজম থেকে সে বেরিয়ে আসবে। তাই বেমালুম ভুলে যায় আমাকে। ইন্টেলিজেন্সে কাজ করা এক আর্মি অফিসারকে বিয়ে করে ফেলে। না কোনো অভিযোগ নেই। শুধু মাঝে মধ্যে অভিমান হয়। অপমান হয়। তবে তা নিজের সাথে নিজের ভাগ্যের কথপোকথনে। জয়ি ভালো থাকুক। ভালোবাসার মানুষগুলোই আমৃত্যু ভালো থাকুক।

জয়ি যাওয়ার পর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসকে মনে হত শ্বশান ঘর। বাবা মাকে রাজি করিয়ে এপ্লাই করি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। কিছুদিন পর ওরা অফার লেটার পাঠিয়ে দেয়। সব কাগজপত্র রেডি করে ভিসার জন্য দাঁড়াই। কেন যেন ভাগ্যদেবতা সুপ্রসন্ন হলেন। পাসপোর্টের গায়ে স্ট্রাচু অভ লেবার্টির একটা সিল লাগল। এই প্রথম অনুকে অনেক দিন পর মনে পড়ল। চোখ ফেটে জল গড়ালো। মা কেঁদে কেটে অস্থির। চলে এলাম আমেরিকা। যখন আসলাম কেউ ছিল না রিসিভ করার জন্য। এত রং-বের-ঙের মানুষ। আমার জন্য কেউ নেই। সেই রবীন্দ্রনাথের বীর পুরুষ কবিতার লাইনের মতো।

‘ধু ধু করে যেদিক পানে চাই
কোনখানে জনমানব নাই’

শুরু হলো বাস্তবতা। না কোনো বন্ধু নেই, নেই-মা-বাবা, নেই আত্মীয়-স্বজন। এখানে এসে জানতে পারলাম স্টুডেন্টদের কাজ করার পারমিশন নেই। শুরু হলো অর্থনৈতিক সমস্যা। বাধ্য হয়ে ক্যাশে কাজ শুরু করলাম। কাজ হলো ব্রঙ্ক্রেস একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে। ক্লিনিং কাজ। বিকেল ৪টা থেকে রাত ২টা। সকালে ক্লাসে জয়েন করে বিকেলের মধ্যে রেস্টুরেন্টে চলে যেতাম। সপ্তাহে ৭ দিন কাজ আর ৫ দিন ক্লাস। পেরে উঠছিলাম না। প্রচুর টিউশনি ফি। ছেড়ে দিলাম পড়াশোনা। অ্যাসাইলাম করলাম।

ফাস্ট হেয়ারিং-এর ডেট পড়ল ৩ বছর পর। শুরু হলো জীবনের অন্যরকম লড়াই। ততদিনে সোশ্যাল সিকিরিটি নম্বর পেলাম। মেট্রো প্লাস হেলথ কার্ড পেলাম। টেক্স ফাইল করলাম। কিছুটা নিজেকে গুছিয়ে নিলাম। প্রতিদিন ভাবি পেপারস পেতেই হবে। তাই সব রকমের কাগজ রেডি করছিলাম নিপুন হাতে। এই রেস্টুরেন্টের প্রধান সেপ আজিজ ভাই। তার স্নেহভাজন হওয়ার কারণে আমি ও একজন দক্ষ সেপ হয়ে উঠলাম। এখানকার চা সারা ইউ এস এ বিখ্যাত। কেউ নিউইয়র্ক আসবে অথচ এখানের চা খেয়ে যাবেন না।

এমনটা খুব কম হয়েছে। চা টা আমি বানাই। এই ভালো চা বানানোর সূত্র ধরেই পরিচয় হয় বন্যার সাথে। বন্যা কাজ করে মানহাটন একটা ল ফার্মে। ও শুধু চা পানের জন্যই ও আমাদের রেস্টুরেন্টে আসে। আমাদের মাঝে মাঝে অনেক গল্প হয়। কখনও রাজনীতি কখনও বাংলা সাহিত্য কখনও একসাথের জীবনের পরিকল্পনা। ও খুব ছোট বেলায় আমেরিকা এসেছে। বাংলা সাহিত্য ওর ওরোকম দখল নেই। ও শুনতে চায়। জানতে চাই রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, নজরুলদেরকে।

বন্যাকে জানাই জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেনের কথা। জানাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আজ ও আমার অবসেশন। ওকে বলি সরিষার তেলে শুকনো লঙ্কার ফোঁড়ন দিলে যেমন চোখ ঝাঁজায় তেমন ঝাঁজালো ওর দিন রাতের কাব্য পুতুল নাচের ইতিকথা। বন্যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমার কথা শোনে। ও আধো বাঙলায় আমাকে শুনায় কাহলিল জিবরানের ‘দ্য প্রফেট’। ইতোমধ্যে আমার হেয়ারিংয়ের ডেট চলে আসে। গ্রাউন্ড ভালো হওয়ার কারণে আমার এসাইলাম এক্সেপ্ট হয়। জয় করি।

ওরা বলে গ্রিন কার্ড থ্রি উয়িকের ভেতর পৌঁছে যাবে আমার বাসার এড্রেসে। আমি আর বন্যা ভবিষ্যত পরিকল্পনা করতে থাকি। অলরেডি চারদিক কোভিট-১৯ এর পেনডামিক সিচুয়েশন শুরু হয়ে গেছে। নিউইয়র্ক হট স্পট। চারদিক মৃত্যুর মিছিল। আমি অসুস্থ হতে শুরু করি। কোথায় কিভাবে ইনফেক্টেড হয়েছি জানি না। বন্যাকে বলে দিয়েছি আমার সঙ্গে দেখা হবে না। ও শুনতে চায় না। প্রচুর শ্বাস কষ্ট ফোনে কথা বলতে পারছি না। ও চলে আসে আমার বাসায়।

আমি দরজা খুলি না। কিছুক্ষণ পর ও চলে যায়। আমি অ্যাম্বুলেন্স কল করি। ওরা আমাকে নিয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি আমি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মায়ের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে প্রিয় বাংলাদেশের কথা, আমার প্রিয় শহরের কথা। মনে পড়ে অন দ্য ওয়েতা থাকা গ্রিন কার্ড, মনে পড়ে অনুকে, মনে পড়ে জয়িতাকে মনে পড়ে বন্যাকে। ‘মৈত্রির দেবীর ন হন্যতে’। আমার ভীষণ ভেন্টিলেটর দরকার। আমার বাঁচার আকুতিতে নার্সের চোখে জল। সে আমাকে এই বলে আশ্বাস করে যে, সে আরও একটা মৃত্যুর অপেক্ষা করছে।