বাংলাদেশ কিভাবে করোনামুক্ত হবে?
রোস্তম মল্লিক
(চীনা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, তাঁরা রোগীর চিকিৎসা দেন একটা মাল্টিডিসিপ্লিনারি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। সেখানে আইসিইউ সুবিধা এবং বক্ষ বিশেষজ্ঞ থাকলেই চিকিৎসা হবে, তা নয়। ওখানে কার্ডিওলজিস্ট ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ থাকবেন। আর তাঁরা প্রথমেই দেখেন করোনা রোগীটির কো-মরবিডিটি আছে কি না। আমরা এটা দেখি অনেকটা দেরিতে। চীনে দ্বিতীয় যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় সেটা হলো, করোনা রোগীর পুষ্টিগত অবস্থা এবং তার মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট আছে কি না। আমাদের রোগীদের অর্ধেক মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। এই ভয় তাড়াতে রোগীদের পুষ্টিগত ও মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট দিতে হবে। উপরন্তু শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা থাকলে দরকার রেসপিরেটরি এক্সারসাইজ। কেবল ফুসফুসের উত্তম অনুশীলন ঘটিয়ে সুফল লাভের অনেক উদাহরণ চীনের রয়েছে।)
আজ কয়েক মাস ধরে পৃথিবীর সব দেশ বিচ্ছিন্ন। যাতায়াত-যোগাযোগ ব্যবস্থাও বন্ধ। কারও সঙ্গেই কারও দেখা নেই। এক কথায় পৃথিবী আজ নিস্তব্ধ। মহাবিশ্বের মহারাষ্ট্রের শক্তিশালী দেশগুলো আজ নিরুপায় স্তব্ধ হয়ে আছে। বুঝতে পারছে না, কী থেকে কী করবে। কখনও কল্পনায়ও আসেনি, পৃথিবীর এরকম অবস্থা হবে। পেরে উঠছে না মহামারী রূপ ধারণ করা করোনাভাইরাসের সঙ্গে। একেকটি দেশ অস্ত্র, বিমান, ওষুধ, অর্থনৈতিক সবকিছুর দিক দিয়েই শক্তিশালী। কিন্তু আজ তাদের শক্তি কোথায়? অস্ত্র-যুদ্ধ ছাড়াই পৃথিবীর সব মানুষ আজ গৃহবন্দি। লাশের মিছিল চলছে, সমাধান খুঁজে বের করতে পারছে না। একটি অদৃশ্য ভাইরাস পৃথক করে দিয়েছে সবকিছু। পরিবার, সমাজ, দেশ, পৃথিবী। মা যেতে পারছে না সন্তানের কাছে। সন্তান পারছে না মায়ের কাছে যেতে। স্ত্রী পারে না স্বামীর কাছে যেতে, কী যে এক করুণ অবস্থা, যা কল্পনাতীত। বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে (২৪ জুন ২০২০) পর্যন্ত ১ হাজার ৫৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে।শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১.২৯ শতাংশ। সর্বশেষ মারা যাওয়া ৩৭ জনের মধ্যে ২৮ জন পুরুষ এবং ৯ জন নারী। এদের মধ্যে হাসপাতালে ৩৪ জন ও বাড়িতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দৈনিক করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে সাড়ে তিন হাজারের উপরে। ঈদের পর থেকেই হু হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশকে পেছনে ফেলে আক্রান্তে শীর্ষ সারিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। মৃত্যুর সারিও দ্রুত দীর্ঘ হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলো নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দুয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে। মৃত্যুর হারও বেড়ে যাবে।
ভাইরোলজিস্ট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেছেন, অধিকাংশ মানুষই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। সঙ্গে মাস্ক নিয়ে ঘুরলেও তা পরছেন না। এখন তো দৈনিক নমুনা পরীক্ষায় ২২-২৩ শতাংশ মানুষের করোনা পজেটিভ পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ হলো পরীক্ষা না হওয়া অনেক সংক্রমিত মানুষ সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নিজের অজান্তেই রোগ ছড়াচ্ছেন। এ ছাড়া এখন তো অনেক আক্রান্তেরই উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে না পারলে করোনাভাইরাস আপনা-আপনি চলে যাবে না। অনেক মানুষ আক্রান্ত হবে, মারা যাবে। দীর্ঘদিন এর ঘানি টানতে হবে। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ এন্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, চলতি জুন মাসে করোনা সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এর জন্য গত ঈদে মানুষের গ্রামের বাড়িতে ছুটে যাওয়াও অনেকাংশে দায়ী। ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে ঈদটা যে যেখানে ছিল সেখানেই উৎযাপন করা দরকার ছিল। সামনে কোরবানির ঈদ। এই ঈদকে কেন্দ্র করে এখানে সেখানে পশুর হাট বসলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমরা সময় পেয়েছি কিন্তু বাধা দিতে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দরকার ছিল সেটা পারিনি। চীনা বিশেষজ্ঞ দল তো বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়ে দিয়েছে, এখানে সমস্যা চিকিৎসায় নয়, সমস্যা ব্যবস্থাপনা অদক্ষতায়। এখন জোন করা হয়েছে। লকডাউন হচ্ছে। কিন্তু রেডজোনের সব মানুষের পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় শুধু জোনিং ও লকডাউন করলে কোনো কাজ হবে না। এদিকে মহামারী বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মাস্ক পরছেন না। পরলেও কথা বলার সময় নামিয়ে কথা বলছেন। কথা বলার সময় মাইক্রো ড্রপলেটের মাধ্যমে দ্রুত করোনা ছড়ায়। এ বিষয়গুলো সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও ভাবতে হবে। কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের সুরক্ষায় বাইরে থেকে এসে কোনো কিছু ধরার আগে গোসল করতে হবে। কিছু ধরলে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। হাত থেকেই নাক, মুখ, চোখে ভাইরাস সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। এরপর সারা পৃথিবীতে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত বিশ্বে সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে করোনায়।
এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে ইতঃপূর্বে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রকৃতপক্ষে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি, ধরন, প্রাদুর্ভাব, বিস্তার ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য এখনও অজানা। এসব তথ্য উদঘাটনের জন্য বিশ্বের বিজ্ঞানীরা সর্বোচ্চ শ্রম দিচ্ছেন। এরপরও ভাইরাসটি সম্পর্কে খুব বেশি জানা সম্ভব হয়নি। কোভিড-১৯-এর প্রতিষেধক এবং রোগটির চিকিৎসার ওষুধ উদ্ভাবনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলছে ব্যাপক গবেষণা। সারা বিশ্বের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে করোনাভাইরাসের শতভাগ কার্যকর প্রতিষেধক ও ওষুধের জন্য। যতদিন এর উদ্ভাবন না হচ্ছে, ততদিন করোনার আতঙ্ক থেকে মানুষের নিস্তার নেই।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ঢাকার ১৫ হাসপাতাল ও আইসোলেশন সেন্টারে করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসক আছেন ২০৩০ জন, নার্স ২৪৯৩ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আছেন ২২২৯ জন। স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কোভিড মোকাবেলায় এসব হাসপাতালে আরও বেশি চিকিৎসক ও নার্স পদায়ন জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত আক্রান্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ১১২৬ জন, নার্সের সংখ্যা ৯৭২ জন, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ১৪৯৩ জন। তাছাড়া প্রতিদিনই নির্দিষ্ট সংখ্যায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে হাসপাতালগুলোয় একটি সংকটময় পরিস্থিতি থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, একটি দেশে প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ১:০.৫৬। চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালে তাদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি নার্স থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে অপ্রতুল নার্স দিয়ে চলছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত। এরপরও নার্সরা যথাসাধ্য সেবা দিলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আছে। দেশের নার্সিং ব্যবস্থাকে উন্নত করতে পারলে স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন আনা যাবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফেরি সংখ্যা ভারতে ২৪ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪ দশমিক ৬, নেপালে ৬ দশমিক ৭ এবং বাংলাদেশে ৬ দশমিক শূন্য ৬ জন।এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতা নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন (স্বানাপ)-এর মহাসচিব ইকবাল হাসান সবুজ বলেন, রাজধানীর মহানগরসহ অনেক হাসপাতালে চিকিৎসকের চেয়ে নার্সের সংখ্যা কম। মহানগর হাসপাতালে নার্স আছেন মাত্র ৪৫ জন। এদের মধ্যে একটি অংশ সব সময় আইসোলেশনে থাকেন। বাকিদের তিন শিফটে ভাগ করে কাজ করতে হয়। এতে অনেকেরই এক দিনে দুই শিফট কাজ করতে হচ্ছে। ফলে তাদের পক্ষে সর্বোচ্চ সেবা দেয়া সম্ভব হয় না। এই নার্স নেতা বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার নার্স নিয়োগ প্রদান করেছেন। যাদের কোভিড হাসপাতালে সংযুক্ত দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি মহল অর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বেশিরভাগ নার্স ঢাকার বাইরে পদায়ন করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি যে দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগ হয়েছে তার মধ্যে একটি বড় অংশ বসুন্ধরা হাসপাতালে ও সিটি কর্পোরেশন হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। ঢাকার ১৪টি কোভিড হাসপাতালে স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক সংযুক্তি দিয়ে বাকিদের প্রত্যেক জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নিযুক্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি (এফডিআরএস)- এর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কোভিড নিয়ে একটি অব্যবস্থাপনা চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী পদায়ন করা হচ্ছে না। ফলে একটি সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এতে অনেক স্থানে চিকিৎসকরাও সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি অবিলম্বে এই সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আইসিইউ পরিচালনায় ডাক্তার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে জানা গেছে। প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় রোগীই মারা যাচ্ছেন শ্বাসকষ্টের শিকার হয়ে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীদের প্রয়োজন হয় আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্তিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনায় আক্রান্ত শতকরা ২০ জনের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসার দরকার হয়। এর মধ্যে ১০-১৫ ভাগের দরকার হয় অক্সিজেনের। তাদের পাঁচ থেকে ১০ ভাগের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়। তাদের জন্য আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়। এই আইসিইউ পরিচালনা করার জন্যই এনেসথেসিওলজিস্ট প্রয়োজন। এ ছাড়া অন্যরা এটি পরিচালনা করতে পারেন না। ন্যূনতম ছয় মাস থেকে এক বছরের প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ আইসিইউ পরিচালনা করতে পারবেন না। সরকারি চাকরিতে এনেসথেসিওলজিস্টের অভাবের কারণেই বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় আইসিইউ স্থাপন ও পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি। সরকারি হিসাবমতে, সারা দেশের কোভিড-১৯-এর জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ শয্যা আছে ৩৪১টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহে করোনা রোগীর সংখ্যা অর্ধলক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই তুলনায় আইসিইউ শয্যা খুবই কম। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা বিষয়ে গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ কিছু করেছে। সরকারের কাছে করা ওই সুপারিশে এনেসথেসিওলজিস্ট নিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, করোনা রোগীদের সেবার জন্য আইসিইউ সুবিধা বাড়াতে হবে। রোগীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অক্সিজেন দিতে ভেন্টিলেটর বাড়াতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই এটা দিক নির্দেশ করছে যে আমরা আরও খারাপ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রশ্ন হলো আজকে কেন এই অবস্থা? যেসব স্বাস্থ্যবিধি জনগণের মানা উচিত, সেগুলো মানা হয়নি। জীবন ও জীবিকার তাগিদের কথা এসেছে। বাংলাদেশে লকডাউন সার্বিকভাবে কখনোই হয়নি। সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ করা হয়েছিল, এরমধ্য ঈদ গেল। এই ৬৭ দিনেও তারা স্বাস্থ্যবিধি মানেনি। আমরা একটু দেরি করে গণপরিবহন খোলার কথা বলেছিলাম। কিন্তু একটু আগে খোলা হয়েছে। উপরন্তু আমরা এখনো স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। সচেতন হচ্ছি না। রাষ্ট্রকে আদেশ জারি করলেই হবে না, সেটা তাকে অবশ্যই এনফোর্স বা কার্যকর করতে হবে। কোনো আদেশ বা সিদ্ধান্ত জারির পরে সেটাকে বাস্তবায়ন করতে যে পদ্ধতি লাগে, অবশ্যই সেই পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে। লকডাউন করে সুফল যা আমরা পেতে পারতাম, সেটাই পাইনি। সেই সময় চলে গেছে। কারণ, সমাজে ব্যাপক সংক্রমণ ঘটে গেছে। এখন জোনিং করতে গিয়ে আমরা রাজধানী ঢাকার কথাই বেশি মনে রাখছি অথচ পুরো দেশকেই বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ছুটির মধ্যে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত আমরা এর আগে দেখেছি। উপরন্তু অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি যে যাদের উপসর্গ আছে, এমনকি তাদের জন্যও টেস্ট এখনো সহজলভ্য নয়। ঢাকার বাইরে কী ঘটছে, সেটা বলার জন্য যে তথ্য জানা থাকা দরকার, সেটা জানা নেই। টেস্ট–সংক্রান্ত যেসব তথ্য প্রকাশ্যে দ্রুত আসা দরকার, সেটাও আসছে না। তিন দিন আগে যার নমুনা নেওয়া হয়েছে, তার তথ্য আজকের তথ্যের মধ্যে মেশানো অবস্থায় জেনে আমার লাভ নেই। গতকালের সঙ্গে আজকের ব্যবধানটি কী, সেটা জানা–বোঝা খুবই জরুরি।অতিমারির সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা বাড়ছে। মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, চূড়ান্ত পর্যায়ে যারা সামলাতে পারছে না, তারা আত্মহননের পথও বেছে নিচ্ছে। আমার মনে হয়, ব্যক্তিগতভাবে আমার মতো অনেকেই কোভিডের সংক্রমণের ভয়ে ভীত বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। যার প্রভাব আমাদের সামাজিক জীবনেও পড়ছে। এবং তা যে প্রাতিষ্ঠানিক আচার-আচরণকে প্রভাবিত করবে না, তা বলা যায় না। স্বাস্থ্যসেবা লাভের ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো আমরা দেখছি। চিকিৎসকদের সুরক্ষা সরকারি ও বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তেমনি সাধারণ লোকজন যেন নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত বোধ করে, তার উপায় সরকারকে দ্রুত বের করতে হবে। যেমন ওই লক্ষ্যে কিছু ওষুধ, প্লাজমা ব্যবহার, অক্সিজেনের ঘাটতি মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে তাঁরা রোগীর চিকিৎসা দেন একটা মাল্টিডিসিপ্লিনারি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। সেখানে আইসিইউ সুবিধা এবং বক্ষ বিশেষজ্ঞ থাকলেই চিকিৎসা হবে, তা নয়। ওখানে কার্ডিওলজিস্ট ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ থাকবেন। আর তাঁরা প্রথমেই দেখেন করোনা রোগীটির কো-মরবিডিটি আছে কি না। আমরা এটা দেখি অনেকটা দেরিতে। চীনে দ্বিতীয় যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটা হলো করোনা রোগীর পুষ্টিগত অবস্থা এবং তার মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট আছে কি না। আমাদের রোগীদের অর্ধেক মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। এই ভয় তাড়াতে রোগীদের পুষ্টিগত ও মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট দিতে হবে। উপরন্তু শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা থাকলে দরকার রেসপিরেটরি এক্সারসাইজ। কেবল ফুসফুসের উত্তম অনুশীলন ঘটিয়ে সুফল লাভের অনেক উদাহরণ চীনের রয়েছে। এখন চীনাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরাও কাজ শুরু করেছি। এটা করতে পারলে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমিয়ে ফেলা সম্ভব। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি দুই হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার। প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে আটটি শয্যা। এই দিয়ে তো আমি প্রত্যাশিত স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা দাঁড় করাতে পারব না। বিকেন্দ্রীকরণ লাগবে। এখন তো বরাদ্দকৃত বাজেটই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি ১০০ জন কর্মীর জন্য বাজেট দিচ্ছি। কিন্তু এর মধ্যে ২০ ভাগ পদ শূন্য। সুতরাং এই ২০ ভাগের জন্য বাজেটের বরাদ্দ খরচ করা যায় না। স্বাস্থ্য বিভাগে প্রচুর শূন্য পদ, সেই সঙ্গে আরও নতুন পদ সৃষ্টি করতে হবে। নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অতীতে পদ সৃষ্টি করা ছাড়াই অনেক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে
বাংলাদেশের চেয়ে যদিও মাথাপিছু আয় তাদের বেশি। কিন্তু লকডাউনের এক মাসের মধ্যেই মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। সামাজিক দূরত্বের শর্ত শ্রমজীবীদের দ্বারাই বেশি লঙ্ঘিত হয়। সেখানে সংক্রমণ (প্রায় দুই লাখ আক্রান্ত, ৫ হাজারের বেশি মৃত্যু) বাড়ে। তার প্রতিবেশী ব্রাজিল সরকার তো তার ঔদাসীন্যের (৩৫ হাজার মৃত্যু) জন্য বেশ সমালোচিত। আপনি যেটা বললেন, সেখানে দেখার বিষয় হলো তিন দেশেই প্রান্তিক মানুষদের ঘর থেকে বেরোতে হচ্ছে। তাই পেরু ও ব্রাজিলের মতোই এই অঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ শ্রমজীবীদের এলাকাগুলো ঝুঁকিতে থাকবে। আমাদের দেশে যাতে তেমনটা না ঘটে, সে জন্য সরকার, স্বেচ্ছাসেবী ও এনজিওগুলোর তরফে সতর্কতা কাম্য। একজন ফিলিপাইনের স্বাস্থ্যকর্মী এক জুম সভায় বলছিলেন, তাঁরা সতর্ক থাকছেন, ইতালি বা যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় যেভাবে স্পাইক (এক লাফে সংক্রমণ অনেক উঁচুতে ওঠা) হয়েছে, সেটা যাতে না ঘটে। আমরা যদি প্রান্তিক মানুষকে খাদ্য দিই, স্বাস্থ্যসচেতন রাখি, তাহলে আমরা উল্লম্ফন রোধ করতে পারব।
সোয়াইন ফ্লুর সময়ও বলা হয়েছিল, ল্যাবে যারা সংক্রমিত বলে প্রমাণিত, তার বাইরে আছে কমপক্ষে ১০ ভাগ। সেটার হার ছিল ১.৫ ভাগ। এটাকে বলে রিপ্রডাকটিভ ফ্যাক্টর। উহানে কোভিডে এই হার ছিল ২.৫ ভাগ। বাংলাদেশে এটা এখনো ১.২৫ ভাগ। এখন স্ব-উদ্যোগ নাগরিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও আত্মরক্ষার বাস্তবিক প্রয়োগই পারে করোনামুক্ত বাংলাদেশ উপহার দিতে।
লেখক- সাংবাদিক,কলামিষ্ট
















