০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সব বরাদ্দ শহরে ধুঁকছে গ্রাম

প্রতিনিধির নাম:

গত রবিবার বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় বরগুনা সদর উপজেলার ৭ নম্বর ঢলুয়া ইউনিয়নের ডালভাঙা গ্রামের বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদের। ৩ জুলাই ঢাকার একটি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মারা যান কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার দক্ষিণ সতানন্দি গ্রামের রুমা আক্তার। এর আগে ৯ আগস্ট পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যান বালিহারি গ্রামের বাসিন্দা আসমা আক্তার (৩০)।

শুধু এ তিনজনই নয়, চলতি বছর জানুয়ারি মাস থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) পর্যন্ত দেশের গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ৩৮ হাজার ৪৬৬ জন। এ সময় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৫২ হাজার ৮৮৫ জন। সেই হিসাবে ৭৩ শতাংশ ডেঙ্গু আক্রান্তই সিটি করপোরেশনের বাইরের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা দেখানো হয়, তার বেশিরভাগ অন্যান্য এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হয় বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে সিটি করপোরেশন। অথচ ডেঙ্গুর বাহক এডিস বা অন্য কোনো মশক নিধনের যত কার্যক্রম আছে তার সবকিছু শহরকেন্দ্রিক। জনসচেতনতা বা মশার ওষুধ ছিটানো যত কাজ আছে, সবই শহরকেন্দ্রিক। যে শহর যত উন্নত, সেই শহরে মশা মারার বাজেট তত বেশি। রাজধানী ঢাকার মশা মারতে চলতি বছর ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ৯ বছরে এ খাতে খরচ হয়েছে ৭০৭ কোটি টাকা। এর বাইরে চট্টগ্রাম, গাজীপুর,নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় মশা মারতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। মোটামুটি জনবল ও সরঞ্জামও রয়েছে। এর বাইরে পৌরসভাগুলোতে কিছু কার্যক্রম রয়েছে। তবে জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে সব পৌরসভা মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে পারেনি।

 

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু একসময় শহরের রোগ মনে করা হতো। এ রোগে শহরেই আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হতো। কিন্তু এটি আর শহরে সীমাবদ্ধ নেই। সারা দেশেই ছড়িয়ে গেছে। এজন্য মশক নিধন কর্মসূচি শুধু শহরকেন্দ্রিক চিন্তা করলে হবে না। গ্রাম পর্যায়েও মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল (৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ৫২ হাজার ৮৮৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৪১৯ জন। সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩৮ হাজার ৪৬৬ জন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে ২২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ১১০ জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার এবং ৩১ জন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার। এর বাইরে যারা মারা গেছে সবাই সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরের। বরিশালে ৩২, চট্টগ্রামে ২৫, রাজশাহীতে ১০, ময়মনসিংহে ৭, খুলনায় ৬ এবং ঢাকায় (সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকা) ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

 

এ বছর শুরুর দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম ছিল। এমনকি বর্ষা শুরুর পরও তেমন প্রকোপ ছিল না। কিন্তু বিলম্বিত বর্ষায় ডেঙ্গু চোখ রাঙাচ্ছে। গত ১ মাস ৯ দিনে ডেঙ্গুতে ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার আগের আট মাসে তা ছিল ১২২ জন। ডেঙ্গুর প্রকোপ আগামী মাসে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

সাধারণত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মানুষ শহরের চিকিৎসা নিতে যায়। রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলে ঢাকায় নিয়ে যায়। যে কারণে পরিসংখ্যানে ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন  বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় বড় হাসপাতাল ডিএসসিসি এলাকায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, মুগদা হাসপাতাল বা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মতো বড় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগী আসছে। অন্যান্য রোগীর পাশাপাশি ডিএসসিসি এলাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীও আসছে।

 

তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলেই চিকিৎসকরা ঢাকায় রেফার্ড করেন। এর মধ্যে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। মৃত্যুর সেই তথ্য প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। সেই তথ্য যোগ করে ডিএসসিসি এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।

 

কোনো কর্মসূচি নেই গ্রামে :

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (ইউনিয়ন পরিষদ-১) মো. নূরে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণত একসঙ্গে বরাদ্দ দেওয়া হয়। মশক নিধনের জন্য আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হয় না। কোনো এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি হলে বা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন মনে করলে বাজেট থেকে এ খাতে খরচ করতে পারে।

সিটি করপোরেশনগুলো হচ্ছে অন্দরমহলের মতো। আর গ্রাম হচ্ছে বাহির মহল। সবাই অন্দরমহল নিয়ে ব্যস্ত। শহর ছাপিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত প্রশাসনও। বিস্তৃত এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কী কৌশল হতে পারে, তা ভেবে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার অতিরিক্ত সচিব মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, সিটি ও পৌরসভার বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণে জনবল কাঠামো নেই। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে সরকার চিন্তা করছে।

 

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, শুধু এডিস মশা দিয়েই ডেঙ্গু ছড়ায় না। যেখানে এডিস মশা রয়েছে এবং ডেঙ্গু রোগী রয়েছে সেখানে ডেঙ্গু বিস্তার হবে। তাই শহর বা গ্রাম না দেখে যেখানে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে, সেখানেই মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা উচিত। যেহেতু সারা দেশেই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে, তাই সব এলাকা নিয়েই ভাবতে হবে। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় আগামী মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।

ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয় ২০০০ সাল থেকে। এরপর গত ২৫ বছরে ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ডেঙ্গু একসময় ছিল শুধু বর্ষার অসুখ। এখন সারা বছরই ডেঙ্গু হয়। শহরের মতো এখন বর্জ্য জমা হয় গ্রামেও। এ অবস্থায় সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে বাজেট ও জনবলের কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান  বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে এমনিতেই বাজেট খুবই অপ্রতুল থাকে। এখনে মশক নিধন বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো তেমন গুরুত্ব পায় না। কিন্তু বর্তমানে গ্রামের অনেক এলাকাতেই শহরের মতো বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করলে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

 

তিনি বলেন, ডেঙ্গু গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই আশঙ্কা করে আসছিলাম। কেননা মশা এক জায়গায় বসে থাকার মতো প্রাণী না। তাছাড়া আক্রান্ত রোগীরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছেন। যে কারণে ডেঙ্গু এখন সারা দেশের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডিস মশা গ্রামে ছড়ালে বিপদ আরও বেশি। একদিকে যেমন মশক নিধন কর্মসূচি বা সচেতনতা নেই, অন্যদিকে পুকুর, ডোবা, নালাসহ মশার বংশ বিস্তারের উপাদানের অভাব নেই। তাই এখন থেকেই ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে সারা দেশের মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

 

কীটতত্ত্ববিদ ড. জিএম সাইফুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে কমবেশি জনবল থাকলেও বাইরের বিশাল এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণে কোনো জনবল নেই। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। মশক নিবারণী পরিদপ্তরকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তা না হলেও অন্য বিকল্প চিন্তা করতে হবে। কেননা বাংলাদেশের মতো আবহাওয়ার দেশগুলোতে এডিস মশার প্রজনন থাকবে। সিটি ও পৌর এলাকার বাইরের জনগণও এ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। তাই এডিস মশার হাত থেকে বাঁচাতে শহর-গ্রামে সমানভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০২:৩০:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
২৩৩ বার পড়া হয়েছে

সব বরাদ্দ শহরে ধুঁকছে গ্রাম

আপডেট সময় ০২:৩০:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫

গত রবিবার বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় বরগুনা সদর উপজেলার ৭ নম্বর ঢলুয়া ইউনিয়নের ডালভাঙা গ্রামের বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদের। ৩ জুলাই ঢাকার একটি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মারা যান কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার দক্ষিণ সতানন্দি গ্রামের রুমা আক্তার। এর আগে ৯ আগস্ট পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যান বালিহারি গ্রামের বাসিন্দা আসমা আক্তার (৩০)।

শুধু এ তিনজনই নয়, চলতি বছর জানুয়ারি মাস থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) পর্যন্ত দেশের গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ৩৮ হাজার ৪৬৬ জন। এ সময় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৫২ হাজার ৮৮৫ জন। সেই হিসাবে ৭৩ শতাংশ ডেঙ্গু আক্রান্তই সিটি করপোরেশনের বাইরের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা দেখানো হয়, তার বেশিরভাগ অন্যান্য এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হয় বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে সিটি করপোরেশন। অথচ ডেঙ্গুর বাহক এডিস বা অন্য কোনো মশক নিধনের যত কার্যক্রম আছে তার সবকিছু শহরকেন্দ্রিক। জনসচেতনতা বা মশার ওষুধ ছিটানো যত কাজ আছে, সবই শহরকেন্দ্রিক। যে শহর যত উন্নত, সেই শহরে মশা মারার বাজেট তত বেশি। রাজধানী ঢাকার মশা মারতে চলতি বছর ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ৯ বছরে এ খাতে খরচ হয়েছে ৭০৭ কোটি টাকা। এর বাইরে চট্টগ্রাম, গাজীপুর,নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় মশা মারতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। মোটামুটি জনবল ও সরঞ্জামও রয়েছে। এর বাইরে পৌরসভাগুলোতে কিছু কার্যক্রম রয়েছে। তবে জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে সব পৌরসভা মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে পারেনি।

 

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু একসময় শহরের রোগ মনে করা হতো। এ রোগে শহরেই আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হতো। কিন্তু এটি আর শহরে সীমাবদ্ধ নেই। সারা দেশেই ছড়িয়ে গেছে। এজন্য মশক নিধন কর্মসূচি শুধু শহরকেন্দ্রিক চিন্তা করলে হবে না। গ্রাম পর্যায়েও মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল (৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে ৫২ হাজার ৮৮৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৪১৯ জন। সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩৮ হাজার ৪৬৬ জন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে ২২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ১১০ জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার এবং ৩১ জন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার। এর বাইরে যারা মারা গেছে সবাই সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরের। বরিশালে ৩২, চট্টগ্রামে ২৫, রাজশাহীতে ১০, ময়মনসিংহে ৭, খুলনায় ৬ এবং ঢাকায় (সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকা) ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

 

এ বছর শুরুর দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম ছিল। এমনকি বর্ষা শুরুর পরও তেমন প্রকোপ ছিল না। কিন্তু বিলম্বিত বর্ষায় ডেঙ্গু চোখ রাঙাচ্ছে। গত ১ মাস ৯ দিনে ডেঙ্গুতে ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার আগের আট মাসে তা ছিল ১২২ জন। ডেঙ্গুর প্রকোপ আগামী মাসে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

সাধারণত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মানুষ শহরের চিকিৎসা নিতে যায়। রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলে ঢাকায় নিয়ে যায়। যে কারণে পরিসংখ্যানে ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন  বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় বড় হাসপাতাল ডিএসসিসি এলাকায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, মুগদা হাসপাতাল বা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মতো বড় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগী আসছে। অন্যান্য রোগীর পাশাপাশি ডিএসসিসি এলাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীও আসছে।

 

তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলেই চিকিৎসকরা ঢাকায় রেফার্ড করেন। এর মধ্যে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। মৃত্যুর সেই তথ্য প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। সেই তথ্য যোগ করে ডিএসসিসি এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।

 

কোনো কর্মসূচি নেই গ্রামে :

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (ইউনিয়ন পরিষদ-১) মো. নূরে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণত একসঙ্গে বরাদ্দ দেওয়া হয়। মশক নিধনের জন্য আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হয় না। কোনো এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি হলে বা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন মনে করলে বাজেট থেকে এ খাতে খরচ করতে পারে।

সিটি করপোরেশনগুলো হচ্ছে অন্দরমহলের মতো। আর গ্রাম হচ্ছে বাহির মহল। সবাই অন্দরমহল নিয়ে ব্যস্ত। শহর ছাপিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত প্রশাসনও। বিস্তৃত এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কী কৌশল হতে পারে, তা ভেবে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সরকার অতিরিক্ত সচিব মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, সিটি ও পৌরসভার বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণে জনবল কাঠামো নেই। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে সরকার চিন্তা করছে।

 

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, শুধু এডিস মশা দিয়েই ডেঙ্গু ছড়ায় না। যেখানে এডিস মশা রয়েছে এবং ডেঙ্গু রোগী রয়েছে সেখানে ডেঙ্গু বিস্তার হবে। তাই শহর বা গ্রাম না দেখে যেখানে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে, সেখানেই মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা উচিত। যেহেতু সারা দেশেই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে, তাই সব এলাকা নিয়েই ভাবতে হবে। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় আগামী মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।

ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয় ২০০০ সাল থেকে। এরপর গত ২৫ বছরে ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ডেঙ্গু একসময় ছিল শুধু বর্ষার অসুখ। এখন সারা বছরই ডেঙ্গু হয়। শহরের মতো এখন বর্জ্য জমা হয় গ্রামেও। এ অবস্থায় সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে বাজেট ও জনবলের কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান  বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে এমনিতেই বাজেট খুবই অপ্রতুল থাকে। এখনে মশক নিধন বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো তেমন গুরুত্ব পায় না। কিন্তু বর্তমানে গ্রামের অনেক এলাকাতেই শহরের মতো বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করলে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

 

তিনি বলেন, ডেঙ্গু গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই আশঙ্কা করে আসছিলাম। কেননা মশা এক জায়গায় বসে থাকার মতো প্রাণী না। তাছাড়া আক্রান্ত রোগীরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছেন। যে কারণে ডেঙ্গু এখন সারা দেশের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডিস মশা গ্রামে ছড়ালে বিপদ আরও বেশি। একদিকে যেমন মশক নিধন কর্মসূচি বা সচেতনতা নেই, অন্যদিকে পুকুর, ডোবা, নালাসহ মশার বংশ বিস্তারের উপাদানের অভাব নেই। তাই এখন থেকেই ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে সারা দেশের মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

 

কীটতত্ত্ববিদ ড. জিএম সাইফুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে কমবেশি জনবল থাকলেও বাইরের বিশাল এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণে কোনো জনবল নেই। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। মশক নিবারণী পরিদপ্তরকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তা না হলেও অন্য বিকল্প চিন্তা করতে হবে। কেননা বাংলাদেশের মতো আবহাওয়ার দেশগুলোতে এডিস মশার প্রজনন থাকবে। সিটি ও পৌর এলাকার বাইরের জনগণও এ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। তাই এডিস মশার হাত থেকে বাঁচাতে শহর-গ্রামে সমানভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।