‘টুডে উই আর ইন এ ট্রাই-পোলার ওয়ার্ল্ড’ (আমরা এখন তিন বলয়ে বিভক্ত বিশ্বের বাসিন্দা)। কথাটা মার্কিন যৌথ বাহিনী প্রধান জেনারেল মার্ক মিলির। ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি তিনি এ কথা বলেছেন।
৩০ বছর ধরে যারা বিশ্বকে ইউনিপোলার বা এক মেরু ভেবে এসেছে, এই স্বীকারোক্তিতে তাদের ভ্রু কোঁচকাতে পারে বৈকি। তিন বলয় মানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। জেনারেল মিলির হিসাবে অবশ্য একটা ভুল আছে, তিনি চতুর্থ একটি সম্ভাব্য বলয়ের কথা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। আর সেটি হলো তথাকথিত তৃতীয় বিশ্ব, যা এখন ‘গ্লোবাল সাউথ’ নামে পরিচিত। বাংলায় আমরা বলতে পারি ‘বৈশ্বিক দক্ষিণ’। ইউক্রেনে রুশ আক্রমণকে ঘিরে যে মেরুকরণ ঘটেছে, তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বিশ্বরাজনীতির এই চতুর্থ স্তম্ভটি জমাট বাঁধতে শুরু করে।
এক থেকে দুই
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, সারা বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাবলয়ে চলে এসেছে। এর আগে দুর্বল হয়ে গেলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে থাকতে তাকে দ্বিতীয় পরাশক্তি হিসেবে মানা হতো। নব্বই দশকের গোড়ায় নতুন ও খণ্ডবিখণ্ড রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তাকে পরাশক্তি হিসেবে কেউ গায়ে মাখত না। তার পারমাণবিক ভান্ডার ছিল বটে, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এতটাই কাবু করে ফেলেছিল যে, সে পরাশক্তির মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। সোভিয়েত ব্যবস্থার পতনের কারণেই এক মার্কিন পণ্ডিত ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ঘোষণা করেছিলেন, যার মোদ্দাকথা ছিল, পশ্চিমা মূল্যবোধ ও রাজনীতির বিজয় হয়েছে। ২০ বছর না যেতেই নতুন করে হিসাব কষতে হলো। প্রেসিডেন্ট পুতিন সেই রাশিয়াকে শুধু আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেননি, পশ্চিমের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অবস্থায় নিয়ে আসেন। ফলে পৃথিবীর কর্তা আর এক নয়, দুইয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু গোল বাঁধল রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে।
এই আগ্রাসী অভিযান শুরুর আগে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটে প্রচ্ছন্ন বিভক্তি ছিল। কোনো কোনো ইউরোপীয় দেশ, বিশেষত ফ্রান্স, ওয়াশিংটনের ছাতা থেকে বেরিয়ে আন্ত–ইউরোপীয় জোট গঠনে আগ্রহী হয়ে উঠে। গত ২০ বছরে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভেতরে-বাইরে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিশ্বের ‘পুলিশম্যান’ হতে হলে যে কবজির জোর ও পকেটে ডলার চাই, তাতে টান ধরেছিল। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তাকে আরও দুর্বল করে তোলে। এ অবস্থায় একদিকে রাশিয়া নিজের ঘর গুছিয়ে নেয়, অন্যদিকে নতুন পরাশক্তি হিসেবে চীন বিশ্ব মানচিত্রে নিজের স্থান পোক্ত করে।

















