০৯:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে অসন্তোষ: বিআইডব্লিউটিসির ১৩শ’কোটি টাকার প্রকল্পে অযোগ্য কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগের প্রস্তাব!

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসির) ১৩শ’কোটি টাকার বৃহত্তর একটি প্রকল্পে অযোগ্য কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করায় কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগেও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ১ হাজার ৩ শত ১৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫ টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ ও দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের পিডি সৈয়দ মো. তাজুল ইসলামকে (অতিরিক্ত সচিব) সরকার অন্যত্র বদলি করায় নতুন পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে এই জটিলতা।

নৌ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পিডি নিয়োগের জন্য বিআইডব্লিউটিসি যে তিন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব দিয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে তাদের মধ্যে দু’জনের কোনো পূর্বঅভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া তাদের মধ্যে একজন বিআইডব্লিউটিসির নৌ-অধীক্ষক ‘ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ হাশেমুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ কেনো বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’- এই মর্মে সরকারের ওপর উচ্চ আদালতের রুলনিশি রয়েছে। এই নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই পদে নিয়োগ প্রত্যাশী আবু হায়াৎ আশরাফুল আলমের করা রিট পিটিশনটির চূড়ান্ত নিস্পত্তির আগে পিডি হিসেবে হাশেমুর রহমান চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করায় বিআইডব্লিউটিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি মহল হাশেমুর রহমান চৌধুরীকে পিডি নিয়োগের চেষ্টা করছেন। তবে সর্বশেষপ্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নৌ প্রতিমন্ত্রী এ সংক্রান্ত ফাইলে এখনো অনুমোদন দেননি।

এ বিষয়ে নৌ প্রতিমন্ত্রী বরাবর মঙ্গলবার একটি চিঠি দিয়েছেন নদ-নদী ও নৌ পরিবহনবিষয়ক লেখক আশীষ কুমার দে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও নৌ প্রতিমন্ত্রী- দু’জনই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিতে অটল, সেহেতু এ অবস্থায় তাকে এতোবড় প্রকল্পের পিডি কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া সঠিক হবে না। তবে উচ্চ আদালত রিট পিটিশনটি নিস্পত্তি করে নিয়োগের বৈধতা দিলে হাশেমুর রহমানকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। তখন তিনি সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

বিআইডব্লিউটিসি থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংস্থার পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান ও মহাব্যবস্থাপক (মেরিন) বা নৌ-অধীক্ষক হাশেমুর রহমান চৌধুরীর পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই। এর মধ্যে হাশেমুর রহমান গত বছরের জুন মাসে এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তার কর্মঅভিজ্ঞতা মাত্র আট মাস। আশিকুজ্জামান চাকরি করছেন প্রায় সাড়ে ১৬ বছর। প্রস্তাবিত অপর কর্মকর্তা সংস্থার মূখ্য নৌ নির্মাতা মো. জিয়াউল ইসলাম ইতোপূর্বে আলাদা ছয়টি প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তার কর্মঅভিজ্ঞতাও দীর্ঘদিনের।

বিআইডব্লিউটিসি থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হাশেমুর রহমান চৌধুরীর জীবন বৃত্তান্তে দেখা যায়, তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে স্নাতক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে নৌ পরিবহন অধিদফতর থেকে কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট (সিডিসি) নিয়ে মাস্টার মেরিনার (ক্যাপ্টেন) হিসেবে সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি করেছেন। তবে তার নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে করা রিট পিটিশনে বলা হয়েছে, পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বিআইডব্লিউটিসির নৌ-অধীক্ষক পদে নিয়োগের শর্ত ছিল সমুদ্রগামী জাহাজে মাস্টার মেরিনার হিসেবে ন্যুনতম তিন বছর চাকরির অভিজ্ঞতা। কিন্তু নৌ অধিদফতরের সিডিসি অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিসিতে আবেদনের সময় হাশেমুর রহমানের অভিজ্ঞতা ছিল দুই বছর এক মাস।

রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ১৪ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈতবেঞ্চ ‘বিআইডব্লিউটিসির নৌ-অধীক্ষক পদে ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ হাশেমুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ কেনো বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’- মর্মে সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করেন। রিটটি এখন চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও হাশেমুর রহমানের মতো পূর্বঅভিজ্ঞতাহীন একজন কর্মকর্তাকে এতো বড় প্রকল্পের পিডি নিয়োগের প্রস্তাব করায় বিআইডব্লিউটিসির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নৌ সংশ্লিষ্টদের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৬:১৩:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২২
১৮০ বার পড়া হয়েছে

কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে অসন্তোষ: বিআইডব্লিউটিসির ১৩শ’কোটি টাকার প্রকল্পে অযোগ্য কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগের প্রস্তাব!

আপডেট সময় ০৬:১৩:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২২

রোস্তম মল্লিক

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসির) ১৩শ’কোটি টাকার বৃহত্তর একটি প্রকল্পে অযোগ্য কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করায় কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগেও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ১ হাজার ৩ শত ১৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৫ টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ ও দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের পিডি সৈয়দ মো. তাজুল ইসলামকে (অতিরিক্ত সচিব) সরকার অন্যত্র বদলি করায় নতুন পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে এই জটিলতা।

নৌ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পিডি নিয়োগের জন্য বিআইডব্লিউটিসি যে তিন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব দিয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে তাদের মধ্যে দু’জনের কোনো পূর্বঅভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া তাদের মধ্যে একজন বিআইডব্লিউটিসির নৌ-অধীক্ষক ‘ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ হাশেমুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ কেনো বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’- এই মর্মে সরকারের ওপর উচ্চ আদালতের রুলনিশি রয়েছে। এই নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই পদে নিয়োগ প্রত্যাশী আবু হায়াৎ আশরাফুল আলমের করা রিট পিটিশনটির চূড়ান্ত নিস্পত্তির আগে পিডি হিসেবে হাশেমুর রহমান চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করায় বিআইডব্লিউটিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি মহল হাশেমুর রহমান চৌধুরীকে পিডি নিয়োগের চেষ্টা করছেন। তবে সর্বশেষপ্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নৌ প্রতিমন্ত্রী এ সংক্রান্ত ফাইলে এখনো অনুমোদন দেননি।

এ বিষয়ে নৌ প্রতিমন্ত্রী বরাবর মঙ্গলবার একটি চিঠি দিয়েছেন নদ-নদী ও নৌ পরিবহনবিষয়ক লেখক আশীষ কুমার দে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও নৌ প্রতিমন্ত্রী- দু’জনই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিতে অটল, সেহেতু এ অবস্থায় তাকে এতোবড় প্রকল্পের পিডি কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া সঠিক হবে না। তবে উচ্চ আদালত রিট পিটিশনটি নিস্পত্তি করে নিয়োগের বৈধতা দিলে হাশেমুর রহমানকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। তখন তিনি সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

বিআইডব্লিউটিসি থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংস্থার পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান ও মহাব্যবস্থাপক (মেরিন) বা নৌ-অধীক্ষক হাশেমুর রহমান চৌধুরীর পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই। এর মধ্যে হাশেমুর রহমান গত বছরের জুন মাসে এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তার কর্মঅভিজ্ঞতা মাত্র আট মাস। আশিকুজ্জামান চাকরি করছেন প্রায় সাড়ে ১৬ বছর। প্রস্তাবিত অপর কর্মকর্তা সংস্থার মূখ্য নৌ নির্মাতা মো. জিয়াউল ইসলাম ইতোপূর্বে আলাদা ছয়টি প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তার কর্মঅভিজ্ঞতাও দীর্ঘদিনের।

বিআইডব্লিউটিসি থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হাশেমুর রহমান চৌধুরীর জীবন বৃত্তান্তে দেখা যায়, তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে স্নাতক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে নৌ পরিবহন অধিদফতর থেকে কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট (সিডিসি) নিয়ে মাস্টার মেরিনার (ক্যাপ্টেন) হিসেবে সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি করেছেন। তবে তার নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে করা রিট পিটিশনে বলা হয়েছে, পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বিআইডব্লিউটিসির নৌ-অধীক্ষক পদে নিয়োগের শর্ত ছিল সমুদ্রগামী জাহাজে মাস্টার মেরিনার হিসেবে ন্যুনতম তিন বছর চাকরির অভিজ্ঞতা। কিন্তু নৌ অধিদফতরের সিডিসি অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিসিতে আবেদনের সময় হাশেমুর রহমানের অভিজ্ঞতা ছিল দুই বছর এক মাস।

রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ১৪ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈতবেঞ্চ ‘বিআইডব্লিউটিসির নৌ-অধীক্ষক পদে ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ হাশেমুর রহমান চৌধুরীর নিয়োগ কেনো বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না’- মর্মে সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করেন। রিটটি এখন চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও হাশেমুর রহমানের মতো পূর্বঅভিজ্ঞতাহীন একজন কর্মকর্তাকে এতো বড় প্রকল্পের পিডি নিয়োগের প্রস্তাব করায় বিআইডব্লিউটিসির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নৌ সংশ্লিষ্টদের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।