স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির বরপুত্র মোতাজজেরুল ইসলাম মিঠু এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই ‘কাজ শেষ’ ঘোষণা দিয়ে তুলে নিয়ে যান সাড়ে চারশ কোটি টাকা। নামে-বেনামে তার আত্মীয়স্বজনদের নামে অর্ধশত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনিই এখনো স্বাস্থ্য খাতের সব টেন্ডার বাগিয়ে নেন। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেন তিনি। বিদেশে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচারের অভিযোগে পানামা পেপারসে নাম ওঠে মোতাজজেরুল ইসলাম মিঠুর। তিনি শুধু স্বাস্থ্য খাতেরই মাফিয়া নন, অনেক ব্যাংককেও করেছেন ফোকলা। তার কাছে এবি ব্যাংকের পাওনাই প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও নামে-বেনামে স্বজনদের নামে করা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ঋণ নেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো তদন্ত ছাড়াই দেওয়া হয় এই ঋণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাবেক এক মন্ত্রীর হাত ধরে স্বাস্থ্য খাতে উত্থান হয় মিঠুর। ওই সময় থেকে শুরু করে বর্তমানেও স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে রয়েছে তার সখ্য। সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করার যোগ্যতা রয়েছে তার। তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অনেক রথী-মহারথীর নাম বেরিয়ে আসবে, যে কারণে মিঠুকে দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সুুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের মাফিয়াদের ধরতে হলে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কঠোর হতে হবে। কিছুদিন আগে জেএমআইর আবদুর রাজ্জাককে দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। স্বাস্থ্য খাতের বড় মাফিয়া মিঠুকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি, কারণ তিনি আমেরিকায় পালিয়ে আছেন। আমি মনে করি, রাজ্জাক ও মিঠুকে দ্রুত গ্রেফতার করে জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারিতে তাদের “কালো তালিকাভুক্ত” এখনো করা যায়নি। এতে বোঝা যাচ্ছে, তাদের পেছনে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন। মিঠু-রাজ্জাকদের তারা সহযোগিতা করছেন। এই প্রভাবশালীদের উপেক্ষা করে তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’ রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীর পাড়ের বাসিন্দা মোতাজজেরুল ইসলাম মিঠু ১০ বছর আগেও ছিলেন স্থানীয় সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছোটখাটো ঠিকাদার। সাবেক এক মন্ত্রীর হাত ধরে স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারি কাজে প্রবেশ করেই যেন হাতে পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ! দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সর্বনাশ করে এক দশকের ব্যবধানে বনে গেছেন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। হয়েছেন স্বাস্থ্য খাতের ‘একক’ ঠিকাদার। দেশে-বিদেশে মালিক হয়েছেন ডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের। বাবার নামে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণ ছাড়াও নামে-বেনামে মালিক হয়েছেন অঢেল সম্পত্তির। নিজের নামে করেছেন ভিআইপি সড়ক। সরকারের কতিপয় অসৎ মানুষের সঙ্গে যোগসাজশে দেশের টাকা লুটেপুটে এখন বসবাস করছেন নিউইয়র্কের পাশে ব্রংসভিলে দুই মিলিয়ন ডলারে কেনা আলিশান বাড়িতে। অভিযোগ রয়েছে, মোতাজজেরুল ইসলাম মিঠু সিন্ডিকেট টানা বছরের পর বছর ধরে গোটা স্বাস্থ্য খাতে শক্ত জাল বিস্তার করে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ওষুধ প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নার্সিং অধিদফতর, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহে আছে মিঠুর বিশ্বস্ত এজেন্ট। এসব এজেন্টই মিঠুর হয়ে যাবতীয় কর্মকান্ড সম্পাদন করে থাকে। কখনো ওপরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব খাটানো হয়, কখনো অর্থের লেনদেনে করা হয় ‘ম্যানেজ’। দেশের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন মিঠু। গড়ে তুলেছেন বিত্ত-বৈভব। মিঠুর গ্রামের বাড়ি রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহীপুর ইউনিয়নে। তিনি বিদেশে থাকলেও তার ইঙ্গিতেই এখনো চলে স্বাস্থ্য খাত। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুগদা হাসপাতালে ২০১৩-১৪ সালে ৩০০ কোটি টাকার দরপত্রে গরমিলের খবর পাওয়া যায়। ওই কাজটি পায় মিঠুর স্ত্রী নিশাত ফারজানার প্রতিষ্ঠান। দুদক অভিযোগের তদন্তে নামলেও মিঠুর বিরুদ্ধে কোনো দোষ খুঁজে না পেয়ে ২০১৭ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি নথিতে বলা হয়, দুদকের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে মিঠুর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। ওই কর্মকর্তার স্ত্রী, কন্যা ও জামাতা যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।