শ্যালককে দিয়ে করাচ্ছেন ঠিকাদারী ব্যবসা: আওয়ামী লীগের দোসর এখন নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক!
স্টাফ রিপোর্টার:
মাসুদ ভালো হয়ে গেলেও নৌপরিবহন অধিদপ্তর আর ভালো হলো না। এই দপ্তরে নৌ বাহিনী থেকে আসা কমোডর র্যাংকের একজন কর্মকর্তা মহাপরিচালক পদে থাকলেও তিনি কেবলমাত্র প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে অধিদপ্তরটিকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করতে পারছেন না। একই সাধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বতীকালীন সরকারের বয়স ৮ মাস অতিবাহিত হলেও সংস্কারের কোন ছোঁয়া লাগেনি এই অধিদপ্তরে। ফলে গোপালগঞ্জের একটি চক্র এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন অধিদপ্তরের নিয়োগ,বদলী,পদোন্নতি,টেন্ডার,নৌযান সার্ভে, রেজিষ্ট্রেশন,মালিকানা পরিবর্তন ও প্রকল্পের কেনাকাটার কাজ। এসব বিষয় নিয়ে বারবার সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশ হলেও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিব রয়েছেন উদাসীন। ফলে নৌবাহিনী থেকে আসা মহাপরিচালক তার ইচ্ছে খুশিমত ফাইল ওয়ার্ক করছেন। আর তাকে ভুল বুঝিয়ে একটার পর একটা ফাইল স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছেন গোপালগঞ্জের অসাধু চক্রটি।
একাধিক সুত্রে জানাগেছে, বর্তমানে নৌ পরিবহণ অধিদপ্তরে গোপালগঞ্জের একজন কর্মকর্তা অবিশ^স্য দুর্নীতি ও দৌরাত্ম চলছে। তিনি গোটা আওয়ামী লীগ আমলে গোপালগঞ্জের কোটায় লোভনীয় পদে থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। বর্তমানে তিনি সিএনএস পদে কর্মরত। তার কথা বা পরামর্শ মতই চলছে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের যাবতীয় কার্যাবলী। তার মধ্যে মাষ্টারশীপ পরীক্ষা বাণিজ্য ও সিডিসি সনদ বাণিজ্য অন্যতম। তার এই সব দুর্নীতির বিষয়ে গত ৫ বছর ধরে দুদক তদন্ত করছে। কিন্ত বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তিনি গোপালগঞ্জের লোক পরিচয়ে নিরাপদ রয়েগেছেন। দুর্নীতির কারণে তাকে সিএনএস পদ থেকে অপসারণের দাবী তুলেছেন বৈষম্য নিরোধী ছাত্র জনতা।
এই অধিদপ্তরেরই আরেকজন কর্মকর্তা হলেন ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শীপ সার্ভেয়ার আবুল বাশার। তিনি আপদমস্তক একজন নেশাখোর কর্মকর্তা হিসাবে অধিদপ্তরে পরিচিত। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির রিপোর্ট রয়েছে। কোন প্রকার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা না থাকা সত্তেও তাকে ডিএমজিএসএইচ প্রকল্পের পিডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর তিনি পিডির পদে বসেই প্রকল্পের বারোটা বাজানোর জন্য ততপর হয়ে উঠেছেন। সরকারী বিধি বিধান উপেক্ষা করে একটার পর একটা ফাইল আদেশ দিচ্ছেন। ঠিকাদারদের সাথে গড়ে তুলেছেন দহরম মহরম সম্পর্ক। তাদের নিয়ে প্রায় গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে বৈঠক ও গোপন লেনদেন করছেন। মোজ-মাস্তিও করছেন।
সুত্রমতে তিনি পিপিআর এর শর্ত ভংগ করে ঠিকাদারদের কার্যাদেশ ও বিল পরিশোধ করছেন। অতি নিমমানের কাজ হলেও মোটা অংকের কমিশন নিয়ে ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন। প্রকল্প পরিচালক হবার পর তিনি তার আপন শ্যালককে অনুমোদন ছাড়াই কন্ট্রাক্টরি কাজ দিয়েছেন। আওয়ামী লেিগর পক্ষে রচিত তার লিখিত আর্টিকেল এখনো আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে রয়েছে। ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন বলে জানাগেছে। বর্তমানে
ফ্যাসিস্টের সহযোগী জাতীয়় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল হক চুন্নুর ভাগিনা হিসাবে প্রভাব দেখাচ্ছেন আবুল বাশার। এখন তাকে টাকার বিনিময়ে শেল্টার দিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির একজন নেতা। আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর হওয়া সত্তেও তাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক তদবীরে।
এছাড়াও এসআরএম ক্রিয়ে়টিভ ইঞ্জিনিয়ারিং নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়া বিভিন্ন কাজ দিয়েছেন পিডি আবুল বাশার। যে প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহাদাত নামে ভোলা জেলার একজন আওয়ামী লীগ নেতা।
আরো জানাগেছে, একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তা হয়েও প্রায় প্রতিদিন তিনি কোন না কোন বার, ফাইভ স্টার হোটেল অথবা থ্রি স্টার হোটেলে গিয়ে আকন্ঠ মদ পান করেন? অবৈধ স্পা সেন্টারে গিয়ে শরীর ম্যাসাজ বা দেহপসারিনীদের সেবা নেন? সরকারি কর্মচারীর শৃঙ্খলা বিধি মোতাবেক অবশ্যই তিনি এসব অনৈতিক কাজ করতে পারেন না। সারকারী কোন কর্মকর্তা যদি এ ধরনের নোংরা এবং অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন, তবে তিনি অবশ্যই সরকারী চাকুরী শৃংক্ষলা বিধি ভংগের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন এবং তিনি বিভাগীয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এটা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সরকারি কর্মচারীর আচরণ ও শৃঙ্খলা বিধির আইন। কিন্তু সেই আইনকে অবিরাম বৃদ্ধাংগুলি প্রদর্শন করে যাচ্ছেন নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। গত ৫ বছর ধরে তিনি এ ধরণের শৃংক্ষলা ভংগমূলক কাজে লিপ্ত থাকলেও আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর বা নৌ-মন্ত্রণালয়। ফলে তিনি এ ধরনের কর্মকন্ডের সকল মাত্রা অতিক্রম করে এখন শীর্ষে পৌছে গেছেন। তার এ ধরনের নোংরা অপকর্মে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি সহ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। একই সাথে তার সহকর্মীরা এবং অন্যান্য কর্মকর্তারাও বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন।
জানাগেছে, ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতার সুপারিশে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরে ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার পদে চাকুরী পান তিনি। তার গ্রামের বাড়ী ময়মনসিংহ জেলায়। তার বাবা একজন মুদি দোকানদার ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক স্বৈরশাসকের আমলে নিয়োগ পাওয়া সত্ত্বেও এখন তিনি ভোল পাল্টে মস্ত বড় জামাত শিবির এবং বিএনপির পৃষ্ঠপোষক বনে গেছেন।
অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি চট্টগ্রামে (৩৮ তম ব্যাচ) প্রশিক্ষণকালীন সময়ে তিনি কুলাঙ্গার হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তার সময়ে উশৃঙ্খলতার দায়ে বাংলাদেশ এবং মেরিন একাডেমির ইতিহাসে পুরোব্যাচ বহিষ্কৃত হয় । যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই কুলাঙ্গার মো: আবুল বাশার। পুরো ব্যাচের সেই বহিষ্কারের ঘটনায় অধিকাংশ নিরীহ ক্যাডেট অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হন। যার রেশ এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেক ক্যাডেট।
সুত্রগুলো আরো জানায়, স্কুল জীবন থেকেই উশৃঙ্খল ও মাদকাসক্ত মো: আবুল বাশার এখনো মাসে কমপক্ষে ২০ দিন হোটেল সোনারগাঁও/ ইন্টার কন্টিনেন্টাল/ পূর্বাণী/ ঈশা খাঁ/ওয়েস্টিন হোটেলের বার ও ডিস্কোর নিয়মিত কাস্টমার। এছাড়াও ঢাকা শহরের অনেক স্পা, মেসেজ পার্লার ও রেড লাইট এরিয়াতে তার নিয়মিত বিচরণ রয়েছে। তার এই রাবিশ জীবনযাত্রা উপভোগের আর্থিক যোগানদাতারা হচ্ছেন মার্চেন্ট ও ইনল্যান্ড পরীক্ষার চিহ্নিত দালাল আবু সাইদ,রাশেদি,সাগরসহ আরো অনেকে। মার্চেন্টের ক্লাস-১ থেকে ক্লাস-২, ক্লাস-৩ এর মৌখিক পরীক্ষায় তার ঘুষের রেট হচ্ছে যথাক্রমে: ৭ লাখ, ৫, লাখ ও ৩ লাখ টাকা। ইনল্যান্ড তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম শ্রেণীতে ঘুষের রেট যথাক্রমে ৭০ হাজার, ১ লাখ ও ১.৫ লাখ টাকা।
তাছাড়াও আর এক মহা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের সাথে মিলে তিনি পানামা সিডিসি ও স্পেশাল ব্যাচের নাম দিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনকে অবৈধভাবে সিডিসি প্রদান করে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ঘুষ হিসাবে উপার্জন করেছেন। আর সে টাকায় তিনি মাস্তি করে বেড়িয়েছেন। একখানা সেকেন্ডহ্যান্ড টয়োটা গাড়ীও কিনেছেন।
২০১০ সালে বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম জাহাজ এম ভি জাহান মনি (যেটি সোমালিয়ান জলদস্যু দ্বারা অপহৃত হয়েছিলো) জাহাজের দ্বিতীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তিনি সমুদ্রের পানি দ্বারা ইঞ্জিন কুলিং এর ব্যবস্থা করে ইচ্ছেকৃতভাবে ইঞ্জিন নষ্ট করেন। যে কারণে জাহাজ মালিক শাহজাহান তার শিপিং কোম্পানীতে (এস আর শিপিং এ) চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ করেন এই উশৃংখল আবুল বাশারকে। তবে এই রকম ঘটনা তার জীবনে প্রথম নয় একাধিক সূত্র বলছে, সে ক্যাডেট লাইফ থেকেই কোনো কোম্পানিতেই এক বারের পর দ্বিতীয়বার চাকরি করতে পারেননি তার আনপ্রফেশনাল কর্মকান্ডের জন্য। এই ধরনের একজন আন প্রফেশনাল প্রকৌশলী সরকারি চাকরিতে যোগদান করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে গড়ে তুলেছেন এক অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দাতা বর্তমান সিএনএস ক্যাপ্টেন মোঃ গিয়াস উদ্দিন আহমদ।
সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ সম্পত্তি এবং টাকার মালিক হয়েছেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে নামে বেনামে রয়েছে তার ফ্ল্যাট ও প্লট। বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে তার এফডিআর এবং নামে বেনামে প্রচুর টাকা যার উৎস এই সরকারি চাকরি থেকে অবৈধভাবে আয়কৃত।
ছাত্র জনতার লাল রক্তের বিনিময়ে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত নতুন বাংলাদেশে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার মদদপুষ্ট কোন কর্মকর্তা স্বপদে বহাল থেকে বেপরোয়া ভাবে এখনো অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করবে তা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন কাঠামোর কোন কর্মকর্তা মেনে নিবে না। তার এ ধরনের কর্মকান্ডের ফলে বর্তমান সরকারের ক্লিন ইমেজ দারুন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার মো: আবুল বাশার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ সব অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে তার এই বক্তব্য মানতে রাজী নন ভুক্তভোগি মহল। তাদের দাবী: তার নিরপেক্ষ ও পক্ষপাত বিহীনভাবে তদন্ত করলেই উল্লেখিত সকল অভিযোগের সত্যতা মিলবে। এ ক্ষেত্রে তারা নৌ-মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিব ও নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপ কামনা করে তার সকল অপকর্মের তদন্তের দাবী তুলেছেন।











