কাদেরের পঞ্চপাণ্ডব!
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে প্রায় দুই মাস। কিন্তু দলটির ভেতর ও বাইরে এখনো সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে। বিশেষ করে কাদেরের দায়িত্ব পালন করা সড়ক পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়ে ঘুরেফিরে উঠছে তার নানা অপকীর্তির কথা। এসব অপকীর্তির নেপথ্যে মূল ভূমিকায় ছিলেন তারই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মন্ত্রণালয়ের চার কর্মকর্তা ও একজন রাজনৈতিক সচিব। এরা মন্ত্রণালয় এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তারা ওবায়দুল কাদেরের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে টাকার কুমির বনেছেন।
আলোচিত এই পঞ্চপাণ্ডব হলেন ওবায়দুল কাদেরের এপিএস মহিদুল হক (আপেল), রাজনৈতিক সচিব আব্দুল মতিন, পিআরও শেখ ওয়ালিদ, পিও জাহাঙ্গীর আলম ও শুকেন চাকমা। এরা মিলেমিশে গড়ে তোলেন ‘পাঁচ সদস্যের সিন্ডিকেট’। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মন্ত্রণালয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিনিময়ে পাওয়া টাকার পার্সেন্টেজ ভাগাভাগি করে নিতেন তারা।
শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই মেয়াদে দলের মুখপাত্রের ভূমিকা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকা। দলের এই সাধারণ সম্পাদক দলীয় রাজনীতিতে তেমন কোনো ভূমিকা পালন করতে পারতেন না। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়েও তেমন একটা সময় দিতে পারতেন না তিনি। এ সুযোগে রাজনৈতিক সচিব ও মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের সরকারি কাজের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাদের ছিল অবাধ বিচরণ। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সরকারি কাজের পাশাপাশি রাজনৈতিক তদবির করে এককজন বনে গিয়েছেন কয়েক শ কোটি টাকার মালিক।
২০১৯ সালে ওবায়দুল কাদেরের হার্ট অ্যাটাক হয়। সে সময় তার হৃদযন্ত্রে তিনটি ব্লক ধরা পড়ে। এর পর থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি প্রতি মাসে সিঙ্গাপুর যেতেন। সব মিলিয়ে দুটি মন্ত্রণালয় ও রাজনীতিতে উপযুক্ত সময় দিতে পারতেন না কাদের। আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,ওবায়দুল কাদের মন্ত্রণালয়ে যেতে চাইলেও ‘স্যার সব ঠিক আছে, না আসলেও হবে’ এমন কথা বলে তার পিএস ও এপিএসরা তাকে আসতে নিরুৎসাহিত করতেন। এই সুযোগে ওই সিন্ডিকেট সদস্যরা মন্ত্রণালয়কে নিজেদের টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। অর্থের বিনিময়ে মন্ত্রীর সরকারি ‘সিল ও ডিও লেটার’ ব্যবহার করে তারা অবৈধভাবে টাকা কামাতেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মেগা প্রকল্পগুলো ঠিকাদারদের পাইয়ে দেওয়া এবং মন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং করিয়ে দিয়ে কাজের টাকার ওপর পার্সেন্টেজ নিতেন তারা। দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে মেগা দুর্নীতি করেছেন তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল ও চার লেন সড়কের কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা হাতে রেখে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উপকরণ মাটি, বালু, ইট, পাথর, রড সরবরাহের ঠিকাদারদের কাছ থেকেও নিতেন পার্সেন্টেজ। পাশাপাশি সড়ক ও সেতু বিভাগ, অধিদপ্তরগুলোতে টাকার বিনিময়ে কর্মকর্তাদের পদায়ন করতেন এই সিন্ডিকেট সদস্যরা। একই সঙ্গে কাজের বিল নিয়ে নয়ছয়, বিল পাস করিয়ে দেওয়া, পদোন্নতি, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ হেন কোনো কাজ নেই যা তারা করতেন না।
শুধু মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়, রাজনৈতিক পদবি, দলীয় নমিনেশন, অন্য মন্ত্রণালয়ের বদলি-বাণিজ্যও করতেন মহিদুল, মতিন, পিআরও ওয়ালিদ।
সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, তদবিরের বিষয় মন্ত্রীকে (কাদের) প্রস্তাব দিতেন পিআরও ওয়ালিদ। পাশে থাকা মহিদুল ও জাহাঙ্গীর তাতে সায় দিতেন। এভাবে মন্ত্রীকে রাজি করিয়ে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা সরকারি কাজ বাগিয়ে নিতেন। বিনিময়ে কাজের টাকা অনুযায়ী পার্সেন্টেজ পেতেন তারা।
বাকিদের চেয়ে চতুর মতিনওবায়দুল কাদেরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন তার রাজনৈতিক সচিব মতিন হাওলাদার। কাদেরের রেফারেন্সে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হন তিনি। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের পদ-বাণিজ্য করে কয়েক শ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মতিন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে একচেটিয়া মনোনয়ন-বাণিজ্য করেছেন তিনি। নৌকা প্রতীক পাইয়ে দেবেন বলেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রার্থীদের কাছ থেকে। গত বছর ২ কোটি টাকা দামের গাড়ি কিনেছেন। সিন্ডিকেটের বাকিদের চেয়ে চালাক ছিলেন মতিন। নিজের এলাকায় বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কিছুই করেননি তিনি। তার পৈতৃক ভিটায় এখনো ভাঙা ঘর। এলাকায় মানুষের সঙ্গে বেশি মিশতেনও না মতিন। তবে রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশানে তার একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে। মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও কামরাঙ্গীরচরে একাধিক প্লট রয়েছে। তদবিরের অর্থ দেশের বাইরেও পাচার করেছেন মতিন। তাকে নিয়ে দুদকে অনুসন্ধানও চলছে। একসময় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় অভিমানে দূরে সরে যান আওয়ামী লীগের উপকমিটির এক নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা খবরের কাগজকে জানান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তদবিরে মতিনকে কাজে লাগাতেন সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যরা। ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত একটি ডায়েরি রয়েছে। ওই ডায়েরিতে কাকে নমিনেশন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা যায় (মনোনয়ন বোর্ডে) তার নাম ও ঠিকানা লেখা থাকত। মতিন সে ডায়েরিতে থাকা নামও পরিবর্তন করে আগে থেকে চুক্তি করা নেতার নাম লিখে রাখতেন। বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
শুধু তা-ই নয়, এই মতিনের হাত ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতির ধানমন্ডির কার্যালয়ে তৈরি হয় প্রটোকল বাহিনী। চলতি বছরের ১৩ জুলাই ‘ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ‘প্রটোকল বাহিনীর দৌরাত্ম্য চরমে’ নামে খবরের কাগজে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এই বাহিনী দিয়ে মতিন আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে করতেন চাঁদাবাজি। মতিনসহ এই বাহিনীর সদস্যরা একাধিক নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে কার্যালয়টিতে নারীসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিদিনই চর্চা হতো। নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় একাধিক বিয়েও করতে হয় মতিনকে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে ব্ল্যাকমেইল করে একটি ফ্ল্যাট নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই তদবিরবাজ মতিন আত্মগোপনে চলে যান। তিনি সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে গেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
ঠাণ্ডা মাথার এপিএস মহিদুল ও পিআরও ওয়ালিদওবায়দুল কাদেরের সরকারি এপিএস মহিদুল হক ও পিআরও ওয়ালিদ ছিলেন ধীরস্থির স্বভাবের। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সব অধিদপ্তরে তাদের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বদলি ও নিয়োগ-বাণিজ্য করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় আরও বেশি সুবিধা হয় এদের। রাজনৈতিক তদবিরও করতেন তারা। এপিএস মহিদুল নারায়গঞ্জের নিজ এলাকায় বাড়ি ও জমি কিনে নানা ব্যবসা করেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট-প্লট, বাড়ি-গাড়িসহ অঢেল সম্পত্তি গড়েছেন মহিদুল।
জাহাঙ্গীরের হাতে নোয়াখালীওবায়দুল কাদেরের চুক্তিভিত্তিক পিএ (অফিস সচিবালয়) জাহাঙ্গীর আলম নোয়াখালীর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ব্যস্ত ও অসুস্থ ওবায়দুল কাদের নিজের আসন এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর নেতা-কর্মীদের সময় দিতে পারতেন না। জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে নেতারা কাদেরের কাছে তথ্য আদান-প্রদান করতেন। সব সুপারিশও আসত এই জাহাঙ্গীরের হাত ধরে। তাতেই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কৃষকের ছেলে জাহাঙ্গীর গত ১৫ বছরে সচিবালয় এবং মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি জায়গায় মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন। ওই অঞ্চলের জেলা ও উপজেলায় টাকার বিনিময়ে পদ দিতেন জাহাঙ্গীর। শুধু কাদেরের মন্ত্রণালয়ের কাজই নয়, মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের তদবিরও করতেন জাহাঙ্গীর। ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটও রয়েছে তার। নিজের এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে জাহাঙ্গীরের। তদবিরের বিনিময়ে পাওয়া টাকা দিয়ে জমি কেনা তার নেশা ছিল। নোয়াখালীর একাধিক স্থানে জায়গা কিনে মার্কেট তৈরি করেছেন জাহাঙ্গীর। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে জাহাঙ্গীর পলাতক আছেন।
ডিও লেটার ও সিল সুকেনের নিয়ন্ত্রণেওবায়দুল কাদেরের ধানমন্ডির ৬/এ বাসার কেয়ারটেকার ছিলেন সুকেন চাকমা। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সুবাদে তিনি পিও হয়ে যান। এই বাসায় কাদেরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতারা দেখা করতে হলে সুকেনের মাধ্যমে যেতে হতো। ওবায়দুল কাদেরের সরকারি ও দলীয় সিল এবং ডিও লেটার ছিল সুকেনের নিয়ন্ত্রণে। সরকারি-বেসরকারি, দলীয় পদ, ভর্তি-বাণিজ্য, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ সব তদবিরে টাকার বিনিময়ে তিনি সিল ও ডিও লেটার দিতেন। সুকেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ওবায়দুল কাদেরের নাম ভাঙিয়ে সরকারি কাজ পাইয়ে দিতেন পছন্দের লোকজনদের। প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন ওবায়দুল কাদেরের ডিও লেটার ও সরকারি সিল। বিনিময়ে পার্সেন্টেজ পেতেন সুকেন। এই টাকা দিয়ে নিজ এলাকা খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে জমি কিনে রিসোর্ট ও ব্যবসা গড়ে তোলেন তিনি।
তাদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওবায়দুল কাদেরের সরকারি বাসভবনের গৃহপরিচারক উখিয়া সিং মারমা। গত ১০ বছরে কামিয়েছেন বিপুল অর্থ। নিজ এলাকা বান্দরবানে একাধিক ব্যবসা রয়েছে মারমার। নিজের বিয়েতে ৯০ লাখ টাকা খরচ করে আলোচনায় আসেন উখিয়া সিং মারমা। তিনি মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে বিআরটিএতে সরকারি চাকরি পেয়েছেন।











