মাগুরায় বাড়ি-জমি উত্তম কুমারের: কোথাও খোঁজ নেই তার, দুদকের অনুসন্ধান সম্পন্ন
পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উত্তম কুমার বিশ্বাস। চাকরিজীবনে অবৈধ উপায়ে হয়েছেন বিপুল ধনসম্পদের মালিক। মাগুরা শহরে এবং নিজ গ্রামে বিপুল অর্থ ব্যয়ে করেছেন বাড়ি; কিনেছেন জমি। এছাড়াও ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাতে বিপুল সম্পদ করেছেন উত্তম কুমার।
দুর্নীতি দমন কমিশন— দুদক এরই মধ্যে তার অবৈধ সম্পদের প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ করেছে। এতে তার বিপুল সম্পদের খোঁজ মিলেছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে কমিশনে উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এখন উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে তা শিগগির জানা যাবে। উত্তম কুমারের ঢাকায় চারটি ফ্ল্যাট এবং বিলাসবহুল গাড়ি, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় তার বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তির (জমি) সন্ধান পেয়েছে দুদক।
বাড়ি–গাড়ির খোঁজ:
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতির তদন্তে নেমে জমি, বাড়ি-গাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে, যা তার পরিবারের সদস্যদের নামে করা হয়েছে। এসব সম্পদের বিষয়ে দুদক থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও তাতে সাড়া দেননি সাবেক এই সিআইডি কর্মকর্তা। দুদকের অনুসন্ধানে ফেঁসে যাচ্ছেন দেখে দেশত্যাগের পরিকল্পনা করছিলেন তিনি।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালি ইউনিয়নের ওয়ার্ড মেম্বার ইসমাইল হোসেন জানান, ফলশিয়া গ্রামে সাবেক অ্যাডিশনাল এসপি উত্তম কুমারের গ্রামের বাড়ি রয়েছে। পূজায় গ্রামে মাঝে মধ্যে আসেন তিনি। গ্রামে তার পরিবারের কেউ থাকেন না, সবাই শহরে থাকেন। এখানে তার জমি ও বাড়ি আছে। আর মাগুরা শহরেও বাড়ি আছে।
গ্রামের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাকরিজীবনে গ্রামে এবং মাগুরা শহরে বেশকিছু জমি কিনেছেন উত্তম। সেখানে (শহরে) একটি বাড়িও আছে। এলাকায় প্রচলিত আছে— চাকরিতে থাকাকালে ঘুষের টাকায় এসব করেছেন তিনি। প্রায় দামি গাড়িতে সন্তানদের নিয়ে গ্রামে আসতেন। বিশেষ করে পূজার সময়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অঢেল সম্পদ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা বা অধিকতর তদন্ত শুরু হলে আরও সম্পদের খোঁজ পাওয়া যাবে। এসব সম্পদের মধ্যে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও ঢাকা শহরে বিপুল সম্পদ মিলেছে, যা তিনি চাকরিকালে করেছেন। এছাড়া নিজ এলাকা মাগুরায়ও সম্পদ গড়েছেন উত্তম। মাগুরা শহরে তার বাড়ি আছে।
গত বছরের ১ আগস্ট সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান সিআইডির সাবেক এই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এরপরই আলোচনায় আসে তার দুর্নীতির নানা খবর। সিআইডির আগে র্যাবে কর্মরত অবস্থায় দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। সম্প্রতি অনুসন্ধান শেষ করেছে সংস্থাটি।
৫০ কোটি টাকা তুলে আত্মগোপনে:
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ তুলে নিয়েছেন উত্তম কুমার। কদিন ধরে ঢাকার বেইলি রোডের বাসায় তাকে দেখা যাচ্ছে না। নগদ অর্থ তুলে নিয়ে তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। এসব টাকা নিয়ে তিনি দেশত্যাগ করে থাকতে পারেন। প্রশ্ন ওঠেছে, তা না হলে কেন এত টাকা ব্যাংক থেকে তিনি তুলে নেবেন। সূত্র বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশে উত্তম কুমারের একাধিক বন্ধু ও স্বজন থাকেন। সেখানেই উত্তম অনেক আগে থেকেই সম্পদ গড়েছেন।
নিজের অবস্থা বেগতিক দেখে দেশত্যাগের পাঁয়তারা করছিলেন দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তা। পরে দুদক তার দেশত্যাগ ঠেকাতে আদালতে চিঠি দেয়। এর প্রেক্ষিতে তার দেশত্যাগের বিষয়ে সতর্কতা জানিয়ে বিমানবন্দর ও দেশের ইমিগ্রেশনগুলোতে চিঠি যায়।
বেইলি রোডের বাসায় নেই উত্তম:
বেইলি রোডের বাসায় বর্তমানে উত্তম কুমারের স্ত্রী থাকছেন। উত্তমের মেয়ে বরিশাল মেডিকেলে পড়াশোনা করছেন। আর ছেলে অন্য একটি মেডিকেলের শিক্ষার্থী। উত্তম কুমার নয়তলা যে ভবনটিতে থাকেন সেখানে ২৭টি ফ্ল্যাট রয়েছে। যেখানে পুলিশ ও র্যাবের ঊধ্বর্তন কয়েকজন কর্মকর্তাও থাকেন। ভবনের গ্যারেজে উত্তমের ব্যবহৃত একটি বিলাসবহুল গাড়ি রাখা আছে; যেটি কদিন ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
উত্তমের সঙ্গে চাকরি করেছেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, উত্তম কুমার সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি আয় করেছেন। এতে কৌশল হিসেবে তিনি কিছু অসাধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হাতে রাখতেন। যাদের উত্তম কুমার অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ বুঝিয়ে দিতেন। এতে সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।
মাগুরার মহম্মদপুরের বাসিন্দা উত্তম কুমার ১৯৮৯ সালে এসআই পদে পুলিশে যোগদান করেন। এরপর তিনি পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। পরে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে পদোন্নতি পেলে তাকে সিআইডিতে পদায়ন করা হয়। এরপর র্যাব-২ তে প্রেষণে বদলি হন। গত বছরের মাঝামাঝি তিনি সিআইডিতে পুনরায় বদলি হন। এরপর গত বছর অক্টোবরে অবসরে যান।
স্বর্ণ চোরাচালানের মামলা করে কোটিপতি:
সিআইডিতে থাকাকালে বেশির ভাগ সময় উত্তম কুমার স্বর্ণ চোরাচালানে হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত পেতেন। এতে অল্পদিনেই ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন তিনি। চতুর উত্তম অল্পসময়ে বিপুল ধনসম্পদের মালিক বনে যান। কর্মজীবনের একটি বড় সময় সিআইডিতে ছিলেন উত্তম কুমার। সেখানে থাকাকালে বিভিন্ন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হয়ে অবৈধ উপায়ে দেশ-বিদেশে করেন অঢেল সম্পদ। উত্তম কুমারকে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা গেলে তার অবৈধ সিন্ডিকেটের আরও সদস্যকে বের করা সম্ভব হবে।
উত্তম কুমার অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় সম্পদ গড়েছেন বলেও বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, যা নিয়ে কাজ করছে তদন্ত সংস্থা।











