জওহারলাল নেহরুর পর নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ইতিহাসে টানা তৃতীয় মেয়াদে আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। এর আগে প্রথমে এই রেকর্ড ছিল প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহরুর। এবার নির্বাচনে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে তার তৃতীয় মেয়াদের এই সরকার হচ্ছে জোটের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জোটের মিত্রদের সঙ্গে চলেছে দরকষাকষি। এমনকি গতকাল এ রিপোর্ট লেখার সময়ও দরকষাকষি চলছিল। কিংমেকার হিসেবে পরিচিতি পাওয়া চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিএস) এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ) ‘পাওনা’ বুঝে পাওয়ার জন্য এই দরকষাকষি করছিলেন। সর্বশেষ জেডিইউ মন্ত্রিপরিষদে দুটি পদ পেতে চলেছে। দলটির বিভিন্ন সূত্র এই তথ্য দিয়েছে।
এ পদের জন্য দু’জন সিনিয়র নেতার নাম করা হয়েছে। তারা হলেন- লালন সিং ও রামনাথ ঠাকুর। এনডিটিভি বলছে, বিহারের মাঙ্গার আসন থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন লালন সিং। অন্যদিকে রামনাথ ঠাকুর হলেন রাজ্যসভার একজন এমপি। তিনি ভারতরত্ন পদক পাওয়া কারপুরি ঠাকুরের ছেলে। আজ রোববার নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের আগে তাদের বিষয়ে মিটিংয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স (এনডিএ)। সূত্রের মতে, লোকসভা নির্বাচনে ১২ আসনে জয় পাওয়ার পর নীতিশ কুমারের জেডিইউ মন্ত্রিপরিষদে দুটি পদ চেয়েছে। অন্যদিকে চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি চারটি মন্ত্রণালয় এবং পার্লামেন্টের স্পিকারের পদ চেয়েছে। এর মধ্যে জেডিইউ’র দাবির বিষয়ে দৃশ্যত সুরাহা হয়েছে। কিন্তু চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি’র সঙ্গে বোঝাপড়া চলছিল বলে মিডিয়া বলছে।
এবার চমক সৃষ্টি করা লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক দল হিসেবে আগের ৩০৩ আসন থেকে আসন হারিয়ে মাত্র ২৪০টি আসনে বিজয়ী হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠন করতে একটি দলকে কমপক্ষে ২৭২টি আসন পেতে হয়। তার থেকে কমপক্ষে ৩২ আসন কম পেয়েছে বিজেপি। এ জন্য তারা এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। এক্ষেত্রে নীতিশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুর কাঁধে ভর করতে হচ্ছে বিজেপিকে। তাদেরকে এনডিএ জোটে ধরে রেখে সরকার গঠন করতে গিয়ে মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে হচ্ছে। তা নিয়েই কয়েকদিন ধরে টানা সমঝোতা চলছিল। জেডিইউ এবং টিডিপিকে নিয়ে এনডিএ জোটের মোট আসন সংখ্যা ২৯৩। ফলে তারা জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠন করছে। এই সরকার আগের সরকারের মতো শক্তিশালী হবে না। কারণ, আগের সরকারে বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তাদেরকে অন্যদের চাওয়া-পাওয়ার কোনো হিসাব করতে হয়নি। কিন্তু এবার যে সরকার গঠন হচ্ছে, তা টিকিয়ে রাখতে হলে তাদেরকে সুবিধা দিতে হবে। কোনো কারণে তারা অসন্তুষ্ট হলে মাঝপথে সরে আসতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে সরকার ভেঙে যেতে পারে। আসতে পারে আগাম নির্বাচন। এ জন্য এই পার্লামেন্টকে বলা হচ্ছে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট।
বিরোধীদলীয় নেতা হচ্ছেন রাহুল গান্ধী: কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি একটি রেজ্যুলুশন পাস করেছে। সে অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলি এবং কেরালার ওয়েনাডে আসন থেকে নির্বাচিত গান্ধী পরিবারের উত্তরসূরি রাহুল গান্ধী হচ্ছেন লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা। অন্যদিকে কংগ্রেসের পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ের পর দলটির এমপি কুমারি সেলজা বলেছেন, ওয়ার্কিং কমিটির ইচ্ছা রাহুল গান্ধী লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হবেন। আলাপুঝা থেকে নতুন এমপি নির্বাচিত কেসি ভেনুগোপাল বলেন, লোকসভায় বিরোধী দলের দায়িত্ব নেয়ার জন্য রাহুল গান্ধীজিকে ওয়ার্কিং কমিটি সর্বসম্মত অনুরোধ করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় তার প্রচেষ্টার প্রশংসা জানিয়ে রেজ্যুলুশন পাস করেছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি। এতে বলা হয়, কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধীকে বড় করে দেখা যায় আলাদা করে। এর কারণ, ভারত জোড়ো যাত্রা এবং ভারত জোড়ো নয়াযাত্রা তিনি সাজিয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে তার চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্ব। আমাদের লাখ লাখ কর্মী এবং কোটি কোটি ভোটারের মধ্যে আশা ও আস্থা বাড়িয়ে তুলেছে। রাহুল গান্ধী নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন নিজের মানসিকতায়। তিনি পয়েন্ট আউট করেছেন অন্যদের চেয়ে বেশি। তিনিই আমাদের সংবিধানের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন। এটাই ছিল ২০২৪ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ইস্যু। শনিবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং হয় রাজধানী নয়াদিল্লিতে। এতে যোগ দেন কংগ্রেসের পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী, কংগ্রেস প্রধান মল্লিকার্জুন খাড়গে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াংকা গান্ধী, মনীষ তিওয়ারি, ডিকে শিবকুমার, রেভান্থ রেড্ডি প্রমুখ। মিটিংয়ের পর কংগ্রেস রাজ্যসভার এমপি প্রমোদ তিওয়ারি বলেন, অবশ্যই তার (রাহুল গান্ধী) লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হওয়া উচিত। আমাদের ওয়ার্কিং কমিটির অনুরোধ ছিল এটাই। রাহুল ভয়হীন ও সাহসী। দিনের শুরুতে জোটে থাকা অন্য দলগুলোর নেতারাও দাবি তোলেন রাহুল গান্ধীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেভান্থ রেড্ডি বিরোধীদলীয় নেতা প্রসঙ্গে রাহুলের বিষয়ে বলেন, এই দাবি ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের। রাহুল গান্ধীকেই বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব নিতে হবে। নারী ও বেকারদের জন্য লড়াই করে চলেছেন রাহুল। গুরুদাসপুর থেকে নির্বাচিত এমপি সুখজিন্দর সিং র্যান্ডওয়া বলেন, রাহুল গান্ধী এমন একজন মানুষ, যিনি পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিতে পারেন। তাই তাকে বিরোধীদলীয় নেতা বানানো উচিত। তিনি আরও বলেন, আমরা পার্লামেন্টে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই।
শপথ অনুষ্ঠানে যারা থাকছেন: ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের নভেম্বরে মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজু ক্ষমতায় আসার পর এই অবস্থার সৃষ্টি। কারণ, মুইজুকে অতিমাত্রায় চীনপন্থি হিসেবে দেখা হয়। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরই তার দেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের প্রত্যাহারের জন্য ভারতকে অনুরোধ করেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর ভারত না গিয়ে, প্রথম বিদেশ সফরে যান চীনে। ভারতের নিকট প্রতিবেশী এই দেশটির এমন অবস্থায় ভারত নাখোশ। কিন্তু সেই ভারতে আজ রোববার তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার কথা নরেন্দ্র মোদির। এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজুকে। তিনি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ড, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে সহ বিভিন্ন বিদেশি অতিথি। তার মধ্যে আছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজু। নিজের দেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহ’কে পরাজিত করেন তিনি। মোহাম্মদ সোলিহকে দেখা হয় ভারতপন্থি হিসেবে। এবার নিজের মেন্টর এবং পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে অনুসরণ করবেন প্রেসিডেন্ট মুইজু। আবদুল্লাহ ইয়ামিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম দফার ক্ষমতা নেয়ার শপথ অনুষ্ঠানে ২০১৪ সালে উপস্থিত ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি এবার জাতীয় নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার পর তাকে ৪ঠা জুন অভ্যর্থনা জানান প্রেসিডেন্ট মুইজু।