১২:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিতে ডুবেছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল

প্রতিনিধির নাম:

কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডে পারিবারিক বোর্ড বানিয়েছেন তিন উদ্যোক্তা। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তারা মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা ও মো. আরিফ মোতাহার ঘুরেফিরে শীর্ষ তিন পদ- চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব পালন করেছেন। তুলেছেন ইচ্ছামতো বেতন-ভাতা। প্রতিষ্ঠানের টাকায় জমি কিনেছেন ব্যক্তির নামে। আবার সেই জমি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নেওয়া ছাড়াও এই তিন উদ্যোক্তার নামে বিপুল জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ থাকার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের পাল্টাপাল্টি মামলার পর ২০২১ সালে বিচারপতি ময়নুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নিয়োগ করে হাইকোর্ট। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডে এমডি হিসেবে রয়েছেন কবির রেজা।

হোটেলের টাকায় ব্যক্তির নামে জমি : দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ভবনের ১৪তলার ফ্লোর জামানত রেখে ২০১৩ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (আইপিডিসি) থেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। তা দিয়ে কক্সবাজার জেলার ঝিলংজা মৌজায় ২৬ শতাংশ জমি কেনেন কবির রেজা, আরিফ মোতাহার ও মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ।

ঋণ মঞ্জুরিপত্র পর্যালোচনা করে দুদক দেখেছে, ওই ঋণ হোটেলের সংস্কার পণ্য কেনার জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা না করে জমি কেনায় ব্যয় করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ২০১৫ সালে ওই জমি ১৩ কোটি টাকায় কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়।

ফার্নিচার কেনার নামে ১৪৫ কোটি টাকা ঋণ : হোটেলের মেশিনারিজ, ফার্নিচার, কিচেন ও রেস্টুরেন্ট আইটেম, ডেকোরেশনের নামে ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৪৫ কোটি ২২ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টে দাখিল করা এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের নামে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১০১ কোটি ৭ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। এ ঋণের স্থিতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালনা কমিটির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের অনুমতি দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী ফিক্সড এসেটের মূল্য ১৪৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু এর স্বপক্ষে তথ্য-প্রমাণ হোটেল কর্তৃপক্ষ অডিটরদের সরবরাহ করতে পারেনি।

অস্বাভাবিক বেতন উত্তোলন :

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য কর্মচারীর সঙ্গে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০০৯ সালের জুলাই থেকে বেতন-ভাতা প্রাপ্ত হয়েছেন। তবে অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা বেতন পাননি। প্রতিষ্ঠানটির তিন উদ্যোক্তা মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা এবং আরিফ মোতাহার পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ২০০৯ সালে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪ লাখ টাকা বেতনপ্রাপ্ত হয়েছেন। এরপর ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬ লাখ টাকা বেতন পেয়েছেন। এ ছাড়া আরিফ মোতাহারের মা দিলখুশ বেগম ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬ লাখ টাকা হারে বেতন গ্রহণ করেছেন। তিনি এখন বেঁচে নেই। এ ছাড়া ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে আরিফ মোতাহারের স্ত্রী নাজমা আরিফ ৬ লাখ টাকা বেতন উত্তোলন করেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা, নাজমা আরিফ ও দিলখুশ বেগম বেতন বাবদ ১৪ কোটি ৯৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯০ টাকা উত্তোলন করেছেন। কিন্তু তাদের প্রাপ্য ৭ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তবে তারা অতিরিক্ত তুলেছেন ৭ কোটি ৮৩ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯০ টাকা।

জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ :

দুদকের প্রতিবেদন বলছে, মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বছরের বেশিরভাগ সময় যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। আরিফ মোতাহার যুক্তরাজ্য ও দুবাই থাকেন। এ ছাড়া কবির রেজা দেশে বসবাস করলেও তার বেশিরভাগ সম্পদ যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কবির রেজার ২০১৮ সালের আয়কর তথ্য অনুযায়ী তার নামে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে ৮ নম্বর রোডে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, এটি তিনি কিনেছেন। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোর রেজিস্ট্রেশন করা তিনটি গাড়ি যেগুলোর মূল্য ১ কোটি টাকা। শেয়ার বাবদ ৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ; সঞ্চয়পত্র ১ কোটি ৫২ লাখ টাকাসহ তার মোট ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকার নিট সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে তার আরও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। কবির রেজার স্ত্রী রোকেয়া বেগমের নামে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে।

মোসলেহ উদ্দিনের আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী, ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার, ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ছাড়াও নামে-বেনামে তার বিপুল সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া লন্ডনে একটি বাড়ি ও একটি কোম্পানির মালিক তিনি। দেশ থেকে অর্থ নিয়ে এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়। অন্যদিকে ঢাকার বারিধারার ডিওএইচএসে তার বাড়ি রয়েছে। তার স্ত্রী জেবুন নেছার নামে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে।

আরিফ মোতাহারের আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী, তার নগদ ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এ ছাড়াও তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। তার স্ত্রী নাজমা আরিফের নামে রিজেন্সি হোটেলে ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে।

দুদকের এ অনুসন্ধানের বিষয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনের দপ্তরে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে কমিশনের জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে বিষয়টি জানা নেই বলে জানান দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে তিন উদ্যোক্তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করে আমাদের সময়। গত কয়েক দিন ধরে মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা ও মো. আরিফ মোতাহার- প্রত্যেককে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াটঅ্যাপে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তারা কেউ সাড়া দেননি।

গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আইপিডিসি ফাইন্যান্স থেকে ঋণ গ্রহণের রেকর্ডপত্র চেয়ে দুদক থেকে হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির রেজাকে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর এ নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। শুনানি শেষে নোটিশের কার্যক্রম ৩ মাস স্থগিত করেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে দুদক থেকে আপিল করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক মশিউর রহমান ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের দুর্নীতি সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে সম্প্রতি কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তবে কোম্পানির এমডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের আদেশে দুদকের নোটিশের স্থগিতাদেশের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দুদকের প্রসিকিউশন শাখায় প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ১২০ ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিনিয়োগ করেছেন। তাদের পক্ষে এম মোহিদ আলী মিঠু নামে এক বিনিয়োগকারী গত অক্টোবরে হাইকোর্টে একটি আবেদন জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ আবেদনের বিষয়ে এখনো শুনানি শেষ হয়নি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৬:২২:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০২৪
১৫৪ বার পড়া হয়েছে

দুর্নীতিতে ডুবেছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল

আপডেট সময় ০৬:২২:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০২৪

কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডে পারিবারিক বোর্ড বানিয়েছেন তিন উদ্যোক্তা। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তারা মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা ও মো. আরিফ মোতাহার ঘুরেফিরে শীর্ষ তিন পদ- চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব পালন করেছেন। তুলেছেন ইচ্ছামতো বেতন-ভাতা। প্রতিষ্ঠানের টাকায় জমি কিনেছেন ব্যক্তির নামে। আবার সেই জমি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নেওয়া ছাড়াও এই তিন উদ্যোক্তার নামে বিপুল জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ থাকার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের পাল্টাপাল্টি মামলার পর ২০২১ সালে বিচারপতি ময়নুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নিয়োগ করে হাইকোর্ট। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডে এমডি হিসেবে রয়েছেন কবির রেজা।

হোটেলের টাকায় ব্যক্তির নামে জমি : দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ভবনের ১৪তলার ফ্লোর জামানত রেখে ২০১৩ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (আইপিডিসি) থেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। তা দিয়ে কক্সবাজার জেলার ঝিলংজা মৌজায় ২৬ শতাংশ জমি কেনেন কবির রেজা, আরিফ মোতাহার ও মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ।

ঋণ মঞ্জুরিপত্র পর্যালোচনা করে দুদক দেখেছে, ওই ঋণ হোটেলের সংস্কার পণ্য কেনার জন্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা না করে জমি কেনায় ব্যয় করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ২০১৫ সালে ওই জমি ১৩ কোটি টাকায় কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়।

ফার্নিচার কেনার নামে ১৪৫ কোটি টাকা ঋণ : হোটেলের মেশিনারিজ, ফার্নিচার, কিচেন ও রেস্টুরেন্ট আইটেম, ডেকোরেশনের নামে ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৪৫ কোটি ২২ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টে দাখিল করা এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের নামে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১০১ কোটি ৭ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। এ ঋণের স্থিতির পরিমাণ ৮৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালনা কমিটির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের অনুমতি দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী ফিক্সড এসেটের মূল্য ১৪৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু এর স্বপক্ষে তথ্য-প্রমাণ হোটেল কর্তৃপক্ষ অডিটরদের সরবরাহ করতে পারেনি।

অস্বাভাবিক বেতন উত্তোলন :

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য কর্মচারীর সঙ্গে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০০৯ সালের জুলাই থেকে বেতন-ভাতা প্রাপ্ত হয়েছেন। তবে অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকরা বেতন পাননি। প্রতিষ্ঠানটির তিন উদ্যোক্তা মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা এবং আরিফ মোতাহার পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ২০০৯ সালে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪ লাখ টাকা বেতনপ্রাপ্ত হয়েছেন। এরপর ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬ লাখ টাকা বেতন পেয়েছেন। এ ছাড়া আরিফ মোতাহারের মা দিলখুশ বেগম ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬ লাখ টাকা হারে বেতন গ্রহণ করেছেন। তিনি এখন বেঁচে নেই। এ ছাড়া ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে আরিফ মোতাহারের স্ত্রী নাজমা আরিফ ৬ লাখ টাকা বেতন উত্তোলন করেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা, নাজমা আরিফ ও দিলখুশ বেগম বেতন বাবদ ১৪ কোটি ৯৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯০ টাকা উত্তোলন করেছেন। কিন্তু তাদের প্রাপ্য ৭ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তবে তারা অতিরিক্ত তুলেছেন ৭ কোটি ৮৩ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯০ টাকা।

জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ :

দুদকের প্রতিবেদন বলছে, মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বছরের বেশিরভাগ সময় যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। আরিফ মোতাহার যুক্তরাজ্য ও দুবাই থাকেন। এ ছাড়া কবির রেজা দেশে বসবাস করলেও তার বেশিরভাগ সম্পদ যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কবির রেজার ২০১৮ সালের আয়কর তথ্য অনুযায়ী তার নামে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে ৮ নম্বর রোডে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, এটি তিনি কিনেছেন। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোর রেজিস্ট্রেশন করা তিনটি গাড়ি যেগুলোর মূল্য ১ কোটি টাকা। শেয়ার বাবদ ৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ; সঞ্চয়পত্র ১ কোটি ৫২ লাখ টাকাসহ তার মোট ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকার নিট সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে তার আরও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। কবির রেজার স্ত্রী রোকেয়া বেগমের নামে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে।

মোসলেহ উদ্দিনের আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী, ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার, ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ছাড়াও নামে-বেনামে তার বিপুল সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া লন্ডনে একটি বাড়ি ও একটি কোম্পানির মালিক তিনি। দেশ থেকে অর্থ নিয়ে এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়। অন্যদিকে ঢাকার বারিধারার ডিওএইচএসে তার বাড়ি রয়েছে। তার স্ত্রী জেবুন নেছার নামে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে।

আরিফ মোতাহারের আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী, তার নগদ ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এ ছাড়াও তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। তার স্ত্রী নাজমা আরিফের নামে রিজেন্সি হোটেলে ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে।

দুদকের এ অনুসন্ধানের বিষয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনের দপ্তরে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে কমিশনের জনসংযোগ দপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে বিষয়টি জানা নেই বলে জানান দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে তিন উদ্যোক্তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করে আমাদের সময়। গত কয়েক দিন ধরে মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা ও মো. আরিফ মোতাহার- প্রত্যেককে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াটঅ্যাপে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তারা কেউ সাড়া দেননি।

গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আইপিডিসি ফাইন্যান্স থেকে ঋণ গ্রহণের রেকর্ডপত্র চেয়ে দুদক থেকে হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির রেজাকে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর এ নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। শুনানি শেষে নোটিশের কার্যক্রম ৩ মাস স্থগিত করেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে দুদক থেকে আপিল করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক মশিউর রহমান ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের দুর্নীতি সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে সম্প্রতি কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তবে কোম্পানির এমডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের আদেশে দুদকের নোটিশের স্থগিতাদেশের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দুদকের প্রসিকিউশন শাখায় প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ১২০ ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিনিয়োগ করেছেন। তাদের পক্ষে এম মোহিদ আলী মিঠু নামে এক বিনিয়োগকারী গত অক্টোবরে হাইকোর্টে একটি আবেদন জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ আবেদনের বিষয়ে এখনো শুনানি শেষ হয়নি।