এনবিআর চেয়ারম্যানের আশীর্বাদ: শুল্কের সম্রাট যেন টাকার মেশিন!
চেয়ারম্যানের আশীর্বাদ পেলে প্রবল প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। মো. মেহরাজ উল আলম সম্রাট যেন তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। পদে উপকমিশনার হলেও সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারের ৩০ ব্যাচের এ কর্মকর্তা। শুল্ক-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন থেকে শুরু করে এনবিআরের অভ্যন্তরে বদলি ও পদোন্নতিতেও থাকে তার ভূমিকা। এমনকি তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানা বিষয়েও প্রভাব খাটান সম্রাট। এর কোনোটাই তিনি আর্থিক সুবিধা ছাড়া করেন না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন মেহরাজ উল আলম সম্রাট। জাতীয় বেতন স্কেলের ষষ্ঠ গ্রেডের এ কর্মকর্তার বিলাসবহুল জীবনযাপনেই তা ফুটে ওঠে। নিজে চলাফেরা করেন হুন্দাই টাসকন এসইউভি গাড়িতে। আর স্ত্রীর জন্য কিনেছেন টয়োটা প্রিমিও। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং কক্সবাজারের মগনামায় সাগরপাড়ে রয়েছে জমি। ব্যাংকের আমানত ছাড়া সব সম্পত্তি তার স্ত্রী ও শাশুড়ির নামে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুল্ক ক্যাডারে যোগদানের পর থেকেই অর্থ উপার্জনে বেপরোয়া মেহরাজ উল আলম সম্রাট। ২০১২ সালের ৪ জুন চাকরিতে যোগ দেওয়া এ কর্মকর্তা শুরু থেকে কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শাখায় দায়িত্বে ছিলেন। দুই দফায় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এবং ঢাকার ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৯ সালের ৭ জুলাই শুল্কনীতির দ্বিতীয় সচিব হিসেবে এনবিআরে যোগদান করেন। এর কয়েক মাস পর ২০২০ সালে এনবিআরে আসেন নতুন চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজের সুবাদে চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হয়ে উঠেন এ শুল্ক কর্মকর্তা। আর সেখান থেকেই তার দাপট বেড়ে যায়।
একাধিক সূত্র জানায়, দক্ষ এবং সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সরলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে নানাভাবে স্বার্থ হাসিল করেছেন সম্রাট। শুল্কনীতির দ্বিতীয় সচিব পদে দায়িত্ব পালনকালে নানা কাজে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে যাতায়াত ছিল তার। সেই সময় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইতেন এনবিআর চেয়ারম্যান। সেই সুযোগে নিজেকে চেয়ারম্যানের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত করিয়ে নেন সম্রাট। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাপট দেখাতে থাকেন।
শুল্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় বাড়ার পর আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন সম্রাট। বিশেষ করে কাস্টমসের বদলি-পদোন্নতির বিষয়ে সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করার পর এসব বিষয় সম্রাট জেনে যান। কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বদলির ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করছেন তিনি। সম্প্রতি ঠুনকো একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে শুল্ক বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি এনবিআর। এ ক্ষেত্রেও সম্রাটের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মেহরাজ উল আলম সম্রাট তার এ ক্ষমতা অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ। চলাফেরা করেন প্রায় ৬৫ লাখ টাকা দামের হুন্দাই টাসকন এসইউভি গাড়িতে। ঢাকা মেট্রো ঘ-২১৫১৫২ নম্বরের গাড়িটি ২০২২ সালে সম্রাটের শাশুড়ির নামে রেজিস্ট্রেশন করা। স্ত্রী নাশিদ আলীর নামে বসুন্ধরার সি ব্লকের ১৫ নম্বর রোডের ২৯৭/ডি নম্বরে নাভানা লুপিনের পঞ্চমতলায় কিনেছেন ২ হাজার ৩৭২ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। কর ফাঁকি দিতে এখানেও অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন সম্রাট। তার স্ত্রীর আয়কর বিবরণীতে এ ফ্ল্যাটের দাম দেখিয়েছেন ৮৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া স্ত্রী ব্যবহার করেন ঢাকা মেট্রো গ-২৬ ৩১৯২ এই নম্বরের টয়োটা প্রিমিও। সর্বশেষ মডেলের এই গাড়িটির দামও প্রায় ৪০ লাখ টাকা। এসব সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দেখাতে সম্রাটের স্ত্রীর টিআইএনে স্বামীর নাম না দিয়ে বাবার নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
সরেজমিন এবং আয়কর বিবরণীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো চাকরি বা ব্যবসা না করেই সম্রাটের স্ত্রী আর শাশুড়ি সম্পদ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে বাড়ছে। শাশুড়ি রোকেয়া বেগমের নামে গাড়ি ছাড়াও কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা এবং কুতুবদিয়ায় রয়েছে অঢেল সম্পত্তি। কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার মগনামায় সমুদ্রপাড়ে রিসোর্ট করার জন্য ১৯৯৫, ২০১৬, ৯৯৯, ৮৭৫, ৯৭৯, ৭৭, ৮৩ খতিয়ানে প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্পদ কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আয়কর বিবরণীতে এসব সম্পদের কোনো মূল্য ঘোষণা দেননি রোকেয়া বেগম। এ ছাড়া পদ্মা ব্যাংকের ০০৫৫১৩৯০০৩২৪, ০০৫৫১৩৯০০২৫৩, ০০৫৫১৩৯০০২৩৫, ০০৫৫১৩৯০০৩১৫ এবং ০০৫৫১৩৯০০২৪৪ নম্বর হিসাবে প্রায় ৫০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। সব আমানতই ২০২২ সালে জমা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ডবলমুড়িং থানার কাটা টিলা ভূমিতেও রয়েছে একটি তিন কাঠার প্লট।
অবশ্য শাশুড়ির নামে থাকা এসব সম্পত্তি তার শ্বশুরের কেনা বলে দাবি করেছেন শুল্ক কর্মকর্তা মেহরাজ উল আলম সম্রাট। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের পেকুয়ায় আমার শ্বশুরের পারিবারিক বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। পেকুয়ায় আমার শাশুড়ির আগে থেকে সম্পত্তি ছিল। তিনি আমার বাসাতেই থাকেন। তিনিই গাড়ি কিনেছেন। এসব সম্পত্তির কোনোটাই আমার নয়।
স্ত্রীর নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার স্ত্রী আগে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন।’
ফ্ল্যাটের দাম কম দেখানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দফায় দফায় যোগাযোগ করেও এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়নি। পরে তার মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।











