ভোটে আস্থা নেই দুই তৃতীয়াংশ দলের
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অগ্রগতিসহ সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গত শনিবার আলোচনায় বসে নির্বাচন কমিশন। সেখানে বিএনপিসহ ১৭টি দল ইসি’র ডাকে সাড়া দেয়নি। একটি দল আলোচনায় অংশ নিতে পারেনি দলীয় কর্মসূচির কারণে। এছাড়া অংশগ্রহণ করা দলগুলোর মধ্যে ১২টি রাজনৈতিক দল মনে করছে নির্বাচন করার মতো পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে না। দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীনদের জোট শরিকরাও রয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধিত দুই-তৃতীয়াংশ রাজনৈতিক দলের ভোটের প্রতি আস্থা নেই। এদিকে সংকট নিরসন করার সামর্থ্য ইসি’র নেই জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে সংলাপ করে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পরিবেশ অনুকূলে না থাকলেও নির্বাচন যথা সময়েই হবে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন এখন এমন কথা বললেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য নির্বাচন যথেষ্ট সময় পেয়েছে। কিন্তু তারা সেটি করতে পারেনি। শনিবার নির্বাচন কমিশনে আলোচনায় অংশগ্রহণ করা ২৬টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে ১৫টি রাজনৈতিক দল।
নির্বাচন কমিশনের সংলাপে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ যেসব দল যায়নি তারা বর্তমান কমিশনের পদত্যাগ চাইছে। এসব দল একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছে। পাশাপাশি সংসদ ভেঙে দেয়া ও সরকারের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন করছে। এসব দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন মনে করছে না। শুধুমাত্র কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ দলীয় কর্মসূচির কারণে বৈঠকে অংশ নিতে পারেনি। তারা চিঠি দিয়ে কমিশনকে বিষয়টি জানিয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীর প্রতীক মানবজমিনকে বলেন, আমরা নির্বাচনে যাব। তবে মানুষ যাতে ভোট দিতে পারে আমরা সেই পরিবেশ চাই।
এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়েছিল এমন দলও এবারের আলোচনায় অংশ নেয়নি। ওই সময় ইসি’র রাজনৈতিক সংলাপে ৩৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৩০টি অংশ নিয়েছিল।
একাদশ সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নির্বাচন নিয়ে এখনো অবস্থান পরিষ্কার করেনি। তবে তারা নির্বাচনের পরিবেশ নেই এমনটি বলে আসছে। সর্বশেষ গতকাল-লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে ভোট বর্জন করেন দলটির প্রার্থী।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, নির্বাচন যদি সঠিকভাবে হয়, তবেই আমরা অংশ নেবো। যদি আমরা মনে করি, সঠিকভাবে নির্বাচন হচ্ছে না, তখন আমরা ঘোষণা দিয়েই নির্বাচন বর্জন করবো।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া ইসি’র সঙ্গে আলোচনা শেষে বলেন, যেহেতু একটা রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে, সেই অস্থিরতা নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা আছে। আমরা চাই, এই শঙ্কা থেকে দেশবাসী যেন মুক্তি পায়।
প্রয়াত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার গড়া দল তৃণমূল বিএনপি’র মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, নির্বাচনে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য কমিশনকে আরও কাজ করতে হবে। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মোমিনুল আলম বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সিইসি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যেভাবে দায়িত্ব চাপিয়েছেন, তাতে ফেরেশতারা ছাড়া আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী মোকাবিলা করে নির্বাচনে টিকে থাকা সম্ভব না।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো প্রহসনের নির্বাচন আর দেখতে চায় না। আমরা চাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) সভাপতি এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক করতে কমিশনকে বলা হয়েছে। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো পরিবেশ দেশে নেই।
এদিকে নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ নেই স্বীকার করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালও। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক যে সংকটগুলো আছে, সেগুলো সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা সবসময় ইতিবাচক। কিন্তু সেই সংকট নিরসন করার সামর্থ্যটা আমাদের নেই বা আমাদের সেই ম্যান্ডেটও নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারাও নিজেদের মধ্যে চেষ্টা করতে পারতেন। নির্বাচন যথাসময়েই হবে।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনের আগে ইসি’র লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটি এখনো তৈরি করতে পারেনি। যদিও বর্তমান কমিশন জাতীয় নির্বাচনের আগে দুই বছর সময় পেয়েছে।











