০২:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬১৯ কোটি টাকার সার ‘খেয়েও’ নবাবি হালে নবাব!

প্রতিনিধির নাম:

মোহাম্মদ নবাব খান। চট্টগ্রামের ‘নবাব অ্যান্ড কোম্পানি’ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তিনি। ২০২১ সালের শুরুর দিকে সরকারের আমদানি করা ৬৪ হাজার মেট্রিক টন সার গুদামে পৌঁছানোর দায়িত্ব পায় তার প্রতিষ্ঠান। তবে দুই বছরেও সেই সার গুদামে পৌঁছেনি। তদন্তে উঠে এসেছে, ৬১৯ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৯ টাকার সেই সার আত্মসাৎ করেছেন নবাব খান! আত্মসাতের ঘটনায় মামলার পর ক্ষতিপূরণ মামলাও করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি); কিন্তু শত শত কোটি টাকার সার ‘খেয়ে’ নবাব খান আছেন নবাবের মতোই!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ঘটনায় করা মামলা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তবে এখনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মতিঝিল থানায় বিসিআইসির করা সেই মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতেও অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন নবাব খান। আয়নাবাজির মতোই নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও আপন ভাগনে ফাহিমকে আদালতে জামিন নিতে পাঠিয়েছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। নকল নবাবের জামিন আবেদন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এরপর বেরিয়ে আসে আয়নাবাজির সেই কাহিনি। শেষ পর্যন্ত ওই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় আসল নবাব খানকে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রিমান্ডেও নেওয়া হয় তাকে। অবশ্য কিছুদিন কারাবাসের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি।

ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, নবাব খান বিসিআইসির তালিকাভুক্ত ঠিকাদার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিসিআইসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিসিআইসির টেন্ডারে অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন সাতটি চুক্তির মাধ্যমে বন্দর থেকে গুদামে ৫০ দিনের মধ্যে সার পরিবহনে চুক্তিবদ্ধ হন। বিসিআইসির চুক্তির আওতায় জি টু জি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও কাতার থেকে কেনা ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৫৬ টন ইউরিয়া সার বিভিন্ন তারিখে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে খালাস হয়। এর মধ্যে ৬১৯ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৯ টাকা মূল্যের ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন সার সরকারের আপৎকালীন (বাফার) গুদামে সরবরাহ করেনি ওই প্রতিষ্ঠান।

বিসিআইসি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে এখনো মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তাই গত জুলাই মাসে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে আদালতে নবাব খানের বিরুদ্ধে ৬১৯ কোটি টাকার একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করে।

২০২১ সালে সার উৎপাদন ও আমদানিকারক সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিআইসির উপব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে নবাবের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মামলা করেন। মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম  বলেন, বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বিদেশ

থেকে আমদানি করা ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বুঝিয়ে দেয়নি নবাব অ্যান্ড কোম্পানি নামের প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য ওই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নবাব খানকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ৫০ দিনের মধ্যে বন্দর থেকে সরকারি গুদামে সার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা; কিন্তু তিনি দীর্ঘ বছরেও সার বুঝিয়ে দেননি। এতে কৃষক সুবিধাবঞ্চিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ওই ঘটনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে কয়েক দফা; কিন্তু তদন্ত শেষ করে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দেয়নি। এরপর তারা বাধ্য হয়ে আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করেন। ওই মামলায় নবাব খানের কাছে ৬১৯ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়।

অবশ্য মামলাটির তদন্ত সংস্থা ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, বাদী পক্ষ বিসিআইসির কাছ থেকে তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন নথি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এখনো কোনো জবাব আসেনি। কার্যত বিসিআইসি তদন্তে কোনো সহায়তা করছে না।

ওই মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের ডিসি মো. জসীম উদ্দিন  জানান, এখন পর্যন্ত তদন্তে তারা নিশ্চিত হয়েছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নবাব অ্যান্ড কোম্পানি সরকারি গুদামে সার পৌঁছে দেয়নি। তা পৌঁছে না দেওয়া তো আত্মসাৎ। তবে মামলাটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত। এজন্য গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে কিছুটা সময় লাগছে।

ঘটনা ধামাচাপা দিতে নবাব খানের নানা কৌশল: অভিযুক্ত নবাব খান আয়নাবাজি করে নিজের ভাগনেকে নকল নবাব বানিয়ে আদালতে পাঠানো ছাড়াও ঘটনা ধামাচাপা দিতে নানা কৌশল নিচ্ছেন। বিসিআইসির কিছু গুদামে সামান্য পরিমাণের সার মজুত রেখে প্রচার করার চেষ্টা চালান বিসিআইসি তার সার গ্রহণ করছে না। এই মর্মে সে বিসিআইসি এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিপত্র ও আবেদন দিয়ে ঘটনার দায় উল্টো বিসিআইসির ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি হাইকোর্টে আরবিট্রেশন মামলা করে নিজের দায়মুক্তিরও আবেদন করেছেন।

সার আত্মসাতের বিষয়ে জানতে  নবাব খানকে ফোন দেওয়া হয়। তিনি বিষয়বস্তু জেনে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে বলেন, ‘তিনি বারবার সার গ্রহণের জন্য বিসিআইসিকে তাগাদাপত্র দিয়েছেন; কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। যে মামলার কোনো মেরিটই নেই। কারণ ঘটনা চট্টগ্রাম ও মোংলার। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মতিঝিলে।’

নবাব খান   কিছু কাগজপত্রও পাঠান। ওইসব কাগজ ঘেঁটে দেখা যায়, তা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাতে লেখা, তার বিরুদ্ধে বিসিআইসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মামলা করেছেন। তিনি শত শত তাগাদাপত্র দিলেও সব সার গ্রহণে কর্মকর্তাদের রাজি করাতে পারেননি। গুদামে জায়গা না থাকায় সার নেয়নি তারা। উল্টো তার ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।

তিনি এ-ও দাবি করেন, মূলত সব সার পৌঁছে দিলেও ৬৯ কোটি টাকার সার নেয়নি বিসিআইসি। তবে ভুলক্রমে মামলায় ৬১৯ কোটি টাকার সার লেখা হয়।

 

কে এই নবাব খান?:

নবাব খানের বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়। ওই এলাকার লোকজন, বিসিআইসির বিভিন্ন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে তিনি আমদানি করা সার পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত। এর আগেও নানা সময়ে সরকারি সার আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এজন্য ২০০৮ সালে কারাগারেও যান; কিন্তু প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যে বারবার রক্ষা পেয়েছেন। একইভাবে বহাল রয়েছে বিসিআইসিতে তার ঠিকাদারি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের বিএনপির তৎকালীন সাংসদ সারওয়ার জামাল নিজামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় নবাব খানের। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। সে সূত্র ধরে তৎকালীন বিএনপি সরকারের অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সরকার বদলের পর ভোল পাল্টে ইউরিয়া সার কারখানা ও কাফকোতে সার পরিবহন ও টেন্ডারবাজি অব্যাহত রাখেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬১৯ কোটি টাকার সার আত্মসাৎ করেও নবাবের মতো থাকা এই নবাব খানের কর্মজীবন শুরু করেন স্থানীয় এক রেস্তোরাঁয় শ্রমিক হিসেবে। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। সে সূত্রে চট্টগ্রামের আনোয়ারার সমুদ্রপথে সিগারেট চোরাচালানের কাজ শুরু করেন প্রথমে। ১৯৮২ সালে খাতুনগঞ্জের অবাঙালি ব্যবসায়ী সুশীল রাজগোরিয়ার সঙ্গে পুলিশের হাতে আটক হয়ে ছয় মাস জেল খাটেন। সেই অবৈধ পথে উপার্জন শুরু তার।

এরপর ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় (সিইউএফএল) নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে নিয়োগ পান নবাব। তখন থেকেই সারের সিন্ডিকেটে পা রাখেন তিনি। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাদামতলীতে প্রতিষ্ঠা করেন নবাব অ্যান্ড কোম্পানি, নবাব সিকিউরিটি কোম্পানি ও ইত্যাদি শপিং কমপ্লেক্স। কিনে নেন লাইটারেজ জাহাজ এনসি-১, এনসি-২ সহ বেশ কয়েকটি সমুদ্রগামী জাহাজ। আগ্রাবাদের সিডিএ আবাসিক এলাকায় তার রয়েছে সাততলা বাড়ি, নাসিরাবাদ ও ঢাকায় আছে ফ্ল্যাট। আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও সীতাকুণ্ডে রয়েছে বিঘা বিঘা জমি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:২৫:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৩
১৮৭ বার পড়া হয়েছে

৬১৯ কোটি টাকার সার ‘খেয়েও’ নবাবি হালে নবাব!

আপডেট সময় ০১:২৫:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মোহাম্মদ নবাব খান। চট্টগ্রামের ‘নবাব অ্যান্ড কোম্পানি’ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তিনি। ২০২১ সালের শুরুর দিকে সরকারের আমদানি করা ৬৪ হাজার মেট্রিক টন সার গুদামে পৌঁছানোর দায়িত্ব পায় তার প্রতিষ্ঠান। তবে দুই বছরেও সেই সার গুদামে পৌঁছেনি। তদন্তে উঠে এসেছে, ৬১৯ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৯ টাকার সেই সার আত্মসাৎ করেছেন নবাব খান! আত্মসাতের ঘটনায় মামলার পর ক্ষতিপূরণ মামলাও করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি); কিন্তু শত শত কোটি টাকার সার ‘খেয়ে’ নবাব খান আছেন নবাবের মতোই!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ঘটনায় করা মামলা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তবে এখনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মতিঝিল থানায় বিসিআইসির করা সেই মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতেও অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন নবাব খান। আয়নাবাজির মতোই নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও আপন ভাগনে ফাহিমকে আদালতে জামিন নিতে পাঠিয়েছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। নকল নবাবের জামিন আবেদন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এরপর বেরিয়ে আসে আয়নাবাজির সেই কাহিনি। শেষ পর্যন্ত ওই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় আসল নবাব খানকে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রিমান্ডেও নেওয়া হয় তাকে। অবশ্য কিছুদিন কারাবাসের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি।

ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, নবাব খান বিসিআইসির তালিকাভুক্ত ঠিকাদার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিসিআইসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিসিআইসির টেন্ডারে অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন সাতটি চুক্তির মাধ্যমে বন্দর থেকে গুদামে ৫০ দিনের মধ্যে সার পরিবহনে চুক্তিবদ্ধ হন। বিসিআইসির চুক্তির আওতায় জি টু জি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও কাতার থেকে কেনা ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৫৬ টন ইউরিয়া সার বিভিন্ন তারিখে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে খালাস হয়। এর মধ্যে ৬১৯ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৯ টাকা মূল্যের ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন সার সরকারের আপৎকালীন (বাফার) গুদামে সরবরাহ করেনি ওই প্রতিষ্ঠান।

বিসিআইসি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে এখনো মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তাই গত জুলাই মাসে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে আদালতে নবাব খানের বিরুদ্ধে ৬১৯ কোটি টাকার একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করে।

২০২১ সালে সার উৎপাদন ও আমদানিকারক সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিআইসির উপব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে নবাবের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মামলা করেন। মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম  বলেন, বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বিদেশ

থেকে আমদানি করা ৬৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বুঝিয়ে দেয়নি নবাব অ্যান্ড কোম্পানি নামের প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য ওই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নবাব খানকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ৫০ দিনের মধ্যে বন্দর থেকে সরকারি গুদামে সার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা; কিন্তু তিনি দীর্ঘ বছরেও সার বুঝিয়ে দেননি। এতে কৃষক সুবিধাবঞ্চিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ওই ঘটনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে কয়েক দফা; কিন্তু তদন্ত শেষ করে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দেয়নি। এরপর তারা বাধ্য হয়ে আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করেন। ওই মামলায় নবাব খানের কাছে ৬১৯ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়।

অবশ্য মামলাটির তদন্ত সংস্থা ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, বাদী পক্ষ বিসিআইসির কাছ থেকে তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন নথি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এখনো কোনো জবাব আসেনি। কার্যত বিসিআইসি তদন্তে কোনো সহায়তা করছে না।

ওই মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের ডিসি মো. জসীম উদ্দিন  জানান, এখন পর্যন্ত তদন্তে তারা নিশ্চিত হয়েছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নবাব অ্যান্ড কোম্পানি সরকারি গুদামে সার পৌঁছে দেয়নি। তা পৌঁছে না দেওয়া তো আত্মসাৎ। তবে মামলাটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত। এজন্য গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে কিছুটা সময় লাগছে।

ঘটনা ধামাচাপা দিতে নবাব খানের নানা কৌশল: অভিযুক্ত নবাব খান আয়নাবাজি করে নিজের ভাগনেকে নকল নবাব বানিয়ে আদালতে পাঠানো ছাড়াও ঘটনা ধামাচাপা দিতে নানা কৌশল নিচ্ছেন। বিসিআইসির কিছু গুদামে সামান্য পরিমাণের সার মজুত রেখে প্রচার করার চেষ্টা চালান বিসিআইসি তার সার গ্রহণ করছে না। এই মর্মে সে বিসিআইসি এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিপত্র ও আবেদন দিয়ে ঘটনার দায় উল্টো বিসিআইসির ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি হাইকোর্টে আরবিট্রেশন মামলা করে নিজের দায়মুক্তিরও আবেদন করেছেন।

সার আত্মসাতের বিষয়ে জানতে  নবাব খানকে ফোন দেওয়া হয়। তিনি বিষয়বস্তু জেনে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে বলেন, ‘তিনি বারবার সার গ্রহণের জন্য বিসিআইসিকে তাগাদাপত্র দিয়েছেন; কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। যে মামলার কোনো মেরিটই নেই। কারণ ঘটনা চট্টগ্রাম ও মোংলার। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মতিঝিলে।’

নবাব খান   কিছু কাগজপত্রও পাঠান। ওইসব কাগজ ঘেঁটে দেখা যায়, তা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাতে লেখা, তার বিরুদ্ধে বিসিআইসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা মামলা করেছেন। তিনি শত শত তাগাদাপত্র দিলেও সব সার গ্রহণে কর্মকর্তাদের রাজি করাতে পারেননি। গুদামে জায়গা না থাকায় সার নেয়নি তারা। উল্টো তার ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।

তিনি এ-ও দাবি করেন, মূলত সব সার পৌঁছে দিলেও ৬৯ কোটি টাকার সার নেয়নি বিসিআইসি। তবে ভুলক্রমে মামলায় ৬১৯ কোটি টাকার সার লেখা হয়।

 

কে এই নবাব খান?:

নবাব খানের বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়। ওই এলাকার লোকজন, বিসিআইসির বিভিন্ন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে তিনি আমদানি করা সার পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত। এর আগেও নানা সময়ে সরকারি সার আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এজন্য ২০০৮ সালে কারাগারেও যান; কিন্তু প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যে বারবার রক্ষা পেয়েছেন। একইভাবে বহাল রয়েছে বিসিআইসিতে তার ঠিকাদারি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের বিএনপির তৎকালীন সাংসদ সারওয়ার জামাল নিজামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় নবাব খানের। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। সে সূত্র ধরে তৎকালীন বিএনপি সরকারের অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সরকার বদলের পর ভোল পাল্টে ইউরিয়া সার কারখানা ও কাফকোতে সার পরিবহন ও টেন্ডারবাজি অব্যাহত রাখেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬১৯ কোটি টাকার সার আত্মসাৎ করেও নবাবের মতো থাকা এই নবাব খানের কর্মজীবন শুরু করেন স্থানীয় এক রেস্তোরাঁয় শ্রমিক হিসেবে। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। সে সূত্রে চট্টগ্রামের আনোয়ারার সমুদ্রপথে সিগারেট চোরাচালানের কাজ শুরু করেন প্রথমে। ১৯৮২ সালে খাতুনগঞ্জের অবাঙালি ব্যবসায়ী সুশীল রাজগোরিয়ার সঙ্গে পুলিশের হাতে আটক হয়ে ছয় মাস জেল খাটেন। সেই অবৈধ পথে উপার্জন শুরু তার।

এরপর ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় (সিইউএফএল) নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে নিয়োগ পান নবাব। তখন থেকেই সারের সিন্ডিকেটে পা রাখেন তিনি। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাদামতলীতে প্রতিষ্ঠা করেন নবাব অ্যান্ড কোম্পানি, নবাব সিকিউরিটি কোম্পানি ও ইত্যাদি শপিং কমপ্লেক্স। কিনে নেন লাইটারেজ জাহাজ এনসি-১, এনসি-২ সহ বেশ কয়েকটি সমুদ্রগামী জাহাজ। আগ্রাবাদের সিডিএ আবাসিক এলাকায় তার রয়েছে সাততলা বাড়ি, নাসিরাবাদ ও ঢাকায় আছে ফ্ল্যাট। আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও সীতাকুণ্ডে রয়েছে বিঘা বিঘা জমি।