০১:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ: দুদকের দায়মুক্তি পাননি নৌ অধিদপ্তরের গিয়াসউদ্দিন আহমদ!

প্রতিনিধির নাম:

 

বিশেষ প্রতিবেদক

ভুরি ভুরি মিথ্যা তথ্য প্রদানসহ অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও শেষপর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে দায়মুক্তি সনদ নিতে পারলেন না নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ারের (সিএনএস) চলতি দায়িত্বে থাকা গিয়াসউদ্দিন আহমদ। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা তথ্যসংবলিত আয়-ব্যয়বিবরণী দাখিল করেও পার পাননি তিনি। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অবৈধ সম্পদের অভিযোগ নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
জনশ্রুতি আছে, গিয়াসউদ্দিন আহমদ ২০১২ সালে ‘নটিক্যাল সার্ভেয়ার এ্যান্ড এক্সামিনার’ পদে যোগ দিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর আয়ের প্রধান প্রধান উৎস হচ্ছে- ক্যাপ্টেনশিপসহ সমুদ্রগামী জাহাজের সব শ্রেণির নাবিকদের যোগ্যতানির্ধারণী পরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টারশিপ পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেয়া এবং সমুদ্রগামী নাবিকদের ধারাবাহিক অব্যাহতি পত্র (সিডিসি) প্রদান। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র মতে, এসব পরীক্ষায় বিশ্বস্থ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে প্রার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি মোটা অংকের টাকা নিয়ে থাকেন তিনি।

তবে ২০১৮ সালে কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এক্সামিনারের (সিএমই) চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর অবৈধ আয়ের পরিমাণ হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। কারণ, সিএমই’র অধীনে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা হয়ে থাকে। এছাড়া গিয়াসউদ্দিন ২০১৯-২০২২ সাল পর্যন্ত চার বছর চট্টগ্রামে নৌ বাণিজ্য দপ্তরের মূখ্য কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে বিদেশগামী জাহাজ এবং সমুদ্র ও উপকূলগামী ফিশিং ট্রলার ও ফিশিং বোটসহ বিভিন্ন ধরনের জাহাজ নিবন্ধন, সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) ও জাহাজ পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ অবৈধ টাকা উপার্জন করেন গিয়াসউদ্দিন। এরপর ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সিএনএস পদে (চলতি দায়িত্বে) যোগ দেন তিনি। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টারশিপ পরীক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় তাঁকে। সিএনএস ও পরীক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন এই কর্মকর্তা।

গিয়াসউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভুত বিপুল পরিমাণ সম্পদের অভিযোগ পেয়ে চার বছর আগে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় সংস্থার উপ-পরিচালক শাহীন আরা মমতাজকে। তিনি অনুসন্ধানকালে গিয়াসউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী সাজেদা আহমেদ ও পরিবারের ওপর নির্ভরশীল প্রাপ্তবয়স্ক অন্য সদস্যদের (যদি কেউ থাকেন) স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব তলব করেন।
দুদকে ২০২১ সালে গিয়াসউদ্দিনের দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে সব মিলিয়ে তাঁর আয় দেখানো হয় ১২ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৯৫ টাকা। এর মধ্যে স্ত্রী সাজেদা আহমেদের নামে কিনেছেন ৯ কোটি ৬২ লাখ ৩০ হাজার টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। স্বামী-স্ত্রীর এই সম্পদের হিসাব দেখানো হয়েছে বিভিন্ন জাহাজে চাকরি করে উপার্জিত অর্থ এবং ২০১২ সালে নৌ অধিদপ্তরে যোগদান ও কর্মকালীন মিলিয়ে। তবে সম্পদের যে হিসাবই গিয়াস দেন না কেনো, গণমাধ্যমকর্মীদের নিজস্ব অনুসন্ধানে তাঁর কর্মকান্ড ও সম্পদ সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসছে।
দুদকে দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে গিয়াসউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর উপজেলার লোহাইঢ় গ্রামের পৈত্রিক ভিটায় একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণের তথ্য রয়েছে। তিনি এর নির্মাণ ব্যয় দেখিয়েছেন ৩০ লাখ ৯ হাজার ২৯০ টাকা। দুদক এই ব্যয়ের সত্যতা যাচাই করে সঠিক তথ্য দেয়ার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে (পিডব্লিউডি) চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায়। সংস্থাটি নিজস্ব দু’জন প্রকৌশলীকে দিয়ে মাপজোক করানোর পর জানায়, বাড়িটির নির্মাণ ব্যয় ৫৯ লাখ ৪৩ হাজার ১১২ টাকা। এতে দেখা যায়, গিয়াসউদ্দিন ২৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকার তথ্য গোপন করেছেন।
এছাড়া সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে বিভিন্ন জাহাজে চাকরি, সেসব প্রতিষ্ঠানে নিজের পদ-পদবি ও আয়ের পরিমাণ নিয়েও দুদকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন গিয়াসউদ্দিন; যার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনুসন্ধান কর্মকর্তা শাহীন আরা মমতাজ দীর্ঘদিনেও দুদকের কাছে গিয়াসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল ও মামলা দায়েরের সুপারিশ করেননি। বরং গত নভেম্বরে দায়মুক্তির সুপারিশ করেছিলেন। তবে তা আমলে না নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মশিউর রহমানকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সিএনএস (চলতি দায়িত্বে) গিয়াসউদ্দিন আহমেদকে তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলেও কলটি রিসিভ করেননি তিনি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:৪৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৩
৩৮২ বার পড়া হয়েছে

নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ: দুদকের দায়মুক্তি পাননি নৌ অধিদপ্তরের গিয়াসউদ্দিন আহমদ!

আপডেট সময় ১০:৪৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৩

 

বিশেষ প্রতিবেদক

ভুরি ভুরি মিথ্যা তথ্য প্রদানসহ অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও শেষপর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে দায়মুক্তি সনদ নিতে পারলেন না নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ারের (সিএনএস) চলতি দায়িত্বে থাকা গিয়াসউদ্দিন আহমদ। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা তথ্যসংবলিত আয়-ব্যয়বিবরণী দাখিল করেও পার পাননি তিনি। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অবৈধ সম্পদের অভিযোগ নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
জনশ্রুতি আছে, গিয়াসউদ্দিন আহমদ ২০১২ সালে ‘নটিক্যাল সার্ভেয়ার এ্যান্ড এক্সামিনার’ পদে যোগ দিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর আয়ের প্রধান প্রধান উৎস হচ্ছে- ক্যাপ্টেনশিপসহ সমুদ্রগামী জাহাজের সব শ্রেণির নাবিকদের যোগ্যতানির্ধারণী পরীক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টারশিপ পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেয়া এবং সমুদ্রগামী নাবিকদের ধারাবাহিক অব্যাহতি পত্র (সিডিসি) প্রদান। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র মতে, এসব পরীক্ষায় বিশ্বস্থ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে প্রার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি মোটা অংকের টাকা নিয়ে থাকেন তিনি।

তবে ২০১৮ সালে কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এক্সামিনারের (সিএমই) চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর অবৈধ আয়ের পরিমাণ হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। কারণ, সিএমই’র অধীনে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা হয়ে থাকে। এছাড়া গিয়াসউদ্দিন ২০১৯-২০২২ সাল পর্যন্ত চার বছর চট্টগ্রামে নৌ বাণিজ্য দপ্তরের মূখ্য কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে বিদেশগামী জাহাজ এবং সমুদ্র ও উপকূলগামী ফিশিং ট্রলার ও ফিশিং বোটসহ বিভিন্ন ধরনের জাহাজ নিবন্ধন, সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) ও জাহাজ পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ অবৈধ টাকা উপার্জন করেন গিয়াসউদ্দিন। এরপর ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সিএনএস পদে (চলতি দায়িত্বে) যোগ দেন তিনি। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টারশিপ পরীক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয় তাঁকে। সিএনএস ও পরীক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন এই কর্মকর্তা।

গিয়াসউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভুত বিপুল পরিমাণ সম্পদের অভিযোগ পেয়ে চার বছর আগে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় সংস্থার উপ-পরিচালক শাহীন আরা মমতাজকে। তিনি অনুসন্ধানকালে গিয়াসউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী সাজেদা আহমেদ ও পরিবারের ওপর নির্ভরশীল প্রাপ্তবয়স্ক অন্য সদস্যদের (যদি কেউ থাকেন) স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব তলব করেন।
দুদকে ২০২১ সালে গিয়াসউদ্দিনের দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে সব মিলিয়ে তাঁর আয় দেখানো হয় ১২ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৯৫ টাকা। এর মধ্যে স্ত্রী সাজেদা আহমেদের নামে কিনেছেন ৯ কোটি ৬২ লাখ ৩০ হাজার টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। স্বামী-স্ত্রীর এই সম্পদের হিসাব দেখানো হয়েছে বিভিন্ন জাহাজে চাকরি করে উপার্জিত অর্থ এবং ২০১২ সালে নৌ অধিদপ্তরে যোগদান ও কর্মকালীন মিলিয়ে। তবে সম্পদের যে হিসাবই গিয়াস দেন না কেনো, গণমাধ্যমকর্মীদের নিজস্ব অনুসন্ধানে তাঁর কর্মকান্ড ও সম্পদ সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসছে।
দুদকে দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে গিয়াসউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর উপজেলার লোহাইঢ় গ্রামের পৈত্রিক ভিটায় একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণের তথ্য রয়েছে। তিনি এর নির্মাণ ব্যয় দেখিয়েছেন ৩০ লাখ ৯ হাজার ২৯০ টাকা। দুদক এই ব্যয়ের সত্যতা যাচাই করে সঠিক তথ্য দেয়ার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে (পিডব্লিউডি) চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায়। সংস্থাটি নিজস্ব দু’জন প্রকৌশলীকে দিয়ে মাপজোক করানোর পর জানায়, বাড়িটির নির্মাণ ব্যয় ৫৯ লাখ ৪৩ হাজার ১১২ টাকা। এতে দেখা যায়, গিয়াসউদ্দিন ২৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকার তথ্য গোপন করেছেন।
এছাড়া সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে বিভিন্ন জাহাজে চাকরি, সেসব প্রতিষ্ঠানে নিজের পদ-পদবি ও আয়ের পরিমাণ নিয়েও দুদকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন গিয়াসউদ্দিন; যার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনুসন্ধান কর্মকর্তা শাহীন আরা মমতাজ দীর্ঘদিনেও দুদকের কাছে গিয়াসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল ও মামলা দায়েরের সুপারিশ করেননি। বরং গত নভেম্বরে দায়মুক্তির সুপারিশ করেছিলেন। তবে তা আমলে না নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মশিউর রহমানকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সিএনএস (চলতি দায়িত্বে) গিয়াসউদ্দিন আহমেদকে তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলেও কলটি রিসিভ করেননি তিনি।