০২:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষায় চলছে টাকার খেলা: সাগর-তুষার-আলমগীর-মঞ্জুরুল সিন্ডিকেটের কব্জায় নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর!

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

ক্ষমতা থাকলে সব কিছুই সম্ভব। সবকিছু সমাধান করার চাবিকাঠিও তার হাতে। মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা নিয়ে এমন কান্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ নৌ-পরিবহন অধিদফতর। মো. ইমরান (ছদ্মনাম) মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা শেষে এক পরীক্ষার্থী তার ক্ষোভের কথাটি জানাচ্ছিলেন । তিনি অভিযোগ করেন, টাকা দিলে বাঘের চোখ মেলে এমন প্রবাদটি আমরা শুনে এসেছি। এখানে পরীক্ষা দিতে এসে দেখলাম, নিজের বুদ্ধি বিবেচনা যতই থাকুক না কেন টাকা ছাড়া চাকরি হবে না। এদিকে গত কয়েক মাস আগে চলমান নানা অভিযোগ ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে মিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা স্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নৌ-খাতে যুবলীগ নেতা পরিচয়দানকারী জনৈক সাগর ও তুষারসহ কয়েক জনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা রয়েছে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীর, ক্যাপ্টেন কাজী মুহাম্মদ আহসান। এই  কর্মকর্তা মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে তাদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। এই ৩ কর্মকর্তা নৌ-পরিবহন অধিদফতরের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের  চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি। অপরজন প্রায় ৫ বছর প্রেষণে রয়েছেন। তারা পরীক্ষার আগের দিন মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষার প্রশ্ন সিন্ডিকেট সদস্য সাগর ও তুষারের হাতে পৌঁছে দেন। তখন তারা রাজধানীর জয়কালী মন্দির এলাকার ওসমানী ইন্টারন্যাশনাল হোটেল, কাকরাইলের ঈশাখাঁ ও ইসলামী হোটেলসহ আরো বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেলে ৬/৭টি রুম ভাড়া নিয়ে ওই সব রুমে ২৫/৩০ জনের এক একটি গ্রুপে পরীক্ষার্থী রেখে গোপনে কোচিং করায়। কোচিং করান বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আলমগীর। তিনি প্রার্থী প্রতি নির্দিষ্ট অংকের টাকা পেয়ে থাকেন। পরবর্তীতে তাদেরকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২ বছর ধরে পরীক্ষা পদ্ধতিতে এই দুর্নীতি চলে এলেও কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে একেবারেই নিরব।

সূত্রমতে, সাগর-তুষারের দালাল সিন্ডিকেট এক একজন পরীক্ষার্থীকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য প্যাকেজ চুক্তিতে আবদ্ধ করে ১ম শ্রেণির মাস্টার ও ড্রাইভার প্রার্থী থেকে ১ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির প্রার্থী থেকে ৮০ হাজার টাকা ও তৃতীয় শ্রেণির প্রার্থী থেকে ৬০ হাজার টাকা আদায় করছে। এ পথে তারা গত ২ বছরে কোটিপতি বনে গেছে। আরো জানা গেছে, সাগর ও তুষারের দালাল সিন্ডিকেটের দেওয়া রোল নম্বর বিশেষ মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাছে পৌঁছে দেবার পর তারা খাতায় সাংকেতিক (চিহ্ন) ব্যবহার করে পাশ নম্বর দিয়ে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষার সময়ও তারা রোল নম্বর ও সাংকেতিক (চিহ্ন) মোতাবেক পাশ করিয়ে দিচ্ছেন। বিনিময়ে প্রার্থী প্রতি তারা ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। প্রশ্ন ফাঁস করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষায় এভাবে ৫০ থেকে ৬০ জন পরীক্ষার্থী প্যাকেজ চুক্তিতে পাশ করিয়ে লাখ লাখ টাকা অবৈধপথে আয় করছেন।

বিগত ২ বছরের পরীক্ষা সংক্রান্ত ফাইল পরীক্ষা- নীরিক্ষা করলেই তাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে আরো উল্লেখ করেন, দালালদের অন্যতম তুষারের সাথে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীরের দহরম মহরম সম্পর্ক বিদ্যমান। তুষার ছাত্রলীগের একজন নেতার মাধ্যমে নৌ-প্রতিমন্ত্রীর কাছে তদবীর করে প্রেষণে থাকা ওই শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে তার সুনজরে এসেছেন। ফলে তুষারের কথামত তিনি বিধিবহির্ভুতভাবে পরীক্ষার্থী পাশ, ছোট নৌযানের নকশা অনুমোদন, বেক্রসিং সনদ ইস্যু, জাহাজের মালিকানা পরিবর্তন, সার্ভে টোকেন ইস্যু, ক্যাডেটদের অনাপত্তি পত্র (এনওসি) প্রদানসহ যে কোন কাজ অবলীলায় করে থাকেন। প্রতিটি পরীক্ষার সময় তুষার ও সাগর পরীক্ষা কেন্দ্রে বেআইনিভাবে স্বশরীরে উপস্থিত থাকে। তারা প্রায় সময়ই ওই ৩ কর্মকর্তার সাথে মোবাইল ফোন, ইমো, ভাইভার, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে থাকেন। এমনকি নৌ-পরিবহন অধিদফতরের তাদেরকে প্রায়ই দেখা যায় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নৌ-পরিবহন অধিদফতরে এর আগেও ড্রাইভার পরীক্ষায় এ রকম দুর্নীতির আশ্রয় নিলে সেটি ধরা পড়ে এবং বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সে সব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি।

কে এই তুষার ও সাগর :
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, তুষারের বাড়ি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায়। মতিঝিল এলাকায় মাদকসেবী তুষার নামেই পরিচিতি রয়েছে তার। স্থানীয় লোকজনর ভাষ্যমতে তিনি সবসময় ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। মাস্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবার কথা বলে শতাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। অনেকে বর্তমানে টাকা ফেরত চেয়ে তার পিছু পিছু ঘুরছে। কয়েকবার তাদের হাতে মারও খেয়েছেন। নিজেকে তিনি যুবলীগ নেতা হিসাবে পরিচয় দেন।
সাগর সাহার বাড়ি শরিয়তপুর জেলায়। পূর্বে সে মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ডের কর্মচারি ছিলো। ক্যাসিনো জুঁয়া বন্ধ হয়ে যাবার পর নৌ-পরিবহন অধিদফতরের একজন সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর সুপারিশে মাস্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষার দালাল হিসাবে আবির্ভুত হয়। প্রতিদিন হাজার টাকার মদ না খেলে সে নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাকে আত্মীয় হিসাবে পরিচয় দিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে থাকে। বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে একাধিক নৌ-পবিহন অধিদফতরের কর্মকর্তারা নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তারা বলেন, এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। এখন শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষার মাত্র একঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র তৈরী করা হয়, তাই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া পরীক্ষার সময় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও উপস্থিত থাকেন। এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া-তুষার ও সাগর নামের কাউকে তারা চেনেন না বলেও দাবি তাদের।
এই বিষয়ে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী এন্ড শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীর বলেন, আমি এসব কোন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। আর প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়দানকারী সাগর-তুষার এদের কাউকেই আমি চিনি না। এভাবেই তারা নিজেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ইতি টানেন। কিন্তু বাজারে জোর গুঞ্জন রয়েছে তুষার এবং সাগর গং এই অধিদফতরের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:৪৯:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ মে ২০২৩
৬২৯ বার পড়া হয়েছে

মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষায় চলছে টাকার খেলা: সাগর-তুষার-আলমগীর-মঞ্জুরুল সিন্ডিকেটের কব্জায় নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর!

আপডেট সময় ০১:৪৯:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ মে ২০২৩

রোস্তম মল্লিক

ক্ষমতা থাকলে সব কিছুই সম্ভব। সবকিছু সমাধান করার চাবিকাঠিও তার হাতে। মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা নিয়ে এমন কান্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ নৌ-পরিবহন অধিদফতর। মো. ইমরান (ছদ্মনাম) মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা শেষে এক পরীক্ষার্থী তার ক্ষোভের কথাটি জানাচ্ছিলেন । তিনি অভিযোগ করেন, টাকা দিলে বাঘের চোখ মেলে এমন প্রবাদটি আমরা শুনে এসেছি। এখানে পরীক্ষা দিতে এসে দেখলাম, নিজের বুদ্ধি বিবেচনা যতই থাকুক না কেন টাকা ছাড়া চাকরি হবে না। এদিকে গত কয়েক মাস আগে চলমান নানা অভিযোগ ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে মিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা স্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নৌ-খাতে যুবলীগ নেতা পরিচয়দানকারী জনৈক সাগর ও তুষারসহ কয়েক জনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা রয়েছে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীর, ক্যাপ্টেন কাজী মুহাম্মদ আহসান। এই  কর্মকর্তা মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে তাদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। এই ৩ কর্মকর্তা নৌ-পরিবহন অধিদফতরের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের  চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি। অপরজন প্রায় ৫ বছর প্রেষণে রয়েছেন। তারা পরীক্ষার আগের দিন মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষার প্রশ্ন সিন্ডিকেট সদস্য সাগর ও তুষারের হাতে পৌঁছে দেন। তখন তারা রাজধানীর জয়কালী মন্দির এলাকার ওসমানী ইন্টারন্যাশনাল হোটেল, কাকরাইলের ঈশাখাঁ ও ইসলামী হোটেলসহ আরো বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেলে ৬/৭টি রুম ভাড়া নিয়ে ওই সব রুমে ২৫/৩০ জনের এক একটি গ্রুপে পরীক্ষার্থী রেখে গোপনে কোচিং করায়। কোচিং করান বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আলমগীর। তিনি প্রার্থী প্রতি নির্দিষ্ট অংকের টাকা পেয়ে থাকেন। পরবর্তীতে তাদেরকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২ বছর ধরে পরীক্ষা পদ্ধতিতে এই দুর্নীতি চলে এলেও কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে একেবারেই নিরব।

সূত্রমতে, সাগর-তুষারের দালাল সিন্ডিকেট এক একজন পরীক্ষার্থীকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য প্যাকেজ চুক্তিতে আবদ্ধ করে ১ম শ্রেণির মাস্টার ও ড্রাইভার প্রার্থী থেকে ১ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির প্রার্থী থেকে ৮০ হাজার টাকা ও তৃতীয় শ্রেণির প্রার্থী থেকে ৬০ হাজার টাকা আদায় করছে। এ পথে তারা গত ২ বছরে কোটিপতি বনে গেছে। আরো জানা গেছে, সাগর ও তুষারের দালাল সিন্ডিকেটের দেওয়া রোল নম্বর বিশেষ মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাছে পৌঁছে দেবার পর তারা খাতায় সাংকেতিক (চিহ্ন) ব্যবহার করে পাশ নম্বর দিয়ে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষার সময়ও তারা রোল নম্বর ও সাংকেতিক (চিহ্ন) মোতাবেক পাশ করিয়ে দিচ্ছেন। বিনিময়ে প্রার্থী প্রতি তারা ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। প্রশ্ন ফাঁস করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষায় এভাবে ৫০ থেকে ৬০ জন পরীক্ষার্থী প্যাকেজ চুক্তিতে পাশ করিয়ে লাখ লাখ টাকা অবৈধপথে আয় করছেন।

বিগত ২ বছরের পরীক্ষা সংক্রান্ত ফাইল পরীক্ষা- নীরিক্ষা করলেই তাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে আরো উল্লেখ করেন, দালালদের অন্যতম তুষারের সাথে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীরের দহরম মহরম সম্পর্ক বিদ্যমান। তুষার ছাত্রলীগের একজন নেতার মাধ্যমে নৌ-প্রতিমন্ত্রীর কাছে তদবীর করে প্রেষণে থাকা ওই শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে তার সুনজরে এসেছেন। ফলে তুষারের কথামত তিনি বিধিবহির্ভুতভাবে পরীক্ষার্থী পাশ, ছোট নৌযানের নকশা অনুমোদন, বেক্রসিং সনদ ইস্যু, জাহাজের মালিকানা পরিবর্তন, সার্ভে টোকেন ইস্যু, ক্যাডেটদের অনাপত্তি পত্র (এনওসি) প্রদানসহ যে কোন কাজ অবলীলায় করে থাকেন। প্রতিটি পরীক্ষার সময় তুষার ও সাগর পরীক্ষা কেন্দ্রে বেআইনিভাবে স্বশরীরে উপস্থিত থাকে। তারা প্রায় সময়ই ওই ৩ কর্মকর্তার সাথে মোবাইল ফোন, ইমো, ভাইভার, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে থাকেন। এমনকি নৌ-পরিবহন অধিদফতরের তাদেরকে প্রায়ই দেখা যায় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নৌ-পরিবহন অধিদফতরে এর আগেও ড্রাইভার পরীক্ষায় এ রকম দুর্নীতির আশ্রয় নিলে সেটি ধরা পড়ে এবং বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সে সব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি।

কে এই তুষার ও সাগর :
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, তুষারের বাড়ি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায়। মতিঝিল এলাকায় মাদকসেবী তুষার নামেই পরিচিতি রয়েছে তার। স্থানীয় লোকজনর ভাষ্যমতে তিনি সবসময় ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। মাস্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবার কথা বলে শতাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। অনেকে বর্তমানে টাকা ফেরত চেয়ে তার পিছু পিছু ঘুরছে। কয়েকবার তাদের হাতে মারও খেয়েছেন। নিজেকে তিনি যুবলীগ নেতা হিসাবে পরিচয় দেন।
সাগর সাহার বাড়ি শরিয়তপুর জেলায়। পূর্বে সে মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ডের কর্মচারি ছিলো। ক্যাসিনো জুঁয়া বন্ধ হয়ে যাবার পর নৌ-পরিবহন অধিদফতরের একজন সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর সুপারিশে মাস্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষার দালাল হিসাবে আবির্ভুত হয়। প্রতিদিন হাজার টাকার মদ না খেলে সে নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাকে আত্মীয় হিসাবে পরিচয় দিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে থাকে। বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে একাধিক নৌ-পবিহন অধিদফতরের কর্মকর্তারা নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তারা বলেন, এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। এখন শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে মাস্টার ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষার মাত্র একঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র তৈরী করা হয়, তাই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া পরীক্ষার সময় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও উপস্থিত থাকেন। এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া-তুষার ও সাগর নামের কাউকে তারা চেনেন না বলেও দাবি তাদের।
এই বিষয়ে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী এন্ড শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীর বলেন, আমি এসব কোন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। আর প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়দানকারী সাগর-তুষার এদের কাউকেই আমি চিনি না। এভাবেই তারা নিজেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ইতি টানেন। কিন্তু বাজারে জোর গুঞ্জন রয়েছে তুষার এবং সাগর গং এই অধিদফতরের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।