দুর্নীতি দমন কমিশন: আমলা হলেই দুর্নীতির মামলা মাফ !
” তৎকালীন চেয়ারম্যান (ইকবাল মাহমুদ) চার্জশিট হওয়ার পর থানা থেকে কাগজ ফেরত এনে আসামির নাম বাদ দিয়ে আবার আদালতে পাঠিয়েছেন”
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা তথা আমলাদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম-অপকর্মের অভিযোগ নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা রয়েছে দুদকের। বিস্তর অভিযোগও আসে সংস্থাটির কাছে। কিন্তু আমলা, বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা দেখলেই কী যেন হয় দুদকের! নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ যাচাই-বাছাই হয়, তদন্ত-অনুসন্ধান হয়, দেদার তথ্য-প্রমাণও মেলে; কিন্তু একপর্যায়ে দেখা যায়, মামলা ডিসমিস, আমলা খালাস। আবার কেউ কেউ হয়তো সাহস করে অনুসন্ধান-তদন্ত শেষ করেন, যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে অভিযুক্ত আমলার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশও করেন; কিন্তু মামলা আর হয় না। এ
কসময় ধামাচাপা পড়ে যায় সব, নয়তো গায়েব হয়ে যায় ফাইল। এমনকি মাঝপথে তদন্ত কর্মকর্তাকে বদলি করার ঘটনাও ঘটে। আবার সব প্রক্রিয়া শেষের পর দোষী সাব্যস্ত আমলার অপকর্ম ‘নিষ্পত্তি করা হলো’বলে সার্টিফিকেটও দেওয়া হয়। এর কোনো ব্যাখ্যাও থাকে না দুদকের নথিতে। এমন অনেক ঘটনার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে।
বিমানে উধাও বিলাস ভ্রমণ
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘সোনার তরী’ ও ‘অচিন পাখি’ নামে দুটি ৭৮৭-৯ বোয়িং বিমান কেনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এই ড্রিমলাইনার বিমান দুটি দেশে আনার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে যান ৪৫ জন সরকারি কর্মকর্তা। টেকনিক্যাল কোর বা প্রকৌশল বিভাগের নয়, বরং বিভিন্ন শ্রেণির কিছু আমলা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যান। বিমান আনতে এত কর্মকর্তার অংশ নেওয়ার বিষয়টি ‘বিলাস ভ্রমণ’ হিসেবে সমালোচিত হলে অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল দুদক। ২০২০ সালের ১৯ মার্চ দুদককে লিখিত ব্যাখ্যা দেয় মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, ‘ফ্যাক্টরি থেকে সরবরাহকৃত উড়োজাহাজ গ্রহণের জন্য প্রতিনিধিদলে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা, পর্ষদ সদস্য, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা, উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য বৈমানিক, কেবিন ক্রু, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ কর্তৃক মনোনীত সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে প্রতিনিধিদল গঠিত হয়ে থাকে বিধায় উক্ত বিমান দুটি গ্রহণের জন্য ৪৫ জন কর্মকর্তা সিয়াটলে গমণ করেন।’
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০১৯ সালের ২০ ও ২৩ ডিসেম্বর দুই দিনের ব্যবধানে ৪৫ জন সরকারি কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে যাওয়ার বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবে দেখে দুদকও। সে কারণে এই ভ্রমণের ব্যাখ্যা চেয়ে দুদক বিমানকে চিঠি দেয়।
বিমান আনার সেই অনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ বিমানের একজন প্রকৌশলী জানান, তাদের সফরের আগেই বিমান কেনার সব কাজ সম্পন্ন হয়। শুধু বিমান আনার আনুষ্ঠানিকতার উছিলায় সে সময় বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। সেই সফরে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন ছিলেন প্রকৌশল ও অপারেশন রিলেটেড।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিশাল বহরের সেই সফরে সরকারের খরচ হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ঘটনার উদ্ভট ব্যাখ্যা দিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। তাদের দেওয়া যুক্তির কোনো গ্রাউন্ড ছিল না।
এ ছাড়া শাহ আলম নামে বাংলাদেশ বিমানের সাবেক একজন ক্যাপ্টেন দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে একটি মেইল করে লেখেন, ‘আমি বিমানের একজন প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সিয়াটলে ৭৮৭-৯ বোয়িং বিমানের ডেলিভারি নিতে যে বিপুল সংখ্যক অপ্রয়োজনীয় উচ্চপদস্থ’ কর্মকর্তা গিয়েছিলেন, তাদের বিমান সরবরাহ প্রক্রিয়ার সাথে কোনো কাজ ছিল না। আমি জানি, কারণ আমি বিমান ক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত। বর্তমানে আমি কাতার এয়ারওয়েজের জন্য কাজ করি, যেখানে বছরে ৪০-৫০টি নতুন বিমান ডেলিভারি হয় এবং শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ার এবং এক সেট পাইলট নতুন বিমানের ডেলিভারি নিতে যান। তাহলে কেন বাংলাদেশ বিমানের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবদের শুধু বিদেশ সফরে যেতে হয়?
এই চিঠির ওপরে আর্জেন্ট সিল মেরে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একটি ফরোয়ার্ডিংয়ের মাধ্যমে অভিযুক্ত বিমান কর্তৃপক্ষকে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিয়ে লেখেন, ‘Send it to the Secretary, Civil Aviation to looking into this.’ সেই সঙ্গে উল্লেখ করেন, ‘পরবর্তী যেকোনো সময় রাষ্ট্রীয় সফরের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’ পরে কমিশনের আদেশে অভিযোগটি অনুসন্ধান না করে শুধু নথিভুক্ত করা হয়।
নজিরবিহীন বয়স-জালিয়াতির নিয়োগ ধামাচাপা
আরেক ঘটনায় নিয়োগ-দুর্নীতির একটি গুরুতর অভিযোগ দুদকে প্রমাণ হওয়ার পরও বেঁচে গেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখার বর্তমান যুগ্ম সচিবের দায়িত্বে থাকা ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক থাকাকালে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি অফিস সহায়ক পদে ১৩ জন, নিরাপত্তা প্রহরী পদে ৩ জন ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী- এই মোট ১৭ জনকে নিয়োগ দেন। অভিযোগ ওঠে, এই নিয়োগে ভয়াবহ বয়স-জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।
অনুসন্ধানে তার প্রমাণও পায় দুদক। দুদকের নথি বলছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন সর্বোচ্চ ৫৪ বছর বয়সে চাকরি পেয়েছেন। আরও পাঁচজন যথাক্রমে ৩৮, ৩৯, ৪৯, ৫১ ও ৫৩ বছর বয়সে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরি পাওয়া কর্মচারীরা নিজেদের আসল বয়স থেকে সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ২৮ বছর পর্যন্ত বয়স কমিয়েছেন। ওই ১৭ জনের প্রত্যেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করে জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে বয়স কমিয়ে চাকরিতে যোগ দেন।
এই জালিয়াতিতে সুভাস চন্দ্র বিশ্বাসসহ নিয়োগ কমিটির ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের পরও চাকরি পাওয়া ১৭ জনসহ ২৩ জনকেই অভিযোগ থেকে পরিত্রাণ দেওয়া হয়। নিয়োগ কমিটির অন্য পাঁচজন হলেনÑ ওই জেলার সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, বর্তমানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব; নেজারাত ডেপুটি কালেক্টর এম রকিবুল হাসান, বর্তমানে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি); ময়মনসিংহ জেলার সাবেক রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর মাহমুদা হাসান, বর্তমানে ধোবাউড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি), ত্রিশালের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তরিকুল ইসলাম এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান খান।
২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর অভিযোগটি অনুসন্ধানের পর দুদকের সহকারী পরিচালক সাধন চন্দ্র সূত্রধর মামলার সুপারিশ করেন। সুপারিশে উল্লেখ করা হয়, ‘ময়মনসিংহে অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে বয়স ৩০ বছরের বেশি হওয়া সত্ত্বেও নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে, প্রতারণা এবং অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করত: একে অপরের সহযোগিতায় অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ১৭ জন প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র আমলে না নিয়ে নতুন করে ইস্যুকৃত জন্মনিবন্ধন সনদকে প্রাধান্য দিয়ে ৩০ বছরের অধিক বয়সের প্রার্থীকে লক্ষ লক্ষ টাকার অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে নিয়োগের সুপারিশ করেন।’
ওই ২৩ জনের বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগের প্রমাণ দাখিল করে মামলার সুপারিশে সাধন চন্দ্র সূত্রধর আরও উল্লেখ করেন, ‘নির্বাচন কমিশন হতে প্রাপ্ত রেকর্ড মোতাবেক অভিযোগে উল্লিখিত চাকরিপ্রাপ্ত ১৭ জনেরই জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখের সাথে জন্মনিবন্ধন সনদপত্রের জন্মতারিখের মিল পাওয়া যায়নি।’
মামলার সুপারিশে আরও বলা হয়, ‘তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ১৩ নং শর্ত ভঙ্গ করে অর্থাৎ পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যতিরেকে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর নিয়োগপত্র ইস্যু করেন। ২০১৮ সালে নিয়োগ হলেও পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাগজ সংযুক্ত হয় ২০১৯ সালে। একইভাবে নিয়োগপত্র লাভের পর জমা দেওয়া হয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার রেজাল্ট।’
দুদকের একটি সূত্র জানায়, তদন্তকারী সহকারী পরিচালক সাধন চন্দ্র সূত্রধর বদলি হয়ে গেলে নতুন করে দুদকের উপপরিচালক ফারুক হোসেনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু তার কাছ থেকে প্রতিবেদন সংগ্রহ না করে অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জানতে চাওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তদন্ত করে বলে ‘ঘটনা সত্য, তবে এ ধরনের নিয়োগের প্রচলন রয়েছে।
নিয়োগপ্রাপ্তগণ দীর্ঘদিন ধরে ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ড অফিসে বিভিন্ন কাজ করে সেবা দিয়ে আসছেন। তাই তাদের বয়স বেশি হলেও মানবিক কারণে নিয়োগ দিয়েছে, যা প্রচলিত। তাই বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার অনুরোধ করা হয়।’অথচ ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বয়সের বৈধতা থাকা ৬ হাজার ৯৭৮ জন প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করেন। যেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে ৬ হাজার ৬৭৮ জনের আবেদন বৈধ বলে গ্রহণ করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর দুদকের তৎকালীন সচিব মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
দুদকের সেই নথিতে বলা হয়, ‘সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত বিষয়ে অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক নিষ্পত্তির মাধ্যমে পরিসমাপ্তি করা হলো।’
অনুসন্ধান কর্মকর্তা মামলার সুপারিশ করলেও তা গ্রহণ না করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মতামত নিয়ে নিয়োগ-জালিয়াতির ওই গুরুতর অভিযোগটি পরিসমাপ্ত করা হয় এবং পত্র দিয়ে নথিভুক্ত করার বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমি নিয়োগ কমিটিতে ছিলাম না। নিয়োগ কমিটির প্রধান ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সার্বিক (শেখ মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন)। আমার সময়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। যেহেতু আমি জেলা প্রশাসক ছিলাম, সে কারণেই আমার ওপর দায়টা পড়েছে। তবে আমি এ সংক্রান্ত নিয়োগের বাছাই কমিটিতেও ছিলাম না।’
গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিকালে ময়মনসিংহের সাবেক জেলা প্রশাসক (সার্বিক), বর্তমানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব শেখ মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি এই বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
ঘটনাটির ব্যাপারে দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হককে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আপনি যে তথ্যটা দিলেন এটা মারাত্মক। বৈধ প্রার্থী রেখে যদি ৫৩-৫৪ বছরের কাউকে চাকরি দেওয়া হয়ে থাকে, সেটা গুরুতর অন্যায়। আপনারা যদি স্পেসিফিক জিনিসগুলো ফাইন্ড আউট করেন, তবে কমিশন ব্যবস্থা নেবে।’ আগে কমিশনে কিছু অনিয়ম হয়েছে জানিয়ে জহুরুল হক বলেন, ‘আগের অনিয়মগুলো আমরা দূর করার চেষ্টা করছি।’
কক্সবাজারের মামলার সুপারিশ ডাস্টবিনে
কক্সবাজারের পানি শোধনাগার প্রকল্পে একটি বড় অনিয়মের সঙ্গে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র এবং জেলা প্রশাসনের আরও কর্মকর্তাসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পায় দুদক।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সারোয়ার কামাল বাঁকখালী নদীর উত্তর পারে পিএমখালী মৌজায় পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য দুই একর জমি বাছাই করেন। ওই জমির বাজারমূল্য ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৬০ টাকা। এ ছাড়া ঝিলংজা মৌজায় আরও একটি জায়গা বাছাই করলেও সরকারের অর্থ সাশ্রয় করতে পিএমখালী মৌজার জায়গাটি প্রকল্পের জন্য সুপারিশ করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৪ মে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান পরস্পর যোগসাজশে বাঁকখালী নদীর উত্তর পারের সুপারিশ করা জায়গা পরিবর্তন করে নদীর দক্ষিণ পারে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণও পায় দুদক। সেই সঙ্গে দাম প্রায় ৩০ গুণ বাড়িয়ে ২ দশমিক ১৯ একর জমির মূল্য নির্ধারণ করে ৩৬ কোটি ৬৩ লাখ ১ হাজার ৯৫ টাকা। মুজিবুর রহমান মেয়র হওয়ার পর ২০১৮ সালে দশমিক ৪১০০ একর জমি স্ত্রী ফারহানা আক্তারের নামে কেনেন। একই বছর দশমিক ৪৭০০ একর জমি শ্যালক মিজানুর রহমানের নামে কেনেন। একইভাবে ২০১৯ সালে দশমিক ৬৩০০ একর জমি আবারও স্ত্রীর নামে কিনে পুরো প্রকল্প এলাকার মালিক বনে যায় তার পরিবার।
অর্ধ যুগ আটকে থাকা প্রকল্পটি চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে বিতর্কিত জমিটি মেয়র মুজিবুর রহমান তার স্ত্রী ফারহানা আক্তার ও শ্যালক মিজানুর রহমানের নামে জাল দলিল ও জবরদখলের মাধ্যমে ক্রয় দেখান, যাতে অধিগ্রহণের সময় উচ্চমূল্য আদায় করতে পারেন। পরে ২০২০ সালের ৯ জুলাই জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ মিজানুর রহমানকে ৭ কোটি ১৬ লাখ ৮৯ হাজার ৭৪ টাকা প্রদান করা হয়।
অনুসন্ধান প্রমাণের পর ২০২১ সালের ৩০ মে দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দীন (পরে বরখাস্ত হওয়া) কমিশন বরাবর ৪২ জনকে আসামি করে মামলার আবেদন করেন। পরে এক বছরে আবেদনটি সুপারিশ করেনি কমিশন। অনুসন্ধান কর্মকর্তা বদল করে অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের উপপরিচালক আলী আকবরের হাতে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষে ২০২২ সালে ২১ এপ্রিল ৩৭ জনকে আসামি করে মামলার সুপারিশ করেন আলী আকবর। মামলার সুপারিশ দীর্ঘ নয় মাস ঝুলে থাকার পর আলী আকবরকে সরিয়ে চতুর্থবারের মতো নতুন একজনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে কমিশন।
দুদক অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে, ২ দশমিক ১৯ একরের মধ্যে ১ দশমিক ৭২ শতক জমি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১ দশমিক ১৯০০ একর জমির ওপর ০৩/১৯৮৮-৮৯ নং রিসিভার মামলা ও অপর মামলা ৫২/১৯৮৬ বিচারাধীন থাকাবস্থায় সরকারি রিসিভারকৃত জমি ব্যক্তির নামে দখল দেখিয়ে মোট ৬টি নামজারি করে মেয়র মুজিবুরের স্ত্রী ফারহানা আক্তার ও শ্যালক মিজানুরের নামে। গত বছর কক্সবাজার জেলার সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আল আমীন পারভেজ ছয়টি নামজারি বাতিল করেন।
দুদকের উপপরিচালক আলী আকবরের করা মামলার সুপারিশে লেখা হয়, ‘প্রকল্পের জন্য সুপারিশ করা ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার জমি বাদ দিয়ে অন্যের দখল করা ও রিসিভার মামলা চলমান একটি জমি জবরদখল করে স্ত্রী ও শ্যালকের নামে কেনেন কক্সবাজারের মেয়র মুজিবুর রহমান। সেই জমি অধিক মূল্য দেখিয়ে বিক্রির মাধ্যমে কয়েক দফা টাকাও হাতিয়ে নেন মেয়র মুজিবুর। প্রকল্প কমিটির সভাপতি কক্সবাজারে তৎকালীন মেয়র মুজিবুর রহমান এসব অভিযোগ জানার পরও নিজ দপ্তরের সহায়তায় অনিয়ম করেন। এই ক্ষেত্রে জমির দর প্রায় তিরিশ গুণ বাড়িয়ে ৩৬ কোটি টাকায় বিক্রির জন্য দর নির্ধারণ করেন।’
এই বিষয়ে জানতে কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখার যুগ্ম সচিব কামাল হোসেনকে তার মোবাইল ফোনে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কল করা হলে তিনি রিসিভ না করে একটি এসএমএস পাঠিয়ে বলেন, ‘সরি, আই কান্ট টক রাইট নাউ।’ এরপর থেকে সর্বশেষ ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ফোনে চেষ্টা করা হয়েছে বক্তব্য নেওয়া জন্য; এসএমএসের মাধ্যমে পরিচয় জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
পার পেলেন ৫ সচিব
২০১৪ সালে প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক পাঁচ কর্মকর্তার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে ব্যাপক আলোচিত সেই ঘটনার প্রমাণ পাওয়ার পরও অভিযুক্ত ওই পাঁচ সচিব- মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন (ওএসডি) সচিব কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকী, একই মন্ত্রণালয় থেকে ওএসডি হওয়া যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদার, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিব একেএম আমির হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব নিয়াজউদ্দিন মিঞা ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের বিরেুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দুদক। ভুয়া সনদ ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তারা, সেই বিষয়েও মামলা করেনি কমিশন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুদকের তৎকালীন সচিব মাকসুদুল হাসান খান স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত চিঠি দুই মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে ওই পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল, সংগৃহীত সনদ বাতিল, অসদাচরণের দায়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, মিথ্যা তথ্য প্রদান করায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কিন্তু সেসব না করে দুদক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে নিজেদের দায়িত্ব সাঙ্গ করে।
দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে হোয়াটসঅ্যাপে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ফোন করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা জানান। এরপর ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে এ প্রতিবেদনের কপি অফিসে জমা দেওয়ার আগ পর্যন্ত আরও কয়েকদিন তাকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। গত ১০, ১৮ ও সর্বশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে তার ফোন নাম্বার ও হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস করা হলেও কোনো উত্তর আসেনি।
আরও কিছু আলোচিত ঘটনা, যেমন ২০১৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে ক্রেস্ট জালিয়াতি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক, সেটি অজ্ঞাত কারণেই বন্ধ রাখে, রাজউকের চেয়ারম্যান থাকাকালে সুলতান আহমেদ নিজের নামে নিজ স্বাক্ষরে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়া, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম লটারি না করে নিজের একক সিদ্ধান্তে অনিয়মের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার মতো বিস্তর অভিযোগ দুদক ফাইল বন্দি করে রেখেছে। অজ্ঞাত কারণেই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে না।
কমিশন থেকে মামলা অনুমোদনের পরও তা দায়ের না হওয়ার প্রসঙ্গ তুললে অবাক হন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক। গত ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, অনুমোদনের পর মামলা দায়ের হওয়ার কথা। কোনো কারণে দেরি হলেও হবে। বিষয়টা কী হয়েছে, জেনে জানাতে পারব। কমিশনের অনুমোদনের পর সেটা বাতিলের এখতিয়ার কমিশনের আছে; তবে মামলা কেন হলো না, সেটার ব্যাখ্যা থাকবে।
এসব বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য- কমিশন যখন কোনো বিষয় অনুসন্ধানের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়, তার আগে অনেক যাচাই-বাছাই করা হয়ে থাকে এবং অভিযোগটি আমলযোগ্য মনে হলেই সিদ্ধান্ত হয়। পরে অনুসন্ধানের জন্য টিম গঠন এবং অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মামলা অনুমোদনের পর যদি তা দায়ের করা না হয়, সেটি আরও ভয়াবহ তথ্য। সেই ক্ষেত্রে কমিশন ব্যক্তির পরিচয় বা অবস্থানের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে কি না অথবা এর মধ্যে অন্য কোনো উপাদান আছে কি না, সেসব প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কমিশন কেন মামলা করল না, কোন প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করল, তারও ব্যাখ্যা থাকতে হবে। যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে, সাধারণ মানুষ দুদকে অভিযোগ জানাতে আগ্রহ হারাবে এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের যে ভাবমূর্তি, তা-ও ক্ষুণ্ন হবে।
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হচ্ছে না- এমন প্রসঙ্গ তুললে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ গত ৭ ফেব্রুয়ারি বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণের পর মামলা হয়নি বা ছাড় দেওয়া হয়েছে- এমন নজির দুদকে নেই। আমার কাছে এমন কোনো অভিযোগ নেই।’
কক্সবাজার পানি শোধনাগার প্রকল্পের ঘটনাটি তুলে ধরলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনুসন্ধান কর্মকর্তা সুপারিশ করলেই কমিশনকে সেটা মানতে হবে? অনুসন্ধান কর্মকর্তা যা দেবে, কমিশনকে সেটিই অনুমোদন করতে হবে কেন?’ তিনি বলেন, ‘দেখেন, অনুসন্ধান শেষ হলে কমিশন বসে; সুপারিশ যাচাই-বাছাই করা হয়; পরে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়।’
প্রমাণিত অভিযোগ আমলে নিতে বা মামলা করায় দুদকের বাধা কোথায় জানতে চাইলে সংস্থাটির সাবেক মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, ‘অনুসন্ধান কর্মকর্তা প্রতিটি অভিযোগ প্রামাণ্য দলিলের মাধ্যমে মামলার জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু কমিশন সুবিধামাফিক পরিসমাপ্তি করে থাকে। এর জন্য অবশ্যই ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কমিশন তা করে না; কোনো যুক্তি খণ্ডনও করে না। দুদক এটা বরাবরই করে আসছে। আমি যখন ছিলাম, তখন তৎকালীন চেয়ারম্যান (ইকবাল মাহমুদ) চার্জশিট হওয়ার পর থানা থেকে কাগজ ফেরত এনে আসামির নাম বাদ দিয়ে আবার আদালতে পাঠিয়েছেন। কমিশনে বিশেষ করে পরিচালক-মহাপরিচালক পর্যায়ে অ্যাডমিন ক্যাডারের লোকেরা থাকেন। কমিশনে তাদেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য।’











