সারাদেশে একই চিত্র: অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির টাকা কাদের পকেটে যাচ্ছে?
রোস্তম মল্লিক:
নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে। প্রকল্প সভাপতি ও সম্পাদকরা নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা করছেন না। ফলে যার যার ইচ্ছেমত চলছে প্রকল্পসমূহের কাজ। কাগজে কলমে প্রকল্পের কাজ ৪০ দিনের হলেও ১০/১২ দিন কাজ করিয়েই প্রকল্প শেষে করা হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ৮/১০ দিন কাজ করানোর পর প্রকল্প বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির টাকা চলে যাচ্ছে অন্যদের পকেটে। সারাদেশের ্একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারের শত-শত কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী তুলেছেন দেশ প্রেমিক,সচেতন নাগরিক সমাজ।
জানাগেছে, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি(ইজিপিপি) মূলত কর্মহীন মৌসুমে স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান ও স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কর্মক্ষম দুস্থ পরিবারগুলোর সুরক্ষা দানের জন্য ২০১৬ সালে সরকার এই কর্মসুচী হাতে নেয়। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই কর্মসুচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মূলত এলাকার অতিদরিদ্র এবং মৌসুমী বেকার শ্রমিক পরিবারের জন্য এই প্রকল্প। দরিদ্র জনগোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তি যার কাজের সামর্থ্য আছে এবং ভুমিহীন (বাড়ি ছাড়া ০.৫ একরের কম পরিমান জমি আছে)। যে ব্যাক্তির মাসিক আয় ৪,০০০/- (চার হাজার) টাকার কম অথবা যার মাছ চাষের জন্য পুকুর বা কোন প্রণীসম্পদ নেই । অদক্ষ শ্রমিক, যারা কাজ করতে আগ্রহী কিন্তু কোন কাজ পায় না । অদক্ষ শ্রমিক বলতে যারা দিন মজুর, রাজমিস্ত্রি,কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, গ্যাস মিস্ত্রি এবং কারখানা শ্রমিক অথবা যার অন্য কোন কাজের সুযোগ নেই । মহিলা এবং পুরুষ নির্বিশেষে একটি পরিবার থেকে মাত্র ০১ জন এ কাজের জন্য নির্বাচিত হবেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সুত্রে জানাগেছে, সারাদেশের ৪৮৯ টি উপজেলার ৪ হাজার ৫ শত ৫৪ টি ইউনিয়নে এই কর্মসুচী বাস্তবায়িত হচ্ছে। খাতা কলমে প্রায় ১০ লক্ষ কর্মহীন মানুষ এই কর্মসুচীর সুবিধা ভোগের আওতায় রয়েছে। গত অর্থ বছরে ( ২০১৯-২০) এই কর্মসুচী বাস্তবায়নে প্রায় ৮ শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বরাদ্দ ছিল সর্ব মোট ৮২১ কোটি ৩৭ লক্ষ ৯৭ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় সরকার প্রায় ১০ লক্ষ কর্মহীন মানুষকে এই সুবিধা দিলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান- মেম্বারদের অনিয়ম -দুর্নীতির কারণে ৫ লক্ষ কর্মহীন দরিদ্র মানুষও সেই সুবিধা পাচ্ছে না। এতে করে সরকারের শত -শত কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে।
কিভাবে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়: চাহিদা অনুসারে স্থানীয় জনগন ও উপকার ভোগীদের সম্পৃক্ত করে ওয়ার্ড পর্যায়ে সামাজিক প্রকল্পের প্রাথমিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। ইউনিয়নের ওয়ার্ড ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রনয়ণের জন্য সভা আহবান করতে হয় । সভায় মহিলাসহ সর্বস্তরের জনগণের উপস্থিতির লক্ষ্যে ব্যাপক ভিত্তিক প্রচারনা চালাতে হয়। ওয়ার্ড ভিত্তিক প্রকল্পের অগ্রাধিকার তালিকা সভার কার্যবিবরণীসহ ইউনিসয়ন কমিটির নিকট দাখিল করতে হয় । বাছাইকৃত প্রকল্প তালিকা ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে ঝুলিয়ে প্রচার করতে হয় ।
ইজিপিপি এর কাজের ধরণ: পুকুর, খাল খনন/পুন:খনন । বাঁধ নির্মাণ/পুন:নির্মাণ (পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক সুপারিশকৃত)। রাস্তা/বাঁধ নির্মাণ পুন:নির্মাণ। .গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন (রাস্তা, ব্রীজ)। সেচ কাজের জন্য ও জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য খাল/ নালা খনন/ পুন: খনন ।
প্রকল্প থেকে কি কি সুবিধা পাওয়া যায়: প্রতি কর্মদিবসে ২০০/- টাকা (প্রতি পর্যায়ে ৪০ দিন/বছরে ০২ টি পর্যায়) । ২৫/- টাকা সঞ্চয় হিসেবে জমা থাকতে হয়। জবকার্ড সরবরাহ, ১০/- টাকায় একটি ব্যাংক হিসাব খোলা, প্রতি বৃহস্পতিবার মজুরী উত্তোলন করতে হয়। পুরুষ/ মহেলা সমান মজুরীর অধিকারী। কার্যক্ষেত্রে মজুরীর হার প্রদর্শন করতে হয় । জবকার্ডে মজুরী প্রদানের সকল তথ্য থাকতে হয় ।
বাস্তবে যা হচ্ছে :দেশের বেশকয়েকটি উপজেলার শতাধিক ইউনিয়নে খোঁজখবর নিয়ে জানাগেছে, প্রকল্প সভাপতি ও সম্পাদকরা তাদের চাহিদামত শ্রমিক কাজে লাগাচ্ছেন না। ৫০ জন অনুমোদন থাকলে সেখানে ১০/১৫ জন দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। আবার ৪০ দিনের স্থলে ১০/১৫ দিন কাজ করিয়ে ৪০ দিনের বিল দাখিল করছেন। এমনও শোনা যায় যে, তারা নিজেদের আত্মীয় -স্বজন ও পকেটের লোকজনদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে নিজেরায় চেকে টাকা তুলে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। ব্যংক হিসাবধারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তার প্রমাণ মিলবে। প্রকল্প সভাপতি ও সম্পাদকদের এসব দুর্নীতির কারণে সরকারের কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) (কর্মহীন মৌসুমে স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান ও স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কর্মক্ষম দুস্থ পরিবারগুলোর সুরক্ষা দানের কর্মসূচি) প্রকৃত দারিদ্য জনগোষ্ঠির শতভাগ উপকারে আসছে না। প্রকল্পের সিংহভাগ টাকা চলে যাচ্ছে চেয়ারম্যান, মেম্বারদের পকেটে।
প্রয়োজন কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থ্া: সরকারের এই মহৎ কর্মসুচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং প্রযোজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে স্ব স্ব এলাকার প্রশাসন ও সিভিল সোসাইটি নিয়ে পৃথক একটি মনিটরিং কমিটি করা যেতে পারে। এছাড়া গত ও চলতি অর্থ বছরের সুবিধাভোগি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবগুলো খতিয়ে দেখার দাবী তোলা হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে ৪০ দিনের কর্মসুচীর যে অর্থ ছাড় করা হয়েছে সেগুলোর কার্ডধারী শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও অনিয়ম-দুর্নীতি ধরা পড়বে বলে তারা মনে করছেন। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী , দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও দুদক চেয়ারম্যানের পদক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।











