নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মুখোমুখি দু’দল
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মুখোমুখি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থানে দুদল। এ নিয়ে উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। তাদের মতে, উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তাই সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই হবে আগামী নির্বাচন। এ নিয়ে বিএনপি আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা করলে রাজপথেই তাদের মোকাবিলা করা হবে। অন্যদিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমেই এ দাবি আদায় করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। বিএনপির এ ধরনের হুঁশিয়ারিকে আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। দুদলের এমন কঠোর অবস্থানে রাজপথে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে
তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না: মির্জা ফখরুল
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলার মাটিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি কোনো নির্বাচনে যাবে না। তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিবাস্বপ্ন। হাছান মাহমুদ, রাজ্জাকরা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিরুদ্ধে তাদের এসব বলার কারণ হলো-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না। ৩০টির বেশি আসন তারা পাবে না। এ কারণে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ভয় পায়।’
শুক্রবার বিকালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঘাগটিয়া চালা ওয়েলফেয়ার ক্লাব মাঠে আয়োজিত দোয়া ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য প্রয়াত নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ্’র ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে হান্নান শাহ্ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি একেএম ফজলুল হক মিলন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ পরপর তিনবার জনগণের ভোট লুট করে, দিনের ভোট রাতে করে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের দাবি ও আন্দোলনের মুখে সংসদ ভেঙে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে এবং সেই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আওয়ামী লীগের উদ্দেশে বলেন, অবিলম্বে জনগণের দাবি মেনে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে জনগণের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচুন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে দশ টাকা কেজি চাল, বিনা পয়সায় সার, ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সঙ্গে তামাশা করছেন। বর্তমানে ঘরে ঘরে এখন লাখ লাখ যুবক বেকার। শিক্ষকতার চাকরি পেতে বিশ লাখ, কনস্টেবলে ২৫ লাখ, চৌকিদার-দফাদারে ১২ লাখ টাকা ঘুস দিতে হয়। এক রাতে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিনের দাম বেড়েছে ৫৪ ভাগ। তা ছাড়া চাল, ডাল, সবজির দাম আকাশচুম্বী। সব কিছুর দাম এখন নাগালের বাইরে। জিনিসপত্রের দাম কমানোর দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ভোলা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে পুলিশের গুলিতে চার নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গোটা পৃথিবী জানে বাংলাদেশে আজ মানবাধিকার নেই, আইনের শাসন নেই। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে। অথচ একই মামলায় অন্যদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আজ নির্বাসিত। অসংখ্য আলেম-ওলামা আজ কারাগারে বন্দি। একই সময়ে যারা ব্যাংক ডাকাতি, মানুষ হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন করেছে, তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র নির্মাণ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে কয়জন অকুতোভয় সৈনিক অবদান রেখে গেছেন, তাদের মধ্যে হান্নান শাহ্ অন্যতম। হান্নান শাহ্ দেশের চরম দুর্দিনে, পার্টির দুর্দিনে ছিলেন কাণ্ডারি। হান্নান শাহ্ চট্টগ্রাম থেকে শহিদ জিয়াউর রহমানের লাশ ঢাকায় এনেছিলেন। তিনি ছিলেন ১/১১-এর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
তিনি ছিলেন আমাদের উজ্জ্বল নক্ষত্র ও প্রেরণার বাতিঘর। ওনার মতো মহান নেতার কবর জিয়ারত করতে পেরে আমি ধন্য। কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আজিজুর রহমান পেরার পরিচালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হান্নান শাহ্পুত্র শাহ্ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ, কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও নরসিংদী জেলা বিএনপির আহবায়ক খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন, বেনজির আহমেদ টিটু, ওমর ফারুক সাফিন, গাজীপুর মহানগর বিএনপির আহবায়ক বিশিষ্ট শিল্পপতি সোহরাব উদ্দিন, গাজীপুর জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক রাশেদুল হক, বিএনপি নেতা মাস্টার হুমায়ূন কবির, শাহজাহান ফকির, হেলাল উদ্দিন, ড. অ্যাডভোকেট সাইদুজ্জামান, আ ন ম ইব্রাহীম খলিল, অ্যাড. কাজী খান, আবু তাহের মুসল্লি, মোয়াজ্জেম হোসেন, আকতারুজ্জামান বাবুল, হাসিবুর রহমান খান মুন্না, আতাউর রহমান মোল্লা, জান্নাতুল ফেরদৌসী, ইয়াসিন মোল্লা প্রমুখ।
এদিকে হান্নান শাহ্’র রুহের মাগফিরাত কামনায় তার গ্রামের বাড়ি ঘাগটিয়াতে কোরআনখানি, মিলাদ, দোয়া, স্মরণসভা ও দলীয় নেতাকর্মীদের পুষ্পস্তবক অর্পণসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হয়।
হুঙ্কারে লাভ নেই সংবিধান মেনেই নির্বাচন: মতিয়া চৌধুরী
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপি নেতারা যা বলছে তা আসলে খড়কুটোকে অবলম্বনের মতো। দলটির নেতারা এখন অনেক কথাই বলছেন। আসলে এগুলো তারা বলছে তাদের ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়াতে। এখন কথার ওপর তো ট্যাক্স বসানো হয়নি। তাই তারাও (বিএনপি নেতারা) যা খুশি বলতে পারছে। কিন্তু হুঙ্কার দিয়ে লাভ হবে না। সংবিধানে যেভাবে আছে সেই প্রক্রিয়াতেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের বাইরে যাওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বলেন, তাই করেন।
শুক্রবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ৩০টির বেশি আসন পাবে না। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া এ দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।’ মির্জা ফখরুলের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় যুগান্তরকে এসব কথা বলেন মতিয়া চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, কেউ বললেই তো আর সেটা হয়ে গেল না। এটা সম্ভবও নয়। সংবিধানের বিধান অনুসারে বাংলাদেশে আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণীয় পর্যায়ের এই নেতা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি আন্দোলনে নামলে আওয়ামী লীগ কী করবে জানতে চাইলে মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিএনপি তো আন্দোলন করে না। আন্দোলনের নামে তারা নৈরাজ্য করে। অতীতেও তারা সেটাই করেছে। অগ্নিসন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। এবারও যদি আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য করতে চায়, তাহলে তো সরকার বসে থাকবে না। জনগণের জানমাল রক্ষায় অবশ্যই যা করণীয় তাই করবে। আওয়ামী লীগও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করবে। কাউকে অশান্তি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।
মতিয়া চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি নেতারা এই ধরনের কথাই বলবে। কারণ দলটির জন্মই হয়েছে হত্যা-ক্যুর মধ্য দিয়ে। হত্যা-ক্যু নিয়েই তাদের রাজনীতি। জিয়াউর রহমানের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশে কারফিউ ছিল। ফলে গণতন্ত্র তাদের ভালো লাগবে না, এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, বিএনপি এটা নিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে। কিন্তু হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই। হুঙ্কার বাস্তবায়ন হতে দেওয়া হবে না।















