০২:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাদেরের ক্যারিশমা

প্রতিনিধির নাম:

পকেটে অস্ত্র। হাতে ওয়াকিটকি। সামনে-পেছনে প্রটোকলে একাধিক বডিগার্ড। ডানে-বাঁয়ে কথিত সুন্দরী নারী মডেল। যাদেরকে ব্যবহার করতেন টোপ হিসেবে। নিজেকে পরিচয় দিতেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। ভুয়া স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে যখন- তখন সচিবালয়ে প্রবেশ করতেন। যাতায়াত করতেন দেড় কোটি টাকা দামের ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো গাড়িতে।৩৩ জন মন্ত্রী, এমপি ও সচিবের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে বলে প্রচারণা চালাতেন। কৌশলে হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে মানুষকে দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতেন। ব্যাংক ঋণ, ঠিকাদারি ও সরবরাহের কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতেন। চুক্তির টাকা হাতে পাওয়ার পর শুরু করতেন নানান তাল-বাহানা। পরে ভুক্তভোগীদের কাজ পাইয়ে না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দিতেন। পাওনাদার টাকা চাইলে বিভিন্ন মহল থেকে ফোন করিয়ে ভয়ভীতি দেখাতেন। এভাবে বহু বছর ধরে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এক প্রতারক। তার নাম আব্দুল কাদের মাঝি। ৭ই অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত রাজধানীর কাওরান বাজার, মিরপুর ও গুলশানে অভিযান চালিয়ে আব্দুল কাদেরসহ তার আরও তিন সহযোগীতে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি’র গুলশান বিভাগ। বাকিরা হলেন- আব্দুল কাদেরের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী ছোঁয়া, শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান। গ্রেপ্তারের সময় কাদেরের কাছে পাওয়া যায় অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া আইডি কার্ড ও ভিজিটিং কার্ড, অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি।
ডিবিসূত্র জানিয়েছে, প্রায় ১৪ বছর ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন আব্দুল কাদের মাঝি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দশম শ্রেণি। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ভূমিহীন এক কৃষক পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা জীবিকার সন্ধানে সন্দ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। একসময় মাছ ধরে বিক্রি করে তার জীবিকা নির্বাহ হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় এসে তার খোলস পাল্টাতে শুরু করেন। প্রতারণার কৌশল রপ্ত করে শুরু করেন বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা। তার নামের সঙ্গে মিল আছে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিবের। যার নাম আব্দুল কাদের চৌধুরী। মূলত আব্দুল কাদের মাঝি তার নামের শেষে মাঝি বাদ দিয়ে চৌধুরী যুক্ত করে বিভিন্ন স্থানে পরিচয় দেয়া শুরু করেন অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। প্রতারণার টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছেন। যে গাড়িতে চলাফেরা করতেন তার দাম প্রায় দেড় কোটি টাকা। গাড়িতে মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ও ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড লাগানো থাকতো। এই গাড়িতে করেই সচিবালয়ে প্রবেশ করতেন। অথচ কেউ তাকে কোনোদিন সন্দেহ করেনি। তার ঘনিষ্ঠতা ছিল ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার ঠিকাদার জি কে শামীমের সঙ্গে। এছাড়া সে ধনকুবের প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতো বলে গোয়েন্দাদের জানিয়েছে।
ডিবিসূত্র জানিয়েছে, প্রতারণা করার জন্য কাদেরের বেশ কয়েকটি নামসর্বস্ব কোম্পানি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে হলো- ঢাকা ট্রেড করপোরেশন, জমিদার ট্রেডিং, সামীন এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী গ্রুপ, হিউম্যান ইমপ্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশন, সততা প্রপার্টিজ, ডানা লজিস্টিকস ও ডানা মোটরস। নামসর্বস্ব হলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য রয়েছে আলিশান অফিস। ঢাকার কাওরান বাজার, মিরপুর ও গুলশানে তার অফিস রয়েছে। গুলশানে ৬ হাজার বর্গফুটের একটি অফিস রয়েছে। প্রতি মাসে এই অফিসের ভাড়া দিতে হয় ৫ লাখ টাকা। মূলত এসব কোম্পানির নামেই প্রতারণা করতেন কাদের। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের’- নামে বড় ধরনের প্রতারণা করেছেন তিনি। সরকারি অনুদানে বাড়ি ও খামার তৈরি করে দেবে বলে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২০ কোটি বা তার চেয়ে বেশি টাকার ঋণ পাইয়ে দেয়ার নামে প্রতারণা করেছেন। এক্ষেত্রে তার মার্কেটিংয়ের লোকরা বিভিন্ন ঠিকাদার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিজ্ঞাপন দিতেন। এরপর ঋণ পাইয়ে দিতে কাদেরের ইন্টারভিউ ও কনসালটেন্সির জন্য নেয়া হতো ৫০ হাজার টাকা। ২-১০ লাখ টাকা নেয়া হতো লোনের জন্য প্রোফাইল বানাতে। এছাড়া ২০ কোটি বা তদূর্ধ্ব অংকের লোন পাইয়ে দিতে ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ৫-১০ শতাংশ টাকা নেয়া হতো লোন প্রার্থীর কাছ থেকে। পরে কাউকে লোন করিয়ে দিতে না পারলেও হাতিয়ে নেয়া সেই লাখ লাখ টাকার অংশবিশেষ  ফেরত দিয়ে বাকিটা রেখে দেয়া হতো। সেনাবাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্টের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি পেয়েছে বলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করতেন কাদের। সেগুলো দেখিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ওয়ার্ক অর্ডার বিক্রি করতেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা জামানত রেখে সেগুলো দিয়ে আবার প্রতারণা করতো কাদের চক্র। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়ার নাম করে বহু মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন  কোটি কোটি টাকা। এছাড়া সততা প্রপার্টিজের নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতারণা করেছেন কাদের। জমি ও স্থাপনা কেনার জন্য নামমাত্র কিছু টাকা বায়না দিয়ে চুক্তি সম্পাদন করতেন। যেগুলো দিয়ে পরে মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে টাকা নিত।
ডিবি’র তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্র জানিয়েছে, প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে আব্দুল কাদের একাধিক ছবি তুলে চাকরিপ্রার্থী, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের দেখাতেন। তাদের সামনে মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, এমপি, সচিবদের সঙ্গে কথা বলতেন। যেগুলো দেখে যে কেউ তাকে বিশ্বাস করতেন। এতে করে মানুষ যেকোনো কাজের জন্য তাকে সহজেই টাকা দিত। অনেক ভুক্তভোগী তার কাছে কোটি টাকার বেশি পান। প্রতারক কাদের তিনটি বিয়ে করেছে। বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যক্তিদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের জন্য কাদের সুন্দরী নারী মডেলদের ব্যবহার করতেন। তার মোবাইলে অন্তত অর্ধশতাধিক কথিত নারী মডেলের ছবি ও মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। আব্দুল কাদের, তার স্ত্রী ও সহকর্মীদের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় অস্ত্র মামলা, তেজগাঁও থানায় প্রতারণার মামলা হয়েছে। এর আগে তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি, বিভিন্ন প্রতারণার জন্য কমপক্ষে অর্ধ ডজন মামলাও রয়েছে বলে জানায় ডিবি।
ডিবি জানিয়েছে, আব্দুল কাদের গাজীপুরের বোর্ডবাজারে নয়তলা বাড়ি কিনেছেন। গাজীপুরের পুবাইলে রয়েছে ৮ বিঘার বাগানবাড়ী। ডাচ্‌?-বাংলা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে রয়েছে তার একাধিক অ্যাকাউন্ট। এসব অ্যাকউন্টে রয়েছে কোটি কোটি টাকা। ঢাকায় রয়েছে তার একাধিক ফ্ল্যাট। অঢেল সম্পদের মালিক এই আব্দুল কাদেরের নেই কোনো বৈধ উপার্জন। সবকিছু প্রতারণার মাধ্যমে করেছেন।
ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদিন মানবজমিনকে বলেন, মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় আমার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা ছিল। সাপ্লাইয়ের সাব-কন্ট্রাক্টে আমি একটা ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছিলাম। এর জন্য আমার টাকার প্রয়োজন ছিল। কাদেরের মার্কেটিংয়ের লোক আমাকে তার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যায়। সেখান থেকে নম্বর নিয়ে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার ২০ কোটি টাকার লোন দরকার ছিল। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ১৫ হাজার টাকা দিয়ে আমি একটি ফরম পূরণ করি। এরপর লোনের জন্য প্রোফাইল মেকিং চার্জের নামে আরও পাঁচ লাখ টাকা চাইলে আমি দুই লাখ টাকা দেই। এরপর ২০ কোটি টাকা লোন পাইয়ে দেয়ার জন্য লোনের ১ শতাংশ টাকা অগ্রিম চায়, কিন্তু আমি ১০ লাখ টাকা দেই। সব মিলিয়ে কাদের আমার কাছ থেকে ১০ লাখ ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।  ঋণ পাইনি। টাকা নিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে ঘুরিয়েছে। তার কাছে টাকা চাইলে নানা সমস্যা দেখাতো। প্রথম কিছুদিন বলতো হয়ে যাবে। পরে বিভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে আমাকে ফোন করাতো।
আরেক ভুক্তভোগী ঢাকার দক্ষিণ খান এলাকার মো. মনির হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমি সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করি। ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করেছি। বনলতা নামের পূর্ব পরিচিত এক নারী আমাকে কাদেরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কাদের জলসিঁড়ি নামক একটি প্রকল্পে ৮৪ কোটি টাকা মূল্যের ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে আমার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে আর কাজও পাইনি টাকাও পাইনি। টাকা চাইলে আমাকে আশ্বাস দিয়ে রাখতো। কিন্তু একসময় যখন দেখলাম টাকা পাওয়ার আর সম্ভাবনা নেই তখন টাকা চাইতে শুরু করি। টাকা না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। গা-ঢাকা দিয়ে থাকতো। ডিবি’র কাছ থেকে জানতে পেরেছি সে ভুয়া পরিচয় দিত। এখন গ্রেপ্তারও হয়েছে।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, কাদের নিজস্ব দালাল ও মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদেরকে প্রলুব্ধ করে বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান এবং ওয়ার্ক অর্ডার, সাব-কন্ট্রাক্ট, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রসেসিং করতো। তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের পরিচয়, ভুয়া সিআইপি পরিচয় দিত। দামি দামি গাড়ি, বডিগার্ড ও ওয়্যারলেস সেট ইত্যাদি ব্যবহার করতো। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত ভুয়া কার্যাদেশ, মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে তোলা ছবি ও লেনদেনের ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করতো। সচিবসহ ৩৩ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে তার কনসোর্টিয়াম, ব্যবসা আছে মানুষকে বলতো।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৪:২৬:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১
১৮০ বার পড়া হয়েছে

কাদেরের ক্যারিশমা

আপডেট সময় ০৪:২৬:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১

পকেটে অস্ত্র। হাতে ওয়াকিটকি। সামনে-পেছনে প্রটোকলে একাধিক বডিগার্ড। ডানে-বাঁয়ে কথিত সুন্দরী নারী মডেল। যাদেরকে ব্যবহার করতেন টোপ হিসেবে। নিজেকে পরিচয় দিতেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। ভুয়া স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে যখন- তখন সচিবালয়ে প্রবেশ করতেন। যাতায়াত করতেন দেড় কোটি টাকা দামের ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো গাড়িতে।৩৩ জন মন্ত্রী, এমপি ও সচিবের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে বলে প্রচারণা চালাতেন। কৌশলে হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে মানুষকে দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতেন। ব্যাংক ঋণ, ঠিকাদারি ও সরবরাহের কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতেন। চুক্তির টাকা হাতে পাওয়ার পর শুরু করতেন নানান তাল-বাহানা। পরে ভুক্তভোগীদের কাজ পাইয়ে না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দিতেন। পাওনাদার টাকা চাইলে বিভিন্ন মহল থেকে ফোন করিয়ে ভয়ভীতি দেখাতেন। এভাবে বহু বছর ধরে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এক প্রতারক। তার নাম আব্দুল কাদের মাঝি। ৭ই অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত রাজধানীর কাওরান বাজার, মিরপুর ও গুলশানে অভিযান চালিয়ে আব্দুল কাদেরসহ তার আরও তিন সহযোগীতে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি’র গুলশান বিভাগ। বাকিরা হলেন- আব্দুল কাদেরের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী ছোঁয়া, শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান। গ্রেপ্তারের সময় কাদেরের কাছে পাওয়া যায় অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া আইডি কার্ড ও ভিজিটিং কার্ড, অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি।
ডিবিসূত্র জানিয়েছে, প্রায় ১৪ বছর ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন আব্দুল কাদের মাঝি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দশম শ্রেণি। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ভূমিহীন এক কৃষক পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা জীবিকার সন্ধানে সন্দ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। একসময় মাছ ধরে বিক্রি করে তার জীবিকা নির্বাহ হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় এসে তার খোলস পাল্টাতে শুরু করেন। প্রতারণার কৌশল রপ্ত করে শুরু করেন বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা। তার নামের সঙ্গে মিল আছে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিবের। যার নাম আব্দুল কাদের চৌধুরী। মূলত আব্দুল কাদের মাঝি তার নামের শেষে মাঝি বাদ দিয়ে চৌধুরী যুক্ত করে বিভিন্ন স্থানে পরিচয় দেয়া শুরু করেন অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। প্রতারণার টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছেন। যে গাড়িতে চলাফেরা করতেন তার দাম প্রায় দেড় কোটি টাকা। গাড়িতে মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ও ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড লাগানো থাকতো। এই গাড়িতে করেই সচিবালয়ে প্রবেশ করতেন। অথচ কেউ তাকে কোনোদিন সন্দেহ করেনি। তার ঘনিষ্ঠতা ছিল ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার ঠিকাদার জি কে শামীমের সঙ্গে। এছাড়া সে ধনকুবের প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতো বলে গোয়েন্দাদের জানিয়েছে।
ডিবিসূত্র জানিয়েছে, প্রতারণা করার জন্য কাদেরের বেশ কয়েকটি নামসর্বস্ব কোম্পানি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে হলো- ঢাকা ট্রেড করপোরেশন, জমিদার ট্রেডিং, সামীন এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী গ্রুপ, হিউম্যান ইমপ্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশন, সততা প্রপার্টিজ, ডানা লজিস্টিকস ও ডানা মোটরস। নামসর্বস্ব হলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য রয়েছে আলিশান অফিস। ঢাকার কাওরান বাজার, মিরপুর ও গুলশানে তার অফিস রয়েছে। গুলশানে ৬ হাজার বর্গফুটের একটি অফিস রয়েছে। প্রতি মাসে এই অফিসের ভাড়া দিতে হয় ৫ লাখ টাকা। মূলত এসব কোম্পানির নামেই প্রতারণা করতেন কাদের। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের’- নামে বড় ধরনের প্রতারণা করেছেন তিনি। সরকারি অনুদানে বাড়ি ও খামার তৈরি করে দেবে বলে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২০ কোটি বা তার চেয়ে বেশি টাকার ঋণ পাইয়ে দেয়ার নামে প্রতারণা করেছেন। এক্ষেত্রে তার মার্কেটিংয়ের লোকরা বিভিন্ন ঠিকাদার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিজ্ঞাপন দিতেন। এরপর ঋণ পাইয়ে দিতে কাদেরের ইন্টারভিউ ও কনসালটেন্সির জন্য নেয়া হতো ৫০ হাজার টাকা। ২-১০ লাখ টাকা নেয়া হতো লোনের জন্য প্রোফাইল বানাতে। এছাড়া ২০ কোটি বা তদূর্ধ্ব অংকের লোন পাইয়ে দিতে ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ৫-১০ শতাংশ টাকা নেয়া হতো লোন প্রার্থীর কাছ থেকে। পরে কাউকে লোন করিয়ে দিতে না পারলেও হাতিয়ে নেয়া সেই লাখ লাখ টাকার অংশবিশেষ  ফেরত দিয়ে বাকিটা রেখে দেয়া হতো। সেনাবাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্টের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি পেয়েছে বলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করতেন কাদের। সেগুলো দেখিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ওয়ার্ক অর্ডার বিক্রি করতেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা জামানত রেখে সেগুলো দিয়ে আবার প্রতারণা করতো কাদের চক্র। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়ার নাম করে বহু মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন  কোটি কোটি টাকা। এছাড়া সততা প্রপার্টিজের নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতারণা করেছেন কাদের। জমি ও স্থাপনা কেনার জন্য নামমাত্র কিছু টাকা বায়না দিয়ে চুক্তি সম্পাদন করতেন। যেগুলো দিয়ে পরে মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে টাকা নিত।
ডিবি’র তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্র জানিয়েছে, প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে আব্দুল কাদের একাধিক ছবি তুলে চাকরিপ্রার্থী, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের দেখাতেন। তাদের সামনে মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, এমপি, সচিবদের সঙ্গে কথা বলতেন। যেগুলো দেখে যে কেউ তাকে বিশ্বাস করতেন। এতে করে মানুষ যেকোনো কাজের জন্য তাকে সহজেই টাকা দিত। অনেক ভুক্তভোগী তার কাছে কোটি টাকার বেশি পান। প্রতারক কাদের তিনটি বিয়ে করেছে। বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যক্তিদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের জন্য কাদের সুন্দরী নারী মডেলদের ব্যবহার করতেন। তার মোবাইলে অন্তত অর্ধশতাধিক কথিত নারী মডেলের ছবি ও মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। আব্দুল কাদের, তার স্ত্রী ও সহকর্মীদের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় অস্ত্র মামলা, তেজগাঁও থানায় প্রতারণার মামলা হয়েছে। এর আগে তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি, বিভিন্ন প্রতারণার জন্য কমপক্ষে অর্ধ ডজন মামলাও রয়েছে বলে জানায় ডিবি।
ডিবি জানিয়েছে, আব্দুল কাদের গাজীপুরের বোর্ডবাজারে নয়তলা বাড়ি কিনেছেন। গাজীপুরের পুবাইলে রয়েছে ৮ বিঘার বাগানবাড়ী। ডাচ্‌?-বাংলা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে রয়েছে তার একাধিক অ্যাকাউন্ট। এসব অ্যাকউন্টে রয়েছে কোটি কোটি টাকা। ঢাকায় রয়েছে তার একাধিক ফ্ল্যাট। অঢেল সম্পদের মালিক এই আব্দুল কাদেরের নেই কোনো বৈধ উপার্জন। সবকিছু প্রতারণার মাধ্যমে করেছেন।
ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদিন মানবজমিনকে বলেন, মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় আমার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা ছিল। সাপ্লাইয়ের সাব-কন্ট্রাক্টে আমি একটা ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছিলাম। এর জন্য আমার টাকার প্রয়োজন ছিল। কাদেরের মার্কেটিংয়ের লোক আমাকে তার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যায়। সেখান থেকে নম্বর নিয়ে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার ২০ কোটি টাকার লোন দরকার ছিল। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ১৫ হাজার টাকা দিয়ে আমি একটি ফরম পূরণ করি। এরপর লোনের জন্য প্রোফাইল মেকিং চার্জের নামে আরও পাঁচ লাখ টাকা চাইলে আমি দুই লাখ টাকা দেই। এরপর ২০ কোটি টাকা লোন পাইয়ে দেয়ার জন্য লোনের ১ শতাংশ টাকা অগ্রিম চায়, কিন্তু আমি ১০ লাখ টাকা দেই। সব মিলিয়ে কাদের আমার কাছ থেকে ১০ লাখ ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।  ঋণ পাইনি। টাকা নিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে ঘুরিয়েছে। তার কাছে টাকা চাইলে নানা সমস্যা দেখাতো। প্রথম কিছুদিন বলতো হয়ে যাবে। পরে বিভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে আমাকে ফোন করাতো।
আরেক ভুক্তভোগী ঢাকার দক্ষিণ খান এলাকার মো. মনির হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমি সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করি। ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করেছি। বনলতা নামের পূর্ব পরিচিত এক নারী আমাকে কাদেরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কাদের জলসিঁড়ি নামক একটি প্রকল্পে ৮৪ কোটি টাকা মূল্যের ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার নাম করে আমার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে আর কাজও পাইনি টাকাও পাইনি। টাকা চাইলে আমাকে আশ্বাস দিয়ে রাখতো। কিন্তু একসময় যখন দেখলাম টাকা পাওয়ার আর সম্ভাবনা নেই তখন টাকা চাইতে শুরু করি। টাকা না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। গা-ঢাকা দিয়ে থাকতো। ডিবি’র কাছ থেকে জানতে পেরেছি সে ভুয়া পরিচয় দিত। এখন গ্রেপ্তারও হয়েছে।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, কাদের নিজস্ব দালাল ও মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদেরকে প্রলুব্ধ করে বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান এবং ওয়ার্ক অর্ডার, সাব-কন্ট্রাক্ট, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রসেসিং করতো। তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য ভুয়া অতিরিক্ত সচিবের পরিচয়, ভুয়া সিআইপি পরিচয় দিত। দামি দামি গাড়ি, বডিগার্ড ও ওয়্যারলেস সেট ইত্যাদি ব্যবহার করতো। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত ভুয়া কার্যাদেশ, মুসা বিন শমসেরের সঙ্গে তোলা ছবি ও লেনদেনের ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করতো। সচিবসহ ৩৩ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে তার কনসোর্টিয়াম, ব্যবসা আছে মানুষকে বলতো।