রাজনৈতিক দলকে ফের সময় বেঁধে দিচ্ছে ইসি
‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন-২০২০’-এর নতুন খসড়ায় ২০২৫ সালের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একাধিক কমিশনার ওই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করার পক্ষে মত দিয়েছেন। বুধবার কমিশনের ৭০তম সভায় নতুন এ খসড়া উত্থাপন করা হলে কমিশনাররা এসব মত দেন।
সভায় প্রয়োজনীয় সংশোধনসাপেক্ষে খসড়া আইনটি নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে ইসি প্রকাশিত খসড়া এ আইনে নারী নেতৃত্ব রাখার সময়সীমা উঠিয়ে দেয়া হয়।
যদিও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও)-এ ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিটি কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, আরপিওর কিছু অংশ আলাদা করে নতুন ‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন’ প্রণয়ন নিয়ে কমিশন সভায় আপত্তি জানিয়েছেন দু’জন কমিশনার।
তারা আরপিওতে এসব বিধান রেখেই প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব দেন। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
সিটি কর্পোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম ও এর জনপ্রতিনিধিদের পদবি বদল সংক্রান্ত প্রস্তাবের বিপক্ষেও মত দিয়েছেন একাধিক নির্বাচন কমিশনার।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে বুধবার নির্বাচন ভবনে কমিশনের ৭০তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে চার কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
সভায় রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন, ২০২০-এর বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য তোলা হয়। সভার কার্যপত্রে বলা হয়, খসড়া আইনের ওপর নিবন্ধিত ১৭টি রাজনৈতিক দল, ২৩টি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান এবং ১৫ জন ব্যক্তি মতামত দিয়েছেন।
করোনা সংক্রমণের কারণে এলডিপি ও খেলাফত মজলিস মতামত পাঠায়নি। এর আগে আইন মন্ত্রণালয় আরপিওর ওপর ভেটিংয়ে নিবন্ধন সংক্রান্ত ধারা আলাদা করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল।
এদিকে বুধবার অনুষ্ঠিত কমিশন সভার আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, খসড়া আইনে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব ২০২৫ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমি ওই বাধ্যবাধকতা ২০৩০ সাল পর্যন্ত রাখার প্রস্তাব করেছি। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত যেসব নাম পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব খসড়া আইনে করা হয়েছে; বহুল প্রচলিত ও অন্যান্য আইনে যেসব শব্দ বিদ্যমান রয়েছে-সেগুলো পরিবর্তন না করার পক্ষে মত দিয়েছি।
অপরদিকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নতুন আইন না করার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়ে কমিশন সভায় নোট অব ডিসেন্ট দেন।
তিনি বলেন, আরপিওর অংশবিশেষ নিয়ে পৃথকভাবে আইন প্রণয়ন হঠকারী সিদ্ধান্ত। আরপিও একটি ঐতিহাসিক আইনগত দলিল, যা বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার অনন্য স্মারক।
নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তাব গৃহীত হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অঙ্গহানি ঘটবে, যাতে একে বিকলাঙ্গ মনে হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিইসি আইনের খসড়া উত্থাপনের পর আইন সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে কবিতা খানম এর ওপর তার মতামত তুলে ধরেন।
তিনি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে নতুন আইন করার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে প্রণীত আরপিওতে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিধান ছিল না।
২০০৮ সালে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন এটি পৃথক আইন করা হলে আরপিওর ব্যত্যয় ঘটবে না। রাজনৈতিক দলের কমিটিতে নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সময়সীমা বেঁধে দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
এরপর নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী স্বতন্ত্র আইন তৈরিতে আপত্তি জানান। তিনি আরপিওতে এ সংক্রান্ত ধারায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার প্রস্তাব দেন।
নতুন আইন করতে হলে স্টেকহোল্ডারদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়ার মত দেন তিনি। এ ছাড়া তিনি নারী নেতৃত্ব রাখার সময়সীমা বেঁধে দেয়ার পক্ষে প্রস্তাব দেন।
কমিশন সভার পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর। নতুন আইনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মনোনয়ন দেয়া হয়।
সেটি আইনি কাঠামো ও শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হলে আরপিও থেকে নিবন্ধন অংশ বের করে এনে আলাদাভাবে স্বতন্ত্র আইন করা উচিত।
যাতে সংসদ ও স্থানীয় সরকারসহ সব নির্বাচনে প্রযোজ্য করা যাবে। এইসব উদ্দেশ্য নিয়ে আইনের খসড়া করা হয়েছে।
নতুন আইন করার বিষয়ে বিএনপি-আ’লীগের বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা যা শুনেছেন তা নয়। এরকম মত আসেনি।
আমরা ১৭টি নিবন্ধিত দলসহ বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক ও নাগরিক ব্যক্তিত্বের মতামত নিয়েছি। কমিশন তাদের মতামত দেখেছেন, পড়েছেন। যে যুক্তিগুলো গ্রাহ্য, তা গ্রহণ করেছে; যা অগ্রাহ্য তা গ্রহণ করেনি।
কমিশন সভার কার্যপত্রে রাজনৈতিক দলের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনের ওপর মতামতে আওয়ামী লীগ বলেছে, আরপিওর বাইরে আলাদা আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই।
প্রস্তাবিত আইনের বিধানাবলি আগের মতো আরপিওতে থাকা সমীচীন। কারণ, আরপিও ১৯৭২ সালে জাতির পিতার নিজের হাতে করা আইন। এর সঙ্গে বাঙালি জাতির আবেগের বিষয় জড়িত রয়েছে।
আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব করে আওয়ামী লীগ আরও বলেছে, এর অংশবিশেষ নিয়ে আলাদাভাবে আইন প্রণয়ন করা সমীচীন হবে না। অপরদিকে বিএনপি রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার কার্যক্রম স্থগিত করার পক্ষে মত দিয়েছিল।















