০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
পাঁচ কোটির বিনিময়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে আব্দুল আউয়াল!
রোস্তম মল্লিক
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) নিয়োগ, পদায়ন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নজিরবিহীন চিত্র ফুটে উঠেছে। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদটি পাঁচ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহ সার্কেলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসি) আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে। তবে তার প্রধান প্রকৌশলী হওয়াকে ঘিরে অধিদপ্তরে ভেতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জ্যেষ্ঠতার সিরিয়াল ভেঙে প্রধান প্রকৌশলীর এই পদ বাগিয়ে নিতে আউয়ালের ঘুষ দিতে হয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। এতে তিনজন সিনিয়র প্রকৌশলীকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গেল বছর ১৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে আব্দুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলী করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে আব্দুল আউয়াল তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ তিনজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে এই পদটি দখল করেন। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র বলছে, এই নিয়োগের পেছনে ছিল বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আউয়াল অনেক পেছনে থাকলেও ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি শীর্ষপদে আসীন হন। নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বা জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে যোগ্য কর্মকর্তাদের এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আউয়ালের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ঐতিহ্য ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যা সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আউয়ালের এই নিয়োগের নেপথ্য কারিগর ছিলেন ময়মনসিংহের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউল হক। তিনি স্থানীয় সরকার সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর নিকটাত্মীয় হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা কাঠামোতে তার বেশ প্রভাব রয়েছে। এই সচিব নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সবার বাড়ি ময়মনসিংহে হওয়ায় অধিদপ্তরে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বলয় বা ‘ময়মনসিংহ সিন্ডিকেট’ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সচিবের আস্থাভাজন হিসেবে ছামিউল হকই পাঁচ কোটি টাকার এই ঘুষের লেনদেন সম্পন্ন করেছেন। এর আগে ছামিউল হক নিজের প্রভাব খাটিয়ে জামাল হোসেন নামের এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহে বদলি হয়ে আসেন। এখন এই সিন্ডিকেটই পুরো অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, আব্দুল আউয়াল একজন অযোগ্য ও অনাভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তিনি কর্মজীবনে কখনো প্রধান কার্যালয়ে কাজ করেননি এবং কোনো বড় প্রজেক্ট বা প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেননি। তার দাপ্তরিক দক্ষতা এতটাই সীমিত যে, উন্নয়ন সহযোগীদের (ফরেনার) সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলা বা মিটিং করার ন্যূনতম সক্ষমতা তার নেই। একজন বিভাগীয় প্রধানের এমন অদক্ষতার কারণে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কাছে দপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে।
এদিকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আব্দুল আউয়ালের আচরণ নিয়ে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তিনি জুনিয়র হয়েও সিনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারি করছেন। সামান্য কারণে কর্মকর্তাদের শোকজ করা, সচিবের ভয় দেখিয়ে চাকরি খাওয়ার হুমকি দেওয়া এবং পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে ব্যক্তিগত কটূক্তি করার অভিযোগ তার নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা তাকে দেখে উঠে না দাঁড়ালে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে শাসানোর মতো অপেশাদার আচরণ করেন তিনি। এর ফলে অধিদপ্তরের কাজের গতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং কর্মকর্তারা এক প্রকার ‘দমবন্ধ’ পরিবেশে কাজ করছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর আব্দুল আউয়াল অধিদপ্তরে নিজস্ব বলয় শক্তিশালী করতে ‘বদলি বাণিজ্য’ শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন স্টাফ অফিসার কাবিল হোসেন। কাবিল একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও সহকারী প্রকৌশলী বা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পরিবর্তে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারে দুর্নীতি ও সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে আগে বরখাস্ত হওয়া কর্মচারী নেতা খোরশেদ আলমকে তিন লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে স্বপদে বহাল করার মতো অনৈতিক সিদ্ধান্ত আউয়াল নিয়েছেন বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহের মেকানিক সানাউল্লাহকে নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউলের ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে ঝালকাঠিতে বদলি করা হয়েছে, যা চরম অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে জানিয়েছেন অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আব্দুল আউয়াল এর আগে সিলেট ও ময়মনসিংহে থাকাকালীন ফাইল আটকে রেখে ঘুষ গ্রহণ ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার এসব অনিয়ম এবং ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে পদ বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। এ কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘুষ দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসা ও অনিয়মের বিষয়ে ডিপিএইচইয়ের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়ালের কাছে জানতে চাইলে তিনি ফোনে এই বিষয়ে কথা বলতে অনিচ্ছুক, তবে সরাসরি কথা বললে ভালো বুঝতে পারবেন হয়তো বলে জানান।
সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের জন্য এমন লেনদেনের অভিযোগ ভয়াবহ। যদি অপরাধীদের শাস্তি না হয়, তবে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে এই সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলা জরুরি।’
এই বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকতা জানান, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পাঁচ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদ দখল করা হয়েছে এমন অভিযোগের ‘পরিপ্রেক্ষিতে’ আমাদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পরে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানো যাবে।
ট্যাগস :










