আওয়ামী পরিবারের সদস্য থেকে একলাফে বিএনপি সমর্থক: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পরিচালক তুহিনের অসীম দৌরাত্ম্য!
# প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী টুকুর বন্ধু পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার
# সাবেক মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের সাথে বিশেষ সখ্যতা
# সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজমের ডিও লেটারে পদোন্নতি
# আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশের নেতৃত্ব দান
# বেআইনি ভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার
# প্রশিক্ষন ও আনুষাংগিক খাতের অর্থ আত্মসাত
# বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনে আনন্দ ভোজের নেতৃত্বে দান
বিশেষ প্রতিবেদক
সরকার বদলের সাথে সাথে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রাজনৈতিক চরিত্র বদল এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহনে দলবাজি করে আসছেন। দলীয় আনুগত্যের কৌশলে তারা ক্ষমতার শীর্ষ পদ দখল করেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তারাও তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের পক্ষে অবস্থা নেন। মুলত তারা নিজেদের আখের গোছাতে ও চেয়ার ঠিক রাখতে এহেন কর্মকান্ড চলমান রেখেছেন। আর এমনই এক বহুরূপী চরিত্রের নেতার সন্ধান মিলেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে। তিনি হলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক মো. শাহজামান খান (তুহিন)।
১৯তম বিসিএসএর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে যোগদানকৃত মো. শাহাজামান খান (তুহিন) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন বিষয়ে ডিগ্রীধারী। সম্মিলিত গ্রেডেশন অনুযায়ী তার গ্রেডেশন নং-৯৩৬। চাকুরী জীবনে বিভিন্ন অনিয়ম দূর্নীতির কারনে পদোন্নতি প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটলে মো. শাহাজামান খান (তুহিন) কুমিল্লা জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উপ পরিচালক হিসাবে কর্মরত থাকা কালীন সময়ে আওয়ামী প্রভাব খাটিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজমের নিকট হতে আধা সরকারী পত্রের (ডিও লেটার) মাধ্যমে পরিচালক পদে পদোন্নতি বাগিয়ে বিসিএস লাইভস্টক একাডেমীর পরিচালক হন। এরপর মো. শাহাজামান খান (তুহিন) কে কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক হিসাবে বদলীর আদেশের পরই তার বিরুদ্ধে বিএনপিপন্থী প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা বদলীর আদেশ বাতিলের দাবীতে অধিদপ্তর চত্বরে তাৎক্ষনিক বিক্ষোভ মিছিল করেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী মীর্জা আজমের নিকট আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আওয়ামী প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এমনকি আওয়ামী সরকারের পতনের আগে নিয়মিত মীর্জা আজমের ঢাকার ধানমন্ডির বাসায় যাতায়াত করতেন তিনি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর কৃষি খামার সড়কে বঙ্গবন্ধু ভেটেরিনারি পরিষদের ব্যনারে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশের নেতৃত্ব দেন এই কর্মকর্তা।
সূত্র জানায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক মো. শাহজামান খান (তুহিন) সাভারে কর্মরত থাকা কালীন সময়ে প্রশিক্ষনের এবং আনুষাংগিক খাতের ৪০ শতাংশ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে আওয়ামী লীগের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ. ম.রেজাউল করিমকে ব্যবহার করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর হতে বিশেষ বরাদ্দ নেয় এবং প্রাপ্যতার বাইরে একটি পাজেরো জীপ গাড়ি বাগিয়ে নেন। সে সময় তিনি প্রতিদিন ঐ সরকারী গাড়ী ব্যবহার করে ঢাকা হতে সাভারে যাতায়াত করতেন এবং সরকারের অনুমতি ছাড়াই নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন। এছাড়াও কুমিল্লায় উপ-পরিচালক থাকা কালীন সময়ে মো. শাহজামান খান (তুহিন) কৃত্রিম প্রজনন সেবা কর্মীদের মালামাল বিতরণকে কেন্দ্র করে মাথা পিছু হাজার টাকা মাসিক হাদিয়া তুলতেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক মো. শাহজামান খান (তুহিন) সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি তুখোড় বঙ্গবন্ধু সৈনিক সেজে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে দাপট দেখিয়েছেন। আবার ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ভোল পাল্টে হয়েছেন বিএনপি পন্থী পেশাজীবি শক্তি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দাবী করেন যে, মো. শাহাজামান খান (তুহিন) একজন সুচতুর আওয়ামী সুবিধাভোগী ও দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সার্বক্ষনিক আওয়ামী পেশাজীবি সংগঠনের সংগে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও গত ৩০ ডিসেম্বর সাবেক তিনবারে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারাদেশে যখন শোকের মাতম চলছে ঠিক সে সময় মো. শাহজামান খানের নেতৃত্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আনন্দ ভোজের আয়োজন করা হয়। সে আনন্দ ভোজ অনুষ্ঠানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন বলে জানা যায়। যা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে তার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি তার নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর আস্থাভাজন হতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকান্ডে সবার আগে অবস্থা স্পষ্ট করছেন এমনকি উদেশ্যমূলক বিভিন্ন ফটোসেশনেও দেখা যাচ্ছে তাকে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পড়া করার সময় মো. শাহজামান খান (তুহিন) প্রথমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন। কিন্তু তার এই প্রস্থান নীতির কারণে তাকে বেশি দিন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে থাকতে পারেন নি। সুচতুর মো. শাহজামান খান (তুহিন) প্রস্থান করেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে শুরু করেন ছাত্রদলের রাজনীতি। ৫ আগস্ট এর আগে শাহজামান খান তুহিন নিজেকে ছাত্রলীগের পদধারী নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন (প্রমাণ স্বরূপ বক্তব্য রেকর্ড আছে)। আওয়়ামী লীগ সরকারের সুবিধা নিয়ে চাকরিতে জয়েনে করেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একের অধিক কর্মকর্তা জনান, বর্তমান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু’র বড় ভাই শামসুল আলম তোফা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন সেই সুবাদে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রায় সময় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। কাকতালীয় ভাবে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু আর শাহজামান খান তুহিনের এসএসসি ১৯৮৬ ব্যাচ হওয়ার কারনে তার বন্ধু পরিচয় দিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সকল কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন। প্রতিমন্ত্রী সুলতানা সালাউদ্দিন টুকুর প্রাণিসম্পদের সকল প্রোগ্রামে তিনি সফর সঙ্গী হচ্ছেন। এমনকি শাহজামান খান (তুহিন) সরকারি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ও ঊর্ধ্বতন মহলে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সাথে সম্পর্কে কথা ফলাও করে প্রচার করছেন।
পরিচালক খান তুহিন ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময় সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগী ছিলেন এবং আওয়ামী পরিচয়ে চলতেন। তার প্রমান পরিচালক পদে পদোন্নতি প্রাপ্তির কালে মীর্জা আজম নিজেই আধাসরকারী পত্র দিয়েছিলেন এবং এসবি ক্লিয়ারেন্সের সময় প্রতিবেদনে পরিস্কার ভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, শাহজামান খান তুহিন আওয়ামী পরিবারের সদস্য এবং আওয়ামী মনোভাবাপন্ন কর্মকতা। যা ঐ সময়ের পুলিশ প্রতিবেদন দেখলেই প্রমাণিত হবে।
এ ছাড়া ৪ঠা আগষ্টে কথিত শান্তি সমাবেশে নেতৃত্বদানকারী এ কর্মকতা ৫ ই আগষ্টের দিন এবং পরের কয়েকদিন অধিদপ্তরে প্রবেশ করতে পারেন নি । তার বিরুদ্ধে অধিদপ্তরে শ্লোগান, সমাবেশ হয়েছিল যা অধিদপ্তরের সকলেই জানেন। পরে বিভিন্ন দেন দরবার করে পিডি রহিমকে ম্যানেজ করে তিনি অধিদপ্তরে প্রবেশ করেন।
পরিচালক শাহজামান খান তুহিন একজন মহা দুর্নীতিবাজ কর্মকতা হিসাবে পরিচিত। তিনি গত বছর নিন্মমানের সিমেন কন্টেইনার কিনে প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। এ বছরও তার নিজস্ব ঠিকাদার দরপত্রে ভুল করায় ৭ গ্রুপের সব টেন্ডার কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই রি-টেন্ডার করেন এবং রি-টেন্ডারে সর্বোচ্চ দর দানকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তদন্ত করলেই প্রমানিত হবে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পরিচালক শাহজামান খান তুহিনের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল দিলেও তিনি কল নিসিভ করেন নি।










