০১:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় আছে শামীম ওসমানের বাড়ি, দুবাইয়ে ব্যবসা

প্রতিনিধির নাম:

আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামীম ওসমান। অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়াসহ নানা কারণে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এই নেতাকে অনেকেই ‘‌‌গডফাদার’ হিসেবে জানতেন। চারবার তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। আগেই পারিবারিকভাবে প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলেও এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি হয়ে উঠেন নারায়ণগঞ্জের সর্বেসর্বা। বল্গাহীন দুর্নীতি, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ কায়েম করেন ত্রাসের রাজত্ব।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদে অবৈধপন্থায় দেশ-বিদেশে তিনি গড়ে তোলেন অঢেল সম্পদ। তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তার সন্ধান দিতে পারছে না কেউ। যদিও বিভিন্ন সময়ে ভারতসহ একাধিক দেশে তাকে দেখা গেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে খবর এসেছে। অনেকেই বলছেন পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সরকার পতনের আগেই বিদেশে পালিয়ে যান ধুরন্ধর শামীম ওসমান।

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শামীম ওসমান। সভা-সমাবেশ ও মিডিয়ার সামনে বারবার ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে এসেছেন আলোচনায়। তিনি নিজেকে নারায়ণগঞ্জের সব চেয়ে বড় মস্তান বলে প্রকাশ্যে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পারিবারিক সূত্র ধরে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শামীম ওসমান ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তার ব্যক্তিগত তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। এরপর ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে কানাডায় গিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন বহু বছর। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরের বছর তিনি নারায়ণগঞ্জে ফেরেন।

 

২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে এমপি হন তিনি। পরে একাদশ ও দ্বাদশ সংসদেও তিনি এমপি ছিলেন। সাবেক এই প্রভাবশালী এমপি দুই যুগ আগে যেভাবে পালিয়ে ছিলেন এবারও বেছে নিয়েছেন একই পথ। যদিও এর মধ্যে ভারতের একটি মাজারে তার ছবি প্রকাশ পায়। এরপর গত সপ্তাহে তাকে দুবাইয়ের একটি মার্কেটে দেখা যাওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

একসময় শামীম ওসমানের সঙ্গে রাজনীতি করা এমন কয়েক জনের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ভারত-দুবাই-কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে শামীম ওসমানের বেশ যাতায়াত ছিল। এসব দেশে তিনি বাড়ি কিনেছেন। তার মেয়ে কানাডার নাগরিক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। দুবাইয়ে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে ছিল শামীম ওসমানের নিয়মিত যোগাযোগ। সেখানে তার ব্যবসাও আছে। এ ছাড়া এসব দেশে তার অনেক বন্ধু ও সহযোগী রয়েছেন। যারা তাকে সম্পদ গড়তে সহযোগিতা করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শামীম ওসমানের এক বন্ধুর ভাষ্য, শামীম জানতেন যেকোনো সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তাই তিনি দেশ ও বিদেশ দুই জায়গাতেই সম্পদ গড়েছেন। তবে কোথায় কী পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন তা তো আর সবাই জানে না। তিনি উল্লেখ করেন, ‘বন্ধু’ শামীম ওসমান তার নেতা-কর্মীদের ডেকে প্রায়ই বলতেন ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে সহজেই যেন তিনি দেশ ছাড়তে পারেন সেই প্রস্তুতি রাখতে। তবে এবার তার আত্মগোপন অতটা সহজ ছিল না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৩০ জুলাই পর্যন্ত শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জে ছিলেন। ওই দিন সব শেষ তিনি চাষাড়ায় গাড়ি নিয়ে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মহড়া দেন। এরপর ৩ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে একটি সভা শেষে তিনি গুলশানের বাড়িতে যান। পরে সেখান থেকেই তিনি আত্মগোপন করেন। এর আগে ২৬ জুলাই নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া থেকে মণ্ডলপাড়া পর্যন্ত অস্ত্রধারী-ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ গাড়িবহর নিয়ে মহড়া দিয়েছিলেন শামীম ওসমান। এ সময় শামীম ওসমানসহ তার ছেলে অয়ন ওসমান ও তাদের সহযোগীরা দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়ে।

তার ঘনিষ্ঠরা জানান, শামীম ওসমান ঘন ঘন বাসস্থানের ঠিকানা পরিবর্তন করেন। এমনকি দেশও পরিবর্তন করেন। ফলে তিনি কোথায় আছেন তা বোঝা মুশকিল। তবে তিনি দেশে তার যে সম্পদ রেখে গেছেন তা রক্ষণাবেক্ষণে লোক নিয়োজিত আছে।

রেখে গেছেন বিপুল সম্পদ

২০০৯ সালে দেশে ফেরার পর ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন শামীম ওসমান। সেসময় তিনি হলফনামায় জানিয়ে ছিলেন বাড়ি-এপার্টমেন্ট-দোকানভাড়া, ব্যবসা ও ব্যাংকে আমানতের সুদ থেকে বার্ষিক আয় পেতেন ২৭ লাখ টাকা। তার নামে ১০ শতাংশ কৃষিজমি, ১৬ শতাংশ জমির ওপর দোতলা বাড়ি ও উত্তরায় ৯ কাঠা জমি রয়েছে। অথচ ১০ বছর পর দ্বাদশ নির্বাচনের সময় শামীম ওসমান হলফনামায় উল্লেখ করেন, তিনি বছরে ৭৯ লাখ টাকা আয় করেন। তার নামে ১২৩ শতাংশ কৃষিজমি, ১০ শতাংশ অকৃষিজমি, পূর্বাচলে রাজউকের নিউ টাউনে ১০ কাঠার প্লটসহ- ২টি টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি রয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে তার আয় বাড়ে কয়েকগুণ।

শামীম ওসমান তার উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখিয়েছেন পণ্য, জ্বালানি তেল আমদানি, পরিবহন ও সরবরাহকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে আবার তার স্ত্রী-ছেলে-মেয়েরও মালিকানা রয়েছে। তবে এর বাইরে থাকা তার সম্পদের তথ্য তিনি লুকিয়েছিলেন নানা কৌশলে।

খোঁজ মিলেছে শামীম ওসমানের মালিকানাধীন অন্তত ১৩টি পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পদক ও মীম সারাত গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সোহাগের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ভাড়া দিতেন। এমনকি জাহাজ ব্যবসার পাশাপাশি করতেন বহুতল বিল্ডিং নির্মাণের ব্যবসাও। এ ছাড়া তার ছেলে অয়ন ওসমানকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাতেন শহর-বন্দর-সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার ইন্টারনেট সংযোগের কারবার। যা থেকে বিপুল অর্থ লুপাট করেছেন তিনি। এ ছাড়া চাষাড়া রূপায়ণ টাওয়ারে তার ছেলের নামে রয়েছে ফ্ল্যাটও।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডে চলাচল করা সিটি বন্ধন ও উৎসব পরিবহনসহ বিভিন্ন বাস থেকে নিতেন মাসিক টাকা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডে চলাচল করা (বিলুপ্ত) নসিব পরিবহনের মালিকরা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, ‘রাইফেলস ক্লাবে ডেকে নসিব পরিবহনের পুরো ব্যবসাই দখল করে নেন শামীম ওসমান। এলজিইডি- গর্ণপূর্তসহ উন্নয়নমূলক কাজ করে এমন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। শামীম ওসমানের সুপারিশে ইজারা বা ঠিকাধারি পেয়ে যেত তার লোকজন। শামীম ওসমান আদমজী ইপিজেডের ঝুট সেক্টরও নিয়ন্ত্রণ করতেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতিকে দিয়ে। বিনিময়ে এসব খাত থেকে পেতেন মোটা অঙ্কের অর্থ।

শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ ক্লাব চালাতেন শ্যালক তানভীর আহাম্মেদ টিটুকে দিয়ে। তাকে বিসিবির পরিচালক পদ পাইয়ে দিতে নানা মহলে তদ্বির চালিয়ে ছিলেন তিনি। এরপর বসান নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতির চেয়ারে। এ ক্লাবে প্রতি রাতে আড্ডা বসতো শিল্পপতিদের। এ ছাড়া চাষাড়া রাইফেলস ক্লাব ছিল শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের আখড়া। এই রাইফেলস ক্লাবকে ব্যবহার করা হতো শামীম ওসমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের মতো। প্রায় রাতে তিনি এখানে বিচার সালিশ, বৈঠক, সভা করতেন। এখানে বসে বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে দমনে হুমকি-নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হতো। এমনকি নানা অপকর্মের নির্দেশও দেওয়া হতো এখান থেকেই।

শামীম ওসমানের অপকর্ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসা মানবাধিকার কমিশনের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহাবুবুর রহমান মাসুম বলেন, শামীম ওসমানরা কখনোই নারায়গণগঞ্জে স্থায়ী বসবাসকারী ছিলেন না। ঢাকা বসবাস করে নারায়গণগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য-সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি-ইজারা-পরিবহন সেক্টর-নৌপথে জাহাজ ব্যবসা, তেলের কারবার, ইন্টারনেট ব্যবসাসহ নানা খাত নিয়ে ছিলেন তার নিয়ন্ত্রণে। এসব খাত থেকে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন শামীম ওসমান। প্রতিটি সেক্টরে থাকত তার নির্ধারিত লোক। আর তাদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ পেতেন তিনি। তবে বেকায়দায় পড়লেই লোক জড়ো করতেন রাইফেলস ক্লাবে বা ডাকতেন সভা-সমাবেশ। দিনে এমপি থাকলেও রাতে শামীম ওসমান হয়ে যেতেন গডফাদার।

মাসুম বলেন, শামীম ওসমান এমন কোনো খাত নেই যেখানে চাঁদাবাজি করেননি। নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সাবেক সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল ছিলেন এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক। পরিবহন, সুতা ব্যবসা, ফুটপাতের চাঁদাবাজি, গার্মেন্টস সেক্টরে চাঁদাবাজি সবই করাতেন। আর জমি দখল করাতেন তার সেনাপতি শাহ নিজামকে দিয়ে। তার কথা না শুনলে রাইফেলস ক্লাবে নিয়ে করা হতো নির্যাতন।

নারায়ণগঞ্জের মানুষ শামীম ওসমানদের আর চায় না উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, সদর ও বন্দর উপজেলার প্রায় সব সরকারি অফিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন শামীম ওসমান। তার বলয়ে থাকা ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ চাঁদাবাজি-জমিদখল-পরিবহন সেক্টর-ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবই করত। সেখান থেকে ভাগ পেতেন তিনি।

শামীম ওসমান তার ছেলে ও ভাতিজাকে দিয়ে অপকর্ম করাতেন উল্লেখ করে ধামীন সাহা বলেন, তার (শামীম ওসমান) ছেলে অয়ন ওসমান ইন্টারনেট সংযোগের নামে শহরবাসীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন। তার ভাতিজা আজমেরী ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীসহ শহরের ঝুট সেক্টর থেকে প্রতি মাসে তিন কোটি টাকা পেতেন। সে সময় তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই করা হতো হামলা-মামলা। নারায়ণগঞ্জের মানুষ এদের আর চায় না। এরা জুলুমকারী ও লুটেরা।

সিটি নির্বাচনের সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে শামীম ওসমানের রোষানলে পড়ে মারাত্মক মাশুল দিতে হয়েছে নিহত ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বিকে। তিনি বলেন, ওসমান পরিবারের সদস্যরা হত্যা, চাঁদাবাজি, ভূমি দস্যুতাসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা করেননি। তাদের সরাসরি আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। বিভিন সেক্টর থেকে শামীম ওসমান যে টাকা কামিয়েছেন তা বিদেশে পাচার করেছেন। নামে-বেনামে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।

 

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৪:৫৬:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৪
২৩৪ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় আছে শামীম ওসমানের বাড়ি, দুবাইয়ে ব্যবসা

আপডেট সময় ০৪:৫৬:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৪

আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শামীম ওসমান। অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়াসহ নানা কারণে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এই নেতাকে অনেকেই ‘‌‌গডফাদার’ হিসেবে জানতেন। চারবার তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। আগেই পারিবারিকভাবে প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলেও এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি হয়ে উঠেন নারায়ণগঞ্জের সর্বেসর্বা। বল্গাহীন দুর্নীতি, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ কায়েম করেন ত্রাসের রাজত্ব।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদে অবৈধপন্থায় দেশ-বিদেশে তিনি গড়ে তোলেন অঢেল সম্পদ। তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তার সন্ধান দিতে পারছে না কেউ। যদিও বিভিন্ন সময়ে ভারতসহ একাধিক দেশে তাকে দেখা গেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে খবর এসেছে। অনেকেই বলছেন পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সরকার পতনের আগেই বিদেশে পালিয়ে যান ধুরন্ধর শামীম ওসমান।

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শামীম ওসমান। সভা-সমাবেশ ও মিডিয়ার সামনে বারবার ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে এসেছেন আলোচনায়। তিনি নিজেকে নারায়ণগঞ্জের সব চেয়ে বড় মস্তান বলে প্রকাশ্যে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পারিবারিক সূত্র ধরে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শামীম ওসমান ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তার ব্যক্তিগত তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। এরপর ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে কানাডায় গিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন বহু বছর। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরের বছর তিনি নারায়ণগঞ্জে ফেরেন।

 

২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে এমপি হন তিনি। পরে একাদশ ও দ্বাদশ সংসদেও তিনি এমপি ছিলেন। সাবেক এই প্রভাবশালী এমপি দুই যুগ আগে যেভাবে পালিয়ে ছিলেন এবারও বেছে নিয়েছেন একই পথ। যদিও এর মধ্যে ভারতের একটি মাজারে তার ছবি প্রকাশ পায়। এরপর গত সপ্তাহে তাকে দুবাইয়ের একটি মার্কেটে দেখা যাওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

একসময় শামীম ওসমানের সঙ্গে রাজনীতি করা এমন কয়েক জনের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, ভারত-দুবাই-কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে শামীম ওসমানের বেশ যাতায়াত ছিল। এসব দেশে তিনি বাড়ি কিনেছেন। তার মেয়ে কানাডার নাগরিক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। দুবাইয়ে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে ছিল শামীম ওসমানের নিয়মিত যোগাযোগ। সেখানে তার ব্যবসাও আছে। এ ছাড়া এসব দেশে তার অনেক বন্ধু ও সহযোগী রয়েছেন। যারা তাকে সম্পদ গড়তে সহযোগিতা করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শামীম ওসমানের এক বন্ধুর ভাষ্য, শামীম জানতেন যেকোনো সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তাই তিনি দেশ ও বিদেশ দুই জায়গাতেই সম্পদ গড়েছেন। তবে কোথায় কী পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন তা তো আর সবাই জানে না। তিনি উল্লেখ করেন, ‘বন্ধু’ শামীম ওসমান তার নেতা-কর্মীদের ডেকে প্রায়ই বলতেন ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে সহজেই যেন তিনি দেশ ছাড়তে পারেন সেই প্রস্তুতি রাখতে। তবে এবার তার আত্মগোপন অতটা সহজ ছিল না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৩০ জুলাই পর্যন্ত শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জে ছিলেন। ওই দিন সব শেষ তিনি চাষাড়ায় গাড়ি নিয়ে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মহড়া দেন। এরপর ৩ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে একটি সভা শেষে তিনি গুলশানের বাড়িতে যান। পরে সেখান থেকেই তিনি আত্মগোপন করেন। এর আগে ২৬ জুলাই নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া থেকে মণ্ডলপাড়া পর্যন্ত অস্ত্রধারী-ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ গাড়িবহর নিয়ে মহড়া দিয়েছিলেন শামীম ওসমান। এ সময় শামীম ওসমানসহ তার ছেলে অয়ন ওসমান ও তাদের সহযোগীরা দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়ে।

তার ঘনিষ্ঠরা জানান, শামীম ওসমান ঘন ঘন বাসস্থানের ঠিকানা পরিবর্তন করেন। এমনকি দেশও পরিবর্তন করেন। ফলে তিনি কোথায় আছেন তা বোঝা মুশকিল। তবে তিনি দেশে তার যে সম্পদ রেখে গেছেন তা রক্ষণাবেক্ষণে লোক নিয়োজিত আছে।

রেখে গেছেন বিপুল সম্পদ

২০০৯ সালে দেশে ফেরার পর ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন শামীম ওসমান। সেসময় তিনি হলফনামায় জানিয়ে ছিলেন বাড়ি-এপার্টমেন্ট-দোকানভাড়া, ব্যবসা ও ব্যাংকে আমানতের সুদ থেকে বার্ষিক আয় পেতেন ২৭ লাখ টাকা। তার নামে ১০ শতাংশ কৃষিজমি, ১৬ শতাংশ জমির ওপর দোতলা বাড়ি ও উত্তরায় ৯ কাঠা জমি রয়েছে। অথচ ১০ বছর পর দ্বাদশ নির্বাচনের সময় শামীম ওসমান হলফনামায় উল্লেখ করেন, তিনি বছরে ৭৯ লাখ টাকা আয় করেন। তার নামে ১২৩ শতাংশ কৃষিজমি, ১০ শতাংশ অকৃষিজমি, পূর্বাচলে রাজউকের নিউ টাউনে ১০ কাঠার প্লটসহ- ২টি টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি রয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে তার আয় বাড়ে কয়েকগুণ।

শামীম ওসমান তার উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখিয়েছেন পণ্য, জ্বালানি তেল আমদানি, পরিবহন ও সরবরাহকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে আবার তার স্ত্রী-ছেলে-মেয়েরও মালিকানা রয়েছে। তবে এর বাইরে থাকা তার সম্পদের তথ্য তিনি লুকিয়েছিলেন নানা কৌশলে।

খোঁজ মিলেছে শামীম ওসমানের মালিকানাধীন অন্তত ১৩টি পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পদক ও মীম সারাত গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সোহাগের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ভাড়া দিতেন। এমনকি জাহাজ ব্যবসার পাশাপাশি করতেন বহুতল বিল্ডিং নির্মাণের ব্যবসাও। এ ছাড়া তার ছেলে অয়ন ওসমানকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাতেন শহর-বন্দর-সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার ইন্টারনেট সংযোগের কারবার। যা থেকে বিপুল অর্থ লুপাট করেছেন তিনি। এ ছাড়া চাষাড়া রূপায়ণ টাওয়ারে তার ছেলের নামে রয়েছে ফ্ল্যাটও।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডে চলাচল করা সিটি বন্ধন ও উৎসব পরিবহনসহ বিভিন্ন বাস থেকে নিতেন মাসিক টাকা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডে চলাচল করা (বিলুপ্ত) নসিব পরিবহনের মালিকরা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, ‘রাইফেলস ক্লাবে ডেকে নসিব পরিবহনের পুরো ব্যবসাই দখল করে নেন শামীম ওসমান। এলজিইডি- গর্ণপূর্তসহ উন্নয়নমূলক কাজ করে এমন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। শামীম ওসমানের সুপারিশে ইজারা বা ঠিকাধারি পেয়ে যেত তার লোকজন। শামীম ওসমান আদমজী ইপিজেডের ঝুট সেক্টরও নিয়ন্ত্রণ করতেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতিকে দিয়ে। বিনিময়ে এসব খাত থেকে পেতেন মোটা অঙ্কের অর্থ।

শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ ক্লাব চালাতেন শ্যালক তানভীর আহাম্মেদ টিটুকে দিয়ে। তাকে বিসিবির পরিচালক পদ পাইয়ে দিতে নানা মহলে তদ্বির চালিয়ে ছিলেন তিনি। এরপর বসান নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতির চেয়ারে। এ ক্লাবে প্রতি রাতে আড্ডা বসতো শিল্পপতিদের। এ ছাড়া চাষাড়া রাইফেলস ক্লাব ছিল শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের আখড়া। এই রাইফেলস ক্লাবকে ব্যবহার করা হতো শামীম ওসমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের মতো। প্রায় রাতে তিনি এখানে বিচার সালিশ, বৈঠক, সভা করতেন। এখানে বসে বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে দমনে হুমকি-নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হতো। এমনকি নানা অপকর্মের নির্দেশও দেওয়া হতো এখান থেকেই।

শামীম ওসমানের অপকর্ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসা মানবাধিকার কমিশনের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহাবুবুর রহমান মাসুম বলেন, শামীম ওসমানরা কখনোই নারায়গণগঞ্জে স্থায়ী বসবাসকারী ছিলেন না। ঢাকা বসবাস করে নারায়গণগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য-সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি-ইজারা-পরিবহন সেক্টর-নৌপথে জাহাজ ব্যবসা, তেলের কারবার, ইন্টারনেট ব্যবসাসহ নানা খাত নিয়ে ছিলেন তার নিয়ন্ত্রণে। এসব খাত থেকে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন শামীম ওসমান। প্রতিটি সেক্টরে থাকত তার নির্ধারিত লোক। আর তাদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ পেতেন তিনি। তবে বেকায়দায় পড়লেই লোক জড়ো করতেন রাইফেলস ক্লাবে বা ডাকতেন সভা-সমাবেশ। দিনে এমপি থাকলেও রাতে শামীম ওসমান হয়ে যেতেন গডফাদার।

মাসুম বলেন, শামীম ওসমান এমন কোনো খাত নেই যেখানে চাঁদাবাজি করেননি। নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সাবেক সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল ছিলেন এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক। পরিবহন, সুতা ব্যবসা, ফুটপাতের চাঁদাবাজি, গার্মেন্টস সেক্টরে চাঁদাবাজি সবই করাতেন। আর জমি দখল করাতেন তার সেনাপতি শাহ নিজামকে দিয়ে। তার কথা না শুনলে রাইফেলস ক্লাবে নিয়ে করা হতো নির্যাতন।

নারায়ণগঞ্জের মানুষ শামীম ওসমানদের আর চায় না উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, সদর ও বন্দর উপজেলার প্রায় সব সরকারি অফিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন শামীম ওসমান। তার বলয়ে থাকা ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ চাঁদাবাজি-জমিদখল-পরিবহন সেক্টর-ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রণসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবই করত। সেখান থেকে ভাগ পেতেন তিনি।

শামীম ওসমান তার ছেলে ও ভাতিজাকে দিয়ে অপকর্ম করাতেন উল্লেখ করে ধামীন সাহা বলেন, তার (শামীম ওসমান) ছেলে অয়ন ওসমান ইন্টারনেট সংযোগের নামে শহরবাসীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন। তার ভাতিজা আজমেরী ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীসহ শহরের ঝুট সেক্টর থেকে প্রতি মাসে তিন কোটি টাকা পেতেন। সে সময় তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই করা হতো হামলা-মামলা। নারায়ণগঞ্জের মানুষ এদের আর চায় না। এরা জুলুমকারী ও লুটেরা।

সিটি নির্বাচনের সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে শামীম ওসমানের রোষানলে পড়ে মারাত্মক মাশুল দিতে হয়েছে নিহত ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বিকে। তিনি বলেন, ওসমান পরিবারের সদস্যরা হত্যা, চাঁদাবাজি, ভূমি দস্যুতাসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা করেননি। তাদের সরাসরি আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। বিভিন সেক্টর থেকে শামীম ওসমান যে টাকা কামিয়েছেন তা বিদেশে পাচার করেছেন। নামে-বেনামে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।