প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি এমন একটি সময়ে এসে দেশের দায়িত্বভার নিয়েছি, যেখানে অনেক দিক থেকেই পুরোপুরি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্ষমতায় থাকার চেষ্টায় শেখ হাসিনার স্বৈরাচার সরকার দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের নির্মম নৃশংসতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার দমন করা হয়েছিল। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম তাদের ভোটাধিকারের চর্চা না করেই বেড়ে উঠেছে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট হয়েছে। আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে লুণ্ঠন করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার।’
ড. ইউনূস বলেন, ‘দেশ নিয়ে ছাত্রদের একটি স্বপ্ন আমাদের মুগ্ধ করেছে, যে স্বপ্ন একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। ছাত্ররা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখছে যেখানে মানুষ তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়নির্বিশেষে, নিজেদের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে ও মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। সরকার গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা সমুন্নত রাখবে।’
ছাত্র আন্দোলনকে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এখন নতুনভাবে শুরু করতে হবে। লাখো জনতার অভ্যুত্থানে চরম স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু যাওয়ার আগে নিরাপত্তা বাহিনী এবং শেখ হাসিনার ছাত্র সংগঠন স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।’
ছাত্র আন্দোলনে হতাহতদের কথা স্মরণ করে আবেগঘন হয়ে পড়েন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তিনি কূটনীতিকদের বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে ছাত্রদের এত ত্যাগ করতে হয়নি। পৃথিবীর কোথাও নাগরিকরা এতটা মানবাধিকার বঞ্চিত হয়নি, যা বাংলাদেশে হয়েছে।’
বাংলাদেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘এসব ঠিক করতে সময় লাগবে। আশা করি, নতুন বাংলাদেশ তৈরিতে সবাই পাশে থাকবেন। এসব সংস্কার শেষ করার পর নির্বাচন করবে এই সরকার।’
আওয়ামী লীগ ও তার দলবলের হামলায় ছাত্র আন্দোলনে শত শত মানুষ মারা গেছে ও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক ছাত্রের চোখে গুলি লেগেছে। তাদের দেখতে গিয়েছিলাম। জানি না তাদের কী হবে।’
অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস কূটনীতিকদের কাছে পূর্ণ সমর্থন চেয়েছেন। তিনি কূটনীতিকদের বলেছেন, এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা ফেরানো এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। জনগণের অটুট সমর্থন ও দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় শিগগিরই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরবে বলে আশা করেন।
প্রধান উপদেষ্টা কূটনীতিকদের আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছে সরকার। সরকার চায় যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। এ কারণে সরকার জাতিসংঘের তদন্ত দলকে সহায়তা করবে। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্কের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত চাই আমরা। এর জন্য জাতিসংঘের তদন্তকারী দলকে আমরা সব ধরনের সহায়তা দেব।’
ড. ইউনূস বলেন, ‘আমাদের সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে সহায়তা অব্যাহত রাখবে। রোহিঙ্গাদের মানবিক কার্যক্রম এবং তাদের শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পূর্ণ অধিকারসহ তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করার জন্য আমরা সুশাসন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শক্তিশালী এবং সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক সংস্কার গ্রহণ করব। গ্লোবাল ক্লদিং সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে আমরা মূল প্লেয়ার। কাজেই এ সাপ্লাই চেইন কেউ বাধাগ্রস্ত করলে আমরা তা সহ্য করব না।’
অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০ জনের বেশি রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন বলে জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এর আগে গত সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন কূটনীতিকদের ব্রিফ করেছিলেন। এটি ছিল প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কূটনৈতিক ব্রিফিং।











