০১:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটে ‘অবৈধ’ নিয়োগে প্রভাষক জালিয়াতিতে অধ্যক্ষ!

প্রতিনিধির নাম:
সিলেটে দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতার সনদ জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, অধস্তন শিক্ষকদের হেনস্তাসহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।

অবসরে যাওয়ার পর এখনো নানাভাবে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে আছেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া অবসরকালীন সব ধরনের সুবিধা নিতে বিভিন্ন দপ্তরে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন তিনি। এ নিয়ে চলছে তোলপাড়।

সর্বশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর মুরারি চাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ কমিটির সুপারিশকেও পাত্তা দেননি সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলাম। তিনি বলেন, এমন অনেক কমিটি আর সুপারিশ হয়েছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামছুল ইসলাম গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মতিউর রহমান (প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ), পদার্থবিজ্ঞানের প্রাক্তন প্রভাষক সাব্বির আহমদ ও রসায়নবিজ্ঞানের প্রাক্তন প্রদর্শক মোছা. নাজনীন খান ইভার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ এনে ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সিলেট মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সমন্বিত জেলা কার্যালয়, সিলেটকে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেন।

অভিযোগ দুটি আমলে নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ২৬ মে মুরারি চাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজকে আহ্বায়ক ও একই কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীন ও সহকারী অধ্যাপক ড. বায়েজীদ আলমকে সদস্য করে কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্তে প্রমাণিত হয়, দক্ষিণ সুরমা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শামসুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় প্রভাষক নিয়োগ বৈধ বলে প্রতীয়মান হয়নি। প্রভাষক পদ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার সকল বেসরকারি ও সরকারি আর্থিক সুবিধা স্থগিতের নির্দেশ রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানির উদ্দেশ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরির সত্যতা পাওয়া যায়।

কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে অক্টোবরে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান শামসুল ইসলাম। সেই নিয়োগ পরীক্ষায় একমাত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন তিনি, যা শিক্ষক নিয়োগবিধি অনুযায়ী বৈধ নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি অগ্রহণযোগ্য হলেও শামসুল ইসলাম ছিলেন রেফার্ডপ্রাপ্ত। এ ছাড়া চাকরির পদোন্নতির ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত কলেজে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার যে সনদ দেওয়া হয়েছিল তাতেও প্রতারণার আশ্রয় নেন তিনি।

এসব অভিযোগের সত্যতা পেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিলের সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বিষয়টি উঠে এলে তার প্রভাষক পদে নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। বেতন-ভাতার সরকারি অংশ ফেরতযোগ্য বলে সুপারিশ করা হয় অডিট রিপোর্টে।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে চার মাসের স্থগিতাদেশ পান শামসুল ইসলাম। তবে এরপর আর এই মামলায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই অবস্থাতেই অধ্যক্ষ পদে আসীন হওয়া, চাকরি সরকারিকরণ, তারপর অবসর। অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেবার পর থেকে কলেজের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন শামসুল ইসলাম, গড়ে তোলেন নিজস্ব বলয়। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করলে বেতন বন্ধসহ একাধিক উপায়ে হেনস্তা করতেন তিনি। তাকে সহযোগিতা করেন সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক জয়নুল ইসলাম।

সরেজমিনে দক্ষিণ সুরমা কলেজে গিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখনো তার ভয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, কলেজে থাকাকালীন নিজের খেয়ালখুশি মতো কলেজ পরিচালনা করতেন তিনি। তার বলয়ের শিক্ষক কর্মচারীরা কাজ না করলেও বেতন ভাতা ঠিকই থাকত। অন্যদিকে ন্যায্য কথা বলায় অন্তত দুই বছর ধরে বেতন আটকে রেখেছিলেন এক শিক্ষিকার। নিজে অবসরে যাওয়ার পরেও সেই শিক্ষিকার বেতন-ভাতা চালু করার ক্ষেত্রে নানা তদবির করে আটকে রাখেন।

এ ছাড়া করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও নিয়মিত যানবাহনসহ অন্যান্য ভাতা তুলে নিতেন শামসুল ইসলাম।

দক্ষিণ সুরমা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মতিউর রহমান  বলেন, আমি যতটুকু জানি দুদকে তদন্ত করছে। লাস্ট একটা অডিট এসে একক নিয়োগ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৮ সালে যখন কাগজপত্র নেওয়া হয় তখন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণি সমমান হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমানে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক আরেকটি তদন্ত কমিটি তদন্ত করছে।

এদিকে উচ্চ আদালতে রিটের ব্যাপারটি সুরাহা না হলেও কীভাবে তার চাকরি সরকারি হয়েছে, পদোন্নতি পেয়েছেন এবং অধ্যক্ষ হয়েছেন এসব ব্যাপারে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি অফিস আদেশ জারি করে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে সেই অফিস আদেশের জবাব না দিয়ে উল্টো মাউশিকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সাবেক এই অধ্যক্ষ।

দক্ষিণ সুরমা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. মোছাব্বির চৌধুরী  বলেন, ‘ওনার নিয়োগ কীভাবে হয়েছে তা আমার জানা নেই। মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মাউশির নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই তার চাকরি সরকারি হয়েছে। তবে মাউশির অফিস আদেশ পেয়ে আমি ওনাকে (শামসুল ইসলাম) চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। বিভিন্ন তদন্ত কমিটি তদন্ত করেছে।

দক্ষিণ সুরমা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলাম  বলেন, এই তদন্তের রিপোর্ট তো কতবার প্রকাশ পেয়েছে। এমন যদি হতো তাহলে সরকার কি আমাকে সরকারি করত? সরকারি বেতন-ভাতা কি এমনি দিত? আমি অবসরে চলে গেছি আমার বেতন ভাতা বন্ধ হবে কেন?

আর মন্ত্রণালয়ে তদবির বিষয়ে তিনি বলেন, পেনশনের টাকা পেতে হলে তো তদবির লাগবেই। আর আমি হয়রানির উদ্দেশ্যে জিডি করিনি। টাকা আত্মসাতের জন্য করেছি। আমার বিরুদ্ধে ৭ বারের মতো তদন্ত কমিটি হলো। প্রভাষক নিয়োগে তো মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি ছিল। তারা কি না জেনে নিয়োগ দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার পেনশনের ফাইল এখন মিনিস্ট্রিতে যাওয়ার পথে। গেজেট কেউ বাতিল করার ক্ষমতা নাই- রাষ্ট্রপতি ছাড়া। আমার গেজেট হয়ে গেছে। নিয়োগ অবৈধ বলা হাস্যকর।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:৪৬:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুলাই ২০২৪
১৫২ বার পড়া হয়েছে

সিলেটে ‘অবৈধ’ নিয়োগে প্রভাষক জালিয়াতিতে অধ্যক্ষ!

আপডেট সময় ০১:৪৬:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুলাই ২০২৪
সিলেটে দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতার সনদ জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, অধস্তন শিক্ষকদের হেনস্তাসহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।

অবসরে যাওয়ার পর এখনো নানাভাবে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে আছেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া অবসরকালীন সব ধরনের সুবিধা নিতে বিভিন্ন দপ্তরে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন তিনি। এ নিয়ে চলছে তোলপাড়।

সর্বশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর মুরারি চাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ কমিটির সুপারিশকেও পাত্তা দেননি সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলাম। তিনি বলেন, এমন অনেক কমিটি আর সুপারিশ হয়েছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামছুল ইসলাম গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মতিউর রহমান (প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ), পদার্থবিজ্ঞানের প্রাক্তন প্রভাষক সাব্বির আহমদ ও রসায়নবিজ্ঞানের প্রাক্তন প্রদর্শক মোছা. নাজনীন খান ইভার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ এনে ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সিলেট মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সমন্বিত জেলা কার্যালয়, সিলেটকে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেন।

অভিযোগ দুটি আমলে নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ২৬ মে মুরারি চাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজকে আহ্বায়ক ও একই কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীন ও সহকারী অধ্যাপক ড. বায়েজীদ আলমকে সদস্য করে কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্তে প্রমাণিত হয়, দক্ষিণ সুরমা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শামসুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় প্রভাষক নিয়োগ বৈধ বলে প্রতীয়মান হয়নি। প্রভাষক পদ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার সকল বেসরকারি ও সরকারি আর্থিক সুবিধা স্থগিতের নির্দেশ রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানির উদ্দেশ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরির সত্যতা পাওয়া যায়।

কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে অক্টোবরে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান শামসুল ইসলাম। সেই নিয়োগ পরীক্ষায় একমাত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন তিনি, যা শিক্ষক নিয়োগবিধি অনুযায়ী বৈধ নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি অগ্রহণযোগ্য হলেও শামসুল ইসলাম ছিলেন রেফার্ডপ্রাপ্ত। এ ছাড়া চাকরির পদোন্নতির ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত কলেজে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার যে সনদ দেওয়া হয়েছিল তাতেও প্রতারণার আশ্রয় নেন তিনি।

এসব অভিযোগের সত্যতা পেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিলের সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বিষয়টি উঠে এলে তার প্রভাষক পদে নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। বেতন-ভাতার সরকারি অংশ ফেরতযোগ্য বলে সুপারিশ করা হয় অডিট রিপোর্টে।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে চার মাসের স্থগিতাদেশ পান শামসুল ইসলাম। তবে এরপর আর এই মামলায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই অবস্থাতেই অধ্যক্ষ পদে আসীন হওয়া, চাকরি সরকারিকরণ, তারপর অবসর। অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেবার পর থেকে কলেজের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন শামসুল ইসলাম, গড়ে তোলেন নিজস্ব বলয়। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করলে বেতন বন্ধসহ একাধিক উপায়ে হেনস্তা করতেন তিনি। তাকে সহযোগিতা করেন সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক জয়নুল ইসলাম।

সরেজমিনে দক্ষিণ সুরমা কলেজে গিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখনো তার ভয়ে মুখ খুলতে চান না কেউ।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, কলেজে থাকাকালীন নিজের খেয়ালখুশি মতো কলেজ পরিচালনা করতেন তিনি। তার বলয়ের শিক্ষক কর্মচারীরা কাজ না করলেও বেতন ভাতা ঠিকই থাকত। অন্যদিকে ন্যায্য কথা বলায় অন্তত দুই বছর ধরে বেতন আটকে রেখেছিলেন এক শিক্ষিকার। নিজে অবসরে যাওয়ার পরেও সেই শিক্ষিকার বেতন-ভাতা চালু করার ক্ষেত্রে নানা তদবির করে আটকে রাখেন।

এ ছাড়া করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও নিয়মিত যানবাহনসহ অন্যান্য ভাতা তুলে নিতেন শামসুল ইসলাম।

দক্ষিণ সুরমা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মতিউর রহমান  বলেন, আমি যতটুকু জানি দুদকে তদন্ত করছে। লাস্ট একটা অডিট এসে একক নিয়োগ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৮ সালে যখন কাগজপত্র নেওয়া হয় তখন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণি সমমান হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমানে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক আরেকটি তদন্ত কমিটি তদন্ত করছে।

এদিকে উচ্চ আদালতে রিটের ব্যাপারটি সুরাহা না হলেও কীভাবে তার চাকরি সরকারি হয়েছে, পদোন্নতি পেয়েছেন এবং অধ্যক্ষ হয়েছেন এসব ব্যাপারে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি অফিস আদেশ জারি করে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে সেই অফিস আদেশের জবাব না দিয়ে উল্টো মাউশিকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সাবেক এই অধ্যক্ষ।

দক্ষিণ সুরমা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. মোছাব্বির চৌধুরী  বলেন, ‘ওনার নিয়োগ কীভাবে হয়েছে তা আমার জানা নেই। মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মাউশির নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই তার চাকরি সরকারি হয়েছে। তবে মাউশির অফিস আদেশ পেয়ে আমি ওনাকে (শামসুল ইসলাম) চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। বিভিন্ন তদন্ত কমিটি তদন্ত করেছে।

দক্ষিণ সুরমা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল ইসলাম  বলেন, এই তদন্তের রিপোর্ট তো কতবার প্রকাশ পেয়েছে। এমন যদি হতো তাহলে সরকার কি আমাকে সরকারি করত? সরকারি বেতন-ভাতা কি এমনি দিত? আমি অবসরে চলে গেছি আমার বেতন ভাতা বন্ধ হবে কেন?

আর মন্ত্রণালয়ে তদবির বিষয়ে তিনি বলেন, পেনশনের টাকা পেতে হলে তো তদবির লাগবেই। আর আমি হয়রানির উদ্দেশ্যে জিডি করিনি। টাকা আত্মসাতের জন্য করেছি। আমার বিরুদ্ধে ৭ বারের মতো তদন্ত কমিটি হলো। প্রভাষক নিয়োগে তো মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি ছিল। তারা কি না জেনে নিয়োগ দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার পেনশনের ফাইল এখন মিনিস্ট্রিতে যাওয়ার পথে। গেজেট কেউ বাতিল করার ক্ষমতা নাই- রাষ্ট্রপতি ছাড়া। আমার গেজেট হয়ে গেছে। নিয়োগ অবৈধ বলা হাস্যকর।